মানুষ বেঁচে থাকে তার স্বপ্ন দিয়ে, স্বপ্নের শক্তিতেই সে এগিয়ে চলে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে মানুষটি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নিজের স্বপ্নের সঙ্গে আপস না করে নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছে, তিনিই বদলে দিতে পেরেছেন সময় ও সমাজ। অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্যা মিয়ান ছিলেন তেমনই একজন স্বপ্নবাজ, যিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষাই একটি জাতিকে আলোর পথে এগিয়ে নিতে পারে। এ বিশ্বাস থেকেই তিনি জীবনভর উচ্চশিক্ষাকে সবার জন্য সহজলভ্য ও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে কাজ করে গেছেন।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি

অধ্যাপক ড. মিয়ান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা জেলায়। তিনি এক দেশপ্রেমিক ও শিক্ষানুরাগী পরিবারে লালিত-পালিত হন। তার বড় ভাই ছিলেন বীর প্রতীক মরহুম কর্নেল সফিক উল্লাহ, যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছেন। এমন একটি আদর্শিক পরিবারেই গড়ে উঠেছেন অধ্যাপক মিয়ান। তার পারিবারিক শিক্ষা ও আদর্শই পরবর্তী সময় তার চিন্তা-চেতনা, কর্মজীবন ও জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে গভীর প্রভাব ফেলে।

শিক্ষাজীবন: স্বপ্নের ভিত্তিপ্রস্তর

শিক্ষাজীবনে অধ্যাপক মিয়ান ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও নিষ্ঠাবান। তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং ১৯৬৩ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৬৮ সালে তিনি ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার স্কুল অব বিজনেস থেকে ১৯৭৬ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এ আন্তর্জাতিক শিক্ষার অভিজ্ঞতা তার চিন্তাচেতনায় বৈশ্বিকতা এনে দেয় এবং ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করে।

পেশাজীবন: শিক্ষকতা ও নেতৃত্বের উজ্জ্বল অধ্যায়

১৯৬৩ সালে অধ্যাপক মিয়ান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে তার পেশাগত জীবন শুরু করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শিক্ষকতা ছাড়াও প্রশাসনিক দায়িত্বেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) পরিচালক ছিলেন। সেই সঙ্গে ছিলেন সেন্টার ফর পপুলেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চের (CPMR) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। নাইজেরিয়ার আহমাদু বেলু বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮১ সালে তিনি ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে এক সেমিস্টার পড়িয়েছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা ও কনসালট্যান্সির মাধ্যমে সম্পৃক্ত ছিলেন।

বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় খসড়া কার্জপ্রণালি প্রস্তুত করা

অধ্যাপক ড. মিয়ান বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় খসড়া কার্জপ্রণালি প্রস্তুত করেছিলেন। এ ওয়ার্কিং পেপারটি অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্যা মিয়ান প্রস্তুত করেছিলেন যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) পরিচালক হিসেবে বিশ্বব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় যুক্তরাষ্ট্র সফর করছিলেন। ওই সময়ে তিনি কানসাস অঙ্গরাজ্যের ম্যানহাটনে অবস্থিত কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটিতে তিন সপ্তাহ কাটান।

কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটিতে প্রায় ৪০ জন শিক্ষাবিদের একটি দলের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে ড. মিয়ান উপলব্ধি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের সমাজের সঙ্গে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে সম্পৃক্ত। বিষয়টি তাকে গভীরভাবে ভাবায়—বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন একইভাবে সমাজের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হতে পারে না? এ উপলব্ধির ভিত্তিতে তিনি কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষাবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং সেই আলোচনার ফলস্বরূপ এ ওয়ার্কিং পেপারটি প্রস্তুত করেন, যা তিনি কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপস্থাপন করেন পর্যালোচনার জন্য। এর ফলস্বরূপ ১৯৮৯ সালের ২৭ এপ্রিল কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে একটি ‘ইচ্ছাপত্র’ প্রদান করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৯ সালের ২৭ জুলাই বাংলাদেশের সরকারকে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব প্রদান করা হয়।

we

উচ্চশিক্ষায় বিপ্লব: আইইউবিএটির প্রতিষ্ঠা

আশির দশকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার যে সংকট ও সীমাবদ্ধতা ছিল, তা গভীরভাবে অনুধাবন করেন অধ্যাপক মিয়ান। তিনি উপলব্ধি করেন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় চাহিদার তুলনায় আসন সংখ্যা সীমিত, সুযোগ-সুবিধাও সীমাবদ্ধ। তাই তিনি স্বপ্ন দেখেন এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার, যা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হবে, কিন্তু শিক্ষার মানে কোনো আপস করবে না। এ স্বপ্নের বাস্তব রূপই হলো ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি)—বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যার ভিত্তি স্থাপন হয় ১৯৯১ সালে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি, থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং অ্যাজাম্পশন ইউনিভার্সিটি। ১৯৯২ সালে আইইউবিএটিতে ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু হয় এবং ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ড. মিয়ানের অন্যতম বড় কৃতিত্ব ছিল—আইইউবিএটিকে একটি সমাজসচেতন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীবান্ধব ও মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরাও যেন উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়—এজন্যই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্টুডেন্ট স্কলারশিপ ও ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম।

