এমএসএমই খাতের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে ব্যাংকগুলো কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?

চাহিদাভিত্তিক নির্দিষ্ট আর্থিক প্রডাক্ট অফার এবং ঋণ লাভের প্রক্রিয়াকে সহজ করার মাধ্যমে এমএসএমই খাতের উন্নয়নে ব্যাংকগুলো তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো আর্থিক লিটারেসি প্রোগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অধিকতর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে এমএসএমইগুলোকে সহায়তা করতে পারে। ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্রসারের মাধ্যমে এ শিল্প খাতে প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করার সুযোগ রয়েছে ব্যাংকগুলোর। এমএসএমইগুলোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ ও নতুন উচ্চতায় আরোহণ করার জন্য তাদের অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এ খাতের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ব্যাংকগুলো সার্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

অর্থায়ন প্রাপ্তিতে এমএসএমইগুলোর মূল সমস্যাগুলো কী এবং আপনারা কীভাবে এর সমাধান করছেন, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ক্ষেত্রে?

ব্যাংকগুলোর উচ্চ জামানত চাহিদা ও সুদহার এবং ফি এবং অনেক সময় এমএসএমইগুলোর বিশেষ চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত আর্থিক প্রডাক্টের অনুপস্থিতির কারণে খাতটির উদ্যোক্তারা এ ঋণ সুবিধা পেতে অনুৎসাহিত বোধ করেন অথবা পান না। ইস্টার্ন ব্যাংক এসব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় উদ্ভাবনী সমাধান অফার করছে, গ্রাহকের প্রয়োজন অনুসারে ঋণ প্রদান করছে, যার জন্য কোনো জামানতের প্রয়োজন হয় না। অন্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় আমরা প্রতিযোগিতামূলক সুদহার এবং উত্তম গ্রাহক সেবা অফার করার মাধ্যমে গ্রাহকের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। ক্ষুদ্র শিল্পগুলোকে আমরা সরাসরি নিজেরাই ঋণ প্রদান করি না, সারা বাংলাদেশে বিস্তৃত অসংখ্য এনজিওর মাধ্যমে এ সুবিধা গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়, যাতে সর্বোচ্চসংখ্যক গ্রাহক সেবাটি পেতে পারেন।

এমএসএমইদের জন্য আপনাদের কি কোনো নির্দিষ্ট প্রডাক্ট, আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি অথবা ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম রয়েছে? মূল উদ্যোগগুলোর ওপর অনুগ্রহপূর্বক আলোকপাত করুন।

আমাদের ব্যাংকের একাধিক নির্দিষ্ট ও চাহিদাভিত্তিক ঋণ প্রডাক্ট, আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি ও ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা ‘ইবিএল মুক্তি’ অফার করি, যা দেশে সর্বোচ্চ জামানতবিহীন ব্যবসায়ী ঋণ। আমাদের অন্যতম একটি এসএমই লোন হলো ‘ইবিএল স্টার্ট-আপ এক্সপ্লোরার’। এর মাধ্যমে আমরা সেসব স্টার্ট-আপকে অর্থায়ন করি, যারা নতুন পণ্য ও সেবা উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এবং সুপরিচিত বেশকিছু গ্রাহককে সেবা প্রদান করেছেন। আমাদের অন্য আরেকটি এসএমই লোন হলো ‘ইবিএল উৎকর্ষ’, যার লক্ষ্য জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করা। এ ঋণের সীমা দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আমরা সারা বাংলাদেশে এরই মধ্যে তিন বছর ধরে আর্থিক সক্ষমতা কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছি। এ কর্মসূচির লক্ষ্য গ্রাহককে আর্থিক বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন এবং তাদের সম্যক ধারণা প্রদান করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনের আওতায় শুরু থেকেই ইবিএল ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমে অংশগ্রহণ করেছে এবং আমরা এরই মধ্যে সফলভাবে এ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছি। ফলে স্টিমুলাস তহবিল, নারী তহবিল ও সিএমএসএমইর জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ বরাদ্ধ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হয়েছি।

এমএসএমই বিশেষ করে আধা-পৌর গ্রামীণ অঞ্চলে গ্রাহকের দোরগোড়ায় অধিক হারে পৌঁছতে এবং উন্নত সেবা প্রদানে আপনার ব্যাংক কীভাবে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবহার করছে?

আমাদের একটি অত্যাধুনিক ইবিএল স্কাইব্যাংকিং সেবা রয়েছে, যা মূলত একটি অল-ইন-ওয়ান মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ। এর মাধ্যমে আমরা দিনরাত গ্রাহককে আধুনিক ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও ডিজিটাল মিডিয়া মার্কেটিং ব্যবহার করে সব সামাজিক প্লাটফর্ম, যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, লিংকডইন ইত্যাদিতে গ্রাহককে অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি তাদের অভিজ্ঞতাকে আরো সমৃদ্ধ করা।

নারীদের এমএসএমইগুলোকে সহায়তা প্রদান এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিতে আপনার প্রতিষ্ঠান কী কী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে?

আমরা লিঙ্গবৈষম্য হ্রাসে নিয়মিত কাজ করছি। এ লক্ষ্যে ইবিএল এমএসএমই নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক নেতৃত্ব গ্রহণে উৎসাহিত করছি এবং তাদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ সৃষ্টিতে ‘ইবিএল মুক্তি’ শীর্ষক একটি ঋণ কর্মসূচির বাস্তবায়ন করছি। এ কর্মসূচিতে নারী উদ্যোক্তাদের ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়া হয়, যার অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ লাখ জামানতবিহীন। নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে ‘ইবিএল উইমেন ব্যাংকিং পোর্টাল’-এর মাধ্যমে আমরা একটি ওয়ান-স্টপ উদ্যোক্তা উন্নয়ন পরিষেবা প্রদান করছি। আমরা এজন্য বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অ্যান্ড কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং চিটাগং উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। আমাদের উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে ইবিএল নারী উদ্যোক্তাদের মর্যাদা ও সক্ষমতা নিশ্চিত করে তাদের সাফল্য অর্জনে ভূমিকা রাখছে।

টেকসই এমএসএমই ইকো-সিস্টেমের উন্নয়ন নিশ্চিতে আপনি কী ধরনের নীতি সংস্কার এবং ব্যাংক ও সরকারের মধ্যে সহযোগিতা সুপারিশ করবেন?

ভবিষ্যতে বাংলাদেশের এমএসএমই ইকো-সিস্টেমের টেকসই নিশ্চিত করতে হলে একই সঙ্গে নীতি সংস্কার এবং সরকার ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমএসএমইর জন্য ঋণ বিতরণকে আরো সহজ করতে হবে। নিয়ন্ত্রণমূলক জটিলতা ও কমপ্লায়েন্স খরচ কমাতে হবে। এজন্য ঋণ আবেদন প্রক্রিয়ায় একটি স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা এবং এমএসএমইগুলোর জন্য সময়মতো ঋণ অনুমোদন জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে একটি অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে সরকার নতুন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল তৈরি করতে পারে, যার সুদহার কম হবে এবং সেসব রফতানিমুখী এমএসএমইগুলোয় যারা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তাদের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারকে আংশিক ক্রেডিট গ্যারান্টি প্রদান করতে হবে। সবশেষে ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের উন্নয়ন ও প্রসারকে আরো বেগবান করতে হবে, যাতে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোয় গ্রাহকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে লেনদেনের খরচ কমে আসবে এবং অর্থায়ন সেবা লাভের পরিসর বাড়বে।