দেশের হৃদরোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ বলা যায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে (এনআইসিভিডি)। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরুর গল্প জানতে চাই।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) গোড়াপত্তন ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের ইতিহাস গৌরবময়। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এক বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন। প্রথম পরিচালক হিসেবে হাসপাতাল পরিচালনা করেন জাতীয় অধ্যাপক মরহুম ব্রিগেডিয়ার ড. আব্দুল মালিক, তিনি সে সময় সেনাবাহিনীতে কর্নেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাত্র ৭১টি শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি দেশের হৃদরোগ চিকিৎসায় অতি দ্রুত পথিকৃতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এ ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালে এখানে সফলভাবে ‘‌ওপেন হার্ট সার্জারি’ সম্পন্ন হয়।

চিকিৎসাসেবার পরিধি বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান রোগীদের স্থান সংকুলান নিশ্চিত করতে ১৯৮৮ সালের দিকে আধুনিক নতুন ভবনের পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর ১৯৯৬ সালে হাসপাতালটি বর্তমান বিস্তৃত ভবনে স্থানান্তর হয়, ফলে শয্যা সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫০। পরে রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বাড়ায় এবং উন্নত সেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০২২ সাল নাগাদ হাসপাতালের মূল কাঠামোর দুপাশের দুটি ব্লককে আটতলা ভবন হিসেবে সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে এ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ইনস্টিটিউটের মোট শয্যা সংখ্যা ১ হাজার ২৫০টিতে উন্নীত হয়েছে, যা বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল জাতীয় হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

দেশে খুব কমসংখ্যক হাসাপাতালই বিশেষায়িত হৃদরোগ সেবা দেয়। ফলে রোগীর বড় একটি চাপ এসে পড়ে এনআইসিভিডির ওপর। প্রতিষ্ঠানটি এ চাপ সামাল দিচ্ছে কীভাবে?

গত বছর আমরা বহির্বিভাগে সোয়া দুই লাখ রোগীকে সেবা দিয়েছি। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা পেয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার। আর ভর্তি রোগী ছিল সোয়া লাখের কাছাকাছি। এর বাইরেও আমাদের অসংখ্য চিকিৎসক প্রতিদিনই ব্যক্তিগতভাবে অনেক আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত লোকজনকে সেবা দিচ্ছেন। শুধু হাসপাতালের নথির তথ্যানুযায়ী, গত বছর সব মিলিয়ে আমরা প্রায় ছয় লাখ রোগীকে সেবা দিয়েছি। অথচ আমাদের হাসপাতালের ধারণক্ষমতা সে অনুযায়ী কতটুকু! এখানে শয্যা আছে ১ হাজার ২৫০; কিন্তু কিচেন থেকে আমার কাছে ১ হাজার ৭০০ রোগীর রান্নার খবর আসে। বাকি ৪০০-৫০০ লোক কিন্তু মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমাদের কোনো রোগীকে ফেরত দেয়ার সুযোগ নেই। শয্যা থাকুক বা না থাকুক, আমাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেই হয়। ফলে আমাদের চিকিৎসকরা, নার্স, টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ডবয় বা রোগী—কেউই খুব স্বস্তির মধ্যে নেই। শুধু এটুকু বলতে পারি, সাধ্যমতো সবাই চিকিৎসা পাচ্ছে, কিন্তু আমরা সেই আরাম বা সুবিধাটা দিতে পারছি না। সাধ্য আর সামর্থ্যের ব্যবধানটা থেকেই যাচ্ছে।

দেশে দীর্ঘদিন ধরেই হৃদরোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এ সংখ্যা বাড়ার মূল কারণ কী বলে মনে করেন?

