গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশা করেছিলেন পুঁজিবাজারে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে। এক বছর পর পুঁজিবাজারে কতটুকু সংস্কার হয়েছে বলে মনে করছেন?

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং স্টক এক্সচেঞ্জের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সংস্কার নিয়ে সবার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। পুঁজিবাজারের মূল শক্তি হচ্ছে এর ক্রেতা-বিক্রেতা তথা বিনিয়োগকারীরা। আমরা দেখেছি যে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীষণ একটা আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। তারা এই বাজার থেকে সম্পূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তো সেই জায়গায় আমি বলব যে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। আস্থা ফিরিয়ে আনতে কিছুটা সময় লেগেছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য অনুকূল কিছু নীতি সহায়তা আমরা পেয়েছি এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ দিতে হয়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মাধ্যমেও আমরা বিনিয়োগকারী ও বাজার মধ্যস্থতাকারীদের জন্য কিছু সুবিধা আদায় করতে পেরেছি। পাশাপাশি আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি যে বড় ধরনের একটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিল সেখান থেকে কিছুটা স্বস্তির জায়গায় এসেছে। তবে আমি বলব না যে সব চ্যালেঞ্জ দূর হয়ে গেছে। কিন্তু এটা ঠিক যে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছে। ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদের হার কিছুটা কমে এসেছে। পুঁজিবাজারের সঙ্গে মুদ্রাবাজারের সুদহারের একটি সম্পর্ক রয়েছে। এখন সুদের হার কমার কারণে আমরা দেখছি বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারের দিকে আসছেন। তাছাড়া কাঠামোগত যে পরিবর্তনগুলো প্রয়োজন সেখানেও কাজ শুরু হয়েছে। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সেটা নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাজার মধ্যস্থতাকারী—সব ক্ষেত্রেই ভীষণভাবে ঘাটতি ছিল। একটা সময় পর্যন্ত অনিয়মগুলোই নিয়মে পরিণত হয়েছিল এবং পুঁজিবাজার কখনই সরকারের কাছে খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। বিধিবিধানগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে বিনিয়োগকারী ও ইস্যুয়ার কোম্পানিগুলোর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না। আমরা এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি। এতদিকে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে যে হয়তো আমাদের কাজের গতি প্রত্যাশা অনুসারে হয়নি। কিন্তু একই সঙ্গে এটা ঠিক, চ্যালেঞ্জ এত বেশি ছিল যে এগুলো ঠিক করে এনে সামনের দিকে এগোনোর জন্য সময়ের প্রয়োজন।

সম্প্রতি বিএসইসির প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে গত এক বছরে সংখ্যায় কম হলেও পুঁজিবাজারে বড় বিনিয়োগকারীদের পদচারণা বেড়েছে। অন্যদিকে অতি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, বাজারে যাদের সংখ্যাটাই বেশি, তাদের অংশগ্রহণ কমে গেছে। এটি আসলে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে—পুঁজিবাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারছে না, নাকি তারা এখানে টিকে থাকতে পারছে না?

আমাদের পুঁজিবাজারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখন পর্যন্ত এটি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভর। আপনি যদি পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তান বা শ্রীলংকার দিকে তাকান তাহলে ওদের জনসংখ্যার অনুপাতে কত শতাংশ মানুষ পুঁজিবাজারে এসেছে?—দেখা যাবে আমরা এগিয়ে আছি। বড় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়ার কারণ হচ্ছে যে তারা সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোকে অনুসরণ করেন এবং তাদের এ-সংক্রান্ত পরামর্শক সেবা পাওয়ার সুবিধাও রয়েছে। তারা বুঝতে পারছিলেন যে যেহেতু মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসছে তাই সুদের হারও কমবে। বর্তমানে পুঁজিবাজার অনেকটাই অবমূল্যায়িত রয়েছে। তাই বাজারে অবস্থান নেয়ার এখনই সময়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে যেটা সমস্যা হয়েছে যে তাদের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে লোকসান নিয়ে পুঁজিবাজারে টিকে থাকাটা কঠিন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেকেই শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে নিয়েছেন। ফলে বাজার ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে যাওয়ার কারণে অনেকে অর্থের প্রয়োজন মেটাতে শেয়ার বিক্রি করেছেন। আরেকটা দিক হচ্ছে যে বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক বিনিয়োগের জায়গা হচ্ছে মিউচুয়াল ফান্ড। কিন্তু যেহেতু আমাদের মিউচুয়াল ফান্ড খাতটির সেভাবে উন্নতি হয়নি সেহেতু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ইকুইটিতে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। তাছাড় আমাদের ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজও তেমন নেই। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য ইকুইটিতে বিনিয়োগে ঝুঁকি বেশি। আমরা আশা করছি পুঁজিবাজার যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবের বার্ষিক নবায়ন ফি ৪৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৫০ টাকা নির্ধারণ করার কারণে সামনে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়বে। সামনে হয়তো আমরা দেখব কিছু কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসছে, সেক্ষেত্রেও আরো বেশি বিনিয়োগকারী বাজারের প্রতি আগ্রহী হবেন।

আপনি নতুন আইপিওর কথা বলেছেন। আমরা দেখেছি যে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারে নতুন আইপিও আসছে না। আইপিও আনার জন্য আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী সে বিষয়ে জানতে চাই?

