বাংলাদেশের মতো স্বল্প থেকে মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে ধাবমান দেশে দ্রুত, টেকসই ও সুষম উন্নয়ন ও ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ব্যয় নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব সম্পদ অপরিহার্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জাতীয় রাজস্বের প্রায় ৮৭ শতাংশ ও কর রাজস্বের প্রায় ৯৫ শতাংশ আহরণ করে আসছে। জিডিপির হিসেবে ওই অবদান প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। ক্রমবৃদ্ধিশীল জাতীয় আয়ের আয়তন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নিরিখে এর মাধ্যমে আরো অনেক বেশি রাজস্ব অর্থাৎ জিডিপির হিসেবে প্রায় ১৫-১৬ শতাংশ পর্যন্ত আয়ের সম্ভাবনা থাকাটাই সংগতভাবে স্বাভাবিক। শুল্ক ও কর রাজস্বের চারটি প্রধান ভূমিকা (যা ফোরআর নামে খ্যাত) যথা রেভিনিউ বা রাজস্ব আহরণ, রিডিস্ট্রিবিউশন বা সম্পদ পুনর্বণ্টন, রিপ্রাইসিং বা মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও রিপ্রেজেনটেশন বা রাজস্ব পরিশোধের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা অর্জনের অধিকার। এ নিরিখে দেশে কাক্ষিত বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে শুল্ককর রাজস্বে অনিবার্য ভূমিকা রয়েছে। যেহেতু চব্বিশের ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার তাগিদ ও তাৎপর্যের আলোকে রাজস্ব খাতের সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ সুবাদে সামনে এসেছে শুল্ক কর রাজস্ব আহরণকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এনবিআরসহ অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ পুনর্গঠন ও এর কর্মধারায় সংস্কার সাধনের প্রাসঙ্গিকতা। প্রত্যাশিত সংস্কার রাষ্ট্রের দায়িত্বে সরকারের রাজনৈতিক দৃঢ়চিত্ত প্রতিশ্রুতি ব্যতিরেকে বাস্তবায়নযোগ্য হবে না। সংস্কার বাস্তবায়ন ও উদ্ভাবন উদ্যোগে স্বয়ং শুল্ক ও কর খাতের দক্ষ, কর্মনিষ্ঠ লোকবলের স্বতঃস্ফূর্ত সক্রিয় অংশগ্রহণ ও তাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি সাপেক্ষ হবে।
এটা প্রণিধানযোগ্য যে দ্রুত, টেকসই ও সুষম উন্নয়ন ও উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণপূর্বক ক্রমান্বয়ে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হতে ক্রমাগত বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ১২ শতাংশে ও ২০৩৫ সালে ১৫ শতাংশ করার প্রত্যাশা, পরিকল্পনা ও সুযোগ রয়েছে। এনবিআর কর্তৃক আহরিত বর্তমান রাজস্বের প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ পরোক্ষ প্রকৃতির কর। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ করেরও বিরাট অংশ পরোক্ষ প্রকৃতির কর হিসেবেই আদায় করা হয়। সিংহভাগ রাজস্ব পরোক্ষ প্রকৃতির কর বিধায় আহরণের সে ধারা পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করে আমদানি পর্যায়ে বাণিজ্যিক কর হিসাবে প্রকৃত আহরিত রাজস্ব বর্তমানের প্রায় ৩২-৩৩ শতাংশ হতে কমিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশে ও ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং স্থানীয় মূসক/ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক রাজস্ব বর্তমানের ৩৫-৩৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ রেখে আয়কর ও করপোরেট করের বর্তমান মোট অবদান ৩২-৩৩ শতাংশ অর্থাৎ প্রকৃত অবদান ২০-২৫ শতাংশ হতে বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশে ও ২০৩৫ সালে ৫০ শতাংশে বৃদ্ধি যৌক্তিক হবে। আর সে লক্ষ্যে বিদ্যমান শুল্ক, মূসক/ভ্যাট, রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি), সম্পূরক শুল্ক (এসডি), আয়কর ও করপোরেট করহার-সংক্রান্ত নীতিকাঠামোয় রাজস্ব, বিনিয়োগ, আদর্শ কর আরোপন নীতি ও উত্তম চর্চা, স্বতঃস্ফূর্ত/স্বেচ্ছায় পরিপালন পরিপন্থী বিরাজমান প্যারাট্যারিফ, বিকৃত কর (dis torted tax) হার ও নীতিগুলো থেকে সময়াবদ্ধ পরিকল্পনার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে বেরিয়ে আসতে হবে। আর তা করতে হলে করনীতি প্রণয়ন থেকে অব্যাহতিপূর্বক এনবিআরকে সরকারের বিভাগ মর্যাদায় বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামগ্রিক (holis tic) ও সমন্বিত (integrated) পদ্ধতিতে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তিতে শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার বিকল্প নেই। এটিকে কোনো কোনো মহলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করা হচ্ছে বলে ধারণা ছড়ানো হচ্ছে। প্রকৃত প্রস্তাবে প্রাতিষ্ঠানিক এ সংস্কারের দ্বারা এনবিআর উচ্চমর্যাদায় উন্নীত করা হচ্ছে এবং এনবিআরের নীতি প্রণয়নসংক্রান্ত কর্মভার আলাদা একটি বিভাগে বিন্যস্ত করা হচ্ছে। যা হোক বাস্তবতার আলোকে আইনটিতে এমন কিছু সংশোধনী আনার পর্যায়ে আছে, যাতে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন বিভাগ ও রাজস্ব বাস্তবায়ন বিভাগ দুটোই বিশেষায়িত ও কার্যক্রমের দিক থেকে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ও পরিপূরক প্রতিষ্ঠান বলে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্ব, তথ্য আদান প্রদান, সহযোগিতা ও যোগাযোগ স্বতঃস্ফূর্ত, তাৎক্ষণিক, সামগ্রিক, সমন্বিত ও সহযোগিতামূলক হওয়ার আবশ্যকতা সুনিশ্চিত হতে পারে।
রাষ্ট্রের আয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আয়ের বণ্টনমূলক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশের স্থিতিশীলতা সংরক্ষণ, মুদ্রাপাচার, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির প্রসার ও দুর্নীতি প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রতিযোগিতামূলক বা ণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি এবং রফতানির বহুমুখীকরণ ইত্যাদি বিবিধ উদ্দেশ্যে রাজস্ব বাস্তবায়ন বিভাগ বা পুনর্গঠিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডই জাতীয়ভাবে সবচেয়ে প্রভাব সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান বিধায় এর আমূল সংস্কার/আধুনিকায়ন উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী বাধা সৃষ্টি করতে পারে—এ আশঙ্কা ও বিবেচনা থেকে এর সংস্কারে রাষ্ট্রের তথা সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক প্রত্যয়/অঙ্গীকার স্পষ্ট না হলে রাজস্ব খাতের সংস্কার সফল হতে পারবে না, শুল্ক কর রাজস্ব খাতের যে সাফল্য সবার কাম্য।
শুধু এনবিআরের (যা এতদিন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে একীভূত সংস্থা হিসেবে পরিগণিত হত) আক্ষরিক পুনর্গঠন নয়, রাজস্ব নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগে শুল্ক কর রাজস্ব আহরণ পদ্ধতি প্রক্রিয়া আধুনিকীকরণসহ বিদ্যমান আইন কানুনকে যুগোপযোগীকরণ, সংশোধন, সংযোজন বিশেষ করে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সংস্কারের সুপারিশ ও দিকনির্দেশনা, অংশীজনের মতামতের আলোকে তুলে ধরার কাজই সংস্কার কমিটির মুখ্য দায়িত্ব বিবেচনায় রয়েছে। মূলত এবং মুখ্যত ক. রাজস্ব নীতি সংস্কার; খ. রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন বিষয়ে পরামর্শ প্রদান; গ. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার মূল্যায়ন ও আধুনিকায়নের সুপারিশ প্রদান; ঘ. শুদ্ধাচার ও সুশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নীতিমালা প্রনয়ন বিষয়ে পরামর্শ প্রদান; ঙ. নাগরিক যোগাযোগ ও অংশীজন সম্পৃক্ততার কার্যক্রম বিষয়ে পরামর্শ প্রদানের জন্য গঠিত কমিটির খসড়া প্রতিবেদন এখন অংশীজনের পর্যালোচনা ও মতামতের জন্য বিবেচনাধীন রয়েছে। +কমিটি প্রস্তাবিত পরামর্শ ও সুপারিশের সংক্ষেপিত রূপ দাঁড়ায় এমন—
উচ্চ ও বৈষম্যমূলক করহার ও আপাতন, বিকৃত, প্যারাট্যারিফ, দ্বৈত কর ও প্রধানত পরোক্ষ প্রকৃতির এবং নির্ভরতার বিদ্যমান আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি/ আরডি/, সম্পূরক শুল্ক/এসডি/, মিনিমাম ও ট্যারিফ ভ্যালু, করের পৌনপুনিকতা সৃষ্টিকারী বহুহারবিশিষ্ট মূসক/ভ্যাট, আয়কর নামে আয়ের স্থলে লেনদেনের ওপর চূড়ান্ত কর হিসেবে পরোক্ষ কর প্রকৃতিতে আদায়কৃত উৎস ও অগ্রিম আয়কর, ব্যাপক অব্যাহতি ইত্যাদিকে পুনঃপর্যালোচনাপূর্বক আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে, রাজস্ব ও বিনিয়োগ এবং স্বেচ্ছা পরিপালন বাস্তবতায় পুনর্বিন্যাস তথা যৌক্তিকীকরণ করা, যাতে তা এসএমইসহ সবার জন্য ন্যায়ভিত্তিক, করভিত্তি সম্প্রসারণ সহায়ক, ব্যয় সাশ্রয়ী, বিনিয়োগ ও রাজস্ব উৎপাদক হয়। একইভাবে আমদানি পর্যায়ের শুল্ক ও কর, স্থানীয় মূসক, অগ্রিম কর ও সম্পূরক শুল্ক এবং আয়কর হার ও তদসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিতে প্রযোজ্য পরিবর্তন আনা।
আদর্শ ব্যবস্থায় মূল্য সংযোজন কর (মূসক) প্রায় সব পণ্য ও সেবার ওপর প্রধানত একক হারে আরোপিত থাকে বিধায় ওই একক হারের পশ্চাদমুখিতা প্রশমনের লক্ষ্যে ওই হারের সঙ্গে প্রধানত সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে অনভিপ্রেত ও বিলাসজাতীয় পণ্য, জন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, প্রাণী ও জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ পরিপন্থী ইত্যাদি প্রকৃতির পণ্যে সম্পূরক শুল্ক বা অতিরিক্ত শুল্ক (যে নামেই হোক) আরোপণ আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত হলেও বাংলাদেশের মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ (২০১২ সালের মূল আইন নয়; বর্তমান আইন)-এর দ্বিতীয় তফসিলের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকৃতির অসংখ্য পণ্যে আমদানি পর্যায়ে বারোটি (১২) ও স্থানীয় সরবরাহ পর্যায়ে আটটি বিভিন্ন হারে আরোপিত সম্পূরক শুল্কের অনেকগুলোই উল্লিখিত রীতিনীতি পরিপন্থী। এর অধিকাংশই বেশি পরিমাণে রাজস্ব আহরণ ও স্থানীয় শিল্পের অযৌক্তিক প্রতিরক্ষণ দাবি হতে উচ্চহারে আরোপিত। ব্যাপকসংখ্যক পণ্যে উচ্চহারে আরোপিত শুল্ক বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মানদণ্ডে প্যারাট্যারিফ নামে পরিচিত। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করার পর এ ধরনের প্যারাট্যারিফ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমদানি পর্যায়ে উল্লিখিত কতিপয় খাত ব্যতীত অন্যান্য খাতে আরোপিত ১৫, ২০, ৩০, ৪৫ ও ৬০ শতাংশে আরোপিত সম্পূরক শুল্ক হার ও স্থানীয় সরবরাহ খাতের সম্পূরক শুল্ক হার সময়াবদ্ধ পরিকল্পনায় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে যৌক্তিকীকরণ করা উচিত।