রোগী বাড়ার বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখতে হবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখনকার তুলনায় বর্তমানে জনসংখ্যা ও গড় আয়ু অনেক বেড়েছে। মানুষ যত বেশি দিন বেঁচে থাকবে, বয়সজনিত রোগগুলো বাড়ার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আবার আগে কখনো হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হলে মানুষ বলত ‘‌সন্ন্যাস রোগ’ হয়েছে। এ বলে মানুষ চিকিৎসা নিত না। ফলে রোগী দ্রুত মারা যেত। কিন্তু এখন তারা চিকিৎসা পাচ্ছে এবং বেঁচে থাকছে। ফলে সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া আগে যেসব রোগ শনাক্ত (ডায়াগনোসিস) হতো না, এখন সেগুলো অনেক আগে, দ্রুত এবং বিস্তৃতভাবে শনাক্ত হচ্ছে। এসব কারণেই সব মিলিয়ে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি মনে হয়।

এ সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?

এনআইসিভিডি হলো দেশের কার্ডিওলজি ও কার্ডিয়াক সার্জারির মূল সূতিকাগার। কিন্তু আইসিভিডি নাম দিয়ে বিভাগীয় শহরগুলোয় এমন আরো বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা দরকার। এজন্য অবকাঠামো, লোকবল (ডাক্তার, নার্স, কর্মচারী) ও যন্ত্রপাতি বাড়াতে হবে। তাহলে এনআইসিভিডিতে প্রায় ৪০ শতাংশ রোগীর চাপ আমরা কমিয়ে আনতে পারব। আমার এখানে এখন পাঁচটি অপারেশন থিয়েটার চালু আছে। আরো তিনটি অপারেশন থিয়েটার তৈরির মতো জায়গা খালি আছে। আমরা সরকারের কাছে সেগুলো সাজিয়ে দেয়ার আবেদন জানাচ্ছি। তা করতে পারলে সার্জারির দীর্ঘ ওয়েটিং লিস্ট ও ব্যাকলগ আমরা অনেক কমিয়ে আনতে পারব।

14

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমাদের পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। বিষয়টি কঠিন মনে হওয়ায় তরুণেরা সহজে এতে আসতে চায় না। আগে থেকে পরিকল্পনা করে তরুণদের উৎসাহ দিলে এ সংকট হতো না। এ ধরনের বিশেষায়িত বিষয়গুলোয় উপযুক্ত জনবল গড়ে তুলতে প্রণোদনা বা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেয়া দরকার।

একদিকে দক্ষতার অভাব, অন্যদিকে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ খাতে কি কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা ভিশন থাকা দরকার বলে মনে করেন আপনি?

বক্ষব্যাধি, কিডনি, গ্যাস্ট্রোলিভার ও হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের মতো প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজ নিজ বিষয়ের প্রধান অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। তাদের কাজ হবে সারা দেশের তথ্য সংগ্রহ করে চাহিদা নিরূপণ করা। এর ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করে এবং মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। সমস্যা হলো আমাদের সবকিছুই কেন্দ্রভিত্তিক। মন্ত্রণালয় প্রতিদিনের কাজের চাপ সামলাতেই হিমশিম খায়, তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার মতো সুযোগ বা বিশেষজ্ঞতা তাদের থাকে না। উপরন্তু, কয়েক দিন পর পর কর্মকর্তা বদলে যান। একজন সচিবের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো জটিল জায়গা বুঝতে বুঝতেই এক বছর চলে যায়। দেড় বছরের মাথায় উনি বদলি হয়ে গেলে ধারাবাহিকতা থাকে না। তাই দীর্ঘমেয়াদে বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্বে রেখে পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়া দরকার। বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যে নজর দিচ্ছে এবং গুছিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছে। আশা করি, সদিচ্ছা থাকলে ভবিষ্যতে এসব ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

বিকেন্দ্রীকরণের জন্য বেসরকারি খাতের কি ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগ নেই?

