ড. বদিউল আলম মজুমদার, ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি একজন অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, রাজনীতি বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। ‘দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তিনি কুমিল্লা বা‍র্ডের বো‍র্ড অব গভ‍‍র্নরসের, টিআইবির উপদেষ্টা পরিষদের এবং ডেনমার্ক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত ‘হাইসাওয়া ফান্ড কোম্পানি’-এর বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সদস্য ছিলেন। তিনি জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। বর্তমানে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সত্তরের নির্বাচনের নানা দিক নিয়ে তিনি কথা বলেন বণিক বার্তার সঙ্গে

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনেকটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছিল বলে অনেকের মত। নির্বাচন যে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছিল, এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

বলতে হবে একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছিল। কোনো নির্বাচনের ব্যাপারেই এমনটা বলা যায় না যে একবারেই কোনো রকম জটিলতা ছিল না। তবে সত্তরের নির্বাচনটা গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছিল বলা যায়। অবশ্য সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার কারণও ছিল। প্রথমত, নির্বাচনের ব্যাপারে জনগণের আগ্রহ ছিল ব্যাপক। নির্বাচনের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং বৈষম্য অবসানের দাবি উঠেছে; এ দাবিগুলো নিয়ে সংঘবদ্ধ ছিল মানুষ। সবাই চেয়েছিল নির্বাচনটি।

প্রতিটা নির্বাচনেই অনেক অংশীজন থাকে, তার মধ্যে নির্বাচন কমিশন সবচেয়ে বড়। নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষ হয়, সাহসী ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। তবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা সরকার। সরকার মানে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা যদি নির্বাচনকে বিতর্কিত কিংবা অন্যায়ভাবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চায়, তাহলে সহজেই করতে পারে। অর্থাৎ নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে রাজনৈতিক দল ও তাদের প্রার্থীরা। তারা যদি সদাচরণ করতে আগ্রহী হয় ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে থাকে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দল যদি যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে জেতার জন্য বদ্ধপরিকর হয়, কিংবা যদি তাদের মনোনীত প্রার্থী সন্ত্রাসী হয়। যদি তারা পেশিশক্তি বা অর্থকড়ি খাটিয়ে নির্বাচিত হওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হয়, তাহলে সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব না।

সুষ্ঠু নির্বাচনের পেছনে গণমাধ্যমের ভূমিকা আছে। নাগরিক সমাজেরও ভূমিকা আছে। তারা অতন্দ্রপ্রহরীর ভূমিকা পালন করবে। সংবাদমাধ্যম সত্য তুলে ধরবে; অন্যায়ের বিরুদ্ধে বক্তব্য তুলে ধরবে। এসব অংশীজনের কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। রাজনৈতিক দল, সরকার, মনোনীত প্রার্থীরা, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও একই সঙ্গে গণমাধ্যম যদি সঠিক দায়িত্ব পালন করে, তাহলে কিন্তু নির্বাচন কমিশন ছাড়াও সুষ্ঠু করা সম্ভব। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো সদাচরণ নিশ্চিত করা। যদি সবাই সদাচরণ নিশ্চিত করে, তাহলে নির্বাচন কমিশন ছাড়াও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ১৯৫৪ সালের নির্বাচন। তখন নির্বাচন কমিশন ছিল না। সে নির্বাচনে নুরুল আমিনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ পরাজিত হয়েছে। এসব অংশীজন সদাচরণ করলে নির্বাচন কমিশন ছাড়াও নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে। কিন্তু আমাদের বর্তমানে যে পরিস্থিতি, এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছাড়া এটা কল্পনাই করা যায় না। তার মানে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। জনসেবা ও জনস্বার্থের বিপরীতে এখন হয়েছে ব্যক্তিসেবা ও ব্যক্তিস্বার্থ। আজ এটা ব্যবসায় পরিণত হয়ে গেছে। শত বিধিনিষেধ ও প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সুষ্ঠু নির্বাচন করাটা প্রায় অসম্ভবে পরিণত হয়েছে। কারণ আমাদের কেউ এখন সদাচরণ করে না। সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে না।

সত্তরের নির্বাচনে সব দিকই পরিপূর্ণভাবে কাজ করেছে, ফলে নির্বাচন সব পক্ষের কাছেই মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হয়েছে। ওই সময়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষা কেমন ছিল?

এটা প্রতিবাদী নির্বাচন ছিল। আমাদের প্রতি যে বঞ্চনা, যে শোষণ নির্যাতন ও বিমাতাসুলভ আচরণ, তার বিরুদ্ধে মানুষ সংঘবদ্ধ হয়েছিল। তারা ভোট দিয়েছিল, যেন পরিস্থিতির অবসান ঘটে।

পাকিস্তান সরকার তো বুঝত, নির্বাচন দিলে ওরা হারবে। মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষাও বোঝা গেছে। তার পরও কেন সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়েছিল?

এটার পেছনে দুটো কারণ থাকতে পারে। বিভিন্ন মতামত আছে। কেউ বলে, সরকার ভাবেইনি যে আওয়ামী লীগ জিতবে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। কেউ কেউ বলেন, মানুষের মধ্যে সে সুকুমার বৃত্তি ছিল; নিরপেক্ষ আচরণ, অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ না করা, সে রকম মানসিকতা হয়তো ছিল। আমার মনে হয়, তারা মনে নির্বাচনের এমন ফল আশা করেনি। আশা করলে তারা নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করত। কারণ তারা পরে যখন দেখেছে ফলাফল তাদের বিপরীতে গেছে, তখন চরম নৃশংস আচরণ করেছে। সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে বিরাট হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।

শেখ হাসিনার সময় আমরা দেখেছি নির্বাচন হতে না দেয়ার প্রবণতা। যত রকমভাবে পারা যায়, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার চেষ্টা। হারজিত পরের বিষয়। এমনটা পাকিস্তানি আমলে ছিল না...

সময়ের সঙ্গে তারা চাপের মধ্যে ছিল। 

কোন ধরনের চাপ কাজ করেছিল, আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে? 

আইয়ুব খানকে ক্ষমতা ত্যাগ করতে হলো, ইয়াহিয়াকে ক্ষমতায় বসাতে হলো চাপের কারণে। আইয়ুব খানের ‘ডিকেড অব ডেভেলপমেন্ট’ তত্ত্ব কাজ করেনি। মানুষ অসন্তুষ্ট ছিল। এমন চাপের কারণে তারা নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে দিয়েছে।

নির্বাচনে কি আন্তর্জাতিক চাপ ছিল?

বর্তমানে যেমন আন্তর্জাতিক চাপ থাকে, আমার মনে হয় না সে সময়ে এমন চাপ ছিল। জনগণের দাবি, আইয়ুব খান ব্যর্থ হয়েছে; ইয়াহিয়া খানের অঙ্গীকারই ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। তারা সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়েছে। যদি তারা ধারণা করত, নির্বাচনে তাদের পরিণতি কী হবে। তাহলে হয়তো তাদের আচরণ ভিন্ন হতো।