১৪ আগস্ট অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের ‘বড় পর্দায় সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র: ভাইরাসের মহাবিপর্যয় থেকে শোভন বাংলাদেশের সন্ধানে’ শীর্ষক গ্রন্থের ওপর একক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে এ ক্রোড়পত্র। 

আলোচক: অধ্যাপক ড. সুশান্ত কুমার দাস

সাবেক চেয়ারম্যান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ভূগোল বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

সঞ্চালক: ড. জামালউদ্দিন আহমেদ, এফসিএ

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

চেয়ারম্যান, ইমার্জিং ক্রেডিট রেটিং লিমিটেড




ড. জামালউদ্দিন আহমেদ, এফসিএ

সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

করোনা মহামারীর দ্বিতীয় আঘাতে আমাদের প্রিয় স্বদেশ আজ ভীষণভাবে বিপন্ন ও অসহায়। বিশ্বব্যাপী শুরু হয়েছে অর্থনৈতিক মহামন্দা। একই সঙ্গে চলছে অতিমারীর অনিশ্চয়তা। বিশ্বের এ দুঃসময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমিতি খুঁজছে শোভন সমাজ, শোভন রাষ্ট্র ও শোভন বিশ্বব্যবস্থা। সেজন্যই ভাচুর্য়াল একক আলোচনা ‘শোভন সমাজের সন্ধানে’-এর আয়োজন। অনুষ্ঠানের শুরুতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সদস্যদের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং খুনিদের বিচারের দাবি জানাচ্ছি।

 





ড. সুশান্ত কুমার দাস

সাবেক অধ্যাপক

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আজ যে গ্রন্থটি নিয়ে আমরা আলোচনা করব—“সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র: ভাইরাসের মহাবিপর্যয় থেকে শোভন বাংলাদেশের সন্ধানে”—গ্রন্থটির লেখক অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ-সমাজচিন্তক, শুধু বাংলাদেশ নয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। গ্রনন্থকারের বেড়ে ওঠা, ইন্টেলেকচুয়াল ক্রমবিকাশ ও ধারার সঙ্গে আমি পরিচিত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে। আমি পদার্থবিজ্ঞানের একজন ছাত্র, শিক্ষকও ছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেছি। এখনো আমি রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করছি। ফলে আমার আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বিষয়গুলো আসবে।

প্রথম অধ্যায়ে লেখক তাঁর প্রস্তাবিত শোভন সমাজের ধারণাত্মক তত্ত্বকাঠামো উপস্থাপন করেছেন। তিনি শোভন সমাজ বলতে কী বোঝাতে চান, শোভন সমাজের মৌলিক মতাদর্শগত দিক কী হবে, তার কাঠামো কী হবে—সে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়—‘শোভন সমাজের সন্ধানে: প্রচলিত মূলধারার অর্থনীতিশাস্ত্রের অপারগতা ও নতুন অর্থনীতিশাস্ত্রের যৌক্তিকতা’। এখানে তিনি শোভন সমাজসংশ্লিষ্ট অর্থনীতিশাস্ত্র কেন প্রয়োজন, সেটি আলোচনা করেছেন। প্রচলিত সব ধারার অর্থনীতিশাস্ত্র নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পর কেন শোভন সমাজের জন্য নতুন অর্থনীতিশাস্ত্র প্রয়োজন, তা নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন।

তৃতীয় অধ্যায়—আমি যেটা মনে করি, শোভন সমাজের মতাদর্শগত ভিত্তি হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে গ্রহণ করেছেন এবং এর জন্য তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম—মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনৈতিক অর্থনীতি: শোভন জীবন ব্যবস্থার ভিত্তি।

চতুর্থ অধ্যায়ের শিরোনাম—ধনী-দরিদ্র শ্রেণীবৈষম্য-অসমতা: শোভন সমাজ বিনির্মাণে প্রধান দুর্ভাবনার বিষয়।

পঞ্চম অধ্যায়—‘সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ: শোভন সমাজের অশোভন প্রতিপক্ষ’। বিশেষ বাস্তবতায় বাংলাদেশের একজন অর্থনীতি ও সমাজবিদ হিসেবে ড. বারকাত তাঁর গবেষণার মৌলিক বিষয় হিসেবে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এবং অতীতেও অনেক গ্রন্থ লিখেছেন। তিনি শোভন জীবনের অশোভন প্রতিপক্ষ হিসেবে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে চিহ্নিত করেছেন, যা বাংলাদেশের জন্য তাঁর একটি মৌলিক অবদান।

