১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ ক্ষমতা গ্রহণের পর ২৬ নভেম্বর ইয়াহিয়া খান যত শিগগির সম্ভব প্রাপ্তবয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেন। ইয়াহিয়া খান নির্বাচন কীভাবে এবং কখন হবে, সে সম্পর্কেও একটি ধারণা দেন। সে অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর দেশে জাতীয় পরিষদের এবং ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তিনি ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ নির্দিষ্ট করেন। ১২ নভেম্বর পূর্ব বাংলার উপকূল অঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি ভোটের তারিখ নির্ধারিত হয়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শুরুতেই একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। ১৯৬৯ সালের ২ জুলাই পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের একজন বাঙালি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টা ও মন্ত্রী জি. ডব্লিউ চৌধুরীর মতে,

আবদুস সাত্তার একটি অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীন। কোনো পর্যায়েই নির্বাচন কমিশন চাপের সম্মুখীন হয়নি এবং এমনকি কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি কীভাবে কাজ পরিচালনা করতে হবে। বিচারপতি সাত্তার আন্তরিকভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। ইয়াহিয়া খান তাকে সব রকমের সৌজন্য ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন, কোনো কোনো সময় বিচারপতি সাত্তারকে মন্ত্রিসভার যেসব বৈঠকে নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হতো, সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হতো। তার মতামত এবং সুপারিশের প্রতি সবসময়ই অগ্রাধিকার ও মনোযোগ দেয়া হতো।

নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করে। সর্বজনীন ভোটাধিকার নিশ্চিত এবং তাদের রায়ের ভিত্তিতে জনসাধারণের প্রতিনিধি নির্বাচনের উদ্দেশ্যে ভোটার তালিকা প্রণয়নের জন্য প্রেসিডেন্ট একটি নির্দেশ জারি করেন, যা ১৯৬৯ সালের ভোটার তালিকা নির্দেশ নামে অভিহিত। এ নির্দেশ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার উপযুক্ত যেকোনো নাম ভোটার তালিকাভুক্ত করার ক্ষমতা দেয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক কাজ ছিল একটি সর্বজনীন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা।

ভোটার তালিকা প্রণয়নের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ। সাত্তার কমিশন সাফল্যের সঙ্গে এ কাজ সমাপ্ত করেছিল। নির্বাচন কমিশনের সর্বপ্রথম সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল যে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের জন্য আইয়ুবীয় পদ্ধতির অধীনে যে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল, তা গ্রহণ করা হবে কিনা। কেননা ওই ভোটার তালিকার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল আইয়ুবের নির্বাচন পদ্ধতি ছিল পরোক্ষ। ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল মৌলিক গণতন্ত্রীদের নির্বাচনের উদ্দেশ্যে; প্রাদেশিক কিংবা কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্যদের নির্বাচনের জন্য নয়। এমনকি আইয়ুব খানের অধীনে যে নির্বাচন কমিশন ছিল, তার নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন না। নির্বাচন কমিশনার একজন কাযনির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন, এমনকি তিনি কয়েক বছর আইয়ুব খানের সচিব ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে এ কমিশনের কাজ জনগণ কর্তৃক গৃহীত হয়নি। এসব বিষয় ধর্তব্যের মধ্যে নিয়ে বিচারপতি আবদুস সাত্তার নতুন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সাড়ে ১১ কোটি লোক অধ্যুষিত দেশে ভোটার তালিকা প্রণয়ন অবশ্য খুব সহজ কাজ ছিল না। কেননা জনসংখ্যার অধিকাংশ ছিল অশিক্ষিত এবং সুদূর গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত। যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই খারাপ। প্রেসিডেন্ট নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়ন বিধি জারি করেন, যাতে যথাযথভাবে ও জনগণের সন্তুষ্টি অনুযায়ী ভোটার তালিকা করা যায়।

নির্বাচনী ভোটার তালিকার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নির্বাচনী এলাকার সীমা নির্ধারণ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুস সাত্তার শপথ নেয়ার পর পরই ঘোষণা দিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা তৈরি করা ছাড়াও নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করবে। এ লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আদেশ জারি করেন। নির্বাচনী সীমানা নির্দেশকরণের জন্য বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে চেয়ারম্যান ও পাকিস্তানের দুই অংশের হাইকোর্টের একজন করে বিচারপতি নিয়ে একটি কমিশন গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনী এলাকার ব্যাপারে আপত্তি ও পরামর্শ কমিশন গ্রহণ করে ১৯৭০ সালের ১১ মে থেকে ২২ মে পর্যন্ত। কমিশন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ৫৮টি নির্বাচনী এলাকা এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৯৬টি নির্বাচনী এলাকায় ভাগ করে। পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ৩৯টি এবং চারটি প্রদেশকে ৮৯টি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত করে। নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ শেষে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনী এলাকার চূড়ান্ত তালিকা ১৯৭০ সালের ৫ জুন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচনী এলাকার তালিকা ১৯৭০ সালের ২৫ জুন প্রকাশ করা হয়। সরকার ১৯৬১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ অনুযায়ী জাতীয় পরিষদের আসন সংখ্যা নির্ধারণের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। প্রায় চার লাখ লোকের সমন্বয়ে একেকটি নির্বাচনী এলাকা গঠিত হয়।

ভোট গ্রহণের দিন ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট প্রদান করতে পারে, সেদিকেও নির্বাচন কমিশনের সতর্ক দৃষ্টি ছিল। নির্বাচনকালীন শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ১৪ হাজার ৪৯৫টি নির্বাচন কেন্দ্রে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার আনসার সদস্য মোতায়েন করার তথ্য সরকারি হ্যান্ড আউটের মাধ্যমে জানানো হয়। প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় পূর্ণ শান্তি বজায় রাখার জন্য ভোট গ্রহণের দিন সেনাবাহিনী সদস্যদের মোতায়েনের সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। সেনাবাহিনীর কাজ ছিল রাস্তায় টহল দেয়া এবং নির্বাচনের আগে বা নির্বাচন যাতে সুশৃঙ্খলভাবে হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার জানায়, নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসাররা ভোটকেন্দ্র থেকে পাওয়া নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল সংবাদমাধ্যমগুলোকে সরবরাহ করবে। তবে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে পাওয়া ফলাফল বিন্যাসের পর সরকারিভাবে ফলাফল প্রকাশ করা হবে।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুস সাত্তার সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করে ছয়টি মূলনীতিবিশিষ্ট আচরণবিধি প্রণয়ন করেন। এ ছয়টি আচরণবিধি ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি প্রচারের কাজে মসজিদকে ব্যবহার না করার জন্যও প্রধান নির্বাচন কমিশনার উল্লেখ করেন।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুস সাত্তার মন্তব্য করেন, সর্বজনীন ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর পাকিস্তান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক লোক ভোট দেয়ার ফলে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র নির্ধারণ এবং যে রাজনৈতিক অবস্থার অধীনে শাসিত হবে, সে সম্পর্কে নিজেদের মনোভাব জানানোর জন্য জনসাধারণ উদগ্রীব। জনসাধারণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং কোনো শক্তিই তাদের ইচ্ছানুযায়ী অধিকার প্রয়োগের ব্যাপারে নিবৃত্ত করতে পারবে না।

পাকিস্তানের ইতিহাসের বাঁক বদলকারী সত্তরের সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের অন্যতম চরিত্র বিচারপতি আবদুস সাত্তার জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার দাড়কা গ্রামে। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ এবং ১৯২৯ সালে বি.এল ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর শুরু করেন কলকাতা জজকোর্টে আইন ব্যবসা। এ.কে ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টিতেও যোগ দেন তিনি। দায়িত্ব পালন করেন কলকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলর, কলকাতা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাইব্যুনালের অ্যাসেসর-মেম্বর এবং কলকাতা কর্পোরেশনের মুখ্য নির্বাহি কর্মকর্তা হিসেবে।

ভারত বিভক্তির পর আবদুস সাত্তার ঢাকায় এসে ঢাকা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন। এ.কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে ১৯৫৩ সালে কৃষক-শ্রমিক পার্টি গঠিত হলে তিনি তাতে যোগ দেন। তিনি ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং আই.আই চুন্দ্রিগড়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। আবদুস সাত্তার ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি এবং ১৯৬৮-৬৯ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন। বিচারপতি সাত্তার ১৯৭৩ সালের শেষদিকে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসার পর বিভিন্ন সরকারি দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ জীবনবীমা কর্পোরেশনের পরিচালক মন্ডলীর চেয়ারম্যান (১৯৭৩-৭৪), সংবাদপত্র বেতন বোর্ডের চেয়ারম্যান (১৯৭৪-৭৫) এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স-এর চেয়ারম্যান ছিলেন।

আবদুস সাত্তার ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের বিশেষ উপদেষ্টা নিযুক্ত হন এবং আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের (জাগদল) আহবায়ক ছিলেন বিচারপতি সাত্তার। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি এ দল বিলুপ্ত ঘোষণা করে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে নবগঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সহ-সভাপতি পদে যোগদান করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হলে তিনি দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান হন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৮৫ সালের ৫ অক্টোবর ঢাকায় সমাপ্তি ঘটে তার বর্ণাঢ্য জীবনের।

তথ্যসূত্র: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন: বাংলাদেশের অভ্যুদয়, মোশারফ হোসেন