কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এমএসএমই খাতে বাড়তি মনোযোগ, সহায়তা প্রয়োজন আছে কি? দেশের এমএসএমই খাত এখন কেমন করছে?

দেশে বড় বিনিয়োগের গতি ধীর হওয়ায় কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির জন্য এমএসএমই খাতে বাড়তি মনোযোগ অত্যন্ত প্রয়োজন। বর্তমানে এ খাত দেশের জিডিপির প্রায় ২৫ ও শিল্প খাতের ৯৩ শতাংশ অবদান রাখছে। তবে কভিড মহামারী ও পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অস্থিরতায় অনেক উদ্যোক্তা মূলধন সংকটে পড়েছেন। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সহায়তার ঘাটতি ও দক্ষতার অভাব এ খাতের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, বাজার সংযোগ ও কর রেয়াতের মতো সহায়তা জরুরি। এমএসএমই খাতকে শক্তিশালী করা গেলে তা অর্থনীতির জন্য একটি টেকসই ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।

এমএসএমই খাতের অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণ সুবিধার বাইরে আছেন। তাদের জন্য ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করতে আপনাদের ভাবনা বা উদ্যোগ কেমন?

ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা এমএসএমই উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা টেকসই অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা ‘ছোট পুঁজি’। নতুন ও অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সুবিধা ‘উদ্যোগ’। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা ‘অপরাজিতা’। গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছতে শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত এসইআইপি (স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম) একটি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, যার মূল লক্ষ্য বেকার ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে টেকসই কর্মসংস্থানে যুক্ত করা। এবি ব্যাংক ‘‌অংশীদার প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা প্রদান করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই বিভাগের তত্ত্বাবধানে ময়মনসিংহ ও খাগড়াছড়িতে এ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এদের মধ্যে আগ্রহী ও উপযুক্ত বিবেচনায় মোট ৪৬ জনকে ঋণ দেয়া হয়েছে।

এবি ব্যাংক নিজস্ব উদ্যোগ এবং অর্থায়নে বিভিন্ন জেলায় ২ হাজার ৬৩৭ জন প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তাকে উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। এদের মধ্যে আগ্রহী ও উপযুক্ত উদ্যোক্তাকে ঋণ দেয়া হয়েছে।

চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে রফতানি আয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে এমএসএমই খাতের। বাংলাদেশও কীভাবে এমএসএমই খাতকে আরো বেশি রফতানি আয়ের অংশীদার করতে পারে?

বাংলাদেশে এমএসএমই খাতকে রফতানিমুখী করতে হলে প্রয়োজন পণ্যের মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সনদায়ন, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণ। সরকারকে রফতানিমুখী এমএসএমইর জন্য স্বল্প সুদে ঋণ, কর প্রণোদনা ও পরামর্শক সেবা দিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বাজার অনুসন্ধান, বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ ও রফতানি প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করা জরুরি। হস্তশিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য, আইসিটি ও হালকা প্রকৌশল খাতকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করলে এমএসএমই খাত রফতানি আয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে।

এমএসএমই খাতের কোন ধরনের প্রডাক্টকে আপনার সম্ভাবনাময় মনে করেন?

বাংলাদেশের এমএসএমই খাতে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রডাক্ট বা খাতের মধ্যে রয়েছে হস্তশিল্প ও পাটজাত পণ্য, যা পরিবেশবান্ধব। আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য যেমন মধু, শুকনা ফল, আচার, মাছ ও দুগ্ধজাত পণ্য, দেশ-বিদেশের বাজারে জনপ্রিয়। বগুড়া, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে গড়ে ওঠা হালকা প্রকৌশল খাতটি কৃষি যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে আইসিটি ও সফটওয়্যার সেবা খাত দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি পোশাক ও হস্তশিল্প দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মেলায় ব্যাপক সাড়া পাচ্ছে। এ খাতগুলোয় প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও রফতানি সহায়তা বাড়ানো হলে এমএসএমই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরো বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাদের অংশগ্রহণকে সহায়তা দিতে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নে এবি ব্যাংক বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা চালু করেছি বিশেষ ঋণ সুবিধা ‘অপরাজিতা’। এছাড়া নারীদের সহজ শর্তে যেকোনো ঋণ দেয়া হয়। নারী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, উদ্যোক্তা মেলা ও বিভিন্ন নারী উদ্যোক্তা সংগঠনের অংশীদারত্বে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ব্যবসায়িক দক্ষতা ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে কাজ করছি, যাতে তারা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারেন।

উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছতে আপনাদের এজেন্ট, উপশাখা বা শাখা কীভাবে ভূমিকা রাখছে?

এবি ব্যাংক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমএসএমই উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছতে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। বর্তমানে আমাদের রয়েছে ১০৪টি পূর্ণাঙ্গ শাখা, ৫৭টি উপশাখা ও ২১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং কেন্দ্র, যা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা সহজে অ্যাকাউন্ট খোলা, ঋণ আবেদন, লেনদেন ও পরামর্শ সেবা পাচ্ছেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ও প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন।