অক্টোবরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়ার পর আমাকে ‘কে’ ফোর্সের অন্তর্ভুক্ত করে যুদ্ধ এলাকায় পাঠানো হলো। নভেম্বরের ১/২ তারিখের রাতে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে আমাদের তিনটি কোম্পানি এবং দ্বিতীয় বেঙ্গলের আরো একটা কোম্পানি নিয়ে বেলুনিয়া পকেটে যেতে হয়। পরশুরাম ও ফুলগাজীর মাঝামাঝি পাকিস্তানিদের দুটি ক্যাম্পের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ গজের ‘গ্যাপ’ ছিল। এই গ্যাপের মধ্য দিয়ে রাতারাতি বাংকার খুঁড়ে আমরা অবস্থান নিয়ে ফেলি। ভোরবেলা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটা প্যাট্রোল পার্টি এ পথে আসে। এই প্যাট্রোল পার্টি আসছিল ফেনী ও বেলুনিয়া রেললাইন দিয়ে একটি ট্রলিতে করে। ট্রলি যখন ঠিক আমাদের পজিশনের ১০০ গজ দূরে এসে পড়ে তখনই তাদের ওপর আমরা হামলা চালাই। ট্রলিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট ছিল। তার সঙ্গে আরো ১০ জন ছিল। তাদের সবাইকে ওখানে আমরা ঘায়েল করি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পজিশন ছিল উত্তর দিকে বেলুনিয়া, দক্ষিণ দিকে ফুলগাজী এলাকা। তারা ধরে নিয়েছিল এটা বোধ হয় একটা মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশ। গোলাগুলির সঙ্গে সঙ্গে ফুলগাজী থেকে পাকিস্তানিদের রিইনফোর্সমেন্ট চলে আসে। ৪০-৫০ জন পাকসেনা আমাদের দিকে এগোতে থাকে হামলা চালানোর জন্য। ওরা যখন আমাদের রেঞ্জের মধ্যে চলে আসে তখন আমাদের সম্পূর্ণ ডিফেন্স—রেললাইনের পূর্ব-পশ্চিম দিক এবং বেলুনিয়া ফেনী সড়ক যেটা রেললাইনের সমান্তরাল—এ দুই পজিশন থেকে একই সঙ্গে আমরা আক্রমণ চালাই। আক্রমণে পাকিস্তানিদের ৪০ জনেরও বেশি হতাহত হয় এবং ছয়-সাতজন বোধ হয় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এসব অ্যামবুশে আমাদের পেছনে যে পাকিস্তানি পজিশন ছিল তারা শঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং তারা আমাদের মধ্য দিয়ে ‘ব্রেক থ্রো’ করার চেষ্টা করে। তারা সেইদিন রাতেই পালানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। পাকিস্তানিদের বেশির ভাগই আমাদের হাতে ধরা পড়ে এবং সেদিন রাতেই ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনী পাকিস্তানি পজিশনের ওপর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করে। পরের দিন বেলুনিয়া থেকে পরশুরাম পর্যন্ত সম্পূর্ণ এলাকাটি হানাদার বাহিনীমুক্ত হয়। এটা ছিল নভেম্বরের ঘটনা।
পরবর্তী সময়ে সব সময়ই কি এটা আপনাদের দখলে ছিল?
বস্তুতপক্ষে এর আগেও এ এলাকা আমাদের দখলে ছিল। বেলুনিয়ায় মুহুরী নদীর পশ্চিম দিক থেকে নিয়ে শালদা নামে একটা স্থান পর্যন্ত বলা যায় সব সময়ই আমাদের দখলে ছিল। আর বর্তমান এলাকা দখলের পর আমাদের এলাকা প্রায় তিনগুণ বেড়ে গেল। এখানে উল্লেখ করা যায় যে এ এলাকায় আমরা যখন তিনদিন পর্যন্ত একটানা পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করি, তখন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বিমান আমাদের ওপর হামলা চালায়। সেই বিমান হামলায় আমাদের ১০-১২ জনের মতো সৈন্য শহীদ হন এবং ১৫-১৬ জনের মতো আহত হন।
এখানে আমাদের ডিফেন্স খুব স্ট্রং ছিল এবং মনোবলও খুব দৃঢ় ছিল। সেই অটুট মনোবলের জন্যই সময়মতো এবং যথাযথ খাওয়া-দাওয়া না পেলেও সৈন্যরা সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে গেছেন। পরবর্তী সময়ে ইন্ডিয়ান কোর-কমান্ডার স্বগত সিং ব্যক্তিগতভাবে আমাদের এলাকা পরিদর্শনে আসেন এবং কমান্ডিং অফিসারদের অভিনন্দন জানান।
খাদ্যের ব্যাপারে আপনাদের কী ধরনের অসুবিধা ছিল? খাবার কি ঠিকমতো সরবরাহ হতো না?
আমরা খাবার পেতাম। আমাদের ব্যাটালিয়নের খাবার দেয়ার দায়িত্ব ছিল ইন্ডিয়ানদের তরফ থেকে। তবে আমাদের ব্যাটালিয়নের যত সৈন্য ‘অথরাইজড’ ছিল তার দ্বিগুণ লোক আমাদের ব্যাটালিয়নে ছিল। এর কারণ ছিল। মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে আমরা লোকজন সংগ্রহ করতাম এবং তাদেরকে আমাদের সঙ্গে রাখতাম। ফলে আমাদের সবাইকে মাসিক যে ভাতা দেয়া হতো সেটা এবং যে খাবার নির্দিষ্ট ছিল তা থেকে শেয়ার করতে হতো।
বেলুনিয়ায় নোয়াখালীর এমপি খাজা আহাম্মদ (আওয়ামী লীগের) এবং তার লোকজনের সঙ্গে আমাদের খুব একটা সৌহার্দ ছিল না। ফলে বেলুনিয়ার আওয়ামী লীগের তরফ থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি। তবে বেলুনিয়ার স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে সব সময় খুবই সহযোগিতা পেতাম। এ সময়ের একটা ঘটনার কথা আমার মনে পড়ে। আমাদের সৈন্যরা গিয়ে একটা অ্যামবুশ করে পাকিস্তানি পজিশনের পেছনে, সেটা ছিল অক্টোবরের শেষের দিকে। নিলকি নামে একটা গ্রাম ছিল, সেখানে পাকিস্তানিদের বেশ ক্ষতি হয়। সেই গ্রামে আমি ছিলাম, সংঘর্ষের পর আমি যখন চলে আসি, সেইদিনই অর্থাৎ পরদিন ভোরবেলা পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেই গ্রামটা জ্বালিয়ে দেয় এবং ৪০-৫০ জন লোককে নৃশসংভাবে হত্যা করে। তার মধ্যে ১৪ বছরের ছেলে ও ৮০ বছরের বৃদ্ধ ছিল। খবরটা পাওয়ার পর আমি মানসিকভাবে খুব দুঃখ পাই এবং রাতের বেলা আবার ফেরত যাই সেই গ্রামে। গ্রামবাসীরা আমাদের দেখে শোকে ভারাক্রান্ত না হয়ে তারা আমাদের আরো উৎসাহিত করতে থাকেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তারা আমাদের সব ধরনের সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন।
সেই রাতে একজন বৃদ্ধা তার গরুর দুধ দুইয়ে আমাদের দিলেন। অথচ তারই নাতিকে সকালে পাকিস্তানি সৈন্যরা মেরে ফেলেছে। তিনি বলছিলেন যে আমার নাতি গেছে তো কী হয়েছে। দেশ যদি একদিন স্বাধীন হয় তবে আমি সবাইকে ফিরে পাব। তোমাদের মাঝেই আমার নাতিকে পাব। গ্রামবাসীদের এ মনোবল আমাদেরকে শত্রু হননে আরো উৎসাহিত করে।
আমরা এমনও শুনেছি যে মুক্তিবাহিনী গ্রাম থেকে আক্রমণ চালালে পরবর্তী পর্যায়ে পাকিস্তানি সৈন্য সেই গ্রামে হামলা চালাত, সেই কারণে গ্রামবাসীরা খুব ভয়ে ভয়ে থাকত। কিন্তু পরে যখন মুক্তিবাহিনীর বিজয় হওয়া শুরু হলো তখন গ্রামবাসীরা দ্বিগুণ উৎসাহে সাড়া দিতে লাগল।
আপনাদের এ বিজয়গুলো গ্রামবাসীদের মনে কী ধরনের সাড়া জাগিয়েছিল?
এ প্রশ্নে আমি শুধু বলব, বেলুনিয়ার পর থেকে ফেনী এবং পরবর্তী পর্যায়ে চট্টগ্রামের দিকে যখন আমরা অগ্রসর হই তখন কোনো ট্রেঞ্চ, বাংকার আমাদের লোকদের পুরোপুরিভাবে খনন করতে হয়নি, গ্রামবাসীরা কোদাল নিয়ে এসে আমাদের সহযোগিতা করত, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গোলার আঘাতে গ্রামবাসীরাও হতাহত হতেন কিন্তু তবু তারা এগিয়ে আসতেন। তাদের মনোবল ছিল অটুট। গ্রামবাসীর মনোবল কত অটুট ছিল সে সম্পর্কে আমি এখানে একটা ঘটনার উল্লেখ করব। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ইন্ডিয়ান একটা প্যাট্রোল পার্টি পাকিস্তানি পজিশনের পেছনে চলে যায়। পাকিস্তানিরা দেখতে পেয়ে তাদের ওপর অবিরাম গোলাবর্ষণ করে। এক সময় ইন্ডিয়ান প্যাট্রোল পার্টির গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাচ্ছিল, সে সময় তারা খবর পাঠায় গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য। আমাদের গ্রামের লোকজন সেই গোলাবারুদ বহন করে নিয়ে যায় প্রায় সাত মাইল পথ অতিক্রম করে। ভারতীয় প্যাট্রোলে যে অফিসার ছিলেন তার সঙ্গে পরে আমার দেখা হয়। তিনি তখন বলেছিলেন, যে দেশের লোকজনের মনোবল এত শক্ত তারা স্বাধীন না হয়ে পারে না। তিনি আরো বলেন, ভারতীয় বাহিনীর যে নিয়মিত সাপ্লাই কোর আছে তারাও বোধ হয় যুদ্ধক্ষেত্রে এত তাড়াতাড়ি গোলাবারুদ সরবরাহ করতে পারত না, যতটা তাড়াতাড়ি করেছে তোমাদের গ্রামবাসীরা।
এ যুদ্ধের আর কোনো উল্লেখযোগ্য দিক আছে কি?
উল্লেখ করার আছে। এ যুদ্ধের পর যখন আমরা পাকিস্তানি ট্রেঞ্চ এবং বাংকারে তল্লাশি চালাই তখন আমরা একটি ধর্ষিত মহিলার লাশ পাই। বাংকারের পাশে মহিলার সঙ্গে একটি মৃত শিশু ছিল। পাকিস্তানিরা যে কী চরম বর্বরতা দেখিয়ে গেছে সেগুলো আজ আমরা ভুলে গেছি, যার জন্য আজকাল আমরা মুক্তিযুদ্ধকে মনে করি একটি দুর্ঘটনা।
এছাড়া পাকিস্তানি বর্বরতার আর কোনো ঘটনা মনে পড়ে কি?
