বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসএমই খাতকে শক্তিশালী করতে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ খাতে যেখানে প্রায় ৭৮-৮০ লাখ সিএমএসএমই রয়েছে এবং এসব উদ্যোগ দেশের মোট কর্মসংস্থানের ২৫-৩০% ও জিডিপির প্রায় ২৫% পর্যন্ত অবদান রাখে। তবে এ খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় ব্যাংকিং সুবিধা ও সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসএমই খাতকে আরো শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। যেমন সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জামানতবিহীন ঋণ প্রদান বাধ্যতামূলক করা, ঋণ প্রক্রিয়াকে সহজতর করা, নীতিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং সেবা চালু, ডিজিটাল রেকর্ড ও ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থা প্রবর্তন, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ, ক্লাস্টারভিত্তিক উন্নয়ন ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম চালু এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবাকে সহজসাধ্য ও কার্যকর করা। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসএমই খাত দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
সিএমএসএমই খাতে আপনাদের ঋণের পরিমাণ ও গ্রাহকসংখ্যা কেমন?
প্রাইম ব্যাংক সিএমএসএমই খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। বর্তমানে এ খাতে ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি এবং আমাদের সাড়ে ১১ হাজারের অধিক সক্রিয় ঋণগ্রহীতা রয়েছেন। এছাড়া ব্যাংকের মোট সিএমএসএমই গ্রাহকের সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি, যা দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের প্রমাণ। প্রাইম ব্যাংক এ খাতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সহজতর ঋণপ্রাপ্তি এবং উদ্যোক্তা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যেন সিএমএসএমই খাত দেশের অর্থনীতিতে আরো বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তির বাস্তব চিত্রটা আসলে কেমন?
বাংলাদেশে এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার বাস্তব চিত্রটি এখনো বেশ চ্যালেঞ্জিং। যদিও এ খাতে ঋণের চাহিদা অনেক, তবে অনেক উদ্যোক্তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঋণ পাওয়ার জন্য প্রস্তুত নন। বিশেষ করে অনেকেরই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ট্রেড লাইসেন্স কিংবা ট্রানজেকশন রেকর্ড নেই, যা ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার অন্যতম শর্ত। ব্যাংকের প্রথাগত ঋণ প্রক্রিয়া এবং কাগজপত্রের জটিলতার কারণে নতুন বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েন। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য চিত্রটি আরো কঠিন, কারণ তারা অনেক সময় পরিবার বা সমাজ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না। অনেক উদ্যোক্তা ঋণের শর্তাবলি ঠিকভাবে বুঝতে পারেন না, ফলে তিনি সঠিকভাবে আবেদন করতে পারেন না। রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এক্ষেত্রে খুবই জরুরি। এ বাস্তবতায় জামানতবিহীন বা আংশিক জামানতভিত্তিক ঋণ, প্রশিক্ষণ ও হ্যান্ডহোল্ডিং সার্ভিস এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সহজ আবেদন প্রক্রিয়া চালুর মাধ্যমে এসএমই উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে সহায়তা করা জরুরি। উদ্ভাবনী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে এসএমই খাতে ঋণপ্রাপ্তি সহজতর করা গেলে এ খাত দেশের অর্থনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়েছে। উদ্যোক্তাদের ওপর এতে কেমন প্রভাব পড়বে?
ব্যাংক ঋণের সুদহার মূলত বাজারভিত্তিক হওয়ায় এটি সময় ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। সুদহার বৃদ্ধিতে ব্যবসায়িক খরচ বাড়লেও এসএমই উদ্যোক্তারা খরচ কমানোর মাধ্যমে তা সমাধান করতে পারেন। এ পরিস্থিতি কর্মীদের দক্ষতা বাড়িয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ করে দেয়। এতে ভবিষ্যতে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের পথ আরো মসৃণ হবে।
আপনাদের ঋণ বিতরণ ও আদায়ের অভিজ্ঞতা কেমন?
সার্বিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণে কিছুটা ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে ভালো, পরিচ্ছন্ন ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কযুক্ত ক্লায়েন্টদের ঋণ অনুমোদন করা হচ্ছে। খেলাপি নির্ণয়ে নতুন নিয়ম পরিপালনের জন্য ঋণের প্রকৃত চিত্র বের হয়ে আসছে
বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় অনেক উদ্যোক্তা চাপে পড়েছেন, এসএমই খাত কেমন করছে?
বাংলাদেশ ব্যাংক ও এসএমই ফাউন্ডেশনের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রোগ্রামের সহায়তায় এসএমই খাত তুলনামূলক নমনীয় ও টিকে থাকার চেষ্টা করছে। তবে চাহিদা হ্রাস, মূল্যস্ফীতি ও রিসোর্স সংকট এ খাতেও ধাক্কা দিচ্ছে। যারা প্রযুক্তি বা অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় এসেছে তারা তুলনামূলকভাবে ভালো করছে।
ডলার পরিস্থিতি এ খাতে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি?
রফতানি আয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ, বৈদেশিক ঋণসহ অন্যান্য উৎস থেকে ডলারের সরবরাহ আগের তুলনায় স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। আমরা ধাপে ধাপে আগামীর আরো স্থিতিশীল ও সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।