ষষ্ঠ অধ্যায়ের শিরোনাম—‘পাল্টে যাচ্ছে বিশ্বায়ন: শোভন সমাজের লক্ষ্যে বিশ্বায়ন নাকি দেশজায়ন?’। এখানে বিশ্বায়নের যাবতীয় বিষয় বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন এবং একই সঙ্গে বিশ্বায়নের অ্যান্টিথিসিস হিসেবে দেশজায়ন, যাকে আমরা ন্যাশনালাইজেশন বলি, তার সম্পর্কটা নির্ধারণ করেছেন এবং আসলে ন্যাশনাল অ্যাসপেক্ট বাদ দিয়ে গ্লোবালাইজেশন হয় কিনা সে প্রশ্নই তিনি তুলেছেন।

সপ্তম অধ্যায়—‘দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের কাঠামোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—কেন হচ্ছে, কত দূর হবে?’ আমরা সবসময় বলি যে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে—এসবের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক এখানে তিনি বিশদ আলোচনা করেছেন এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কেন এ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে এবং এটি কত দূর যেতে পারে, যেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের বুদ্ধিজীবীসহ বিশ্বব্যাপী অনেকের ধারণা, প্রবৃদ্ধি দিয়ে যে পথে বাংলাদেশ এগোচ্ছে, তাতে সংকট থেকে আমরা পরিত্রাণ পাব। কিন্তু ড. বারকাত এ গ্রন্থে দেখিয়েছেন—এ প্রবৃদ্ধি কত দূর হবে এবং এর সীমাবদ্ধতাই বা কী।

অষ্টম অধ্যায়—‘কভিড-১৯-এর প্রত্যক্ষ ক্ষতির বিশ্লেষণ এবং মোকাবেলা ভাবনা: শোভন সমাজের অভীষ্ট প্রাথমিক কর্মকাণ্ড’। এখানে ড. বারকাত বিশ্বব্যাপী সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রে কভিড-১৯-এর ক্ষতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ এবং কীভাবে তা মোকাবেলা করতে হবে এবং শোভন একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে, তা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন।

নবম অধ্যায়ে ড. বারকাত ‘কভিড-১৯: পুনরুদ্ধার ও শোভন সমাজ-অর্থনীতি বিনির্মাণ মডেল’ শিরোনামে এখন যে বিশ্ব অর্থনীতিতে মহামন্দা চলছে, তাকে তিনি কভিড-১৯-এর কারণে নয় পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে তুলে ধরে কভিড-১৯-এর ক্ষতির আলোকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। এবং এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে, যাকে তিনি ‘শোভন সমাজ ও জীবনব্যবস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করছেন এবং সেই ব্যবস্থার ‘অর্থনৈতিক মডেল’ উপস্থাপন করেছেন।

আমার দৃষ্টিতে অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের এ গ্রন্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও মূূল অধ্যায় হলো দশম অধ্যায়—‘সমাজ সমগ্রকের রাজনৈতিক অর্থনীতি: শোভন সমাজ-অর্থনীতির সন্ধানে’। এ প্রসঙ্গে আমি এখন থেকে সাত বছর আগে ড. বারকাতের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত আলোচনার প্রসঙ্গে বলব। তাঁকে সে সময় বলেছিলাম, ‘আপনার উচিত বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার গবেষণালব্ধ একটি বিস্তৃত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তুলে ধরা।’ তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘এটা কি আমাকেই করতে হবে?’ আমি বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ আপনাকেই করতে হবে।’ আমি আজকে এ প্রসঙ্গে তাঁকে ধন্যবাদ দিই—‘সমাজ সমগ্রকের রাজনৈতিক অর্থনীতি: শোভন সমাজ-অর্থনীতির সন্ধানে’-এর ১৫টি উপ-অধ্যায়ে সেসব বিষয় নিয়ে তিনি বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। তাঁর সঙ্গে একমত-দ্বিমতের প্রসঙ্গ যা-ই থাকুক, আমি মনে করি, বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অবদান এবং বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজ এবং বুদ্ধিবৃত্তির সমস্ত ক্ষেত্র নিয়ে তিনি যে মূল্যায়ন করেছেন, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আছে—তা কাজে দেবে।

