বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের পথে এগোচ্ছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বড় শহরগুলোতে মানুষের বসতি ক্রমেই বাড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে আবাসনের চাহিদা। কিন্তু চাহিদা বাড়ার বিপরীতে সীমিত হয়ে আসছে পরিকল্পিত জমির সরবরাহ। একই সঙ্গে নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে, অস্থিরতা রয়েছে নির্মাণসামগ্রীর বাজারে এবং বাড়ছে নাগরিক অবকাঠামোর ওপর চাপ। বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পরিকল্পিত জমির অপ্রতুলতা, জমির উচ্চ মূল্য, নির্মাণসামগ্রীর বাজারদরের ওঠানামা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং উচ্চ সুদহারের কারণে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

ঢাকা ও দেশের অন্যান্য বড় শহরে বাসযোগ্য জমির সংকট এখন আবাসন খাতের অন্যতম বড় বাধা। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় একটি আবাসন প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর সঙ্গে রড, সিমেন্ট, ইটসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দামের ওঠানামা যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের মোট ব্যয় এবং বাস্তবায়নের সময়—দুটিই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। আবার নকশা অনুমোদন, পরিবেশ ছাড়পত্র, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগলে নির্মাণকাজের ব্যয় আরো বাড়ে। ফলে আবাসন প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমি থেকে অর্থায়ন এবং নির্মাণ থেকে অনুমোদন—প্রতিটি ধাপই এখন ব্যয় ও সময় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

এ বাস্তবতায় অনুমোদন ব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিয়ে আসা জরুরি। রাজউক, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ছাড়পত্র একটি সমন্বিত অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেয়ার সুযোগ তৈরি করা গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কমবে। একই সঙ্গে কমবে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তাও। তবে শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করাই যথেষ্ট নয়; ঢাকা ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপসহ নগর পরিকল্পনাগুলোকেও পরিবর্তিত বাস্তবতা, জনসংখ্যার চাপ ও ভবিষ্যৎ নগরায়ণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

আবাসন খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন। উচ্চ সুদের কারণে ডেভেলপারদের অর্থায়ন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়ছে ক্রেতার ওপরও। গৃহ ঋণের কিস্তি অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও তরুণদের জন্য নিজস্ব আবাসনের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। এ অবস্থায় ৫-৭ শতাংশের মতো সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহ ঋণ সুবিধা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আবাসন উন্নয়নকারীদের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি বিশেষায়িত অর্থায়নের ব্যবস্থা থাকা দরকার। সরকারি অব্যবহৃত বা খাসজমিকে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি খাতের অর্থায়ন ও নির্মাণ দক্ষতার সমন্বয়ে পিপিপি ভিত্তিতে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা গেলে জমির ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয়ী আবাসন তৈরির সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।

তবে আবাসনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে শুধু অধিকসংখ্যক ফ্ল্যাট নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। প্রযুক্তি, জ্বালানি দক্ষতা ও পরিবেশগত স্থায়িত্বকে আবাসন পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। ‘স্মার্ট আবাসন’ বলতে শুধু স্মার্ট লক, অ্যাপ নিয়ন্ত্রিত লাইটিং কিংবা নিরাপত্তা প্রযুক্তিকে বোঝালে এর পরিধি সীমিত থাকে। প্রকৃত অর্থে স্মার্ট আবাসনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির পাশাপাশি জ্বালানি, পানি ও অন্যান্য সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। ভবনের নকশায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সোলার প্যানেল স্থাপন, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

টেকসই আবাসন ব্যবস্থায় পানির ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, গ্রে-ওয়াটার পুনর্ব্যবহার এবং উৎস পর্যায়েই জৈব ও অজৈব বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থা আবাসিক প্রকল্পকে আরো টেকসই করতে পারে। জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরির উদ্যোগও শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে ইডিজিই বা এলইইডির মতো আন্তর্জাতিক গ্রিন বিল্ডিং মানদণ্ড অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ করা গেলে জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব।

a8

ঢাকার ওপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও আবাসনের চাপ কমাতে পরিকল্পিত বিকেন্দ্রীভূত নগরায়ণের বিকল্প নেই। রাজধানীর আশপাশের কেরানীগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর কিংবা পূর্বাচলসংলগ্ন এলাকায় স্যাটেলাইট টাউনশিপ গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে এ ধরনের প্রকল্পে শুধু আবাসিক ভবন নির্মাণ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, বিনোদন, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বিত পরিকল্পনা থাকতে হবে। একইভাবে চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে আধুনিক ও সমন্বিত আবাসন গড়ে তোলা গেলে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাপ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে।

