জলবায়ু পরিবর্তন বিদ্যমান সামাজিক ও লিঙ্গ বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তুলছে। বাংলাদেশের নীতিমালা উদাহরণযোগ্য হলেও বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা নারীদের অংশগ্রহণকে সীমিত করছে। তাই জেন্ডার-দায়বদ্ধ জলবায়ু শাসন, কমিউনিটি নেতৃত্বাধীন অভিযোজন এবং নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত জলবায়ু কার্যক্রম সম্ভব নয়। আজ সকালে ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে জাতীয় পর্যায়ের নাগরিক সংগঠন ওয়েভ ফাউন্ডেশন আয়োজিত “জলবায়ু নীতি, অভিযোজন ও প্রশমন কৌশল: জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পর্যালোচনা” শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
ওয়েভ ফাউন্ডেশন বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগের ৫টি জেলার যথাক্রমে বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, রাজশাহী ও নওগাঁর ১৫টি উপজেলা ও ৯০টি ইউনিয়নে ডিসেম্বর ২০২৪-জুন ২০২৭ মেয়াদে ‘জেন্ডার ইকুয়ালিটি ট্রান্সফর্মস ক্লাইমেট অ্যাকশন (গেটকা)’ নামক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি প্রকল্পের কর্মএলাকায় ‘জলবায়ু নীতি, অভিযোজন ও প্রশমন কৌশল: জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পর্যালোচনা’ শীর্ষক একটি গবেষণাও পরিচালনা করা হয়েছে। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য, বিশ্লেষণ এবং সুপারিশসমূহ জাতীয় পর্যায়ে নীতি-নির্ধারক ও অংশীজনদের সামনে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে আজ এই মতবিনিময় সভা’র আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট (বিসিসিটি) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) গাজী মোঃ ওয়ালি-উল-হক। তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা অন্য যে কোন স্থানের চেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় খাকে। দুযোর্গের কারণে টেকসই জীবন-জীবিকা গড়ে তোলা তাদের জন্য খুব কঠিন। যা তাদের পরিবারকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা গেলে অনেকক্ষেত্রেই অভিঘাত মোকাবেলা সম্ভব। একইসাথে জলবায়ু অভিঘাত মোকাবেলায় কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রণোদনা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান, কৃষি উপকরণ বিতরণসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বিশেষ প্রয়োজন। এছাড়া শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যতের দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে, যা একমাত্র সম্ভব বাংলাদেশকে একটি জলবায়ু সহনশীল দেশ গঠনের মাধ্যমে।
সম্মানীয় অতিথির বক্তব্যে ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরামের সদস্য সচিব গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, যে কোন ধরনের দুর্যোগে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বয়স, ধর্ম, স্থান-কাল ভেদে নারীদের অবস্থা আরও নাজুক। দুর্যোগকালীন সময়ে নারীদের নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষ্যে তাদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করা খুব জরুরী।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বিশিষ্ট নারীনেত্রী শিরীন পারভিন হক বলেন, দুযোর্গকালীন সময়ে নারীদের বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়। যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যেও সমস্যা সৃষ্টি করে। ভবিষ্যতে একটি সুস্থ ও সুন্দর প্রজন্ম নির্মাণে দুযোর্গকালীন নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সময় উপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপ বা উদ্যোগ নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরী।
ওয়েভ ফাউন্ডেশন-এর নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী সভাপতির বক্তব্যে বলেন, দুর্যোগকালে নারীরা যেমন নাজুক অবস্থায় থাকে তেমনি থাকে শিশুরাও। উভয়কেই আমাদের গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, একে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি, শিল্প. খাদ্য নিরাপত্তাসহ আমাদের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। একটা বিপুল সংখ্যক মানুষ স্থানান্তরিত হচ্ছে। এ সকল দিক বিবেচনায় নিয়ে জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবেলায় আমাদের সকল পক্ষকে একত্রে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যেতে হবে।
মত বিনিময় সভায় সম্মানীয় অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন, রায়হান উদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইডকল, ড. সানজিদা আখতার, অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যাথরিনা কোনিগ, ডেপুটি টিম লিডার, নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড, আজিজা আসফিন, ও ফান্ড ম্যানেজমেন্ট এক্সপার্ট রাবেয়া রওশন, জেন্ডার অ্যান্ড সোশ্যাল ইনক্লুশান স্পেশালিস্ট, বাংলা এসএইচইপি প্রজেক্ট, জাইকা, ইরফাত আরা ইভা, এডিবি কনসালটেন্ট, জিইএসআই ইএক্সপিইআরআর, ঢাকা সাউথ সিটি করপোরেশন সেফটি নেট প্রোগ্রাম, নাহিদ শারমিন, জেন্ডার এনালিস্ট, এসপায়ার টু ইনোভেটিভ প্রোগ্রাম, ইউএনডিপি-বাংলাদেশ, লাবিব তাজওয়ান উৎসব, কান্ট্রি ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ব্রেমেন ওভারসিজ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন প্রমুখ। এতে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল ওহাব। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক কানিজ ফাতেমা।