এখানে শুধু বিকেন্দ্রীকরণ নয়, ‘‌শেয়ারিং’র একটা বিষয় আছে। ধরা যাক গাজীপুরের টঙ্গীতে কোনো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আছে, যার চারপাশে অসংখ্য কারখানা ও শ্রমিক বসবাস করেন। এখন সরকারিভাবে যদি বলা হয়—উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা ইউনিয়ন সেন্টারগুলো থেকে রোগী সরাসরি ওই মেডিকেল কলেজে রেফার করা যাবে এবং সরকারি রেফারেন্সের কারণে হাসপাতালটি ৩০ বা ৫০ শতাংশ ছাড় দেবে, তাহলে উভয় পক্ষই লাভবান হবে। রোগীকে ঢাকায় যাতায়াতের খরচ, সময় ও দুর্ভোগ পোহাতে হবে না, অন্যদিকে ওই এলাকাটিও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট হিসেবে গড়ে উঠবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা দরকার। জেলায় জেলায় শুধু মেডিকেল কলেজ খুললেই হবে না। মানসম্মত শিক্ষক ও অবকাঠামো ছাড়া শুধু সংখ্যা বাড়ালে মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি হয় না। তার চেয়ে বরং প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল দরকার, যেখানে বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসাসেবা দেবেন। আর মেডিকেল কলেজগুলো বাছাইকৃত হওয়া উচিত, যাতে উপযুক্ত শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত বজায় থাকে।

জরুরি বিভাগে সংকটাপন্ন আসা রোগীদের এনজিওগ্রাম বা প্রাইমারি পিসিআইয়ের মতো জটিল চিকিৎসা দেয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের সক্ষমতা কতটুকু?

আমরা সক্ষমতার ১২০ শতাংশ দিয়ে কাজ করছি। ক্যাথল্যাবে প্রতিদিন একেকজন ১৮-২০ জন রোগীর তালিকা দিয়ে রাখছেন, যদিও হয়তো ১৪-১৫ জনের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। তীব্র হৃদরোগ নিয়ে এলে আমরা ‘‌প্রাইমারি পিসিআই’ করি। অর্থাৎ রোগীকে জরুরি বিভাগ থেকে সরাসরি ক্যাথল্যাবে নিয়ে আর্টারি খুলে রিং পরিয়ে দেয়া হয়। বেসরকারি হাসপাতালে আড়াই থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার বিপরীতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র ১৫-২০ হাজার টাকায় এটি সম্ভব হচ্ছে।

তবে সীমাবদ্ধতাও আছে। বাইরে ২৪ ঘণ্টা প্রাইমারি পিসিআই হলেও আমরা লোকবল (বিশেষ করে নার্স ও টেকনিশিয়ান) সংকটের কারণে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সেবা দিতে পারছি। তাও এটি আমাদের জন্য এক বিরাট সাফল্য। আমাদের এখানে মৃত্যুর হার ৩ শতাংশেরও নিচে।

আমাদের দেশে চিকিৎসা-সংক্রান্ত গবেষণায় পিছিয়ে থাকার কারণ কী?

গবেষণায় পিছিয়ে থাকার মূল কারণ আমরা গবেষণার সঠিক মূল্যায়ন করি না এবং গবেষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিই না। রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে গিয়েই আমাদের চিকিৎসকদের নাজেহাল অবস্থা হয়। চিকিৎসকরা যদি সেবা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তবে গবেষণা করবেন কখন? বিদেশে যারা গবেষণা করেন, তাদের কাজের ক্ষেত্র এবং সেবা দেয়ার সময় আলাদা করা থাকে। তাছাড়া পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু জ্যেষ্ঠতা নয়, মেধারও সঠিক মূল্যায়ন এবং উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা উচিত।

সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশে আপনার কোনো বার্তা আছে কি?

এ দেশ, এ হাসপাতাল ও এখানকার চিকিৎসকরা আমার, আপনার, সবার। গণমাধ্যমসহ সবার উচিত পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা। কারণ পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া একটি সুস্থ সমাজ ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।