একাদশ অধ্যায়—‘ভাইরাসের মহাবিপর্যয় থেকে শোভন বাংলাদেশ: বিকল্প বাজেট ২০২০-২০২১’। বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি, বাংলাদেশ সরকারের প্রতি বছর জাতীয় বাজেট উত্থাপনের ঠিক আগেই অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত জাতির কাছে একটি বিকল্প বাজেট পেশ করেন। কভিড-১৯-এর এ মহাবিপর্যয়কালে সরকার যে বাজেট ঘোষণা করেছে, তার বিপরীতে বাংলাদেশের বাজেট আসলে কেমন হওয়া উচিত, সেটিও এ গ্রন্থে বিস্তৃতভাবে তিনি উপস্থাপন করেছেন।

ড. বারকাত বলেছেন, তিনি গবেষণাগ্রন্থটি এমনভাবে বিনির্মাণ করেছেন—প্রথমে তিনি একটি তাত্ত্বিক মডেল নির্মাণ করেছেন এবং সত্যিকারভাবে তার অনুশীলন ও ব্যবহারিক দিক কী হওয়া উচিত, আমাদের দেশের বাস্তবতায় কীভাবে তা প্রয়োগ ও অনুশীলন করতে পারি, সেজন্য তিনি বিকল্প বাজেট থেকে শুরু করে সমাজ সমগ্রকের রাজনৈতিক অর্থনীতির সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে ‘শোভন একটি সমাজ ও অর্থনীতির’ সন্ধান করেছেন। ফলে তাঁর গোটা গবেষণাগ্রন্থের কাঠামো একদিকে যেমন তাত্ত্বিক মডেল অন্যদিকে আমাদের দেশের বাস্তবতায় সেই মডেল কীভাবে প্রয়োগ করা যাবে তার পথনির্দেশক।

সবশেষে উপসংহারে পৌঁছেছেন এবং বলেছেন, এ মহামারীর বিশ্বে পরিবর্তন অনিবার্য। এ পরিবর্তনে আমরা কী চাই। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন—যে বিশ্ব এখন আছে, মহামারীর পর সেই বিশ্ব আর থাকবে না। আমরা গত শতাব্দীতে দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখেছি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে যে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল, তার সঙ্গে আমরা একমত বা দ্বিমত হতে পারি। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তির লড়াই আমরা দেখেছি। এখন এই ভাইরাসের মহাবিপর্যয়ের পর আমার মনে হয়, লেখক এ গ্রন্থে পরিষ্কারভাবেই বলেছেন, গোটা বিশ্ব একটি নতুন পৃথিবী দেখবে এবং নতুন পরিবর্তনের সামনে দাঁড়াবে—এটাই হলো ড. বারকাতের উপসংহার। এক বাক্যে বলা যায়, তাঁর এ গবেষণাগ্রন্থের এটাই হলো মূল নির্যাস।

এ গবেষণাগ্রন্থের মুখবন্ধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্ল মার্ক্সের পুঁজি হোক বা অ্যাডাম স্মিথের ওয়েলথ অব নেশনস হোক, যেকোনো গবেষণাগ্রন্থের জন্যই মুখবন্ধ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ গ্রন্থের মুখবন্ধে ড. বারকাত সার্বিকভাবে কতগুলো বিষয় এনেছেন। প্রথম কথা হলো, তিনি মানুষ ও তার সামাজিক কাঠামোর ইতিহাসের কথা বলেছেন এবং আমার মনে হয়, তিনি ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে ভিত্তি করেই সেসব কথা বলেছেন। আদিম সাম্যবাদী সমাজ, দাস সমাজ, ফিউডাল সমাজ, পুঁজিবাদী সমাজ—এসব কাঠামোকে তিনি আমার দৃষ্টিতে মার্ক্সীয় প্যারাডাইমের আলোকে বলেছেন, ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোকে বলেছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি এসব ঐতিহাসিক বিষয় বস্তুবাদের কাঠামোর আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন।

