এককভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক রফতানির বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের শীর্ষ পোশাক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান হা-মীম। ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষিত পাল্টা শুল্কের প্রভাব কেমন হতে পারে বলে মনে করছেন?

বর্তমানে কাস্টমার অতিরিক্ত শুল্কভারের বোঝা রফতানিকারকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইছেন। এ পরিস্থিতিকে একটা স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে যেতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগবে বলে ধারণা করছি। আমরা কাস্টমারের ওপর নির্ভরশীল, আমাদের নিজেদের কিছু করার নেই। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাস্টমারের বোঝা বহনে আমাদের অংশ নিতে হচ্ছে। কতদিন হবে এটা কাস্টমার বা ক্রেতারা নিজেরাও জানেন না। তবে ভারতের ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা উচ্চ শুল্ক অপরিবর্তিত থাকলে তা বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা। কারণ ক্রেতারা ভারত থেকে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ সরিয়ে নেবেন, যার একটা অংশ আসতে পারে বাংলাদেশে। এরই মধ্যে যা ঘটতেও শুরু করেছে। তার পরও শুল্কের চাপ আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। এজন্য সরকারের কাছে কোনো কিছু চাওয়ার অবস্থাও নেই। সরকারের থেকে কিছু আশা করাটা এখন দুরাশা। কারণ সরকার এমনিতেই সংকটের মধ্যে আছে। আমাদের প্রাপ্য নগদ সহায়তা অনেক বাকি পড়ে আছে। যেটা সরকারের দেয়ার কথা, দিতে পারছে না। তাৎক্ষণিকভাবে বর্তমান চাপ সামলাতে আমাদের যে উৎসে কর দিতে হয়, সেটা বন্ধ করতে পারলে উপকার হতো।

সামগ্রিকভাবে শুল্ক বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় প্রায় ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়, যার মধ্যে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারই পোশাক শিল্প। এ বিশাল বাজার হারানোর ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন। ট্যারিফ নিয়ে আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার সমস্যার কারণে চীন ইউরোপের দিকে ঝুঁকবে এবং রফতানি বহুমুখীকরণ করবে। ফলে আমেরিকার ওপর তাদের নির্ভরতা কমবে, যা অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন করে তুলবে। অন্যদিকে এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিদ্যমান জিরো ট্যারিফ সুবিধা আর থাকবে না। এতে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে যাবে, এমনকি হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে। প্রাইভেট সেক্টরে ঋণের পরিমাণ কমছে এবং বিনিয়োগের অভাব দেখা যাচ্ছে। ফলে রাজস্ব সংগ্রহ কম হচ্ছে এবং কর্মসংস্থান কমছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় অর্থনীতিকে বিনিয়োগ ও কর্মমুখী করতে হবে। কাঁচামালের ওপর আরোপিত ট্যারিফ প্রত্যাহার করে জিরো ট্যারিফ করা উচিত, কারণ কাঁচামালই উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভিত্তি। বাণিজ্য ঘাটতির দিকে নজর দেয়া এবং আমদানি কমিয়ে রফতানি বাড়ানোর জন্য ট্যারিফ শূন্য করার বিকল্প নেই। পোশাক শিল্পের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের ওপর জোর দিতে হবে। আমেরিকার পাল্টা শুল্ক বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণ গতিশীল হচ্ছে না কেন?

বাজার বহুমুখী ও পণ্য বহুমুখীকরণের উদ্যোগ দীর্ঘদিনের। এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রধান বাধা হলো ইউটিলিটি। একদিকে সহজলভ্য না আবার দামও বেশি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হলেও বাংলাদেশে তেমন সুযোগের অভাব রয়েছে। ইউটিলিটির ক্ষেত্রে পদে পদে বাধা এবং এর অত্যধিক দামের কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে ইউটিলিটিকে সহজলভ্য করতে হবে। প্রতিযোগী দেশগুলো তাদের বিনিয়োগকারীদের কী সুবিধা দিচ্ছে, সে বিষয়ে নজর রাখা জরুরি। বর্তমানে সরকারের ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। আমরা যদি রফতানি বাড়াতে পারি তাহলে আর আইএমএফের দিকে তাকাতে হবে না। যখন রফতানি বাড়বে, তখন মৌলিক কাঁচামালের আমদানিও বাড়বে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়বে এবং সরকারি ঋণের পরিমাণ কমবে।

বৈশ্বিকভাবে এখন ম্যান মেড ফাইবার (এমএমএফ) ব্যবহার বাড়ছে। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এমএমএফ পণ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে করণীয় কী?

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রফতানির ৭৫ শতাংশ কটনবেজড হওয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী দাম বেশি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা কটনবেজড পণ্য থেকে সরে গিয়ে ম্যান মেড ফাইবারের দিকে ঝুঁকছে। এক্ষেত্রে চীন ও ভিয়েতনাম অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশে ম্যান মেড ফাইবার তৈরির সুযোগ এখনো তেমনভাবে তৈরি হয়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্পূর্ণরূপে আমদানিনির্ভর। এ পরিস্থিতিতে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে ম্যান মেড ফাইবার উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। তবে ব্যাংকের উচ্চ সুদহার ও ইউটিলিটির অতিরিক্ত দামের কারণে নতুন বিনিয়োগে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। ঝুঁকি বেশি এবং সরকারের সুযোগ-সুবিধা কম থাকার কারণেও নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হচ্ছে না। যেমনটা আগে বলেছি, এক্ষেত্রেও প্রতিবেশী দেশ কী ধরনের সুবিধা বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে দিচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে সংগতি রেখে আমাদের জন্যও সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে।

নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি কি কোনো প্রভাব রাখছে?

নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবশ্যই প্রভাব ফেলছে। ব্যবসায়ীরা একটি স্থিতিশীল সরকার চান। কারণ ব্যাংক ঋণের সুদের চাকা ঘুরতে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের অস্থায়ী প্রকৃতির কারণে বিদেশী এবং দেশীয় বিনিয়োগকারীরা কেউই এর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে পারছে না। বিনিয়োগকারীরা একটি স্থিতিশীল সরকার চান, যা দ্রুত গঠিত হলে সরকারের ওপর নির্ভরতা বাড়বে এবং বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে বলে আমি মনে করি।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বিষয়ে কিছু বলতে চান?

আমরা মনে করছি যে এ মুহূর্তে সরকারের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না। যে প্রস্তুতির দরকার ছিল সেটা আমাদের নেই। আমাদের ইউটিলিটি নেই, গ্যাসের চাপ কম, এলএনজি আনতে পারছি না। স্থানীয়ভাবে গ্যাসের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। যতদিন না জ্বালানি প্রাপ্যতা নিশ্চিতের বিষয়টি স্পষ্ট হবে, ততদিন নতুন বিনিয়োগ আসবে না।