আপনি ঠিকই বলেছেন যে আমাদের গত এক বছরে কোনো আইপিও আসেনি। আসলে গত একটা বছর বা তার আগে থেকে আমরা বেশ অস্থির এক সময় পার করেছি। তাছাড়া আইপিও প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও কিছুটা সময় লাগে। আমাদের পুঁজিবাজারে বড় মূলধনি কোম্পানি—যাদের আমরা ব্লু-চিপ কোম্পানি হিসেবে অভিহিত করে থাকি—বেশ কম। সব মিলিয়ে আমাদের এ ধরনের ৪০টি কোম্পানি আছে, যেখানে স্বচ্ছন্দে বিনিয়োগ করা যায়। এসব কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর আমরা ভরসা রাখতে পারি। এখন আমাদের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ ধরনের ব্লু-চিপ কোম্পানির সংখ্যা কীভাবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা ২০০-২৫০টিতে নিয়ে যেতে পারি। এতে আমাদের পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়বে এবং সেটিই বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশা করে। বাজেটে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে কর ব্যবধান বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। সম্ভাব্য স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রাখছি। আইপিও প্রক্রিয়ার সময় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে আমরা বলেছি যে ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর জন্য আমরা গ্রিন চ্যানেল ব্যবহার করব এবং যেখানে তারা দুই মাসের মধ্যে তালিকাভুক্ত হতে পারবেন। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে শেয়ারদর নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটা আর্বিট্রারি সিলিং দেয়া হতো। এ বিধান পরিবর্তন করা হচ্ছে। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত বিধান পরিবর্তন না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত ওয়ান টু ওয়ান ভিত্তিতে যুক্তিসংগতভাবে এক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হবে। আমরা আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একটা ইভেন্ট করব। সেখানে আইপিওর জন্য সম্ভাব্য কোম্পানির উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানাবে। পুঁজিবাজার নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে সেখান থেকে তাদের বের করে আনার জন্য আমাদের ধারাবাহিকভাবে আলোচনার মধ্যে থাকতে হবে। পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে হবে এবং বিধিবিধানগুলোকে সহজীকরণ করতে হবে। এ তিন জায়গায়ই কাজ হচ্ছে।

আমরা দীর্ঘদিন ধরেই দেখছি যে এফডিআরের সুদ ডিএসইর আয়ের মূল উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ পুঁজিবাজার থেকে আসা আয়ই স্টক এক্সচেঞ্জের মূল আয় হওয়ার কথা ছিল। আয় ও মুনাফা স্থিতিশীল না হলে স্টক এক্সচেঞ্জের সেলফ লিস্টিং করা সম্ভব হবে না। ডিএসইর ব্যবসায়িক ও আর্থিক পারফরম্যান্স আরো গতিশীল করার জন্য আপনাদের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাই।

এফডিআরের সুদের কারণে আমরা নিট মুনাফায় আছি। কিন্তু আমাদের পরিচালন আয় থেকে গত দুই-তিন বছর মুনাফা করতে পারছি না। এর মূল কারণ হচ্ছে আমাদের যে বিদ্যমান ব্যয় কাঠামো আছে সেখানে পুঁজিবাজারে দৈনিক ৮০০ কোটি টাকা লেনদেন হলে আমরা ব্রেক ইভেনে থাকি। কভিড, ফ্লোর প্রাইসের মতো কারণে আমাদের লেনদেন অনেক কমে গিয়েছিল। আমরা আশাবাদী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মুনাফায় ফিরে যাব।

পুঁজিবাজারে কারসাজির বিষয়টি বেশ আলোচিত। বর্তমানে কারসাজি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে নাকি এক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতার ঘাটতি রয়ে গেছে?

আপনারা দেখেছেন কারসাজির বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা খুব কঠোরতার সঙ্গে এগোচ্ছে এবং খুবই ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব যারা ছিলেন এ পুঁজিবাজারের সঙ্গে তারাও ছাড় পাননি। বাংলাদেশের ইতিহাসের আগে বোধ হয় এ রকম ঘটনা ঘটেনি। তো এটা বাজারকে অবশ্যই একটা বার্তা দিয়েছে। আমি বলব না যে শতভাগ কারসাজি দূর হয়ে গেছে। কিন্তু এখন একটা কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে চলে এসেছে। কারসাজিকারীদের ভূমিকা ধীরে ধীরে কমে আসছে। কিছু ক্ষেত্রে আমাদের এখনো কাজ করতে হবে। যেমন একটা হচ্ছে তালিকাচ্যুতি। দুর্বল যে কোম্পানিগুলো আছে যাদের কার্যক্রম বন্ধ এগুলোকে তালিকাচ্যুতির উদ্যোগ নিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সাময়িক কিছু কষ্ট হলেও আমাদের যেসব কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে তাদের তালিকাচ্যুত করতেই হবে। এসব কোম্পানিতে যারা উদ্যোক্তা ছিলেন তারা যদি কোম্পানির অর্থ বের করে নিয়ে যান, অনিয়ম করেন, সেক্ষেত্রে তাদের কীভাবে শাস্তির আওতায় আনা যায় সেটি নিশ্চিত করেই আমরা কাজগুলো করব।