তৃতীয় অধ্যায়ে তিনি ‘শোভন সমাজ ও জীবনব্যবস্থা’র প্রস্তাব করেছেন এবং সেটির মতাদর্শগত যে ভিত্তি, যা মূল বিষয় এ গবেষণাগ্রন্থের, তাও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। বিস্তৃতভাবে তিনি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাঠামোগত সারসংক্ষেপ এবং তার বিপরীত বা অ্যান্টিথিসিস হিসেবে ‘শোভন জীবনব্যবস্থা’র অপরিহার্যতার কথা বলেছেন এবং তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন—গবেষণার মেথডোলজি হিসেবে তিনি ডায়ালেকটিক মেথড ব্যবহার করেছেন এবং তিনি আরোহ-অবরোহ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। আমি মনে করি, মূলত তিনি দ্বন্দ্ব-দর্শন ব্যবহার করেছেন। যাঁরা মার্ক্সীয়বাদী স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা বলবেন, তিনি দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী চিন্তন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ ভাববাদী নয়, বস্তুবাদী দ্বন্দ্ব-দর্শন  গ্রন্থের মুখবন্ধের ১০ নম্বর পয়েন্টটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল ও তার উপায় এবং এ রাষ্ট্রের রূপান্তরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেছেন। আমরা জানি যে মার্ক্সীয় দর্শন বা সমাজবিজ্ঞানের বহু মতবাদে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বিষয়ে অনেক বিতর্ক আছে। ড. বারকাত রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সব উপায়ের বিশ্লেষণ করেছেন, সশস্ত্র উপায়, নির্বাচন, অভ্যুত্থান বা অন্য যেকোনো উপায়েই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল হতে পারে বলে তিনি নিজের বক্তব্য রেখেছেন। এ নিয়ে একমত-দ্বিমত হতেই পারে। তবে কেন তিনি বলেছেন, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে সারসংক্ষেপ আকারে তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। এসবের পর তিনি ‘শোভন জীবনব্যবস্থা’র কাঠামোগত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। এসবই এ গ্রন্থের মুখবন্ধের উল্লেখযোগ্য এবং সার্বিক বিষয়।  প্রথম অধ্যায়ের শোভন সমাজের ধারণাত্মক তত্ত্বকাঠামো এবং তাঁর যে প্রস্তাব, সে বিষয়ে কিছু বলব। প্রথম অধ্যায়ের ৪ নম্বর পৃষ্ঠার লেখচিত্র ১-এ তিনি ‘শোভন সমাজ’ ধারণার তিনটি বৃহত্বর্গীয় অঙ্গ, অঙ্গসমূহের ভিত্তি-উপাদান ও যোগসূত্র তুলে ধরেছেন।

এ ভিত্তিকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেগুলো বৃহত্তর আলোচনার দাবি রাখে, তার মধ্যে প্রথমত, ‘মানবকল্যাণ-উদ্দিষ্ট বিজ্ঞানচর্চা’ অর্থাৎ এমন বিধ্বংসী বা এমন কোনো বিজ্ঞানচর্চা হওয়া উচিত না, যা সমাজ-সভ্যতা-পৃথিবীকে ধ্বংস করে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ভিত্তি-উপাদানের ‘বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, বঞ্চনামুক্ত অর্থনীতি’ ব্যবস্থার কথা বলেছেন—এগুলোর প্রতিটিই আলোচনার দাবি রাখে। এখানে তিনি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন—কেন বৈষম্য সৃষ্টি হয়, কোথায় বৈষম্য হয় এবং কে শোষণ করে, কে শোষক, কে শোষিত—এসব বিষয়। তিনি দেখিয়েছেন, দারিদ্র্যের উৎস প্রকৃত কোথায়, কারণ কী এবং যে অর্থনীতিশাস্ত্র এসব সমস্যা সমাধান করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, তাকে তিনি ‘শোভন সমাজের অর্থনীতিশাস্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এখানে তিনি একটি মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছেন, সেটি হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদে জনগণের মালিকানা। ব্যক্তিমালিকানা নয়, সামাজিক মালিকানা; যেখানে উৎপাদনের উপায়ের ওপর সামাজিক মালিকানা: জনগণের মালিকানা, রাষ্ট্রের ও যৌথ-সমবায়ী মালিকানা থাকবে। এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ড. বারকাত উল্লেখ করেছেন, যিনি ব্যাংকিং সিস্টেমেরও একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যতীত সব ব্যাংক বিলুপ্ত হবে। অর্থাৎ তিনি মনে করেন, আমাদের দেশ বা পুঁজিবাদী সমাজের মৌলিক শোষণের অন্যতম ক্ষেত্রটা হচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা ফাইন্যান্সিয়ালাইজেশন সিস্টেম। অতএব ব্যাংকিং ব্যবস্থা যদি জনগণের হাতে না থাকে, জনগণের অধিকারের মধ্যে না থাকে—তাহলে তা সমাজে বৈষম্য-শোষণ-বঞ্চনা সৃষ্টি করতেই থাকবে। তৃতীয় ভিত্তি উপাদানে তিনি ‘শোভন রাষ্ট্র’-এর কথা বলেছেন। এ ‘শোভন রাষ্ট্র’ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন—জনগণের রাষ্ট্র, যেখানে জনগণের প্রাধান্যই মূল কথা। রাষ্ট্র নিয়ে বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক কর্মী-নেতৃত্ব এবং সামাজিক বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক-বিস্তৃত বিতর্ক আছে। ড. বারকাত বলছেন, জনগণের রাষ্ট্র, যেখানে সর্বত্র জনগণের প্রাধান্য থাকবে, জনগণের গণতন্ত্র থাকবে, আমরা পিপলস ডেমোক্রেসি বলতে যা বুঝি। মার্ক্সীয় পরিকাঠামো নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরাও পিপলস ডেমোক্রেসির কথা বলেন। ড. বারকাত এসব পরিকাঠামোর সঙ্গে তাঁর প্রস্তাবিত ব্যবস্থার পার্থক্য কী, সেটা ব্যাখ্যা করেছেন এবং তিনি নতুন ধরনের নাগরিক শাসনের কথা বলেছেন, যেটা ‘নিচ থেকে উপরে’ অর্থাৎ ‘উপর থেকে নিচে নয়’, যেখানে প্রথাগত আমলাতন্ত্র, যা এখনকার রাষ্ট্রব্যবস্থায় রয়েছে, তা থাকবে না। কীভাবে থাকবে না, কেন থাকবে না সেসবও তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিনি বলেছেন—দেশরক্ষা, প্রতিরক্ষা—জনগণের দায়িত্ব। এটি নিয়ে বড় ধরনের আলোচনা হতে পারে।