বর্তমান সংকীর্ণ করভিত্তিকে অবশ্যই সময়াবদ্ধ পরিকল্পনায় প্রত্যাশিত মাত্রায় সম্প্রসারিত করতে হবে। করনেটের বাহিরে অবস্থানকারী উল্লিখিত-সংখ্যক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, করদাতা ও কোম্পানিকে মূসক ও আয়করের নেটে আনতে সময়াবদ্ধ পরিকল্পনায় ও যোগ্য নেতৃত্বে সামগ্রিক ও সমন্বিত ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের ভিত্তিতে বাস্তবায়নের দায়িত্ব সুসংগঠিত ও সক্ষমতাসম্পন্ন পুনর্গঠিত এনবিআরকেই নিতে হবে।
যৌক্তিক ও স্থিতিশীল শুল্ক ও করহার নীতি এবং সহজ পদ্ধতি যথাযথ বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের জন্য আবশ্যক। উত্তম চর্চা পরিপন্থী অযৌক্তিক ও অস্থিতিশীল শুল্ক ও কর এক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। কাজেই বিনিয়োগের স্বার্থে নতুন শিল্প বিনিয়োগ ও বিদ্যমান শিল্পের যৌক্তিক প্রতিরক্ষণ, সুলভ মূল্যে অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্য পণ্যের সরবরাহ, স্থানীয় কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজারমূল্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, জনস্বাস্থ্য ও প্রাণী স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বিদ্যমান হার ও প্রজ্ঞাপনের অসংগতি দূরীকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনিবার্য প্রয়োজন ব্যতীত বিদ্যমান শুল্ক করহার নীতি ন্যূনতম চার-পাঁচ বছর অব্যাহত রাখার ও মৌলিক যেকোনো পরিবর্তন যথাসম্ভব জাতীয় সংসদের মাধ্যমে করা হলে কর ব্যবস্থা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা তৈরি হবে।
বিদ্যমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন তিনটি আইনের (কাস্টমস, মূসক ও আয়কর) বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসন পরস্পর থেকে আলাদাই বলা যায়। ফলে তাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানে প্রচুর ঘাটতি আছে। তাছাড়া কাস্টমসের অ্যাসাইকুডার আংশিক ক্ষেত্রে ব্যতীত প্রত্যেকটি বিভাগের ব্যবস্থাপনার সিংহভাগ এখনো জটিল, ব্যয়বহুল ও অসমন্বিত পদ্ধতিতে ম্যানুয়ালি পরিচালিত। অর্থাৎ তিনটি ব্যবস্থাই এখনো হার্ড কপি ডকুমেন্টস ও জটিল পদ্ধতিভিত্তিক এবং কর কর্মকর্তা ও করদাতার মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ যোগসাজশে পরিচালিত বলে এন্তার অভিযোগ ওঠে। উল্লিখিত পদ্ধতিতে তিনটি কর ব্যবস্থাকে আলাদাভাবে অটোমেটেড করার পর ওই তিনটি ব্যবস্থার সামষ্টিক পরিবেশে প্রত্যেক করদাতার প্রকৃত করদায় জানার জন্য প্রত্যেকটি সিস্টেমের নিজস্ব নিরাপত্তা সংরক্ষণ করতে হবে।
এনবিআরের বিদ্যমান রাজস্ব নীতি
কাস্টমস, মূসক ও আয়কর নীতিকে ওপরের পর্যালোচনার আলোকে রাজস্ব ও ব্যবসাবান্ধব করে সাজাতে ওই নীতি প্রণয়ন কাজকে এনবিআর হতে সরিয়ে আলাদা রাজস্ব নীতি প্রনয়ন বিভাগ গঠন করা হয়েছে। এতদুদ্দেশে ১২ মে ২০২৫ খ্রি. তারিখে জারিকৃত অধ্যাদেশ নিয়ে কিছু মতভেদ দেখা দেয়ায় সরকারের নির্দেশে বিষয়টি পুনঃপর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, যথোপযুক্ত রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন দেশে অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব সৃষ্টিকারী বিবেচনায় অংশীজনদের প্রত্যাশা ও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে প্রণীত বলে ওই সুপারিশের ভিত্তিতে এর মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে আপস না করে প্রস্তাবিত মতে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন বিভাগ ও প্রণীত নীতি বাস্তবায়নার্থে এনবিআরকে সরকারের বিভাগ মর্যাদায় একটি শক্তিশালী বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতির আবশ্যকতা থেকেই যাবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রায় অর্ধশত উৎপাদক-বাণিজ্যিক গ্রুপ আছে। এরাই জাতীয় অর্থনীতির রাজস্ব সম্ভাবনাময় খাতের সিংহভাগের নিয়ন্ত্রক। তাদের অন্তর্ভুক্ত ও তার বাহিরে বড় ও মাঝারি আকারের সর্বোচ্চ ৫০০টি প্রতিষ্ঠানেরই সম্ভাব্য রাজস্বের ৮০ শতাংশ দেয়ার সামর্থ্য আছে। বর্তমানে তিনটি কর ব্যবস্থায় (আমদানি শুল্ক ও কর; স্থানীয় মূসক; আয়কর) আলাদা ও সমষ্টিগতভাবে তাদের প্রত্যেকের প্রকৃত করদায় ও প্রকৃত রাজস্ব জমার তথ্য সমন্বিত ব্যবস্থায় জানার সুযোগ নেই। এ লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে । এসব সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় কার্যভিত্তিক সমন্বিত একক ব্যবস্থাপনা ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে রাজস্ব উৎপাদিকা অবশ্যই বাড়বে। পাশাপাশি হয়রানি, ফাঁকি, যোগসাজশের সুযোগ ও অভিযোগ কমে আসবে।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরসহ সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যেক বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা শহর ও অর্থনৈতিকভাবে প্রবৃদ্ধিশীল এলাকায় মূসক/ভ্যাট ও আয়কর অফিসকে বর্তমানের আলাদা অখ্যাত স্থান, জরাজীর্ণ ভবন থেকে সরিয়ে এনে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও করদাতার পক্ষে সহজে যাতায়াতযোগ্য স্থানে অবস্থিত নিজস্ব ও এনবিআরের সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেমে সংযুক্ত, যোগাযোগ সুবিধাসংবলিত আধুনিক ভবনে স্থাপন করতে হবে। এতে রাজস্ব বিভাগের প্রতি করদাতাদের ভয়, শ্রদ্ধা ও স্বেচ্ছায় পরিপালন বাড়বে।
দেশে মূসকযোগ্য প্রতিষ্ঠান সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ, আয়করযোগ্য প্রতিষ্ঠান প্রায় চার কোটি ও দৈনিক আমদানি ও রফতানি বিল অব এন্ট্রি ও বিল অব এক্সপোর্টস সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। অন্যদিকে এনবিআরের তিনটি কর ব্যবস্থাই এখন পর্যন্ত প্রধানত ম্যানুয়েল ও ডকুমেন্টভিত্তিক। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশন এখনো প্রায় প্রাথমিক পর্যায়ে। বিশাল এ রাজস্ব পরিবেশ পরিচালনার জন্য কর্মরত জনবল মাত্র সাত-আট হাজার। ওই-সংখ্যক কর্মকর্তার পক্ষে এ বিশাল প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে দেখা সম্ভব নয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উত্তম সমাধান হচ্ছে (ক) স্বনির্ধারণী ব্যবস্থা, কার্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও গোয়েন্দা তথ্য এবং ঝুঁকিকেন্দ্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন।
পুনর্গঠিত এনবিআরকে এর মানবসম্পদের যৌক্তিক সংখ্যা, দক্ষতা, মান ও পারফরম্যান্স বৃদ্ধি এবং শুদ্ধাচার চর্চার দিকে বিশেষ নজর দেয়া। কর সংস্কৃতির উন্নয়নে শুধু এনবিআরের ভূমিকার দিকে তাকিয়ে থাকলেই হবে না। পাশাপাশি দেশে অব্যাহতভাবে জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক চর্চা, আর্থিক ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় জনকল্যাণ ও গুনগতমান বজায় রাখা এবং সুশাসন ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য দেশের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে।
ব্যক্তি শ্রেণীর আয়করের হার এক বা দুই বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারণ এবং ব্যক্তি শ্রেণীর নির্ধারিত করদাতাদের স্থূল প্রাপ্তির ওপর নির্ধারিত হারের ন্যূনতম আয়কর আরোপ বিলোপ করা। করপোরেট আয়করের হারের সংখ্যা কমিয়ে আনা, প্রয়োজনবোধে নিরুৎসাহিত খাতের জন্য সারচার্জ আরোপ করা যেতে পারে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৩ ধারায় ন্যূনতম আয়করের বিধান আছে। এ বিধান অনুসারে লাভ-লোকসান নির্বিশেষে স্থূল প্রাপ্তির ওপর শতাংশ হারে ন্যূনতম কর দিতে হয়। আবার ৪০টি উৎসে আয়করের ক্ষেত্রে উৎসে সংগৃহীত আয়কর ন্যূনতম আয়কর হিসাবে আরোপিত হয়। এ ধারণা আয়করের মূলনীতির পরিপন্থী। প্রাথমিকভাবে ব্যক্তি সংঘ ও স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা এবং শিল্পোৎপাদন ও রফতানি ব্যবসায় নিয়োজিত করদাতাদের এ ন্যূনতম আয়করের আওতামুক্ত করে এর প্রভাব পর্যালোচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ৪০টি ধারার মধ্যে সাতটি ধারাকে (ধারা ৮৮, ১০২, ১১৭, ১২৮, ১৩২, ১৩৫, ও ১৩৯) রেখে বাকি ৩৩টি ধারাকে আওতার বাইরে আনা যায়। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে বিধানটি বিলুপ্ত করা যুক্তি যুক্ত হবে।
সিকিউরিটি, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ অথবা অন্য কোনো পরিসম্পদ নির্ধারিত হারে আয়কর প্রদান সাপেক্ষে আয়কর আইন এমনকি অন্য আইনে প্রশ্ন উত্থাপন হতে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, যা বৈষম্যমূলক এবং নৈতিকভাবে সমর্থযোগ্য নয়। অপ্রদর্শিত বিনিয়োগ প্রদর্শনের সুযোগ প্রদানসংক্রান্ত আয়কর আইন, ২০২৩-এর প্রথম তফসিল অংশ ৩ চিরতরে বিলোপ করা যেতে পারে।
আয়কর রিটার্নের বিদ্যমান জটিল অডিট পদ্ধতি সব করদাতার জন্য একই করা হয়েছে, যা যুক্তিযুক্ত নয়। ছোট, মাঝারি ও বড় করদাতাদের জন্য বা আয়কর শ্রেণীর প্রয়োজন অনুযায়ী অডিট এর ব্যাপ্তি flexible রেখে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৮২ ধারার বর্তমান বিধান সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে অডিট ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো প্রয়োজন হবে ।
ছোট করদাতাদের পরিপালন বাড়ানো এবং কর বিস্তারে সহায়তার জন্য ধারণাগত কর (presumptive tax) প্রচলন করা যেতে পারে। স্থূল মুনাফা (gross profit) ভিত্তিক ব্যবসার আয় নিরূপনের ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। এ ধারণা থেকে সরে আসা যেতে পারে।
কর অবকাশপ্রাপ্ত আয়ের বেলায় কর দিবসের পরে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা হলে কর অবকাশ সুবিধা বাতিলের বিধান বিলোপ করে এ-সংক্রান্ত আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৭৪ ধারা সংশোধন করা প্রয়োজন ।
আয়কর আরোপ ও পরিগণনা বহুমাত্রিক তথ্যের ভিত্তিতে করা হয় বিধায় এর হিসাব জটিল। ফলে তথ্য প্রযুক্তির algorithm-এর নকশা তৈরীতে সমস্যা সৃষ্টি করছে। আয়কর পরিগণনায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়কর পরিগণনা সরলীকরণ আবশ্যক।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব; জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ও এনবিআর সংস্কার কমিটির সদস্য










