তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণ ও গ্রাহকের আস্থাহীনতার মতো ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। গত এক বছরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি?

বিভিন্ন ইস্যুতে শুধু ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নয়, বরং পুরো আর্থিক খাতই অর্থাৎ ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। গত এক বছরে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা পদক্ষেপের কারণে অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের আকার তুলনামূলক বড় বিধায় ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে ফোকাস করেছে এবং তারল্য সহায়তাসহ বিভিন্ন সাহায্য করেছে। কিন্তু গুটিকয়েক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পর্ষদ পুনর্গঠন ছাড়া নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থার উন্নতিতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ এখনো নেয়া হয়নি, যদিও তুলনামূলক দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর চিঠি দেয়া হয়েছে। আমরা আশা করি, পরিস্থিতির উন্নতির জন্য শিগগিরই পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের এনবিএফআইগুলোয় কী ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন হয়েছে?

আমি আগেই বলেছি, অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে মনোনিবেশ করেছে। যেখানে তারল্য সহায়তা, মার্জার, ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রস্তাবিত পরিবর্তনসহ নানা উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি, যার অনেকটাই হচ্ছে ব্যাংকিং সংস্কার কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার পদক্ষেপ নেবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থার উন্নতির জন্য।

সমস্যাগ্রস্ত এনবিএফআইগুলোর ক্ষেত্রে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন? এনবিএফআই খাত ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে কোন বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন?

দেশের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা ৩৫। তার মধ্যে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান সফলতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাদের সমস্যা যেমন এক নয়, কোনো একটি নীতি দিয়ে এর সমাধানও সম্ভব নয়। বেশকিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসনের অভাব আছে। ফলে তাদের বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ তৈরি হয়েছে। এতে তারা গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে পারছে না। সেক্ষেত্রে গ্রাহকদের আস্থাহীনতা শুধু সেই প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, পুরো খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

শুধু পর্ষদ ভেঙে দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। আবার তারল্য সহায়তা দিয়েও এর সমাধান হবে না। তাই কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে অপ্রিয় হলেও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি যারা সেসব প্রতিষ্ঠানে তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় রেখেছেন, তাদের স্বার্থ রক্ষা করাও নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা দেখেছি, গভর্নর এ ব্যাপারে স্পষ্ট মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এবং সরকারের কাছে এ বাবদ থোক বরাদ্দ চেয়েছেন। পাশাপাশি বেশকিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে যারা কিছুটা নীতি সাহায্য ও তারল্য সহায়তা পেলে ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে যে রকম সহায়তা দিয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও সে রকম নীতি সাহায্য দেবে।

এনবিএফআই খাতে খেলাপি ঋণের হার বেশি থাকা সত্ত্বেও ডিবিএইচ কীভাবে খেলাপি ঋণ ১ শতাংশের নিচে রাখতে সক্ষম হয়েছে?

ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসি আর্থিক খাতে একটি শক্তিশালী অবস্থান বজায় রেখে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ডিবিএইচ গত ২০ বছর ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ ক্রেডিট রেটিং ‘ট্রিপল এ’ অর্জন করেছে, যা শুধু নন-ব্যাংক নয়, সমগ্র আর্থিক খাতেই একটি অনন্য অর্জন। ক্রেডিট রেটিং নির্দেশ করে একটি প্রতিষ্ঠানের দায় পরিশোধের সামর্থ্য, যা আমানতকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। ডিবিএইচের এ ক্রেডিট রেটিং প্রাপ্তির মূল কারণ পরিচালনগত দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন।

ডিবিএইচ ১৯৯৭ সাল থেকে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এ সুদীর্ঘ ২৮ বছরে ডিবিএইচের খেলাপি ঋণ কখনো ১ শতাংশ অতিক্রম করেনি। বর্তমানে যেখানে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের গড় হার ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ, সেখানে ডিবিএইচের খেলাপি ঋণ ১ শতাংশের কম এবং এ খেলাপি ঋণের হার কোনো ধরনের বড় ঋণ অবলোপন ছাড়াই। গত ২৮ বছরে ডিবিএইচের বিতরণকৃত ১৭ হাজার কোটি টাকার ঋণের মধ্যে অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ মাত্র ৯৪ লাখ টাকা। ডিবিএইচ ঋণ দেয় গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য অনুযায়ী এবং কোনো ধরনের চাপ ছাড়া বস্তুগত তথ্য, পরিসংখ্যান, জামানত ও সদিচ্ছা যাচাইয়ের মাধ্যমে, তাই খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম।

আবাসন খাতে বর্তমানে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে, এর কারণ কী?

আবাসন খাতে, সুনির্দিষ্টভাবে বললে ডেভেলপারদের তৈরি ফ্ল্যাট বিক্রি আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। এর পেছনে নানাবিধ কারণ আছে। প্রথমত, নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ায় খরচ বেড়ে গেছে। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে নির্মাণসামগ্রী ও কাঁচামালের দাম বেড়েছে। তাই নির্মাণ খরচও বেড়েছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়েছে, গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি। ফলে ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বৃদ্ধির নীতির কারণেও ফ্ল্যাটের বিক্রি কমেছে। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) ও ফ্লোর এরিয়া রেশিওর (এফএআর) কারণে ২০২২-২৪ সময়ে কমসংখ্যক নির্মাণ প্রকল্প গৃহীত হয়েছে বা অনুমোদনের জন্য জমা পড়েছে। ফলে নতুন ফ্ল্যাটের সরবরাহও বেশির ভাগ জায়গায় আগের চেয়ে কমেছে। এছাড়া অস্বীকার করার উপায় নেই, অপ্রদর্শিত টাকার একটি প্রভাব আবাসন খাতে সবসময় ছিল। যদিও এ গ্রাহকশ্রেণী ঋণ মুখাপেক্ষী নন। তার পরও তাদের তুলনামূলক অনুপস্থিতি বা কম উপস্থিতিও আবাসন খাতে স্থবিরতা সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে ফ্ল্যাট বিক্রি সবসময়ই কম হয়। এসব কারণেই ফ্ল্যাট বিক্রি আগের বছরগুলোর চেয়ে কমেছে।

সবার জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের দিক থেকে কী ধরনের উদ্যোগ প্রত্যাশা করছেন?

গৃহঋণ প্রদানকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিবিএইচ সবার জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। ডিবিএইচ এখন পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি পরিবারকে আবাসন ঋণ দিয়েছে। কিন্তু দেশের জনসংখ্যা হিসাবে এ সংখ্যা আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল। আসলে আমাদের দেশের আবাসন মূলত উচ্চ ও উচ্চ মধ্যবিত্তের আওতার মধ্যে ছিল। সমাজের বিপুল অংশ যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী যাদের আয় ৫০ হাজার টাকার কাছাকাছি, তাদের জন্য ফ্ল্যাট ক্রয় মোটামুটি আয়ত্তের বাইরে ছিল। এর কারণ ফ্ল্যাটের আকার, মূল্য ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। ঢাকা শহরে জমির দাম অনেক বেশি, তাই ফ্ল্যাটের দামও অনেক বেশি। এছাড়া ৫০০-৬০০ বর্গফুটের সাশ্রয়ী ফ্ল্যাট নির্মাণ করতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো খুব একটা আগ্রহী না। এক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের মতো আবাসনকে সাশ্রয়ী করতে হলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি প্রজেক্টের মাধ্যমে সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য সরকারকে জমির ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে ডেভেলপাররা প্রতিযোগিতামূলক বিডের মাধ্যমে প্রজেক্ট গ্রহণ করবে এবং সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য ছোট সাশ্রয়ী ফ্ল্যাট তৈরি করবে। ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট যদি ২৫ লাখ টাকায় দেয়া যায়, তাহলে এর ব্যাপক চাহিদা আছে। বাংলদেশ ব্যাংক যদি এ আকারের ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে কম সুদে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা দেয়, তবে গ্রাহক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক থেকে ১৫-১৬ হাজার টাকার মাসিক কিস্তিতে এ ফ্ল্যাটের লোন নিয়ে ফ্ল্যাট মালিক হতে পারবেন বা নিজের বাড়ি বানাতে পারবেন, যা অর্থনীতিতে বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। তাছাড়া নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন প্রজেক্টের ক্ষেত্রে করছাড় এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পেনশন ফান্ড ও বন্ড মার্কেটের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের ব্যবস্থা করলে সাশ্রয়ী আবাসন অনেকটাই নিশ্চিত হবে। এর জন্য দরকার নীতি সাহায্য ও তার সফল বাস্তবায়ন।