এমএসএমই খাতের অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণ সুবিধার বাইরে আছেন। তাদের জন্য ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করতে কী করা যেতে পারে?
বাংলাদেশে ব্যাংক ব্যবস্থা শুরুই হয়েছিল করপোরেটকে কেন্দ্র করে। হঠাৎ কয়েক বছর আগে এমএসএমই নজরে আসে। এরপর ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে এমএসএমইর জন্য তাদের প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন করতে শুরু করে। সে সময় যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান নতুন করে গড়ে উঠছিল, তারা হয়তো এমএসএমইতেই তাদের নজর রেখেছে। পুরনো ব্যাংকগুলো এখনো এ খাতের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই ব্যাংকগুলো হয়তো সে ধরনের কাঠামো তৈরি করে ফেলবে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে যত আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য আমাদের সামনে এসেছে, সবই কিন্তু করপোরেটরা করেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে এখন বৈচিত্র্য আসছে। তারাও এমএসএমইর দিকে নজর দিচ্ছে। তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ব্যাংকে এমএসএমইর সম্পৃক্ততা বাড়বে।
এমএসএমই খাতে আপনাদের ব্যাংকের অবস্থান কী?
শুরু করার পর শুধু উপশাখার মাধ্যমেই আমরা ১ হাজার কোটি টাকার মতো ঋণ এমএসএমই খাতে দিয়েছি। ব্যাংকের টোটাল পোর্টফোলিওর ২৬ শতাংশ এমএসএমইতে বিতরণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যকে আমরা ৩৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে রফতানি আয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে এমএসএমই। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কীভাবে কাজ করতে পারে?
রফতানির জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যে হিসাবনিকাশ, এগুলোর বোঝা ও বাস্তবায়ন করার সামর্থ্য এমএসএমই উদ্যোক্তাদের নেই। আবার ব্যাংক স্বপ্রণোদিত হয়ে রফতানি করাবে, এটাও খুব কঠিন। তবে দুটো পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে এক্ষেত্রে। এক. চীনের আলীবাবার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে। আলীবাবা করপোরেট ও এমএসএমই—দুটোরই সেবা দিচ্ছে। গুচ্ছভুক্ত এমএসএমই থেকেই কিন্তু বাটা বা অ্যাপেক্সের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানে পণ্য যাচ্ছে। এর অর্থ হলো তাদের পণ্যের গুণগত মান ও উৎপাদন সক্ষমতা আছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার কারণে বড় উদ্যোক্তারা তাদের থেকে পণ্য নিয়ে যাচ্ছে। তারা সরাসরি রফতানি করতে পারছে না। আলীবাবার মতো এ রকম একটা প্লাটফর্ম হলে ওই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার পণ্য প্রদর্শন করতে পারবে। এ বিষয়টিকে যদি আমরা সারা বিশ্বে পরিচিত করাতে পারি, তাহলে শুধু এমএসএমই খাতকে আলাদা করে রফতানি করার জন্য কাজ করতে হবে না। ক্রয়াদেশ পেয়ে পণ্য সরবরাহ করবে, আর ডলার পেয়ে যাবে। মাঝখানের ঝক্কি-ঝামেলা তাদের নিতে হবে না। আমাদের উদ্যোগটা হতে হবে এমন যে কমন প্লাটফর্মটি সব এমএসএমইকে তাদের নেটওয়ার্কে নিয়ে আসবে এবং এর মূল নজর হবে আলীবাবার মতো রফতানিতে। এ রকম করতে পারলে আমাদের এমএসএমই খাতও রফতানির দিকে চলে যাবে। এতে ব্যক্তি খরচও কমে যাবে এবং মধ্যস্বত্ব প্রতিষ্ঠানও অনেক বেশি লাভবান হবে।
দুই. ব্যাংকের উপশাখার প্রসার। আমাদের এমএসএমইগুলো প্রায় প্রত্যন্ত অঞ্চলকেন্দ্রিক। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সেখানে ঋণ দেয়ার সুযোগ নেই। এজন্য ভালো ভালো যেসব ব্যাংক আছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেসব ব্যাংককে আরো বেশি উপশাখা চালুর অনুমোদন দিতে পারে।
এমএসএমই খাত নিয়ে নীতিমালায় কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখেন কিনা?
