অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
স্বাভাবিকভাবে সাধারণ জীবনে আশা-প্রত্যাশার সৃষ্টি হয় একটা সরকার থেকে। যেহেতু একটি নতুন সরকার এসেছে, তাই জনগণের মধ্যে প্রত্যাশা বাড়বেই। যদিও আমি মনে করি এই মুহূর্তে প্রত্যাশা করা বা আকাঙ্ক্ষা করা একেবারেই ঠিক নয়। যখন কোনো আশা বা প্রত্যাশা থাকে না, তখন কী পূরণ হলো আর কী পূরণ হলো না, তা নিয়ে আমি চিন্তা করি না। এর কারণ আশা এবং প্রত্যাশা সৃষ্টি হয় একটা নির্বাচন থেকে। নির্বাচনের আগে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল জনগণকে একটি ম্যানিফেস্টো ও প্রতিশ্রুতি দেয়। সেখানে অনেক কিছু লেখা থাকে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল এবং রাজনীতিবিদরা মিথ্যা কথা বলতে বলতে অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে এবং তারা যা বলে সেখানে পূরণ করার মতো অনেক জিনিসই বলেন না। তার পরও আমরা তাদেরকে দায়বদ্ধ করতে পারি। কারণ তাদের বলা যায় যে আপনি ভোট নেয়ার আগে এই কথাগুলো বলেছেন। কিন্তু আপনি এখন উল্টো দিকে যাচ্ছেন বা এ কাজগুলো করছেন না। আশা ও প্রত্যাশার সৃষ্টিটা আমাদের ঠিক নেই, কাজেই এখানে পূরণ হওয়া নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই।
যদি বাস্তবতার নিরিখে দেখা যায়, নির্বাচন হোক বা না হোক, কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকে। এর মধ্যে প্রথমে আসে রাজনৈতিক প্রত্যাশা, তারপর সামাজিক এবং সবশেষ অর্থনৈতিক প্রত্যাশা। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রথমে আমরা চাই একটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তারপর রাজনৈতিক নিশ্চয়তা। এখন পর্যন্ত শতভাগ রাজনৈতিক নিশ্চয়তা আছে বলে মনে হয় না। যদিও আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যখন নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসবে এবং নির্বাচন কমিশন তাদের রোডম্যাপ দেবে, আমরা সবাই যখন নির্বাচনের জন্য তৎপর হব, তখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা অনিশ্চয়তা কমে আসবে। স্থিতিশীলতা তখনই আসবে যখন দেশে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি রাজনৈতিক সরকার গঠিত হবে। যে সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হবে। কারণ নির্বাচিত সরকারের সমাজ, জাতি এবং ভোটারের কাছে দায়বদ্ধতা থাকে। অনির্বাচিত সরকারের সেই দায়বদ্ধতা থাকে না। বর্তমান সরকারকে অন্তর্বর্তী সরকার বলা হলেও সংবিধানে এমন কোনো অন্তর্বর্তী সরকার নেই। যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট নেয়া হতো, তবে আগে একটা বাধ্যবাধকতা ছিল যে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে, যা এখন নেই। এখন বর্তমান সরকার যদি নির্বাচন না দেয়, তাহলে কী হবে? এর অর্থ হলো দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দুটোই বিদ্যমান। তাই নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাশা পূরণ হবে না।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যাশার বিষয়ে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, প্রতিদিন খবরের কাগজে যে খবরগুলো আসে সেগুলোয় মনে হয় যে এই সমাজে স্থিতিশীলতা আছে বা শৃঙ্খলা আছে? সম্প্রতি একদিন সকালেও দেখলাম যেখানে দেখা যাচ্ছে জনৈক ব্যক্তি প্রথমে স্ত্রীকে মেরেছেন, দুই ছেলেকে বা মেয়েকে মেরেছেন। এরপর নিজেকেও মেরেছেন, বলেছেন দেনা ও খাওয়ার অভাবে আমি নিজেকে মেরে ফেললাম। এ রকম খবর সংবাদপত্রে প্রতিদিন আসে। ভাই কর্তৃক ভাইকে মারা বা বাবা কর্তৃক ছেলেকে মারার ঘটনাও ঘটছে। সুনামগঞ্জ বা কোনো এক জায়গায় ফুটবল নিয়ে মারামারির ঘটনায় দুজন মারা যাওয়ার খবরও কানে এসেছে। যখন এমন সামাজিক বিশৃঙ্খলা থাকে, মানুষ মারা যায়, তখন কোন মানদণ্ডে দেশে সামাজিক শৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা বা প্রাণের নিরাপত্তা আছে বলা যাবে? এ প্রত্যাশা যদি কারো পূরণ হয়ে থাকে, তবে তা উপদেষ্টাদের হতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের পূরণ হয়নি।