খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি বিরল সম্মান নিয়ে শেষ বিদায় নিলেন। ইহজাগতিক কর্মযজ্ঞ থেকে বিদায় নিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ‘সসম্মান’ শব্দটা বলার পেছনে বড় কারণ—কোনো কোনো মৃত্যু গোটা জনপদকে থমকে দাঁড়াতে হয়। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তেমনি গোটা দেশ, গোটা জনপদ, দেশের আপামর-জনগণ থমকে দাঁড়িয়েছিল। তাকে শত্রু-মিত্র, আলোচক-সমালোচক, আদর্শ অনুসারী-বিরোধী চিন্তার—কমবেশি সবাই শোকাকুল বিদায় শ্রদ্ধা-সম্ভাষণ জানিয়েছেন। বাংলাদেশে কোনো রাজনীতিবিদের মৃত্যুর পর এমন শোকাকুল পরিবেশ আমরা অতীতে দেখিনি। একজন রাজনীতিকের জন্য ঐতিহাসিকভাবে এটা এক বিরল ঘটনা। অন্যদিকে, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনদের পালাবদলের পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। অনভিপ্রেত রক্তপাত, হত্যাকাণ্ড আর বন্ধুর নানা রাজনৈতিক জটিলতায় ভরা ছিল সেই কন্টাকাকীর্ণ পথ। ফলে সেই বিদায়-বিভেদের জায়গাগুলো দেশ ও জনগণের জন্য সুখকর ছিল না! রাজনৈতিক জটিল এমন উত্থান-পতনের মধ্যে তিনি বেঁচে ছিলেন, আজীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়েও ছিলেন দেশের সাধারণ মানুষের কাতারে। বেগম জিয়ার মৃত্যুও সেই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম উদাহারণ হয়ে থাকল বাংলাদেশের শোকাকুল জনপদে।

বাংলাদেশে জনসংস্কৃতিতে কোনো রাজনীতি শুদ্ধ-অশুদ্ধ আর ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। ভাল-মন্দ মিলিয়ে ছিল বিএনপির বিগত শাসন আমল।। রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুণাবলীর ক্ষেত্রে চ্যুতি-বিচ্যুতির সেসব বিচার-বিশ্লেষণ নানাভাবে করা যেতে পারে। এমন কি—ইতিহাসের পরতে পরতে বিভেদের চিহ্নগুলো নিয়েও নানা আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। সে সময় এখন নয়! কিন্তু প্রশ্নের জায়গা অন্যখানে—একজন বাঙালি আটপৌড়ে নারী কিভাবে একটি দেশের প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠলেন? বলা যায়, বাংলাদেশের জনসংস্কৃতি সাংস্কৃতিকভাবেই অবগুণ্ঠিত সমাজ। সে সমাজে একজন বাঙালি সহজ-সরল নারী রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে ওঠা চাট্টিখানি কথা নয়। বস্তুত বাঙালি নারীদের দু’ধরনের লড়াই করতে হয়—ঘরের এবং বাইরের। বেগম খালেদা জিয়া সেই ক্ষেত্রে দু’ধরনের লড়াইয়ে জয়ী হয়েছিলেন। আটপৌড়ে ঘরকন্না ছাড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন রাজনৈতিক লড়াকু যোদ্ধা। হয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধাননেতা। বিশেষ করে, আশির দশকের স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে নেতৃত্বদানে তিনি ছিলেন অগ্র-রাজনীতিকদের মধ্যে অন্যতম। স্বৈরাচার পতনের পর একানব্বইয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে হলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। অবগুণ্ঠিত সমাজের পাঁচিল ডিঙিয়ে এ যেন বাঙালি এক লড়াকু গৃহবধুর অসামান্য কীর্তি। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। বস্তুত রক্ষণশীল সমাজে নারী অধিকার ও নেতৃত্বের বেলায় তিনি ছিলেন এক রাজনৈতিক আইকন।

নেতৃত্বের আরো দিক বিবেচনা করলে, খালেদা জিয়া ছিলেন স্মিতবাক, ভদ্র-নম্র, সহনশীল ও ‘উদার বুর্জোয়া জাতীয় গণতান্ত্রিক’ রাজনীতির ধারক। কিন্তু শাসক দল হিসেবে নানা সময়ে বিএনপিকে নানা চ্যুতি-বিচ্যুতির কবলে পড়তে হয়। ক্ষমতাও হারিয়ে নানা নির্যাতন, জেল-জুলুম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সে সময় তার দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব, আপসহীন মনোভাব ও অমায়িক দেশপ্রেম গণতান্ত্রিক লড়াই থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। অপসৃয়মান এমন অবস্থায় তাকে এর জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল অনেক গুণ বেশি। এতদ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় স্মতর্ব্য যে—এক/এগারোর পর জীবনবাজি রেখে কঠিন ও নিষ্ঠুর সময়ে তিনি কখনো দেশের মাটি ত্যাগ করেননি। এবং বলেছিলেন—‘আমি বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও যাব না। এদেশের মাটিতেই লড়াই করে মরব।’ জীবনের শেষ সময়ে—এমন কি—সকল সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও দেশের ভেতরে চিকিৎসা নিয়ে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যেখানে সামান্য হাঁচি-কাশি হলে আমাদের রাজনীতিবিদরা বিদেশে চিকিৎসা করান, সেখানে বেগম জিয়ার শেষ চিকিৎসার এই দৃষ্টান্ত দেশের রাজনীতিবিদদের জন্য অনন্য নজির হয়ে থাকবে। দ্বিতীয়ত, মাঠের রাজনৈতিক বক্তৃতায় কিংবা প্রতিপক্ষের সমালোচনার ক্ষেত্রে তার ভাষা ছিল নমনীয়, মার্জিত এবং অধিকাংশে গণতান্ত্রিক সহনশীলতায় ভরা। এমন উদারনৈতিক মনোভাব তাকে সাধারণ মানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

স্মতর্ব্য যে—দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামে তার নেতৃত্ব জনগণের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের একক নেতৃত্ব কোনো দেশের ইতিহাসের নির্মাতা হতে পারে না। সেটা সম্ভবও নয়। কোনো দেশ ও জাতির ইতিহাসের নির্মাতা সে দেশের লড়াকু জনগণ। বাংলাদেশের সংকটকালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বেগম জিয়া জনগণের কাতারে সামিল হয়ে সেই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটাই তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য করে রাখবে। তিনি মামলা–মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার–কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ—রাজনৈতিক জীবনের এসব ঝুঁকিকে পাশ কাটাননি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো নেতৃত্বের দুর্বলতাও ছিল! তবে একথা ঠিক—পিচ্ছিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেটা দৃঢ় নেতৃত্বে আপসহীনভাবে মোকাবেলা করেছেন তিনি। তার জীবনাবসান এমন অস্থির সময়ে হলো, নানা অনিশ্চয়তার ভেতর যখন বাংলাদেশ ধুকে ধুকে গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা করছে। এমন সময় তার নেতৃত্বের ভেতর থেকে অনেক কিছু শেখার আছে—বিশেষ করে, আপামর মানুষের লড়াইয়ের অভিপ্রায় ও গণতান্ত্রিক পথে ফেরার মহরতে। অন্তত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পথে যাত্রায় উন্মুখ হয়ে থাকা বাংলাদেশের। আশাকরি, ভাবিষ্যতের বাংলাদেশ তাকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ রাখবে।

সালাম, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী!

লেখক: কবি ও চিন্তাবিদ