এক্ষেত্রে যোগাযোগ অবকাঠামোর সঙ্গে আবাসন পরিকল্পনার সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে ও প্রধান রেলপথকে কেন্দ্র করে নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠলে শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে বসবাস করেও মানুষ তুলনামূলক সহজে কর্মস্থলে যাতায়াত করতে পারবে। একইভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলের আশপাশে কর্মীদের জন্য আবাসন তৈরি করা গেলে কর্মস্থল ও বসতির মধ্যে দূরত্ব কমবে। এতে একদিকে মানুষের যাতায়াতের সময় ও ব্যয় কমবে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় শহরের ওপর চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

মধ্যবিত্ত ও তরুণদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে ফ্ল্যাটের আকার এবং অর্থায়ন কাঠামোতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। ছোট পরিবারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ৮০০ থেকে ১১০০ বর্গফুটের কার্যকর ও কমপ্যাক্ট ফ্ল্যাট নির্মাণ করা যেতে পারে। অপ্রয়োজনীয় জায়গার ব্যবহার কমিয়ে তুলনামূলক কম দামে এসব ফ্ল্যাট বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ২৫-৩০ বছর মেয়াদি স্বল্প সুদের ঋণ এবং ‘রেন্ট-টু-ওন’ বা ভাড়া থেকে মালিকানা মডেল চালু করা গেলে মাসিক ভাড়ার কাছাকাছি কিস্তিতে ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্পে নির্মাণসামগ্রী আমদানিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা ও ভ্যাট প্রণোদনাও এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

আগামী ১০-২০ বছরের বাংলাদেশকে সামনে রেখে আবাসন খাতের ধরনও পরিবর্তিত হবে। এ বাস্তবতায় নাভানা রিয়েল এস্টেট বড় পরিসরে কন্ডোমিনিয়াম ও কমিউনিটি লিভিংয়ের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব আবাসনে খেলার মাঠ, সুইমিং পুল, ওয়াকওয়ে, জিম ও কমিউনিটি হলের মতো সুবিধা থাকবে। অর্থাৎ আবাসনের ধারণা ক্রমেই শুধু একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা থেকে বেরিয়ে একটি সমন্বিত জীবনযাপন ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে।

পরিবেশের ওপর চাপ কমাতে নতুন প্রকল্পে গ্রিন বিল্ডিং স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের পাশাপাশি ইডিজিই ও এলইইডি সার্টিফিকেশনের লক্ষ্যও রয়েছে। নির্মাণে বিআইএম প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নকশা ও নির্মাণকাজের সমন্বয়, কাঁচামালের অপচয় এবং নির্মাণের সময় কমানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পরিবর্তিত কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফ্ল্যাটে ফ্লেক্সিবল ওয়ার্কস্পেস রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে বড় আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে সোলার ব্যাকআপ এবং ইলেকট্রিক ভেহিকল বা ইভি চার্জিংয়ের মতো সুবিধা যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের আবাসন শুধু বসবাসের জায়গা নয়, বরং প্রযুক্তি, পরিবেশ ও পরিবর্তিত জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সমন্বিত পরিসরে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।

বাংলাদেশে আবাসনকে বিচ্ছিন্ন কোনো খাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে নগর উন্নয়নের সামগ্রিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করেই পরিকল্পনা করতে হবে। জমির ব্যবহার, অর্থায়ন, অনুমোদন, যোগাযোগ, পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধা—সবকিছুর সমন্বিত পরিকল্পনাই ভবিষ্যতের আবাসন সংকট মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের নীতিগত সহায়তার সঙ্গে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নির্মাণ দক্ষতার সমন্বয় ঘটানো গেলে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার পথ তৈরি হবে। তখন আবাসন খাত শুধু মানুষের থাকার জায়গা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পরিকল্পিত ও টেকসই নগরায়ণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

সাজেদুল ইসলাম

ভাইস চেয়ারম্যান, নাভানা গ্রুপ