ড. বারকাত শোভন যে সমাজের কথা বলছেন, সেখানে একটি শোভন রাষ্ট্র থাকবে। আমরা যাঁরা মার্ক্সবাদী কর্মী বা যাঁরা সমাজবিপ্লবের কথা বলি, আমরা যাকে কমিউনিস্ট সোসাইটি বা সাম্যবাদী সমাজ বলি, যেখানে মার্ক্স-অ্যাঙ্গেলসের ভাষায় ‘রাষ্ট্রের বিলুপ্তি’ অর্থাৎ রাষ্ট্র শুকিয়ে যাবে, রাষ্ট্র থাকবে না। কিন্তু অধ্যাপক আবুল বারকাত বলছেন, ‘শোভন সমাজে’ একটি বিস্তৃতকাল ধরে রাষ্ট্র থাকবে অর্থাৎ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব তিনি স্বীকার করেছেন। ফলে এখানে যাঁরা পুঁজিবাদের বিকল্প হিসেবে, সমাজতন্ত্রের কথা বলেন এবং সমাজতন্ত্রে একটা বিস্তৃত সময় ধরে একটা রাষ্ট্র থাকবে। শুধু সাম্যবাদী সমাজে রাষ্ট্র শুকিয়ে মরবে বা বিলুপ্ত হবে, যা মার্ক্সীয় পরিকাঠামোয় বলা আছে। ড. বারকাত এটির সঙ্গে তাঁর মতা পার্থক্যের কথা বলেছেন। তিনি অবশ্য সাম্যবাদী সমাজের সঙ্গে তাঁর প্রস্তাবিত শোভন সমাজের কিছু মিলের কথা বলেছেন। কিন্তু সাম্যবাদী সমাজে যাওয়ার পর যে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থাই থাকতে পারে না, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট করে কিছু বলেননি—এমনটাই আমার মনে হয়েছে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে, তিনি শোভন সমাজের সন্ধান করতে গিয়ে প্রচলিত মূলধারার অর্থনীতিশাস্ত্রের অপারগতা ও নতুন অর্থনীতিশাস্ত্রের যৌক্তিকতা তুলে ধরে শোভন সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি কেমন হতে পারে, সেটা বলেছেন। এখানে তিনি প্রচলতি অর্থনীতিশাস্ত্রকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। একটিকে মূলধারার অর্থনীতিশাস্ত্র বলেছেন, অন্যটিকে তিনি কভিড-১৯ এবং বৈশ্বিক এ সংকটের বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য নতুন অর্থনীতিশাস্ত্রীয় ধারা বলেছেন। এখানে তিনি মূলধারার অর্থনীতিশাস্ত্রের মধ্যে মার্ক্সীয় অর্থনীতিশাস্ত্রকে রেখেছেন। আমি তাঁর এ বিভাজনের সঙ্গে একমত নই। কারণ তিনি নিজেই বলেছেন, মার্ক্সীয় অর্থনীতিশাস্ত্রকে এখন মূলধারার অর্থনীতিশাস্ত্র বলতে যা বোঝায়, যার দুটি ধারা আছে—একটি ধারা সার্বিকভাবে পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে গ্রহণ করেছে, আর অন্যটি পুঁজিবাদী অর্থনীতিশাস্ত্রের পরিকাঠামো কিছুটা পরিবর্তন নতুন অর্থনীতি বলছে। কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থনীতিশাস্ত্রের বিকল্প হিসেবে যেসব অর্থনীতিশাস্ত্র রয়েছে, তার মধ্যে প্রধান ধারা হচ্ছে, মার্ক্সীয় অর্থনীতিশাস্ত্র—এটা অস্বীকার করার কিছু নেই; ড. বারকাত এটা বলেছেন মার্ক্সীয় অর্থনীতিশাস্ত্রের ব্যাখ্যা করে। তাঁর এ কথার যুক্তি আছে—কভিড-১৯ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দা মার্ক্সীয় অর্থনীতিশাস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করা যাবে না। আর এ অর্থেই তিনি মার্ক্সীয় অর্থনীতিশাস্ত্রকে মূলধারার অর্থনীতিশাস্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন।


