কক্সবাজারের উপকূল থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সোনাদিয়া। বিদ্যুৎ সুবিধা না থাকায় সন্ধ্যার পর কার্যত এ দ্বীপে জনজীবন থমকে যেত। রাতে আলো বলতে দেখা যেত কেবলই চাঁদের আলো। শিশুদের পড়াশোনা করতে হতো কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে। পড়াশোনার সময় সংকুচিত হয়ে আসত, গরমে পাখা চালানোর প্রশ্নই উঠত না। দ্বীপে সে বাস্তবতায় বদলের ছোঁয়া এসেছে প্রাইম ব্যাংকের উদ্যোগে স্থাপিত সোলারের আলোয়। দ্বীপের ১০০টি পরিবার এখন সোলার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। প্রতিটি ঘরে বসানো হয়েছে চারটি করে লাইট, একটি করে বিদ্যুচ্চালিত পাখা ও একটি পাওয়ার পয়েন্ট। এতে করে পরিবারগুলো অন্তত মৌলিক বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। দ্বীপবাসীর জীবনে নেমে এসেছে আলোর ছোঁয়া।
সোনাদিয়া দ্বীপে বর্তমানে প্রায় ৩১১টি পরিবার বসবাস করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি সবসময়ই মাথার ওপর ঝুলে থাকে। অবকাঠামোগত জটিলতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রাকৃতিক ঝুঁকির কারণে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ এখানে পৌঁছানো বেশ কঠিন। ফলে দ্বীপবাসীর দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আয়মূলক কার্যক্রমে বিদ্যুতের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেখানে সমাধান হয়ে এসেছে প্রাইম ব্যাংকের গ্রীন রিনিউএবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প। দ্বীপবাসীর জীবন আলোকিত করতে এগিয়ে আসে দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক ও পরিবেশগতভাবে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ফুটস্টেপ’। সংগঠনটির সহযোগিতায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়।
শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ করেই থেমে থাকেনি প্রাইম ব্যাংক; বরং টেকসইভাবে একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করার লক্ষ্যে সোলার সিস্টেম বসানোয় সীমাবদ্ধ না থেকে রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৫ জন স্থানীয় তরুণদের সোলার সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা প্রাথমিক ত্রুটি শনাক্ত, ছোটখাটো মেরামত এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সিস্টেমগুলোর স্থায়িত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষতাও তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় এ বিদ্যুৎ সুবিধা এরই মধ্যে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার পর ঘরে আলো জ্বালানো, ফ্যান ব্যবহারের মাধ্যমে স্বস্তি পাওয়া এবং মোবাইল ফোন বা অন্যান্য ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস চার্জ দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে করে শিশুদের পড়াশোনার সময় বেড়েছে এবং পরিবারগুলোর দৈনন্দিন কাজকর্মে স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে।
এ দ্বীপের বাসিন্দা শাকিলা বেগম বলেন, ‘সন্ধ্যার পর কেরোসিনের বাতির নিভুনিভু আলোতে শিশুরা বেশিক্ষণ পড়তে পারত না। বইয়ের অক্ষরগুলোও স্পষ্টভাবে দেখা যেত না। সৌরবিদ্যুৎ আসার পর এখন শিশুরা অনেক সময় ধরেই পড়তে পারে।’
সোনাদিয়ার আরেক বাসিন্দা আকরাম হোসেন। মাঝ সমুদ্রে মাছ আহরণ করতে প্রায়ই বেরিয়ে পড়েন তিনি। এ সময়ে পরিবারের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকতে হতো তাকে। তবে এখন বিদ্যুৎ থাকায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মুহূর্তেই পরিবারের খোঁজখবর নিতে পারেন তিনি। আকরাম হোসেনের স্ত্রী আমেনা আক্তার বলেন, সমুদ্র প্রায়ই উত্তাল থাকে। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। আমার স্বামী যখন মাছ ধরতে সমুদ্রে চলে যেতেন, তখন এক-দুই সপ্তাহ তার কোনো খোঁজ পেতাম না। এখন নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ করতে পারি।
সোনাদিয়া দ্বীপে দুটি পাড়া আছে। পূর্ব ও পশ্চিম পাড়া। প্রাথমিকভাবে পূর্ব পাড়ার ১০০টি পরিবারে সৌরবিদ্যুৎ পৌঁছে দিলেও শিগগিরই বাকি পরিবারগুলোকেও এ সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে জানিয়েছে প্রাইম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, দ্বীপের বাকি পরিবারগুলোতে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার প্রস্তাব এরই মধ্যে পর্ষদ সভায় অনুমোদিত হয়েছে। আগামী বছরের জানুয়ারিতেই বাকি পরিবারগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন করা হবে। ২০২৬ সালে উত্তরবঙ্গেও একটি বড় জলবায়ু প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে প্রাইম ব্যাংক।