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে বলতে হয় অর্থনীতির একটি সূচক দেখান, যেই সূচকে আমরা বলতে পারি যে উন্নতি হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর ক্ষেত্রে প্রথমেই আসবে ভোগ বা খরচ (কনজামশন)। এটা একদম খারাপ তা বলব না। সাধারণত আয় বাড়লে ভোগ বা খরচ বাড়ে। তবে বাংলাদেশে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিচার করা যায় না, কারণ গ্রামগঞ্জে খরচ বাড়ে বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের কারণে। এই রেমিট্যান্সের বিতরণ দেশের সম্পদের পুনর্বণ্টনের চেয়েও ভালো হয়, কারণ যারা বিদেশ থেকে টাকা পাঠায়, তারা মা-বাবা বা ছেলেমেয়ের জন্য পাঠায় এবং এটি দেশজুড়ে মোটামুটি ভালোভাবে বিতরণ হয়। এই টাকা খরচ হওয়ার কারণে কনজামশন একটি মোটামুটি পর্যায়ে আছে। কিন্তু ওই পর্যায়ে নেই যে পর্যায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। হয়তো রেমিট্যান্সের কারণে দারিদ্র্যের মাত্রা গ্রামে কম দেখা যেতে পারে।
কনজামশনের পর আসে সরকারি ব্যয় (গভর্নমেন্ট এক্সপেন্ডিচার)। গত বছর সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৮-২০ শতাংশ কমেছে। দেশের আয় কম হলে দেশ কীভাবে বেশি ব্যয় করবে? এছাড়া বিদেশ থেকে যে টাকা আসার কথা ছিল তা আসেনি, যদিও পাইপলাইনে অনেক টাকা আছে, কিন্তু ডিসবার্সমেন্ট হয়নি। তাই সরকারি ব্যয় আগের তুলনায় কমেছে।
তৃতীয়ত, বিনিয়োগ। কোনো বিনিয়োগ হয়েছে, এমনটা আমার চোখে ধরা পড়েনি। কিছুদিন আগে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি ২৮ শতাংশ কমে যাওয়ার খবর এসেছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমলে বিনিয়োগ হয়নি এবং উৎপাদন কমে গেছে, যা প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার লক্ষণ। আবার বিনিয়োগের সঙ্গে কর্মসংস্থান জড়িত। যদি প্রতি বছর ২০-২২ লাখ ছেলেমেয়ে চাকরির বাজারে আসে এবং বিনিয়োগ না হয়, তাহলে কর্মসংস্থান কীভাবে হবে। আবার বিনিয়োগের তো কিছু রকম আছে। পদ্মা ব্রিজের মতো বড় প্রকল্পে ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও সেখানে কর্মসংস্থান খুবই সীমিত। তবে ৩০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে ৩০টি গার্মেন্টস করলে প্রতিটি কারখানায় ৫ হাজার করে ধরলে, দেড় লাখ লোকের কর্মসংস্থান হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতো। এর মানে এই নয় যে পদ্মা ব্রিজের প্রয়োজনীয়তা নেই। পদ্মা ব্রিজের রিটার্ন সামাজিক মূল্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। শুনেছি দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ লোক প্রতিদিন ঢাকা শহরে আসে, ব্রিজ হওয়ার কারণে যদি তাদের ১ ঘণ্টা করে সময় বাঁচে, তাহলে ২০ লাখ কর্মঘণ্টা বাঁচে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বাঁচানো সময় দিয়ে মানুষ কী করবে, যদি কর্মসংস্থান না থাকে, তাহলে এ সময়ের কোনো মূল্য নেই। এজন্যই বলছি যে বিনিয়োগ নেই।
আমদানি ও রফতানির বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে রফতানি ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়েছে। যদিও মাঝেমধ্যে শুনতে পাই যে রফতানিবাবদ প্রাপ্য অর্থের কিছু অংশ বাংলাদেশে ফেরত আসে না বা গায়েব হয়ে যায়। যদি ধরে নিই যে রফতানি প্রবৃদ্ধির সরকারি তথ্য সঠিক, তাহলে এটি একটি উন্নতি, কারণ আমদানি প্রায় ১২-১৩ শতাংশ কমে গেছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির এই নির্দিষ্ট সূচক কিছুটা বেটার মনে করছি।
গত ১০ বছরে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬-৭ শতাংশের মতো। গত বছর তা ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এবার শুরু হয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ দিয়ে। ১৮ কোটি মানুষের দেশে যেখানে জনসংখ্যা ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ে, সেখানে ৩ দশমিক ২, ৩ দশমিক ৯ বা ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আমি মনে করি কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি পাঁচজনের একটি পরিবারে ৫ হাজার টাকা আয় থাকে, লোকসংখ্যা ১ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়ে ধরলে পরিবারের সংখ্যা যদি ছয়জন হয়, পাশাপাশি যদি আয় না বাড়ে, তাহলে অবশ্যই আমাকে ধার করতে হবে। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, চার বছর ধরে মজুরির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম, ফলে মানুষের আয় বাড়েনি। এখন কেউ যদি বলে এই সরকার এক-দেড় বছরের জন্য এসেছে, তারা কী করবে? আমি তা মেনে নিয়েই তাদের কাছে কোনো প্রত্যাশা করি না। প্রত্যাশা তাদের কাছে রাখা উচিত যারা আমাদেরকে আশা দেখাবে। এবং তারাই আশা দেখাবে যারা দেশের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা যদি দেশে একটা সরকার গঠন করতে পারি, সেই সরকারের কাছে আমাদের অনেক চাওয়া-পাওয়ার বিষয় থাকবে। তখন প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিবিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দেয়া সহজ হবে, এখন এই উত্তর দেয়াটা অনেক কঠিন।
এক বছরে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা আপনার মূল্যায়নে কেমন?
ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি কমেছে কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় আমি অনেক ইতিবাচক যে, অনেক ব্যাংকেই এখন অনিয়ম হতে পারছে না, দুর্নীতিও হচ্ছে না। তবে ব্যাংকিং খাতের ওপর জনগণের আস্থা যদি বিনিয়োগের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করে, তাহলে তা একেবারেই নেই। বরং কিছু কিছু ব্যাংক খুব খারাপ অবস্থায় চলে গেছে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা ব্যাংক নিজেই সৃষ্টি করছে না। এর কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার ১০ শতাংশ। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কথা বলে, যার একটা নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। একটা ব্যাংকে আমি আছি। আমি নিজেও বলি সেটার অবস্থা খুব খারাপ। কিন্তু আমরা ভালো করার চেষ্টা করছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহযোগিতাও করছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন বলে এটা লাল এটা সবুজ, তখন মানুষের আস্থা ওই ব্যাংকটির ওপর কমে যায়। ফলে মানুষ খারাপ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে যেটাকে ভালো ব্যাংক মনে করে সেখানে জমা রাখে। মনে করেন একটা ব্যাংকে গত বছর সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা আমানত বেড়েছে। কিন্তু তারা অত টাকা ঋণ দেয়নি। কারণ ব্যাংক দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বন্ড কিনলে যদি ১০ শতাংশ পাওয়া যায়, তাহলে এত ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করার দরকার কী। জনগণ থেকে ৬-৭ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১০ শতাংশ পেলে ব্যাংক বাইরে বিনিয়োগ করবে না। গত বছর বেশির ভাগ ব্যাংকের লাভ সরকারি বন্ড, ট্রেজারি বন্ড ও ট্রেজারি বিল থেকে এসেছে। আমি মনে করি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকের অবদান সম্পর্কে মধ্যবিত্ত বা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা মানুষরা পুরোপুরি পর্যালোচনা করে না। বিশ্বের কোনো দেশে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যাংক দেয় না। অনেক দেশেই দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য পুঁজিবাজার আছে, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল আছে কিন্তু বাংলাদেশে সব টাকা ব্যাংক থেকে আসে। ব্যাংক সাধারণত অল্পদিনের জন্য ঋণ দেয় (তিন মাস থেকে সর্বোচ্চ তিন বছর), কিন্তু বিনিয়োগের জন্য ১০ বছর মেয়াদি ঋণ প্রয়োজন হয়। অর্থনীতির সাধারণ নিয়মে উত্থান ও পতন রয়েছে। একবার ডাউনে ধরা খেলে ঋণ আটকে যায়, খেলাপি হয় বা ওভার ডিউ হয়, যার ফলে ঋণের পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। পরে অর্থনীতি ভালো হলেও ওই বিনিয়োগকারীর পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাংকের অবদানের ক্ষেত্রে আরো বলা যায়, বাংলাদেশে যত গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি আছে, তার মধ্যে প্রথম ৪০০ গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির ৩২০টিকেই ন্যাশনাল ব্যাংক ঋণ দিয়েছে। ১৯৮৬ বা ৮৭-তে ব্যাংকই কম ছিল। আর বেসরকারি তিন বা চারটা ব্যাংক ছিল। ন্যাশনাল ব্যাংক ছিল বাংলাদেশের প্রথম ব্যাংক এবং সরকারি ও বেসরকারি তিন-চারটি ব্যাংক ছিল। ব্যাংকিং এ সমস্যাটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আর্থিক