গোপালগঞ্জের নিভৃত গ্রাম আড়ুয়াকান্দিতে ১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জন্ম স্যামসন এইচ চৌধুরীর। চিকিৎসক বাবা ইয়াকুব হোসেন চৌধুরীর চাকরির সুবাদে শৈশব কেটেছে নানা জায়গায়। চাঁদপুর, পাবনা, ময়মনসিংহ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা তাকে গড়ে তুলেছিল কৌতূহলী ও আভিযাত্রিক এক মানুষ হিসেবে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে পরিবারের অমতে কলকাতা হয়ে মুম্বাই পাড়ি দেন। রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে যোগ দিয়ে সিগন্যালিং বিভাগের বদলে রাডার প্রযুক্তি শেখার আগ্রহ দেখান। নির্দেশ অমান্য করায় কারাবন্দি হলেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি। শেষ পর্যন্ত রাডার অপারেটর হিসেবে কাজের সুযোগ পান। প্রায় তিন বছর নৌ বাহিনীতে থাকার পর ১৯৪৬ সালের নৌ-বিদ্রোহেও অংশ নেন এবং পরে চাকরি ছেড়ে দেন।
১৯৪৭ সালে পাবনার ডাক বিভাগে যোগ দেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ ও ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে চাকরি ছাড়ার পর বাবার ‘হোসেন ফার্মেসি’র দায়িত্ব নেন। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল আরো বড়। ১৯৫৬ সালে বাবার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নিয়ে শুরু করেন ‘ইসন্স’। দুই বছর পর তিন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে মাত্র ১৭ হাজার টাকা পুঁজি ও একটি টিনশেড ঘরে যাত্রা করে ‘স্কয়ার’। প্রথম তিন বছর লোকসান হলেও চতুর্থ বছরে আসে লাভ। সেখান থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ সাফল্যের পথচলা।
১৯৭৪ সালে বেলজিয়ামের জ্যানসেন ফার্মাসিউটিক্যালস লাইসেন্স পাওয়ার পর স্কয়ারের উৎপাদন আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছয়। ১৯৮৫ সালে দেশের শীর্ষ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং ১৯৮৭ সালে প্রথম বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদেশে ওষুধ রফতানিকারকের মর্যাদা অর্জন করে স্কয়ার।
তবে স্যামসনের স্বপ্ন ওষুধ শিল্পে সীমাবদ্ধ ছিল না। টয়লেট্রিজ, টেক্সটাইল, স্পিনিং, নিট ফ্যাব্রিকস, ফ্যাশনস, কনজিউমার প্রডাক্টস, ইনফরমেটিকস ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন খাতে গড়ে তোলেন একের পর এক প্রতিষ্ঠান। ব্যবসার বিস্তারের সঙ্গে তিনি ধরে রেখেছিলেন সততা ও নৈতিকতার ভিত্তি।
মুক্তিযুদ্ধেও ছিল তার সক্রিয় ভূমিকা। মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ, খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থার পাশাপাশি আহতদের সেবা করেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন। যুদ্ধের পর দেশের পুনর্গঠনে সিসিডিবি গঠনের উদ্যোগ নেন।
ব্যবসা ও সমাজে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। ২০০৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ করদাতার মর্যাদা এবং পরে সিআইপি স্বীকৃতিও পান। তবে তার কাছে এসব ছিল অর্জনের প্রতীক মাত্র; প্রকৃত সাফল্য ছিল সততার সঙ্গে দেশের শিল্পকে এগিয়ে নেয়া।
২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে মৃত্যুবরণ করেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। পাবনার মাটিতে সমাহিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার দীর্ঘ কর্মময় যাত্রা। তবে রেখে যান এমন এক শিল্প-উত্তরাধিকার, যার বিস্তৃতি আজও বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও শিল্পোদ্যোগের নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। জন্মের এক শতাব্দী পরও তার গড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান ও মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের জন্য হয়ে আছে এক আলোকিত পথচিহ্ন।
আজ তার ১০১তম জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি স্বপ্নবান এ শিল্পোদ্যোক্তাকে—যার সাহস, সততা ও দূরদর্শিতায় সমৃদ্ধ হয়েছে দেশের শিল্প ও ব্যবসার অঙ্গন। সময় পেরিয়ে গেলেও তার কর্ম ও আদর্শ আজও অনুপ্রেরণার আলো হয়ে আছে। বণিক বার্তার পক্ষ থেকে স্যামসন এইচ চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম ভালোবাসা।

বয়সের ব্যবধান অনেক হলেও ব্যক্তিগতভাবে স্যামসন ভাইয়ের সঙ্গে আমার ছিল এক গভীর ও আন্তরিক সম্পর্ক। তার বাসায় মাঝেমধ্যে আমাদের আড্ডা বসত। মঞ্জুর এলাহী সাহেব, আনিসুজ্জামান সাহেবসহ অনেকেই থাকতেন, সবাই বয়সে আমার বড়। কিন্তু স্যামসন ভাই কখনো আমাকে সেই ব্যবধান অনুভব করতে দেননি। কোনো একদিন আমি না গেলে পরে দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বলতেন, ‘আপনি আসেন নাই কিন্তু, আমার খেয়াল আছে।’ দেশে এ রকম আরো বেশি মানুষের জন্ম হোক। আমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, সেই বাংলাদেশ গড়তে আমাদের আরো অনেক স্যামসন ভাইয়ের প্রয়োজন।
[এমসিসিআই ও বণিক বার্তা আয়োজিত গত বছর স্যামসন এইচ চৌধুরীর জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্য থেকে নেয়া]

দেশের অন্য ব্যবসায়ীদের থেকে স্যামসন ভাই ছিলেন আলাদা। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সর্বদা মানুষের কল্যাণকে উদ্যোক্তার মূল কেন্দ্রে রেখেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে কখনো কোনো বিতর্কে জড়াননি। পাবনায় পৈতৃক ভিটে ও ঢাকায় নানাভাবে জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন, তবে সবই করেছেন আড়ালে থেকে, প্রচারের আলোয় আসতে চাননি। স্যামসন ভাই আমাদের কার্যক্রম পরিচালনায় সর্বদা দিকনির্দেশনা ও সমর্থন দিয়েছেন। তার প্রস্থানে আমরা হারিয়েছি সময়ের এক কিংবদন্তি উদ্যোক্তাকে। একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান রেখে গেছেন তিনি। সেটা যেমন তার পরিবারের জন্য, তেমনি সমাজের জন্য। ব্যবসা ক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে সমাদৃত স্যামসন ভাই যে কাজেই হাত দিয়েছেন, চেষ্টা করেছেন তা যেন দেশের ও সমাজের স্বার্থে কাজে লাগে।

স্যামসন এইচ চৌধুরীকে আমি ষাটের দশক থেকেই চিনি। তিনি ছিলেন আমার পিতার বন্ধু। এড্রুক প্রতিষ্ঠা করে ঢাকায় আসার পর ষাটের দশকে র্যাংকিন স্ট্রিটের আমাদের বাসায় তাকে প্রথম দেখি। বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ইতিহাস লিখতে গেলে স্যামসন চৌধুরীর নাম অগ্রগণ্য। পাকিস্তান আমলে যখন রাষ্ট্রটি ছিল সাম্প্রদায়িক, সেই বৈরী পরিবেশেও ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে তিনি বাংলাদেশের প্রতি আস্থা রেখেছেন। বিশ্বাস রেখে বিনিয়োগ করেছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন এবং আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দেশের শিল্পায়নের ইতিহাস আর স্যামসন এইচ চৌধুরীর জীবন ও কর্মকাণ্ড অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি বাংলাদেশের সৎ শিল্পপতি হিসেবে আমাদের সবার শ্রদ্ধার পাত্র। একই সঙ্গে সমাজের প্রতিও ছিলেন দায়িত্বশীল। আমি বিশেষভাবে স্মরণ করি যে ২০০৬-এর সিপিডির পক্ষে নাগরিক কমিটিতে আমরা যে রূপকল্প ২০২১ প্রণয়ন করি, তার একজন অন্যতম সম্মানিত সদস্য ছিলেন। সেই সমস্ত আলোচনায় তিনি প্রভূত অবদান রেখেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি যেভাবে বাংলাদেশের শিল্পের বিভিন্ন খাতে, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ওষুধ শিল্পকে দাঁড় করিয়েছেন, যা আজ বিশ্বের বহু দেশে রফতানি হচ্ছে, এক্ষেত্রে তার অবদান নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকবে।

দেশের শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা বিকাশ ও জাতি গঠনে স্যামসন এইচ চৌধুরীর অবদান অনুকরণীয়। দূরদর্শী নেতৃত্ব, সততা, কঠোর পরিশ্রম, নৈতিক ব্যবসা ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধের মাধ্যমে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। একজন কিংবদন্তি উদ্যোক্তা, দূরদর্শী নেতা ও জাতি গঠনের অগ্রদূত ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে যোগ দিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধ শেষে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে পাবনার আতাইকুলায় বসতি স্থাপন করেন। ১৯৫২ সালে পিতার হোসেন ফার্মেসির পরিচালনার দায়িত্ব নেন। কয়েক বছরের মধ্যেই বন্ধুদের সঙ্গে তিনি স্কয়ার প্রতিষ্ঠা করেন। সেই ক্ষুদ্র সূচনা থেকে স্কয়ার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্যামসন এইচ চৌধুরীর অবদান কেবল ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সমাজসেবক, দাতা এবং নীতিবোধে দৃঢ় একজন মানুষ ছিলেন। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে তার অবদান ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এমসিসিআইয়ের জন্যও তার উত্তরাধিকার বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ মেয়াদে এ সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রজ্ঞা, সততা ও নেতৃত্ব এমসিসিআইয়ের কার্যক্রমকে শক্তিশালী করে এবং দেশের বাণিজ্য ও শিল্পায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।







