দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বর্তমানে বেড়েছে। এ আশা-আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করেই নাগরিকরা চাচ্ছেন কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হোক, যেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ খেয়ে-পরে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারে। এ ধরনের রাষ্ট্র বিনির্মাণের দায়িত্ব বর্তাবে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা সরকারের ওপর। প্রত্যাশা রয়েছে যেন ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর তেমন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে।

তেমন এক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখাই প্রণয়ন করতে চেয়েছেন ড. ইউনূস। সে কারণে প্রায় দেড়-দুই মাসব্যাপী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের বৈঠক হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দেড়-দুই মাসব্যাপী সংস্কার কমিশনের বৈঠকের ফলাফল দেখে আমি পুরোপুরি আশাবাদী হতে পারছি না। কারণ সবচেয়ে বেশি সংস্কার আবশ্যক ছিল অর্থনীতিতে। কিন্তু সেটি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। অথচ অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থনৈতিক ভিত মজবুত না হলে কোনো রাজনৈতিক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে পারে না।

বর্তমান সরকার শুধু হালকাভাবে ওপরের দিকে তাকিয়ে এমন কিছু সংস্কার নিয়ে এসেছে, যা সেভাবে কার্যকর হবে বলে আমার মনে হয় না। সংস্কার প্রস্তাবে আনুপাতিক হারে নির্বাচন, প্রদেশ ভাগ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলো মূলত পুরনো ধারার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনারই প্রতিফলন। বর্তমানে ৩০০ সদস্যবিশিষ্ট সংসদের সঙ্গে সংস্কারের পর ১০০টি নতুন আসন যোগ হয়ে সংসদ সদস্যের সংখ্যা দাঁড়াবে ৪০০। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ অতিরিক্ত সংসদ সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কী হবে? তারা কতটা সৎ হবেন? অতীতে আমরা দেখেছি, অনেক সংসদ সদস্যের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ছিল না। তারা দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করেছেন। সংসদের আসন বাড়ানো মানে যদি অসৎ রাজনীতিবিদের সংখ্যা বাড়ানো হয়, তবে এটি জনগণের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। তাই সংস্কারের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা প্রণয়নে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে সংসদ সদস্যরা জনগণের সম্পদ লুট করে পুঁজিপতি হওয়ার সাহস না পান।

বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো অপরিহার্য। অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে রাজনৈতিক ব্যবস্থাও সুদৃঢ় হবে। দুঃখজনকভাবে সংস্কার আলোচনায় কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি। প্রদেশ বিভাজনের মতো বিষয় বরং অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও আঞ্চলিক বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে—যেমনটি আমরা অতীতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দেখেছি। এছাড়া এ ধরনের বিভাজন ভূরাজনৈতিক সংকটও ডেকে আনতে পারে। বিশেষত প্রতিবেশী রাষ্ট্র দেশে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে।

আনুপাতিক হারে ভোট ব্যবস্থার বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ পদ্ধতি কিছু দল, বিশেষত অতীতে ক্ষমতায় থাকা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত দলের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। তাদের নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক ও সংখ্যালঘু ভোটের কারণে সহজেই উল্লেখযোগ্য আসন পেতে পারে, যা পুরনো রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করবে। এতে সুশাসনের পরিবর্তে পুরনো রাজনৈতিক চর্চা টিকে থাকার ঝুঁকি তৈরি হবে।

সুশাসনের জন্য নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর চেয়ে জরুরি হলো ক্ষমতায় আসা প্রতিনিধিদের চরিত্র, সততা ও জবাবদিহিতা। তারা সম্পদ দেশে রাখেন নাকি বিদেশে পাচার করেন—এর জবাব জনগণ পাওয়ার অধিকার রাখে। আমাদের এমন সরকার চাই, যারা শাসক নয় বরং দায়িত্বশীল অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’—এ মন্ত্রে বিশ্বাসী নেতৃত্বই দেশের কল্যাণে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ আজ নতুন ধরনের রাজনীতির অপেক্ষায় আছে—যেখানে পুরনো ধাঁচের ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা নয়, বরং সৃজনশীল চিন্তাভাবনা ও দায়বদ্ধতা থাকবে। চব্বিশের আন্দোলনে আমরা দেখেছি তরুণদের সংগঠিত ও সুশৃঙ্খল অগ্রযাত্রা, যেখানে নারীর অংশগ্রহণ ছিল নজিরবিহীন। এ আন্দোলনে ঘরের গৃহিণী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসেছিল। সবার লক্ষ্য ছিল নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন।

এমন রাষ্ট্র গড়ে উঠলেই নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই নিজেদের সমান নাগরিক মনে করতে পারবে। রাষ্ট্র হবে সবার, কেউ বৈষম্যের শিকার হবে না। যদি সংস্কারের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। আর যদি পুরনো গতানুগতিক রাজনীতি চলতে থাকে, তবে ২০-৩০ বছর পর নতুন করে বিপ্লবের আহ্বান উঠতে পারে—যা জাতির জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। এত ঘন ঘন অভ্যুত্থান ও অস্থিরতা কোনো জাতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে প্রধানতম বাধা। পুরনো অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের নতুন রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করতে হবে।

আমাদের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা শুধু পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাববে না; বরং ৫০ বা ১০০ বছর পর বাংলাদেশ কোথায় থাকবে তা নিয়ে পরিকল্পনা করবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, ‘A politician thinks of the next election, a statesman thinks of the next generation’। নির্বাচনী জয়লাভ ও আশার বাণী শুনিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী রাজনীতিবিদ নয়, আমরা চাই দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শক্ত ভিত্তি গড়ে যাবে।

অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা হলে তবেই ভালো রাজনীতি গড়ে উঠবে। অর্থনীতিতে বৈষম্য ও দুর্নীতি থাকলে সমাজে দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও অরাজকতা দেখা দেবে। সুতরাং সুষম অর্থনীতি, সুশিক্ষা, জ্ঞানভিত্তিক ও মেধাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যদি আমরা অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারি তাহলে সেদিকে অগ্রসর হতে পারব। শিক্ষার দিকেও অগ্রসর হতে হবে। প্রতিটি সন্তান, নাগরিক যেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, মেধার বিকাশ ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবে এক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রয়োজন আছে।

উদাহরণ হিসেবে যদি বলি, ব্রিটিশ আমলে জমিদারি প্রথার কারণে কৃষকরা ঋণে জর্জরিত ছিলেন। ১৯৩৭ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টির হয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কৃষি ঋণ মওকুফের। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি ‘ঋণ সালিশি বোর্ড’ গঠন করে লাখো কৃষককে ঋণমুক্ত করেন এবং জমিদারি প্রথা বিলোপের উদ্যোগ নেন। ফলে কৃষকরা জমি ও আর্থিক স্বাধীনতা পান। তাদের সন্তানদের লাঙল হাতে মাঠে যেতে হয়নি। তারা কলম হাতে স্কুলে গিয়েছিল। শিক্ষিত হয়ে তারা ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, আমলা হলেন; গড়ে উঠল মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এ অর্থনৈতিক পরিবর্তনই ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের জন্য সচেতন নাগরিক তৈরি করেছিল।

এ উদাহরণ প্রমাণ করে—অর্থনৈতিক ভিত্তি পরিবর্তনের উদ্যোগই একটি জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির সূচনা করে। বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার বিরল সুযোগ এসেছে। এ সুযোগ যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র উপহার দেয়া সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা।

যদি সংস্কারের মাধ্যমে এগুলোর বাস্তবায়ন ঘটে তবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে নিশ্চিত থাকবে। আর যদি আমরা পুরনো ধারা অব্যাহত রাখি, তবে ইতিহাস হয়তো আমাদের আরেকটি বিপ্লবের দিকে ঠেলে দেবে—যা এড়ানোই উত্তম।

ড. নুরুল আমিন বেপারী: সাবেক চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়