খাতে যারা আছেন বা অর্থনীতি নিয়ে যারা কাজ করেন তারা কখনো ভালো করে দেখেন না। তারা মনে করে যে-ই টাকা নেয় তারা শুধু লুটপাট করে। কিন্তু অনেক প্রকৃত উদ্যোক্তা বাংলাদেশের রাজনীতির ফাঁকফোকরে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় কবলে পড়ে গিয়ে ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার কবলে পড়ে টাকা ফেরত দিতে পারেন না। আবার সবাই যে সাধু তাও বলা যাবে না। কারণ আমার চোখের সামনেই দেখেছি অনেকে নিয়ম-নীতি না মেনে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। এই মুহূর্তে শৃঙ্খলা ঠিক আছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া নজরদারিও ঠিক আছে। তবে ব্যাংকের আসল মালিক হলো জনগণ অর্থাৎ যারা টাকা রাখে তারা। এবং দ্বিতীয় মালিক হলো যারা টাকা নেয়। যদি আসল মালিকরা টাকা না দেয় এবং ব্যাংকেরও দেয়ার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে খুব দ্রুত সমস্যা কাটবে না, সময় লাগবে।
শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না কেন?
শেয়ারবাজার নিয়ে আমার কোনো উত্তর নেই। কারণ যে অর্থে অন্যান্য দেশে শেয়ারবাজার পরিচালিত হয়, আমাদের এখানে শেয়ারবাজারকে ‘জুয়া খেলার’ মতো একটি সংস্থায় পরিণত করা হয়েছে। কোনো কোম্পানির দাম কেন বাড়ে, তা বোঝা খুব কঠিন। অন্যান্য দেশের ইন্ডিকেটরের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই; আমাদের এখানে এটি নিজে নিজেই বাড়ে আবার নিজে নিজেই কমে যায়। কারা এটি করছে এবং কেন করছে, সরকারও দেখে না বা দেখার ভান করে। ফলে এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।
দেশের বীমা খাত নিয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই।
বীমা খাতে সবচেয়ে লিস্ট পেনিট্রেটিভ দেশ হলো বাংলাদেশ। সব ধরনের বীমা মিলিয়ে মাত্র ২-৩ শতাংশ লোক বীমা কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত বা তাদের সেবা নেয়। অন্যান্য দেশে ৬০-৭০ শতাংশ লোক বীমার সঙ্গে জড়িত থাকে। যেখানে বীমা করার লোক কম, সেখানে ৬০-৭০টি লাইসেন্স দিয়ে রাখলে সমস্যা হবে। তবে যে কোম্পানিগুলো আছে বা যেগুলোর সঙ্গে আমি জড়িত, সেগুলো ভালো আছে এবং তাদের ক্লেইম দিতে কোনো সমস্যা হয় না। তাদের গ্রোথও ভালো। তবে অনেক বেশি লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে এত বেশি লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক খাতে এত রাজনীতি ঢুকলে সবসময় সমস্যা বড় হয়ে দেখা দেয়।
ব্যবসার পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
যত লোকের সঙ্গে কথা বলি, তাদের বেশির ভাগই মনে করেন ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। অত খারাপভাবে এ বিষয়টি উপস্থাপন করতে চাই না, কিন্তু এটি আগের তুলনায় খারাপ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দোকানদার বা যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারীদের সঙ্গে কথা বললেও একই চিত্র পাওয়া যায়। ম্যাক্রো লেভেল থেকেও এটি বোঝা যায়: প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ বা ৭ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। কৃষি উৎপাদনও ভালো নয়; গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আমাদের কোনো ধান আমদানি করতে হয়নি। গত জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৭৫ লাখ টন বা তারও বেশি চাল আমদানি হয়েছে, যা গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মানে উৎপাদন কম হয়েছে। অন্যান্য পণ্য যেমন হলুদ, রসুন, আদা, এলাচ সবই আমদানিনির্ভর। কৃষি খাত জিডিপিতে মাত্র ১২-১৪ শতাংশ অবদান রাখে। যদিও রফতানি খাত কিছুটা বেড়েছে (গার্মেন্টস), ওভারঅল রফতানি যথেষ্ট নয়। চার-পাঁচ বছর আগে যেখানে আমদানির পরিমাণ ৯০ বিলিয়ন ডলার ছিল, এখন তা ৫০ বা ৬০ বিলিয়নের ভেতরে নেমে এসেছে। একটি দেশ যখন কাঁচামাল আমদানিনির্ভর থাকে, সেখানে আমদানি কমে গেলে চিন্তার বিষয়। যদি খাদ্য আমদানি না হয়, দারিদ্র্য বাড়বে; যদি কাঁচামাল আমদানি না হয়, উৎপাদন কমবে। চালের দাম ও পেঁয়াজের দাম এরই মধ্যে বেড়ে গেছে। এখন দেখতে হবে কয়েক মাস গেলে আরো কত আমদানি করতে হয়।
রাজনৈতিক চর্চায় তেমন কোনো পরিবর্তন দেখছেন কী?
