যেকোনো পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের অপরিহার্য একটি পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হয় এর কার্যকর ব্র্যান্ডিংকে। এটি পণ্যের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরির পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়ে প্রতিযোগীদের সরবরাহকৃত পণ্যের সঙ্গে ব্যবধানকেও স্পষ্ট করে তোলে, যা ভোক্তা আস্থা ও বাজার চাহিদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। অনেক সময় কোনো পণ্যের গুণগত মান ভালো হলেও এর বাজার সম্প্রসারণের পথে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় কার্যকর ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতি।

ইউরোপে বাংলাদেশ থেকে রফতানীকৃত চিংড়ির বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও এ বিষয়কেই বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে এখন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে রফতানি হলেও বাংলাদেশী চিংড়ির ব্র্যান্ডিং এখনো উপেক্ষিতই থেকে গেছে। অঞ্চলটিতে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া চিংড়ির ঠাঁই হয় মূলত হোটেল-রেস্টুরেন্টে। ভোক্তারা এ পণ্য কিনে খেলেও জানতে পারছেন না যে তা বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা।

এ অবস্থায় চিংড়ি বাজারজাতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিংয়ে জোর দেয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্যমতে, যেকোনো পণ্যের ‘মেড ইন’ ব্র্যান্ডিং সংশ্লিষ্ট রফতানিকারক দেশের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বতন্ত্র পরিচিতি পায় পণ্যটি। পণ্যের ‍গুণগত মান ভালো হলে এর মাধ্যমে বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। এতে রফতানি আয়ও বাড়ে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে বাংলাদেশী চিংড়ির ভ্যালু অ্যাডিশন বা মূল্য সংযোজনে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। এতে এখান থেকে রফতানীকৃত চিংড়িতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ তেমন একটা থাকে না। একই কারণে এসব চিংড়ি ইউরোপের সুপারশপ বা সুপারমার্কেটে ঢুকতে পারছে না। ফলে ইউরোপের হোটেল-রেস্তোরাঁর গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ ভোক্তাদের হাতে ব্যাপক পরিসরে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না বাংলাদেশের চিংড়ি।

প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাজার সম্প্রসারণ করতে না পারায় দেশের চিংড়ি রফতানি দিন দিন কমছে। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরেও ৪০ কোটি ৭২ লাখ ডলারের চিংড়ি রফতানি করেছিল বাংলাদেশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ২৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলারে। সে অনুযায়ী তিন বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের চিংড়ি রফতানি কমেছে ২৭ শতাংশের বেশি। এর আগে ২০২৩-২৪ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে চিংড়ি রফতানি হয়েছে যথাক্রমে ২৪ কোটি ৮৩ লাখ ও ৩০ কোটি ডলারের।

বাংলাদেশের চিংড়ি তুলনামূলক বেশি সুস্বাদু উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ চিংড়ির আলাদা কদর রয়েছে। কিন্তু পণ্যের গায়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং না থাকায় সাধারণ ভোক্তাদের কাছে তা পৌঁছতে পারছে না।

পারিবারিকভাবেই চিংড়ি রফতানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান মো. হেফজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা সুপারশপ বা সুপারমার্কেটে যেতে চাই। বিগত ৫০ বছরেও আমরা সুপারমার্কেটে ঢুকতে পারিনি। আমাদের চিংড়ি অন্যদের তুলনায় আলাদা। এগুলো ডিম পাড়ে ব্র্যাকিশ ওয়াটারে (মিঠা ও লোনা পানির মিশ্রণ, উপকূলীয় মোহনার কাছাকাছি অঞ্চলের পানি)। কিন্তু বড় হয় মিঠাপানিতে। এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে এ অঞ্চলের চিংড়ি আর কোথাও চাষ করা সম্ভব না। এর স্বাদও আলাদা। “‍মেড ইন বাংলাদেশ” ব্র্যান্ডিং থাকলে বিশ্বকে এর গল্পটি জানানো যেত।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যেসব পণ্য রফতানি করছে সেগুলো ইউরোপের হোটেল-রেস্টুরেন্টে যাচ্ছে। আমরা ভ্যালু অ্যাডিশনে যেতে চাই। আন্তর্জাতিক বাজারে “‍রেডি টু কুক” চিংড়ি পাঠাতে চাই। সেজন্য গার্মেন্ট খাতের মতো বাইরে থেকে সস্তায় কাঁচামাল হিসেবে চিংড়ি আমদানি করতে চাই। এরপর সেগুলোয় মূল্য সংযোজন করে আবার আমরা রফতানির চিন্তা করছি। এজন্য সরকারের নীতিগত সহযোগিতা প্রয়োজন। এটি সম্ভব হলে দেশের চিংড়ি শিল্প বড় হবে। এতে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয় বাড়বে। এছাড়া শিল্প বড় হলে এবং ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতি পেলে উৎপাদনও বাড়বে। তখন গ্রাম পর্যায়েও কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে চিংড়ি। চাষীরাও উপকৃত হবেন।’

দেশের চিংড়ি চাষের জন্য ব্যবহৃত জমির পরিমাণ ২ লাখ ৬২ হাজার ২১৭ হেক্টর। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এর উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রফতানি আয় বাড়িয়ে খাতটিকে আবারো প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে এর যথাযথ ব্র্যান্ডিংয়ের পাশাপাশি সরকারি নীতিসহায়তা, শক্তিশালী সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে অভিমত তাদের।

এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য হলো একসময় সামুদ্রিক খাদ্য বাংলাদেশের রফতানি আয়ের উৎসে শীর্ষ তালিকায় স্থান করে নিয়েছিল। তবে ব্ল্যাক টাইগার চিংড়ির উৎপাদনে স্থবিরতা, স্থানীয় ভোগ বেড়ে যাওয়া এবং ব্যয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় রফতানি আয়ের উৎস হিসেবে খাতটি এখন সপ্তম স্থানে নেমে এসেছে। যথাযথ ব্র্যান্ডিং না হওয়ায় পণ্যটির বাজার সম্প্রসারণও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।