জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি রাজনীতির ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ময়দানের পথে হেঁটেছেন। তাই অনেকটাই আড়ালে থেকে গেছে তার জীবনের ব্যক্তিগত শোক। দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী খালেদা জিয়া ব্যক্তিগত শোককে প্রকাশ্য করেননি।
স্বামীকে হারিয়েছিলেন মাত্র ৩৬ বছর বয়সে। জিয়াউর রহমানের অপেক্ষায় নিয়মিতই রাতে জেগে থাকতেন তিনি। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকাটা নিয়মিত হয়ে যায়। দূরে কোথাও গেলে জিয়াউর রহমান সবসময় ফোনে স্ত্রীর খবর নিতেন। এ কাজটি তিনি কখনো ভুলতেন না। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাত ১০টায় জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম থেকে বাসায় খালেদা জিয়াকে ফোন করেছিলেন। এটাই ছিল শেষ ফোন। গভীর রাতে নিহত হন তিনি। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ২১ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটে। এ শোক তাকে বাকরুদ্ধ, স্তব্ধ করে দিয়েছিল। নিজেকে আবদ্ধ করে নেন একটি কক্ষের সীমানায়।
৩ জুন খালেদা জিয়া স্বামীর কবর দেখতে গিয়েছিলেন। সেদিন তার সঙ্গে ছিলেন অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার। সেদিন কান্নায় ভেঙে পড়ে বারবার আঁচলে চোখ মুছেছিলেন তিনি। এই সর্বগ্রাসী শোকেই শেষ হয়নি জীবনের বিষাদ। এরপর আরো অনেকবার নিকটজনের প্রস্থান বেদনায় ডুবিয়েছে এই নারীকে।
১৯৮৪ সালের ১৫ নভেম্বর উল্লাপাড়ায় জনসভায় যোগ দেয়ার কথা ছিল খালেদা জিয়ার। কিন্তু সেদিন পেয়েছিলেন পিতৃবিয়োগের সংবাদ। দিনাজপুরের বাসায় তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব ঠিক করার সময় নিচে পড়ে যান। এ আঘাত তাই শরীর সহ্য করতে পারেনি। চিকিৎসকরা চেষ্টা করেও সফল হননি। ১৫ নভেম্বর সকালে নিজ বাসভবনে মারা যান। খবর পেয়ে জনসভা বাতিল করে রওনা হন দিনাজপুরের দিকে। ১৬ নভেম্বর ইস্কান্দার মজুমদারকে দাফন করা হয়। তার জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের ৬ শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় খালেদা জিয়াকে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উপ-সেনাপ্রধান থাকাকালে বেগম জিয়া এ বাড়িতে উঠেছিলেন। তার জীবনের একটা বড় সময় তিনি এখানে কাটিয়েছেন। সংসার জীবনের অনেক স্মৃতি জমা ছিল এ বাসায়। কিন্তু আওয়ামী সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় বেগম জিয়াকে অসম্মানজনকভাবে এ বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে। সেদিনের ঘটনায় বড় আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। সেদিন তাকে কাঁদতে দেখেছিলেন দেশের মানুষ।
এর ঠিক দুই বছরের মাথায় আরো বড় শোকের আঘাত আসে খালেদা জিয়ার জীবনে। বিদেশের মাটিতে মারা যান তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। এ সংবাদ যখন তার কাছে এসেছিল তিনি তখন তার গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ। তৎকালীন আওয়ামী সরকার তাকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া থেকে বিরত রাখতে তাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল।
২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মালয়েশিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে মারা যানা আরাফাত রহমান কোকো। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে স্বামীকে হারিয়ে দুই পুত্রকে নিয়েই ছিল তার ব্যক্তিগত জীবন। এর মধ্যে ছোট ছেলেকে হারানোর বেদনা বহন করতে হয়েছে তাকে। ২৪ জানুয়ারি বেলা আড়াইটায় খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ ইস্কান্দারের স্ত্রী, আরাফাত রহমানের শাশুড়ি নাসরিন সাঈদ ইস্কান্দার ও তার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা খালেদা জিয়াকে তার গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে কোকোর মৃত্যুসংবাদ জানান। পুত্রের অকাল মৃত্যুর খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। ২৬ জানুয়ারি সকালে আরাফাত রহমানের মরদেহ বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে নেয়া হয়। ছেলের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলেন তিনি। এই শেষবার তাকে কাঁদতে দেখা যায়।