করপোরেটকে ১০-১২ শতাংশ সুদ হারে ঋণ দিলেও এমএমএমইকে ১৩-১৪ শতাংশ হারে ঋণ দিতে হচ্ছে। এমএসএমইকে যদি আমরা সত্যিকারার্থে এগিয়ে আনতে চাই, তাহলে এ খাতে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে। অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সাশ্রয়ী প্যাকেজ থাকতে পারে, যা আমাদের মাধ্যমে বিতরণ করে আরো কম হারে সুদ নেবে। কিংবা যাদের কোনো খেলাপি নেই, তাদের রেমিট্যান্সের মতো ২ শতাংশ বা এ রকম কিছু প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। এ মুহূর্তে মাইক্রোইকোনমি খুব চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে, মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট ইত্যাদি কারণে এমএসএমই খাত একটা ধাক্কাও খেয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে ব্যাংকগুলোয় এমএসএমই খাতের জন্য একটা বাজেট দেয়া যেতে পারে। তাহলে সবারই খরচ কমে আসবে।
এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাদের অংশগ্রহণকে সহায়তা দিতে কী উদ্যোগ দরকার?
নারীদের জন্য নিয়মিত স্কিমের পাশাপাশি বিশেষ স্কিমও আছে। বাংলাদেশে নারীদের একটা নীরব বিপ্লব হচ্ছে। ছোট ছোট উদ্যোক্তা তৈরি করার মাধ্যমে এর বীজ বপন করেছে এনজিওগুলো। গ্রামগঞ্জের নারীদের সঙ্গে উৎপাদন ও বাজারের অনেক বেশি সংযোগ তৈরি হয়েছে। তারা এখনো এনজিওকেন্দ্রিক এবং অনেক বেশি পরিমাণে তাদের সুদ দিতে হয়। এ জায়গায় এখনো ব্যাংক ঠিকভাবে পৌঁছতে পারেনি। এসব নারী উদ্যোক্তাকে যদি এনজিও থেকে বের করে ব্যাংকমুখী করা যায় তাহলে তাদের অর্থনৈতিক ব্যয় ৪০-৫০ শতাংশ কমে যাবে। আমাদের সামাজিক অর্থনীতির বৈষম্য কমাতে চাইলে ব্যাংকগুলোকে দ্রুত প্রসারিত হতে দিতে হবে। এজন্য শুধু উপজেলা নয়, প্রতিটা ভালো বাজারে ব্যাংককেন্দ্রিক কার্যক্রমের সুযোগ করে দিতে হবে।
এমএসএমই খাতের উন্নয়নে সরকারের কী কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?
আমাদের টেকসই অর্থনীতির জন্য এমএসএমই খাতের বিকল্প নেই। এ খাতের উন্নয়নে সবার জন্য একটা কমন প্লাটফর্ম তৈরিতে সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ভূমিকা রাখতে পারে। উদ্যোক্তাদের ডাটা কারো কাছে নেই। তাদের ডাটা তৈরি ও সংরক্ষণে এসএমই ফাউন্ডেশন এগিয়ে আসতে পারে। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। আমাদের অর্থনীতির সব চিন্তা করপোরেটদের জন্য। তাদের জন্য বড় বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা হয়। অথচ এমএসএমইদের জন্য উপজেলা পর্যায়েই ছোট কিছু জমিজমা নিয়ে গুচ্ছভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা যেতে পারে। এমএসএমই খাতে যারা ব্যবসা করতে চায়, তাদের জন্য যদি এ রকম অবকাঠামো তৈরি করে দিতে পারি, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা অনেক মেধাবী ও পরিশ্রমীরাও এগিয়ে আসবেন। সরকারের পক্ষ থেকে ইপিজেড যেমন করা হচ্ছে, সে রকম উপজেলাভিত্তিক ছোট এমএসএমই শিল্পাঞ্চল করে দেয়া যেতে পারে। এখানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব তৈরি হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের জন্যও একটা জায়গা তৈরি হবে।










