বিশুদ্ধ পানির অভাব এখনো দেশের বহু এলাকায় নীরব সংকট। স্কুল, হাসপাতাল, এমনকি ঘরের ভেতরেও নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা নেই অনেক স্থানেই। এ বাস্তবতায় জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে প্রাইম ব্যাংকের প্রজেক্ট ‘তৃষ্ণা’। যেখানে মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, সেখানে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করাই প্রকল্পটির উদ্দেশ্য।

এরই মধ্যে উদ্যোগটির দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে স্থাপিত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২০টি বিদ্যালয়ের ৮ হাজার ৬৮০-এর বেশি শিক্ষার্থী সরাসরি নিরাপদ পানির সুবিধা পাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি স্বাস্থ্য, উপস্থিতি ও পড়ালেখার পরিবেশে।

প্রজেক্ট তৃষ্ণা বাস্তবায়িত ২০টি বিদ্যালয়ের একটি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুয়াবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক আবুল মোহাম্মদ কালাম বলেন, ‘আগে অনেক শিক্ষার্থী পানিবাহিত রোগে নিয়মিত অসুস্থ হয়ে পড়ত। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির সহজপ্রাপ্যতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াচ্ছে, একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির হারও কমছে।’

প্রজেক্ট তৃষ্ণার প্রভাব শুধু স্কুল চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যালয়ভিত্তিক এ পানি ব্যবস্থার সুফল ছড়িয়ে পড়েছে অতিরিক্ত প্রায় ২৬ হাজার পরিবারের সদস্য ও আশপাশের প্রতিবেশীদের জীবনে। শিক্ষার্থীদের হাত ধরে নিরাপদ পানি ব্যবহারের বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে ঘরে। অনেক পরিবারই এখন পানির গুণগত মান নিয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতন।

স্বাস্থ্য খাতেও প্রজেক্ট তৃষ্ণার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ঢাকার ছয়টি হাসপাতালে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার ৫০০ রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা পাচ্ছেন। হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল স্থানে পানির মান সরাসরি রোগ সংক্রমণ ও চিকিৎসার নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। এখানে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা মানে রোগীর ঝুঁকি কমানো, স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মপরিবেশ নিরাপদ করা।

প্রজেক্ট তৃষ্ণার আওতায় বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা হাসপাতালগুলোর একটি রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠনটির সেবাদানকারী ফাতেমা আক্তার বলেন, ‘রাজধানীতে নিরাপদ পানির সংকট নিত্যদিনের। হাসপাতালে আসা রোগী ও তার আত্মীস্বজন প্রায়ই বোতলজাত পানি কিনে পান করতেন। প্রজেক্ট তৃষ্ণা সে কাজ অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। এখন তারা হাসপাতালের অভ্যন্তর থেকেই নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে পারছেন।’

প্রজেক্ট তৃষ্ণাকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, বরং জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এটি একসঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করছে। শুধু অবকাঠামো স্থাপন নয়, ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানান প্রাইম ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত চার বছর ধরে প্রাইম ব্যাংক সিএসআর খাতে কার্যকর ব্যয় বৃদ্ধির চেষ্টা করেছে। এর ফলে নতুন ধরনের কাজ করছে তারা। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি ‘‌ফুটস্টেপ বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে মিলিত হয়ে যৌথভাবে ‘‌তৃষ্ণা’ প্রকল্প চালু করেছে। ঢাকার বাইরে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, যেখানে শিশুরা সারা দিন স্কুলে থাকছে; কিন্তু নিরাপদ ও সুপেয় পানি পাচ্ছে না। বাসা থেকে বোতলে করে কতটুকুই আর পানি আনা যায়! আবার হাসপাতালগুলোতে অনেক রোগী আসছে। তাদের অনেককেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এসব দিক চিন্তা করেই প্রাইম ব্যাংক স্কুল ও হাসপাতালে ‘‌তৃষ্ণা’ প্রকল্প চালু করেছে। এ প্রকল্পকে আরো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।