স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ সংগ্রামে আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা সত্যিই অনন্য। কোনো সময়ে তিনি আন্দোলনের পথ থেকে বিরত হননি। সরে যাননি সংগ্রামের অগ্নিঝরা উত্তপ্ত দগ্ধক্ষেত্র থেকে। অতীতে খালেদা জিয়া রাজনীতির চোরাবালি থেকে দূরে ছিলেন। সযত্নে নিজেকে ঢেকে রেখেছিলেন স্বামী মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার ব্যক্তিত্বের আবরণে। কোনো সময় তেমন বক্তব্য বা বিবৃতির মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতির আলোয় নিজেকে তুলে ধরেননি। ভাবতে ভালো লাগে, একবার যখন এ পথ মাড়ালেন, পথই তাকে করে তোলে সর্বজন শ্রদ্ধেয়। আন্দোলনের বন্ধুর পথই তার জন্য রচনা করে নেতৃত্বের দ্যুতি। ওই যে এলেন, আর তিনি ফিরে তাকাননি পেছনের দিকে। এগিয়েই গেছেন রাজনীতির মহাসড়ক ধরে। স্বৈরাচারের পতনই এ মহাসড়কের সীমারেখা।

বেগম জিয়ার নেতৃত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সহজ-সরল ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি। সমস্যা একবার চিহ্নিত হলে তার সমাধানে যে উদ্যম প্রয়োজন তা তার জানা। সমাধানের পথটি যেন তার চেনা। ১৯৮২ সালে অবৈধ ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে জাতীয় জীবনে যে অনভিপ্রেত অধ্যায়ের সূচনা হয়, তার সমাপ্তির জন্য প্রয়োজন ছিল অবৈধ দখলদারকে হঠানো। গণতন্ত্রকে নতুনভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজন ছিল স্বৈরাচারের সঙ্গে সবরকম সম্পর্ক ছিন্ন করা। স্বৈরাচারকে ঘৃণা, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বৈরাচারকে প্রতিহত করা। প্রয়োজনবোধে সর্বশক্তি দিয়ে।

খালেদা জিয়া এ বিষয়টি সম্যকরূপে অনুধাবন করলেন। অব্যাহত রাখলেন তার দীর্ঘ সংগ্রাম। শেষে জয়ী হলেন তিনি। জয়যুক্ত হলো তার দৃঢ় সংকল্প। অবিচল নিষ্ঠা। দেশের অন্যান্য নেতা-নেত্রীও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু তার বৈশিষ্ট্য এক্ষেত্রে অভূতপূর্ব, অতুলনীয়। ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণে যখন তিনি বিরত থাকলেন, তখন অনেকের মনে অনেক প্রশ্নের উদয় হয়। তার পদক্ষেপ বিভিন্নভাবে সমালোচিত হয়। কিন্তু তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন যুদ্ধে জয়ী হতে হলে শত্রুর দুর্বল স্থানে আঘাত হানতে হয়। তিনি তাই করেছিলেন। জেনারেল এরশাদ নির্বাচনের মাধ্যমে চেয়েছেন বৈধতার স্পর্শ পেতে। একবার তা সম্পন্ন হলে তিনি হতে পারতেন অপরাজেয়। খালেদা জিয়ার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি এরশাদকে বঞ্চিত করে সে সুযোগ থেকে।

স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে পথপ্রদর্শন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজনীতির অন্দর-বাহির তার চেনা। তিনি সব গলি-ঘুপচি চেনেন বলেই অপরকে পথ চেনাতে তার অসুবিধা হয়নি। ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিশেষ বিশেষ মহল অনেক রকম ভবিষ্যদ্বাণী নিক্ষেপ করে। তিনি কিন্তু ছিলেন নিশ্চিন্ত এবং একদিক থেকে নিশ্চিত, যা প্রয়োজন তা তুলে ধরলেন। জনতার দাবি প্রতিধ্বনিত হলো তার কর্মসূচিতে, তার বাণীতে। বিজয় এল তার হাতের মুঠোয়। ফ্রান্সিস বেকন (Francis Bacon) লিখেছেন বহু আগেই: ‘শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের তিনটি ক্ষেত্রে সেবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়—সার্বভৌম বা রাষ্ট্রের সেবক, খ্যাতির সেবক এবং কর্মসূচির সেবক হিসেবে” (Men in great place are three servants, servants give sovereign or state servants of fame and servants of business)’ খালেদা জিয়ার ভূমিকাও অনেকটা এমনি। দেশে স্বৈরাচারের পতন এবং গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা রাজনীতিকে জনগণের কল্যাণে নিয়োগ এবং গণমুখী কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে তিনি এমনই সেবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। আদর্শ ও ন্যায়নীতির প্রতি অবিচল আস্থা কোনো নেতা বা নেত্রীর থাকলে অসম্ভব সম্ভব হয়। পর্বতও মাথা নোয়ায়।

দ্বাদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশে আবার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্র। এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য খুব স্পষ্ট। বেগম জিয়া শুরু করেছেন যেখানে রাষ্ট্রপতি জিয়া শেষ করেন। এ এক সুদীর্ঘ পথ। বন্ধুর ও কণ্টকাকীর্ণ। কারো পক্ষে একা এ পথ অতিক্রম করা সম্ভব নয়। জিয়া যা শেষ করতে পারেননি তারই আদর্শে উদ্বুদ্ধ, তারই আপনজনকে তা সমাপ্ত করার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হলো। এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।

বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ ধরেই তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করে। আগেই বলেছি, এ পথ বড় বন্ধুর। সবার পক্ষে স্বাচ্ছন্দ্যে পথচলা সম্ভব নয়। তাই ১৯৭২ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌল বিধিবিধান রচিত হলেও মাত্র এক বছরের মধ্যে প্রণীত হলো জরুরি বিধান। মাত্র তিন বছরের মধ্যে সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে জন্মলাভ করে রাষ্ট্রপতি সরকারের নামে এক ধরনের ব্যক্তিত্বনির্ভর (Personalized System) সরকার ব্যবস্থা। বহুদলীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে নেমে এলো একদলীয় শাসন। বিরোধী দলের ঘটে অবসান। সংবাদপত্রের কণ্ঠ হলো রুদ্ধ। বিচার বিভাগ এল দলীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে। জাতীয় জীবন সার্বিকভাবে হলো ক্ষত-বিক্ষত।

এমনই অবস্থায় ১৯৭৫ সালের শেষপ্রান্তে ক্ষমতায় এলেন জিয়াউর রহমান। স্বনামধন্য সৈনিক। মহান মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ জিয়ার বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হয়নি জাতীয় রাজনীতির কোন প্রবাহ সঠিক। তাই মাত্র ক’বছরের মধ্যে বাংলাদেশ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি শুধু যে পরিবর্তিত হলো তা-ই নয়, লাইনচ্যুত রাজনৈতিক রেলগাড়ি নতুনভাবে এল লাইনে। জাতীয় আকাঙ্ক্ষার তট ঘেঁষে।

একদলীয় ব্যবস্থার সমাধিতে রচিত হলো বহুদলীয় ব্যবস্থা। বিচার বিভাগের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে এল। সংবাদপত্রের, কণ্ঠে আবার এল ভাষা। পর্যায়ক্রমে গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া সমাজে প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বেগম জিয়া দেশে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন। একদিক থেকে এ পদক্ষেপ এক সুনির্দিষ্ট দিকদর্শন। সমাজের সর্বমহলে এ বিষয়ে যে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা অনুধাবন করেই বেগম জিয়া জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে এই ঐতিহাসিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। গণতান্ত্রিক সংবিধানের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকাশের এ পদক্ষেপ ঐতিহাসিক।

লেখাটি আসাদুল করিম শাহীন সম্পাদিত ‘বেগম খালেদা জিয়া: আপসহীন দেশনেত্রীর প্রতিকৃতি’ থেকে সংকলিত