গবেষণা ও লেখালেখি

অধ্যাপক মিয়ান শুধু শিক্ষক ও প্রশাসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাগ্র গবেষক ও লেখক। তিনি ব্যবসা উন্নয়ন, শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবার পরিকল্পনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, জ্বালানি নীতি এবং ব্যবস্থাপনাবিষয়ক ৫১টিরও বেশি গবেষণামূলক রচনার প্রণেতা ও সহপ্রণেতা। তার লেখা শিক্ষামূলক বইয়ের সংখ্যা ১৫। তার কাজগুলো একদিকে যেমন প্রাসঙ্গিক গবেষণাকে সমৃদ্ধ করেছে, অন্যদিকে নীতিনির্ধারণে সহায়তা করেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা

ড. মিয়ান ছিলেন একাধারে দেশপ্রেমিক ও আন্তর্জাতিকতাবাদী। তিনি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর লেবার অ্যান্ড সোশ্যাল সিকিউরিটি লর নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি ছিলেন অ্যাসোসিয়েশন অব ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউশনস ইন সাউথ এশিয়ার (এমডিসা) প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সদস্য। তিনি যুক্ত ছিলেন সোসাইটি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইতালি), ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইউনিভার্সিটি প্রেসিডেন্টস (যুক্তরাষ্ট্র) এবং রোটারি ইন্টারন্যাশনালের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে। তিনি রোটারি ক্লাব অব গ্রেটার ঢাকার একজন সদস্য এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সংখ্যা প্রায় ৪০, যার মধ্যে প্রতিটি দেশ থেকে তিনি শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা গ্রহণ করে তা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন।

শেষ অধ্যায়: জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও শিক্ষা

অধ্যাপক মিয়ান ২০১৭ সালের ১০ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন শিক্ষা কার্যক্রমে। তার শেষ দিনগুলোয় তিনি নতুন প্রজেক্ট, ছাত্র-ছাত্রীদের স্কলারশিপ, গবেষণা ও ইনোভেটিভ শিক্ষা মডেল নিয়ে কাজ করে গেছেন।

তার এ আত্মত্যাগ ও নিরলস প্রচেষ্টা শুধু একজন শিক্ষাবিদের পরিচয় নয়, বরং একজন দূরদর্শী সমাজ সংস্কারকের প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে।

Untitled-2

উত্তরাধিকার ও প্রেরণা

অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্যা মিয়ানের রেখে যাওয়া শিক্ষা, আদর্শ ও কর্মকাণ্ড আজও আমাদের জন্য প্রেরণা হয়ে আছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, একটি মানুষের একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও দূরদর্শিতা কীভাবে একটি শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে পারে। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতি বছর আইইউবিএটিতে তার মৃত্যুবার্ষিকীতে নানা স্মরণসভা, আলোচনা ও ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রেরণামূলক কর্মসূচি পালন করা হয়। তার নামে চালু হওয়া স্কলারশিপগুলো অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করে চলেছে।

অধ্যাপক আলিমউল্যা মিয়ান ‘স্বপ্ন ছাড়িয়ে যাওয়া মানুষ’

অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্যা মিয়ানের জীবন অবলম্বনে রয়েছে ‘স্বপ্ন ছাড়িয়ে যাওয়া মানুষ’ নামের একটি বই। যেখানে লেখা রয়েছে অধ্যাপক আলিমউল্যা মিয়ান ছিলেন একজন স্পষ্টভাষী মানুষ। তাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তার পরিবারের সবার সঙ্গেই আমার কথা হয়েছে, কথা হয়েছে তার সহকর্মী, বন্ধু, স্বজন অনেকের সঙ্গেই। প্রত্যেকের কাছে ড. মিয়ান একজন অনবদ্য মানুষ। তিনি শুধু স্বপ্ন দেখেননি, বরং ধাপে ধাপে তিনি তার স্বপ্নকে ছাড়িয়ে গেছেন দেশের প্রতিটি কোনায়। তারই দেখানো পথে দেশে হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গোড়াপত্তন।

আইইউবিএটি চলছে স্বপ্নদ্রষ্টা আলিমউল্যা মিয়ানের দেখানো পথে

অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্যা মিয়ান জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিক্ষাদানে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন। জন্ম থেকে যে পারিবারিক আদর্শে তিনি বড় হয়েছেন, তা তিনি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে। অর্থের অভাবে দেশের কোনো মেধাবী মানুষ যেন উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে উদ্যোগে কাজ করে গেছেন জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত। এ ঐতিহ্য ধরে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে আইইউবিএটি। আজ অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্যা মিয়ানের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এক সুদূরপ্রসারী দর্শন—শিক্ষাই জাতির ভিত্তি, আর স্বপ্নই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তার স্বপ্ন, আত্মত্যাগ ও নেতৃত্বের গল্প নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে চলার সাহস জোগাক।

আমরা যেন তার দেখানো পথ অনুসরণ করে একটি উদার, আধুনিক ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি—এ হোক আমাদের অঙ্গীকার।

অধ্যাপক মিয়ান নেই, কিন্তু তার স্বপ্ন আছে—আমাদের হৃদয়ের গভীরে, প্রেরণার চিরন্তন আলোকবর্তিকায়।