গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের ব্যাংক খাত কেমন চলছে?

পরিস্থিতি এখন মিশ্র। একদিকে স্থিতি ফিরছে, অন্যদিকে আস্থার সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে এখনো অনেক পথ বাকি। মাঠপর্যায়ের ব্যাংকারদের অভিজ্ঞতা আর নীতি পরিবর্তনের সাম্প্রতিক ফল মিলিয়ে বলতে পারি, ব্যাংক খাত একটা বড় ধরনের পলিসি শক (ভুল নীতির আঘাত) সামলে উঠতে সক্ষম হয়েছে। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী বিনিময় হার এখন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত, সুদের হার বাজারভিত্তিক আর ওদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এতে লেনদেন বেড়েছে, আস্থাও ধীরে ধীরে ফিরছে।

তবে উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল গভর্ন্যান্স এবং ‘লোন এভারগ্রিনিং’ সংস্কৃতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব না বদলালে স্থিতি টেকসই হবে না। আমি বিশ্বাস করি, দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া, নতুন ব্যাংক রেজল্যুশন আইন এবং বিগ-ফোর (PwC, EY, Deloitte, ও KPMG) দিয়ে পরিচালিত ওই ব্যাংকগুলোর অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০২৫-২৬ অর্থবছর হবে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের প্রকৃত ‘রিকভারি উইথ রিফর্ম’ পর্ব।

ব্যাংক খাত সংস্কারে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

আমার মনে হয়, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এবার সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক সংস্কারের পথে এগোচ্ছে। আইনি কাঠামো, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা—সব মিলিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ দাঁড় করানো হচ্ছে। ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স, অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর), ব্যাংক রি-স্ট্রাকচারিং রেজল্যুশন ইউনিট (বিআরআরইউ) কিংবা এডিবি সাপোর্টেড প্যাকেজ—সবগুলোই ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল আইন বা ঘোষণা যথেষ্ট নয়। বাস্তবায়নকে গতিশীল ও নির্ভরযোগ্য করতে হবে আর এর জন্য দরকার স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। যেমন ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স—কাগজে এটা শক্তিশালী আইন, কিন্তু কার্যকরভাবে চালাতে হলে ব্যাংক রিস্ট্রাকচারিং রেজল্যুশন ইউনিট (বিআরআরইউ)-কে দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে PwC, EY, Deloitte ও KPMG-এর মতো আন্তর্জাতিক ফার্মকে অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) সম্পন্ন করার দায়িত্ব দিয়েছে এবং লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগও নিয়েছে। এগুলো সাহসী পদক্ষেপ হলেও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও আইনি জটিলতা এড়িয়ে বাস্তবে কতদূর এগোনো যাবে, সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

এছাড়া জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সম্পদ উদ্ধারে এফআইইউ, এসিসি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এখানে কাজের গতি আরো বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রম্পট কারেকটিভ অ্যাকশন (পিসিএ) ফ্রেমওয়ার্ক ও বাজারভিত্তিক সুদের ব্যবস্থা এরই মধ্যে চালু হয়েছে। এটা ভালো। এগুলো আমাদের খাতকে আরো স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করবে।

সব মিলিয়ে আমার মূল্যায়ন হলো: সংস্কারের দিকনির্দেশনা সঠিক পথে আছে। এখন সবচেয়ে জরুরি সমন্বিত প্রয়োগ, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং ব্যাংকিং কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তাহলেই এ সংস্কার প্রকৃত ফল বয়ে আনবে।

এখন পর্যন্ত কোন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে? আর কোন কোন উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া দরকার বলে মনে করেন?

কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এরই মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ কার্যকর হয়েছে। ব্যাংক রিস্ট্রাকচারিং রেজল্যুশন ইউনিট (বিআরআরইউ) গঠিত হয়েছে। আর প্রম্পট কারেকটিভ অ্যাকশন (পিসিএ) ফ্রেমওয়ার্ক চালুর মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। ডিভিডেন্ড ও এনপিএল নীতিতে কড়াকড়ি এবং অতিরিক্ত ১১ ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার অংশ হিসেবে এডিবি ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে।

তবে এখন জরুরি হলো খেলাপি ঋণ কমানোর রোডম্যাপ দ্রুত কার্যকর করা, মার্জার প্রক্রিয়ায় গতি আনা, দুর্নীতিগ্রস্তদের সম্পদ উদ্ধারে বাস্তব ফল আনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেয়া। পাশাপাশি রেজল্যুশন ফান্ড ও ক্রাইসিসি ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিল দ্রুত সক্রিয় করা। সংক্ষেপে বলব, সংস্কারের দিকনির্দেশনা প্রশংসনীয়, কিন্তু সফলতা নির্ভর করছে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বাস্তবায়নের ওপর।

এ মুহূর্তে দেশের ব্যাংক খাতের মৌলিক সংকট কোনগুলো? সংকট কাটিয়ে উঠতে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার?

এখন ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া খেলাপি ঋণ। ২০২৫ সালের মার্চে এটা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। এর সঙ্গে আছে পুঁজির ঘাটতি, দুর্বল গভর্ন্যান্স, ভঙ্গুর বৈদেশিক মুদ্রাবাজার, ধীর আইন প্রয়োগ, বাজারভিত্তিক সুদের চাপ এবং বাড়তে থাকা সাইবার ঝুঁকি।

এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে দরকার কঠোর প্রভিশনিং ও খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, গভর্ন্যান্সে শূন্য সহনশীলতা, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় টেকসই করা, রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স দ্রুত প্রয়োগ এবং সুদ ও লিকুইডিটি ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা। একই সঙ্গে সমন্বিত সাইবার প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা জরুরি। সময়মতো এসব বাস্তবায়ন করতে পারলে ব্যাংক খাত আবারো টেকসই ও স্থিতিশীল পথে ফিরতে পারবে।

ব্যাংকারদের সর্বোচ্চ সংগঠন হিসেবে এবিবি সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে কী ধরনের সহযোগিতা করছে?

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস, বাংলাদেশ (এবিবি) সবসময়ই সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার উদ্যোগের ঘনিষ্ঠ অংশীদার। নীতিনির্ধারক ও ব্যাংকারদের মধ্যে সেতুবন্ধ গড়ে দিয়ে আমরা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছি।

খেলাপি ঋণ ও সম্পদ-গুণমান সংস্কারে বিগ-ফোর দিয়ে পরিচালিত অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর)-এর ফলাফলকে ব্যাংকভিত্তিক কারেক্টিভ অ্যাকশন প্ল্যান -এ বাস্তবায়ন করতে এবিবি সদস্য ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে রিকভারি টার্গেট নির্ধারণ, লোনের জামানত পুনর্মূল্যায়ন ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিতে নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের কাজ করছে।

মার্জার ও রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় দুর্বল ব্যাংকগুলোর আইটি ইন্টিগ্রেশন, শাখা পুনর্বিন্যাস বা মানবসম্পদ রক্ষার মতো বাস্তব সমস্যায় এবিবি যৌথ সমাধান দিতে পারে। গভর্ন্যান্সে শৃঙ্খলা আনার জন্য রিলেটেড-পার্টি ঋণে জিরো টলারেন্স অবস্থান নেয়া এবং ব্যাংক বোর্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে এবিবি কাজ করছে।

এছাড়া ক্রলিং-পেগ ও বাজারভিত্তিক সুদের হার বাস্তবায়নে এবং গ্রাহকের কাছে স্বচ্ছ বার্তা পৌঁছে দিতে আমরা কাজ করছি। ডিজিটাল ঝুঁকি মোকাবেলায়ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ ও সাইবার-ড্রিলের উদ্যোগ নিয়েছি।

সংক্ষেপে বলব, এবিবি শুধু পরামর্শ দেয় না বা দাবি-দাওয়া করে না; আমরা সংস্কার বাস্তবায়নের কার্যকর সহযোগী। সরকারের সদিচ্ছা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতির সঙ্গে মিলে মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

গত দেড় দশকে দেশের ব্যাংক খাতে নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুণ্ঠন সংঘটিত হয়েছে। এর প্রভাবে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকের পরিস্থিতিই এখন নাজুক। এ অবস্থার মধ্যেও সিটি ব্যাংক দুর্বল না হয়ে বরং শক্তিশালী হয়েছে। এটি কীভাবে হলো?

আপনি একদম ঠিক বলেছেন। দেড় দশক ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি ব্যাংক খাতকে দুর্বল করে দিয়েছে। বহু ব্যাংক আজও উচ্চ খেলাপি ঋণ, পুঁজির ঘাটতি ও আস্থার সংকটে ভুগছে। কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও সিটি ব্যাংক ব্যতিক্রম। দুর্বল না হয়ে সে বরং আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এর মূল কারণ তিনটি: সুশাসন, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও ইনোভেশন।

প্রথমত, আমরা বোর্ড ও ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে সুশাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। রিলেটেড-পার্টি এক্সপোজারে কড়াকড়ি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং স্বাধীন পরিচালকদের সক্রিয় ভূমিকা সিটি ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রেখেছে।

দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আমরা সবসময় শৃঙ্খলা বজায় রেখেছি। যেখানে অনেক ব্যাংক নির্বিচারে ঋণ বিতরণে সমস্যায় পড়েছে, আমরা সেখানে প্রতিটা ঋণ ক্যাশ-ফ্লো ও ঝুঁকি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দিয়েছি এবং নিয়মিত মনিটরিংকে বাধ্যতামূলক করেছি।

তৃতীয়ত, ইনোভেশনে ধারাবাহিক বিনিয়োগই আমাদের এগিয়ে রেখেছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং, ডিজিটাল লোন, কার্ড ব্যবসা, রিটেইল ও এসএমই খাতে আধুনিক প্রযুক্তি, সিটিটাচ ইন্টারনেট ব্যাংকিং আর গ্রাহকবান্ধব সেবা আমাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে দিয়েছে। ফলে নীতি পরিবর্তন বা বাজারচাপ, কোনো কিছুই সিটি ব্যাংককে দুর্বল করতে পারেনি, বরং আরো শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।

আমার অভিজ্ঞতায়, সিটি ব্যাংকের এ সাফল্য প্রমাণ করে যে গভর্ন্যান্স, শৃঙ্খলা আর ইনোভেশনের সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতেও টেকসই প্রবৃদ্ধি ভালোমতোই সম্ভব।