অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি খুবই নাজুক অবস্থায় ছিল। সে পরিস্থিতি থেকে সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচক স্থিতিশীল হয়েছে। বিগত এক বছরের মূল্যায়ন করলে কিছু ইতিবাচক দিক যেমন রয়েছে, তেমনি অসফলতার পাল্লাও কম ভারী নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে আমরা খুব একটা সফলতা দেখিনি। শুরুতেই সফলতার কথা বলা যাক। বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব নেয় তখন রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। রিজার্ভের ধারাবাহিক ক্ষয় হচ্ছিল। সেই জায়গা থেকে রিজার্ভ পরিস্থিতি অনেকটাই উন্নত হয়েছে। রিজার্ভের পরিমাণ এখন বাড়ছে। এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে রফতানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে কিছু ঋণসহায়তা এসেছে। এতে সার্বিকভাবে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে (বিওপি) কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে। আবার ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে এবং বর্তমানে এ বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। এগুলো ইতিবাচক দিক। তবে আমাদের দাবি ছিল বিভিন্ন খাতভিত্তিক সংস্কারের। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার গঠনকালীন দেশের সমস্ত খাতই এক প্রকার ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। এ ভঙ্গুরতা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। এ প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখব, গত এক বছরে অর্থনীতিতে মৌলিক কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা খুব একটা অগ্রসর হতে পারিনি।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নকামী দেশে উন্নয়নের পথ পিচঢালা বা মসৃণ নয়। তাই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে চাইলে সংস্কারকে একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবেই নিতে হয়। এজন্য বলা হয়, সংস্কার একটা চলমান প্রক্রিয়া। প্রতি মুহূর্তেই সংস্কার কার্যক্রমকে দেশীয় ও বৈদেশিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পরিচালিত করতে হবে। এটা সব দেশেই করতে হয়। আমাদেরও করতে হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে দৃশ্যমান কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে কাঠামোগত কোনো সংস্কার হয়নি। দুর্বল ব্যাংকগুলো এখনো প্রায় একই অবস্থায় আছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা করা সত্ত্বেও সেগুলোর মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। একই অবস্থা অন্যান্য খাতেরও। সব খাতেই কেবল কিছু উপরি সংস্কার (শ্যালো রিফর্ম) হয়েছে। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জন্য আমূল সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এটা করতে পারত।
সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে তখন কিন্তু মৌলিক সংস্কার করা কঠিন হয়। এর মূল কারণ হলো যেকোনো ধরনের সংস্কারকাজের দরুন কিছু লোক লাভবান হয়, আবার কিছু লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের দেশে সাধারণত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় যারা নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। কারণ নিয়ম-নীতিগুলো উচ্চশ্রেণী বা প্রভাবশালীদের পক্ষে থাকে। কাজেই দরিদ্রবান্ধব বা সাম্য মৈত্রী থেকে সমতাভিত্তিক সংস্কারের চেষ্টা করা হলে প্রভাবশালীরা সেগুলোকে বাধা দেয়; বাস্তবায়ন করতে দেয় না।
এজন্য আমরা বলি একটা দেশে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মৌলিক সংস্কারের জানালা খুলে যায়। যেটাকে ‘উইন্ডো অব অপরচুনিটি’ বলে। এ সময় সংস্কারকাজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ ধরনের পরিস্থিতিতে সমাজে আগে থেকে বিত্তবান ও প্রভাবশালীরা অস্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। তাদের ক্ষমতাবলয় সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে সুযোগ সৃষ্টি হয় সত্যিকার সমতাভিত্তিক সংস্কারের। বিভিন্ন সমস্যা দ্রুততার সঙ্গে সমাধান করা সম্ভব হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এক বছরের মধ্যে আমরা এ সুযোগগুলো গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। বিভিন্ন খাতের দিকে যদি আমরা লক্ষ করি, দেখা যাবে কেবল উপরি সংস্কার হয়েছে। দেশের বৈষম্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে যে মৌলিক সংস্কার করার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল তার অনেকাংশই গ্রহণ করা যায়নি। শুধু চিরাচরিত, গতানুগতিক কিছু সংস্কার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা কিছুটা অর্জন করেছি। কিন্তু আরো বেশি অর্জন করার প্রয়োজন ছিল। সেটির সুযোগও ছিল। এটাকে ‘মিস অপরচুনিটি’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। আমাদের জাতীয় উদ্দেশ্য যেমন অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন, টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা ইত্যাদি অর্জনের জন্য যে ধরনের সংস্কার কার্যক্রম নেয়া প্রয়োজন ছিল, সেক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছি।
