দেশে বড় আকারের বিনিয়োগের গতি এখন ধীর। এমন অবস্থায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আমাদের দেশে এমএসএমই খাতে বাড়তি মনোযোগ, সহায়তা প্রয়োজন আছে কি? দেশের এমএসএমই খাত এখন কেমন করছে?
বর্তমানে দেশে বড় আকারের বিনিয়োগের গতি কিছুটা মন্থর, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ ঝুঁকি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো কারণ থেকে উদ্ভূত। এ পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্য ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মাইক্রো উদ্যোগ খাতে বাড়তি মনোযোগ ও সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ, নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এমএসএমই খাতের একটি নতুন গতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ খাতের পরিপূর্ণ বিকাশে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাব, আধুনিক প্রযুক্তির অভিগম্যতায় সীমাবদ্ধতা, বাজারে প্রবেশাধিকারে প্রতিবন্ধকতা ও প্রশাসনিক জটিলতা। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক এমএসএমই খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে শরিয়াহভিত্তিক সহজ, ন্যায়সংগত ও সময়োপযোগী সেবা নিশ্চিত করে আসছে।
অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণ সুবিধার বাইরে আছেন। তাদের জন্য ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করতে আপনাদের ভাবনা বা উদ্যোগ কেমন?
আমাদের লক্ষ্য হলো প্রত্যন্ত এলাকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা, যাতে তারা অর্থায়নের মাধ্যমে তাদের ব্যবসায়িক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন। ক্লাস্টার-ভিত্তিক অর্থায়ন আমাদের অন্যতম উদ্যোগ, যার মাধ্যমে আমরা বিশেষত একাধিক উদ্যোক্তাকে একত্র করে তাদের প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সুবিধা দিচ্ছি। এছাড়া গ্রামীণ শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে মাইক্রো ফাইন্যান্স কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। এতে প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা সহজে ঋণ সুবিধা নিতে পারছেন এবং তাদের ব্যবসা পরিচালনায় আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছেন।
আমাদের কার্যক্রম শুধু অর্থায়নে সীমাবদ্ধ নয়, বরং উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও পরামর্শসেবা দিচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আমরা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কমপিটেটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রাম’ (এসআইসিআইপি) কর্মসূচি পরিচালনা করছি। এ কর্মসূচির মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের ব্যবসার সুষ্ঠু পরিচালনা, আর্থিক পরিকল্পনা ও বাজার ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেয়া হচ্ছে।
চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার রফতানি আয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে এমএসএমই খাতের। বাংলাদেশও কীভাবে এমএসএমই খাতকে আরো বেশি রফতানি আয়ের অংশীদার করতে পারে?
চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সহজতাই এ খাতের রফতানি বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। বাংলাদেশের জন্যও একই পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রযুক্তিভিত্তিক উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোক্তাদের আধুনিক মেশিনারিজ ও প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে গবেষণা ও উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে। এর জন্য একটি ন্যাশনাল প্রডাক্ট ইনোভেশন সেন্টার স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে উদ্যোক্তারা নতুন পণ্য তৈরি ও উন্নয়নের জন্য সহায়তা পাবেন। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করতে হবে।
অন্যদিকে ব্যাংক হিসেবে আমরা এমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য রফতানি অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক লেনদেন সুবিধা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছি। আমাদের ব্যাংক উদ্ভাবনী বিনিয়োগ পণ্য সরবরাহের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের রফতানিমুখী পণ্যের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে।
এমএসএমই খাতের কোন ধরনের প্রডাক্টকে আপনারা সম্ভাবনাময় মনে করেন?
আমার দৃষ্টিতে এমএসএমই খাতের সম্ভাবনাময় পণ্যগুলোর মধ্যে কৃষি ও খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কাঠ ও হস্তশিল্পজাত পণ্য, বস্ত্র ও পাটজাত সামগ্রী, আইসিটি-ভিত্তিক সেবা এবং জৈব ও সবুজ প্রযুক্তিপণ্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া জৈব সার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জাম ও পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের মতো সবুজ প্রযুক্তিপণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সক্ষম। স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার, দক্ষ শ্রমশক্তি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ই খাতগুলোকে আরো গতিশীল ও লাভজনক করে তুলতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাদের অংশগ্রহণকে সহায়তা দিতে আপানাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে এগিয়ে নিতে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। প্রতি বছর আমরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করি। এ প্রশিক্ষণে তারা ব্যবসা পরিকল্পনা, হিসাবরক্ষণ, মার্কেটিং, অনলাইন ব্যবসার কৌশলসহ বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান।
প্রতি বছর প্রতিটি শাখা থেকে ন্যূনতম তিনজন নতুন নারী উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং এর মধ্যে কমপক্ষে একজনকে বিনিয়োগ প্রদানের বাধ্যবাধকতা আছে। আমাদের ব্যাংকে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা স্কিম রয়েছে, যাতে জামানতের ঝামেলা ছাড়াই সহজে বিনিয়োগ পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রেই তারা ঘরে বসে অনলাইনে আবেদন করতে পারেন এবং স্থানীয় শাখা পর্যায় থেকেই সার্বিক সহায়তা পান। নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক সেবা ছাড়াও আমরা তাদের নেটওয়ার্কিং এক্সপোজার ও অনুপ্রেরণা বৃদ্ধিতে কাজ করি, যাতে তারা আত্মবিশ্বাস নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। আমাদের লক্ষ্য সম্ভাবনাময় প্রত্যেক নারী উদ্যোক্তার পাশে থেকে তাকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তোলা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যে আগামী দিনে আমরা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এর মধ্যে রয়েছে প্রতি জেলায় নারী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আয়োজন, মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল প্লাটফর্মে ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি, ক্লাস্টার-ভিত্তিক নারী উদ্যোক্তা হাট ও এক্সপো আয়োজন এবং সফল উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও স্বীকৃতি চালু করা।










