বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা জনবল তৈরির ক্ষেত্রে কী কী ঘাটতি রয়েছে? সেগুলো কাটাতে কী করা দরকার?
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য দক্ষ জনবল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় আইটি কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণ বা ইনসিডেন্ট রেসপন্সে অভিজ্ঞতা থাকে না। এজন্য ব্যাংকগুলোতে আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন (যেমন সিআইএসএম, সিআইএসএসপি, সিইএইচ) অর্জনে কর্মীদের উৎসাহিত করতে হবে। কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরো দক্ষ করে তুলতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাইবার নিরাপত্তা শিক্ষা ও ব্যাংক খাতের বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। এগুলো করতে পারলে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সাইবার হামলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী?
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ডিজিটাল রূপান্তর দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। এ রূপান্তরের সঙ্গে সাইবার ঝুঁকিও বেড়েছে বহুগুণ। এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ক্রমবর্ধমান জটিল সাইবার আক্রমণ। এসব আক্রমণের মধ্যে রয়েছে ফিশিং, র্যানসমওয়্যার ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। এসব মোকাবেলায় আমাদের দেশে দক্ষ জনবল সীমিত রয়েছে। অবকাঠামোও পুরনো। এছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। এসব বিষয় দেশের ব্যাংক খাতের সাইবার নিরাপত্তায় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
গত কয়েক বছরে সাইবার নিরাপত্তা নীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে?
সাইবার নিরাপত্তা নীতিতে নানা পরিবর্তন এসেছে। সময় ও চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে এ নীতিতে আরো পরিবর্তন আসবে বলেই মনে করি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) সুরক্ষা নির্দেশিকা (ভার্সন ৪.০)’ জারি করেছে। এটি আন্তর্জাতিক মান আইএসও/আইইসি ২৭০০১:২০২২ ও পেমেন্ট কার্ড ইন্ডাস্ট্রি ডাটা সিকিউরিটি স্টান্ডার্ডের (পিসিআই ডিএসএস) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যাংকগুলো এখন তাদের তথ্যনিরাপত্তা নীতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো হালনাগাদ করেছে। এমন বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে সাইবার নিরাপত্তা হুমকি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করি।
ফিশিং, র্যানসমওয়্যার ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আক্রমণ প্রতিরোধে ব্যাংকগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে?
ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে। তবে দেশের ব্যাংকগুলো এখন উন্নত অ্যান্টি-ম্যালওয়্যার সিস্টেম, ই-মেইল ফিল্টারিং ও নেটওয়ার্ক সেগমেন্টেশন ব্যবহার করছে। এতে সাইবার নিরাপত্তা বাড়ছে। পাশাপাশি কর্মীদের নিয়মিত ফিশিং সচেতনতা প্রশিক্ষণ ও সিমুলেটেড অ্যাটাক ড্রিল পরিচালিত হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা হামলা ঠেকাতে গ্রাহকদের সচেতনতার বিকল্প নেই। কেননা গ্রাহকদের অসচেতনতা কিংবা এ বিষয়ে অজ্ঞতা থাকলে অপরাধীরা সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে পারে। সেজন্য গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে নিয়মিত নিরাপত্তা বার্তা এবং সতর্কীকরণ এসএমএস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক গণমাধ্যমেও সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলো এসব আক্রমণ প্রতিরোধে প্রায় সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আপনাদের ব্যাংক কীভাবে ডিজিটাল লেনদেন ও তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করছে?
আমাদের কাছে ডিজিটাল লেনদেন ও তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রথম অগ্রাধিকার। সে অনুযায়ী আমরা যা যা করণীয় তার সবই করছি। আমাদের ব্যাংক আইএসও/আইইসি মান অনুযায়ী তথ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা (আইএসএমএস) বাস্তবায়ন করেছে। সব ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, ডাটা এনক্রিপশন ব্যবস্থা রয়েছে আমাদের ব্যাংকে। গ্রাহকের কার্ডভিত্তিক লেনদেনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমরা পেমেন্ট কার্ড ইন্ডাস্ট্রি ডাটা সিকিউরিটি স্ট্যান্ডার্ডের (পিসিআই ডিএসএস) সব প্রাসঙ্গিক নিয়ন্ত্রণ ও চাহিদা পূরণ করেছি। এর মধ্যে কার্ডধারীর তথ্য, পেমেন্ট প্রক্রিয়াকরণ ও লেনদেনসংক্রান্ত ডাটা সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় সংরক্ষিত থাকে। পাশাপাশি আমরা নিয়মিতভাবে নিরাপত্তা দুর্বলতা নিরীক্ষা এবং সিস্টেমে অনধিকার প্রবেশ পরীক্ষা (পেনিট্রেশন টেস্টিং) পরিচালনা করছি। এর মাধ্যমে যেকোনো নিরাপত্তা দুর্বলতা দ্রুত শনাক্ত ও সমাধান করা যায়। ডিজিটাল লেনদেন ও তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে আমরা কোনো ধরনের ঘাটতি রাখছি না।
বাংলাদেশ ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা কতটা তদারক করে?
বাংলাদেশ ব্যাংক এখন অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে সাইবার নিরাপত্তা তদারক করছে। তারা নিয়মিত অডিট, বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়ন ও স্বমূল্যায়ন প্রতিবেদন (সেলফ অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট) সংগ্রহ করছে। পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন ও জবাবদিহিমূলক আচরণ করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে বিজিডি ই-গভ সিআইআরটি, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগও নানা রকম তদারকিমূলক কাজ করছে। এসব সংস্থা ব্যাংক খাতের জন্য হুমকি সতর্কতা, সচেতনতা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা মান কেমন?
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো গত কয়েক বছরে সাইবার নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। অনেক ব্যাংক এখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সনদপ্রাপ্ত। তবে উন্নত দেশের ব্যাংকগুলোর তুলনায় আমাদের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো উন্নত দেশের তুলনায় থ্রেট ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং, রিয়েল-টাইম রেসপন্স ও সাইবার ফরেনসিক সক্ষমতায় কিছুটা পিছিয়ে আছে। এখানে উন্নতি করতে হলে প্রযুক্তিতে আরো বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করি।
গ্রাহকদের মধ্যে সাইবার সচেতনতা বাড়াতে কী ধরনের কার্যক্রম হাতে নেয়া উচিত?
গ্রাহক সচেতনতা সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রথম স্তর। সেজন্য সাইবার প্রতিরক্ষা সম্পর্কে গ্রাহককে সচেতন ও শিক্ষিত করার বিকল্প নেই। ব্যাংকগুলোকে নিয়মিতভাবে এসএমএস ও ই-মেইল ক্যাম্পেইন চালু রাখতে হবে। এছাড়া শাখা পর্যায়ে পোস্টার, ব্যানার ও ভিডিও প্রচারণা চালাতে হবে। পাশাপাশি অনলাইনে সেমিনার ও কুইজ আয়োজন করা যেতে পারে। প্রতি বছর অক্টোবরে ‘সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা মাস’ উপলক্ষে বিশেষ সচেতনতামূল কর্মসূচিও অত্যন্ত কার্যকর।
ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাইবার নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী করতে কী কী নীতি ও বিনিয়োগ প্রয়োজন?
সাইবার নিরাপত্তাকে এখন কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। এটিকে কেবল ব্যয় হিসেবে দেখা যাবে না। কেননা সাইবার নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকিভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ (রিস্ক বেজড বাজেটিং) রাখতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও থ্রেট ইন্টেলিজেন্স ড্রাইভেন সিকিউরিটি সিস্টেম গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। বোর্ড থেকেই সাইবার নিরাপত্তাকে ব্যবসার মূল কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। যৌথভাবে এসব কৌশল গ্রহণ করলে তবেই ব্যাংক খাতে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।