কয়েক বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। এটি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতির হার একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে না আসা পর্যন্ত নীতি সুদহার কমানো হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব হচ্ছে না। মূলত নীতি সুদ এককভাবে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে সক্ষম নয়। দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বড় কারণ আমাদের বাজার ব্যবস্থা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা। সিন্ডিকেট বা শক্তিশালী ব্যবসায়ী মহল যেভাবে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে সরকারের কার্যকর কোনো সংস্কার দেখা যায়নি। ফলে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে বা আমদানি শুল্ক কমিয়ে ভোক্তাকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে স্বস্তি দেয়া যায়নি। উদাহরণ হিসেবে ভোজ্যতেল কিংবা ডালের বাজারের কথা বলা যায়। শুল্ক কমানো হলেও এর সুফল ব্যবসায়ীরা ভোগ করেছেন, সাধারণ ক্রেতা নয়। মূল্যস্ফীতির হার কমিয়ে আনতে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে, সেগুলো ছিল স্বল্পমেয়াদি ও আংশিক। এক্ষেত্রেও কাঠামোগত কোনো সংস্কার হয়নি। ফলে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সমস্যা নিরসন হয়নি। বাজারে যৌক্তিক প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা তৈরি করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি উপেক্ষিত হয়েছে। মোটকথা, নীতি সুদহারের ওপর নির্ভর করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আমাদের প্রয়োজন প্রকৃত সংস্কার; সিন্ডিকেট ভাঙা, সরবরাহ ব্যবস্থা ও আমদানি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট সহায়তা নিশ্চিত করা। অন্যথায় অর্থনৈতিক বৈষম্য আরো বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির বোঝা সাধারণ মানুষকেই বইতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মৌলিক একটি সংকট হলো বৈষম্য। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে জনগণের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস। কিন্তু বাস্তবে বৈষম্য আরো বেড়েছে। কারণ মূল্যস্ফীতি দরিদ্রকে বেশি আঘাত করে, ধনীদের কম। উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে লাভবান হচ্ছে, আর নিম্নবিত্ত শ্রেণী প্রতিদিন ভোগ করছে সংকট। অর্থনীতির ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন সমাজের দিকে এগিয়ে যাওয়ার যে প্রত্যয় ছিল, সে প্রত্যয় অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের সফলতা অত্যন্ত ক্ষীণ।
দেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ না হওয়ায় বেকারত্ব আরো বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ শতাংশের নিচে। কভিডের সময় আরো কম ছিল। এর পর থেকে এটিই সর্বনিম্ন। দেশে নতুন কোনো বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বাস্তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল দুই-চারটা আশ্বাস পেয়েছি। দেশীয় বিনিয়োগও নেই, বিদেশী বিনিয়োগও নেই। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বা মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি—এ ধরনের সূচকগুলো নিচের দিকে। অর্থাৎ নতুন করে বিনিয়োগ যদি না হয়, উৎপাদন যদি না বাড়ে তাহলে কর্মসংস্থান কোত্থেকে হবে? যত উৎপাদন বাড়বে তত কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। সেজন্যই কর্মহীনের সংখ্যা বা বেকারত্বের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির গতি এখন মন্থর। কর্মসংস্থান
সৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় বাধা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না থাকা। দ্রুত পরিবেশ-পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে।
সরকারি খাতের চেয়ে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান বেশি তৈরি হয়। কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ৬ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। কটেজ, মাইক্রো, স্মল ও মিডিয়াম উদ্যোগেও (সিএমএসএমই) খুব বেশি বিনিয়োগ হচ্ছে না। অর্থাৎ আমাদের উৎপাদনের কাঠামোটা ভেঙে গেছে। এ কাঠামোটা এখনো আমরা পুনরুদ্ধার করতে পারিনি। বিনিয়োগকারীরা যাতে এগিয়ে আসেন এবং উৎপাদন কর্মকাণ্ডে মনোনিবেশ করেন সে রকম পরিস্থিতি আমরা তৈরি করতে পারিনি। বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায় দেশে অরাজকতা বেড়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থানের অভাবে দেশে চুরি-ছিনতাই বেড়ে গেছে। সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে গেছে।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বিনিয়োগে প্রভাব ফেলেছে। বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ চান। সেটি এখন নেই। দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজমান। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এখনো উন্নতি হয়নি।
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ঘোষণার পরও এখনো এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজমান। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার এখনো উন্নতি হয়নি। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারী এক-দুইদিনের কথা চিন্তা করে বিনিয়োগ করবেন না। বিনিয়োগকারী পাঁচ-দশ বছরের চিন্তা করবেন। কারণ তারা যখন অর্থ বিনিয়োগ করবেন, তখন তাকে উৎপাদন করতে হবে এবং সেখান থেকে মুনাফা আসতে হবে। কাজেই তারা দীর্ঘ সময় বিবেচনা করে বিনিয়োগ করেন। ছয় মাস পর কোন সরকার আসবে বা নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা রয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে কেউ বিনিয়োগ করতে আসবেন না। কাজেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সবকিছু মিলিয়েই বিনিয়োগ পরিবেশ। এসব যদি স্থিতিশীল করা না যায় বা বিনিয়োগবান্ধব করা না যায়, তাহলে বিনিয়োগ আসবে না। দেশীয় বিনিয়োগকারী যেমন বিনিয়োগ করছেন না, তেমনি বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগে আরো বেশি উৎসাহী হবেন না। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রাজনৈতিক বা সামাজিক স্থিতিশীলতা না থাকলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকে না। সেক্ষেত্রে আমাদের উৎপাদন, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সব ক্ষেত্রেই একটি নেতিবাচক প্রভাব আমরা দেখতে পাই।
ড. মোস্তফা কে মুজেরী: নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম) ও সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক










