দেশের এমএসএমই খাতের পরিস্থিতি কেমন?
২০২৪ সাল পুরোটাই চ্যালেঞ্জিং ছিল। বছরের শুরুতে নির্বাচন, জুলাইতে আন্দোলন, আগস্ট-সেপ্টেম্বরে দেশের পূর্বাঞ্চলে বন্যা—সবকিছু মিলিয়ে আমরা গত বছর বিশাল একটা চ্যালেঞ্জিং বছর পার করেছি। অর্থনীতি যখন এ ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, তখন ছোট ছোট গ্রাহক বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। এখন তারা আর্থিক সিদ্ধান্তগুলো আরো বিচক্ষণতার সঙ্গে নেয়ার চেষ্টা করছেন। আমরাও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের আর্থিক সাক্ষরতা বাড়াতে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি।
এমএসএমই খাতে ঋণ প্রদানে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন? এ খাতে ঋণ সুবিধা সহজলভ্য করতে সরকারের কাছে আপনাদের কোনো প্রত্যাশা আছে কি?
ঢাকার বাইরে ১৮টিসহ ইউনাইটেড ফাইন্যান্সের মোট ২৩টি শাখা থাকলেও ৬৪ জেলাতেই আমাদের কার্যক্রম বিস্তৃত। আমাদের ব্যবসার উদ্দেশ্য শুধু ঋণ দিয়ে মুনাফা অর্জন নয়, বরং কর্মসংস্থান তৈরি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দিকেও আমাদের নজর থাকে। ব্যবসার আকার অনুযায়ী যত ছোট গ্রাহকের কাছে যাবেন, তত বেশি পরিশ্রম করতে হয়। ছোট গ্রাহককে ঋণ দিলে তা ফেরত নেয়ার জন্য বেশি লোকবল নিয়োগ দিতে হয়। এতে আমাদের ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়। ফলে ব্যাংকের তুলনায় আমাদের মুনাফার হার কমে যায়।
তথ্যের ঘাটতি, প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা দেশের এমএসএমই খাতের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। উদ্যোক্তাদের এসব সমস্যা সমাধানে আপনাদের কোনো উদ্যোগ আছে কিনা?
ছোট গ্রাহকের আর্থিক লেনদেনের অতীত রেকর্ড পাওয়া যায় না। সেজন্য আমরা বলেছি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সরকার যতি তাদের একটি ডাটাবেজ তৈরি করে, সেখান থেকে আমরা গ্রাহক বাছাই করতে পারি। এটা উভয়ের জন্যই সুবিধাজনক হতো। তবে তথ্যপ্রযুক্তির যে সুবিধাটা আমরা পাচ্ছি, তা হলো অন্যান্য গ্রাহকের লেনদেন দেখে আমরা তাদের প্রবণতা বোঝার চেষ্টা করি। আর্থিক ঝুঁকি বিশ্লেষণের সময় নির্দিষ্ট ওই খাতের সম্ভাব্যতা যাচাই করার সুবিধা পাচ্ছি। এর পরও গ্রাহকরা আমাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে ঋণের জন্য আবেদন করলে আমরা গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। সম্প্রতি আমরা একটি অ্যাপসও তৈরি করেছি। তবু ছোট গ্রাহকরা আসছে না। এখনো সেই পুরনো রীতিতে আমরাই গ্রাহককে খুঁজে নিয়ে আসছি।
আবার দেশে ব্যাংক ও ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) কে কোন খাতে কাজ করবে—এ রকম কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এমএসএমই খাতে কাজ করতে গেলে একটু বেশি কষ্ট করতে হয়। আর এ পরিশ্রমটা ব্যাংকের লোক থেকে হয়তো আমরা বেশি করতে আগ্রহী। কারণ আমাদের অন্য কোথাও বিকল্প নেই। আমরা ধরেই নিয়েছি যে কষ্টাসাধ্য হলেও এ কাজ আমাদের করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ঋণ বিতরণে আপনাদের সাফল্য কেমন?
টেকসই অর্থায়নে টোটাল ডিসবার্সমেন্টের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেয়ার কথা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমরা সে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি অর্জন করেছি। বর্তমানে আমাদের পোর্টফোলিওর প্রায় ৭০ শতাংশই টেকসই অর্থায়নে বিতরণ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে সবুজ অর্থায়নসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারণ করে দেয়া সবক’টি লক্ষ্যমাত্রাই আমরা অর্জন করেছি। গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি অর্জন হয়েছে।
এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাদের অংশগ্রহণকে সহায়তা দিতে আপানাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
নারীদের জন্য আমাদের প্রতিটি শাখায় বিশেষ নারী উদ্যোক্তা ডেস্ক আছে। গত মাসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোক্তা মেলায় আমাদের একজন গ্রাহক পুরস্কৃতও হয়েছেন। ছেনছেন রাখাইন নামে রাঙ্গামাটির ওই নারী উদ্যোক্তা ছোট থেকেই আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তার জন্য আমরাও গর্বিত।
এমএসএমই খাতের বর্তমান নীতিমালায় আপনাদের জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা?
রিফাইন্যান্সিং স্কিমে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারণ করে দেয়া সুদহারেই আমরা ঋণ দিচ্ছি। কিন্তু ঋণ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সংগ্রহ ঝুঁকি থেকে যায়। গ্রাহক ঋণ ফেরত দিতে পারুক বা না পারুক, বাংলাদেশ ব্যাংকেকে কিন্তু আমাদের নির্দিষ্ট সুদহারে টাকাটা ফেরত দিতে হয়। অর্থাৎ টাকা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঝুঁকি নেই। কিন্তু আমাদের ঝুঁকি নিয়েই ঋণ দিতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনো ঋণ খেলাপি হলে সেটার পুরো ব্যয়ভার আমাদেরই বহন করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ঝুঁকি না নিয়েও পুরো টাকাটা ফেরত পেলেও আমাদের সবসময় ঝুঁকি থেকে যায়। এ জায়গায় আরো একটু ছাড় দেয়া দরকার। কারণ গ্রাহকের পুরো মূলধন ঝুঁকিটাই আমরা নিচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন যে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম শুরু করেছে, তার আওতা যদি আরো বাড়িয়ে দেয়া হয়, তখন আমাদের সাহসটা আরো বাড়বে।
ওয়ান স্টপ সার্ভিস কতটা অগ্রসর হয়েছে?
ওয়ান স্টপ সার্ভিসের চিন্তা বাংলাদেশে এখনো গড়ে উঠছে না। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ইউনাইটেড ফাইন্যান্স এ বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আবেদন, যাচাই, পরামর্শ ও প্রক্রিয়াকরণ—সব ধরনের সহায়তা এক জায়গা থেকেই দেয়া। আমাদের পুরো ঋণ প্রক্রিয়াকে যতটা সম্ভব ডিজিটাল ও একক প্লাটফর্মে আনার চেষ্টা করছি। সামনে আরো শক্ত কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে সেটাই হয়ে উঠবে আমাদের নিজস্ব ওয়ান স্টপ সার্ভিস। আমরা বিশ্বাস করি, এতে উদ্যোক্তাদের সময়, খরচ আর ঝামেলা অনেকটাই কমে যাবে।
সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা আপনাদের?
ব্যাংক খাতের মতো এনবিএফআইও তারল্য সংকটে আছে। কিন্তু গত এক বছরে ব্যাংক খাত যেভাবে তারল্য সহায়তা পেয়েছে, এনবিএফআই সে সহায়তাটা পায়নি। তারল্য সহায়তার পাশাপাশি এনবিএফআই সংস্কারেও যদি সরকার তার রোডম্যাপটা স্পষ্ট করে, ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম ও রিফাইন্যান্সের আওতা আরো বাড়ায়, তাহলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিই হয়তো আরো উপকৃত হবে।