আমি একটি দল করি। আমার তার দল কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার কথা বলেনি। চাঁদাবাজির সঙ্গে সামাজিক শৃঙ্খলার একটি সম্পর্ক আছে। সবকিছুর ওপর রাজনীতি একটি দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই রাজনীতিকে অর্থনীতি বা সামাজিক শৃঙ্খলা থেকে আলাদা করতে চায় না, কিন্তু এটি সম্ভব নয়। এমন কোনো দেশ পাবেন না যেখানে রাজনীতি খারাপ কিন্তু অর্থনীতি খুব ভালো। দিনশেষে রাজনীতি অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং অর্থনীতি ভালো হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিকে পরিশীলিত করে। এই দুটি একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
যদি রাজনীতি ভালো না হয়, অর্থনীতিকে কোনো দিন ভালো করা যাবে না। আমি আশা করি, বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে তারা সংস্কারগুলো করবে। এখন থেকে সাত থেকে আট বছর আগে আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং বছর তিনেক আগে সর্বসম্মতিক্রমে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ২৭ দফা সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীকালে যারা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ আন্দোলন করেছে, তাদের সবার সঙ্গে কথা বলে পরিবর্তন পরিবর্ধন করে, সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলে একত্রভাবে একটা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেখানে সামাজিক, বিচারিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত আছে। আমার প্রত্যাশা হলো, যদি নির্বাচন যথাযথভাবে, যথাসময়ে হয় এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে তাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আসবে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহায্য করবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতই হোক এবং সম্পদ সৃষ্টি হোক না কেন, সেই সম্পদের পুনর্বণ্টনের দায়িত্ব ব্যবসায়ীদের নয়, বরং রাজনীতিবিদ বা সরকারের। যখন সৃষ্ট সম্পদের সঠিক পুনর্বণ্টন হবে, তখন ধীরে ধীরে সামাজিক শৃঙ্খলাও আসবে। সামাজিক বিশৃঙ্খলা হয় যখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না এবং একে অপরের ওপর বিশ্বাস থাকে না, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা থাকে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে শুধু ব্যাংক ঋণ দিলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। দুটি মূলধন অত্যন্ত জরুরি: সামাজিক ও আর্থিক মূলধন। সামাজিক মূলধন আর্থিক মূলধন বিনিয়োগের পূর্বশর্ত। আগে সামাজিক শৃঙ্খলা আসা উচিত, তারপর অর্থনীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের কথা আসবে। এগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা সংযুক্ত, একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি সম্ভব নয়।
কোনো পরিবর্তন এমনি এমনি হয় না, ব্যক্তিরও একটি ধারাবাহিকতা আছে। প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বেগম খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেছিলেন এবং তার আমলে গত ১০ বছরের তুলনায় এত চুরি, অনিয়ম, দুর্নীতি হয়নি। যদিও তার আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হয়নি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত ছিল। এখন দলের নেত্রী জীবিত থাকলেও মূল কর্ণধার হলেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। আমার পূর্ণ আস্থা আছে যে তিনি জীবনটাকে দেখে অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছেন এবং ভবিষ্যতে দেশের কর্ণধার হওয়ার সুযোগ পেলে তিনি সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন।