আমি ঢাকায় দেখেছি ২৫ মার্চের পর বাঙালির মরদেহ কীভাবে রাস্তায় রাস্তায় পড়ে ছিল এবং আমাদের এনকাউন্টারে আমরাও পাকিস্তানি লাশ এভাবে রাস্তায় ফেলে রেখে যেতাম—এটা আমাদের একটা প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ ছিল। এ সংঘর্ষের পর পাকিস্তানিরা পুরো বেলুনিয়া ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় এবং ফেনীতে গিয়ে পজিশন নেয়।
চিটাগংয়ের দিকে যখন আমরা অ্যাডভান্স করি তখন সীতাকুণ্ডে পকিস্তানিরা আমাদের প্রতিরোধ করে। ১০ তারিখে আমরা সীতাকুণ্ডে পৌঁছাই। এরপর যখন আমরা কুমিরার কাছাকাছি এলাম তখন আমাদের ব্যাটালিয়নকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একটা অংশ আমাদের সিওর নেতৃত্বে তিন কোম্পানিসহ পাহাড়ের ওপর দিয়ে চিটাগং ইউনিভার্সিটির দিকে যায়। সেখানে বহু পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে।... ১৬ ডিসেম্বর বিকালে যখন সারেন্ডার আরম্ভ হয়েছে—পাকিস্তান আর্মির দুজন অফিসার সর্বপ্রথম আমার ডিফেন্সে এসে সারেন্ডার করে। তখন আমি ইন্ডিয়ান আর্মিকে খবর দিই। কমান্ডিং অফিসার এবং একজন ব্রিগেডিয়ার আসেন। আত্মসমর্পণকারী দুজন পাকিস্তানি অফিসারের একজন হচ্ছেন গোলন্দাজ বাহিনীর ক্যাপ্টেন ইফতেখার এবং একজন লেফটেন্যান্ট ছিলেন, তার নামটা আমি ভুলে গেছি। উনি বোধ হয় ৪৬ ই-এমের। ১৭ ডিসেম্বর যখন ইন্ডিয়ান আর্মি ‘মুভ’ করল চিটাগং শহরে, তখন ইন্ডিয়ান আর্মি সিদ্ধান্ত নেয় যে আমাদেরকে ঢুকতে দেবে না; আমরা পরে ঢুকব। ইন্ডিয়ান ৩২ মাহারের সিও ছিলেন লে. কর্নেল হরদেব সিং। যেহেতু আমি তার সঙ্গে ছিলাম, তিনি ব্রিগেড কমান্ডারের আদেশ অমান্য করে বলেন যে আমি তার সঙ্গে যাব এবং আমার কোম্পানি নিয়ে ১৭ তারিখেই চিটাগং শহরে মুভ করি।
সেদিনই কি পাকিস্তান আর্মি সারেন্ডার করে?
জি। এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সারেন্ডার করানো হয়নি। পাকিস্তানি সেনার যে ২৪ এফ-এফ ব্যাটালিয়ন এখানে তাদেরকে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে আনা হয় এবং তারা সেখানে সারেন্ডার করে। আমি এ কলেজে পড়াশোনা করেছি, আর সেই কলেজেই পাকিস্তান আর্মি সারেন্ডার করছে—এটা আমার কাছে খুব আনন্দের বিষয় ছিল। এখানে উল্লেখযোগ্য যে আমার সিও যিনি ছিলেন লে. কর্নেল জাফর ইমাম, উনি ২৪ এফ-এফে ছিলেন। তারই ব্যাটালিয়ন এখানে সারেন্ডার করল আমাদের কাছে, এটা বেশ আনন্দের ব্যাপার ছিল। তাকে যখন তার ব্যাটালিয়নের লোকজনকে দেখতে হলো তখন অনেকেই কান্নাকাটি করল। লে. কর্নেল জাফর ইমামের ব্যাটসম্যান নানা কথা জিজ্ঞাসা করতে করতে অঝোরে কাঁদতে থাকে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় সাধন করা হতো? সম্পর্ক কেমন ছিল?
এমনিতে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালোই ছিল। তবে আমাদের সেনাবাহিনী চায়নি যে ৩ ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করুক। সেদিন আমাদের অনেক লোকই কেঁদেছিল।
এরই মধ্যে আপনার কথায় দেখতে পাচ্ছি যে অনেকখানি জায়গা পুনর্দখল করে ভেতরে পৌঁছে গেছেন?
জি, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে আরো হয়তো দুই বছর লাগবে কিন্তু বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবেই হবে।