আমি আগেই বলেছি যে, এই গ্রন্থের দশম অধ্যায়ে সমাজ সমগ্রকের বিস্তৃত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তিনি করেছেন, তা সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আনা সম্ভব না। সে কারণে আমি উপসংহারে আসি। তিনি উপসংহারে কতগুলো কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ত পরিবর্তনশীল—সত্য কথা। তিনি বলেছেন, ইতিহাস হামাগুড়ি দেয় না, লাফিয়ে চলে। তিনি বিশ্ব ধ্বংসের চারটি উপাদানের কথাও বলেছেন।

আমার দৃষ্টিতে, ড. আবুল বারকাতের গবেষণাগ্রন্থটির যেসব বিষয় চিন্তা উদ্রেককারী বা চিন্তার খোরাক জোগায়, তা হলো—সমাজব্যবস্থার ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের যে চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন, আমার কাছে সেটাকে মনে হয়েছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পুঁজিবাদের নির্বিশেষ স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। অর্থাৎ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যত ধরনের আবেদন আছে, সেসবের তিনি পুঙ্খনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সংকটগ্রস্ত এ সমাজকে সামনে এগিয়ে নিতে পারবে না। তিনি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার একটা নির্মোহ বিশ্লেষণ করেছেন, বিশেষ করে কৃষি এবং শিল্পের বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন গবেষণালব্ধ জ্ঞান দিয়ে, যা আমাদের সবাইকে সাহায্য করবে। এবং সবশেষে তিনি পুঁজিবাদের বিকল্প অন্বেষণ করে, নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন। এ চারটি দিক আমার মনে হয় এ গ্রন্থের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক, যা আমাদের মধ্যে চিন্তার উদ্রেক করে।

এখন আমি কয়েকটি গ্রন্থের রেফারেন্স উল্লেখ করব। অ্যাডাম স্মিথের ওয়েলথ অব নেশনস, কার্ল মার্ক্সের দ্যস ক্যাপিটাল, যোশেফ সুমপিটারের ক্যাপিটালিজম সোস্যালিজম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি, ফুকুয়ামার দি এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান, জিওভান্নি আরাহির দ্য লং টোয়েনটিয়েথ সেঞ্চুরি এবং টমাস পিকেটির দ্য ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েনটি ফার্স্ট সেঞ্চুরি। আমি এগুলোর নাম এজন্য উল্লেখ করেছি যে এর প্রতিটি গ্রন্থই একেকটি বিশেষ বিশেষ পর্যায়ে রচিত। এর মধ্যে একটি কথা গবেষক অধ্যাপক আবুল বারকাত, যেটি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর বিখ্যাত বলি আর কুখ্যাত বলি ফুকুয়ামার লেখা দি এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান গ্রন্থটির উল্লেখ এ গবেষণাগ্রন্থে করেছেন। কিন্তু একটা বিষয় শ্রোতাদের উদ্দেশে বলতে চাই—এই ফুকুয়ামা ২০১৮ সালে ‘রিসারজেন্স অব সোস্যালিজম ইন দি ইউএসএ’ প্রসঙ্গে নিউ স্টেটসম্যান-এ একটি বক্তব্য রেখেছেন, যেটি আমি উদ্ধৃত করছি:

“At this juncture, it seems to me that certain things Karl Marx said are turning to be true. He talked about the crisis of over production… That workers would be impoverished and there would be insufficient demand”

অর্থাৎ যে ব্যক্তি ২৬ বছর আগে বলেছেন, দি এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান, জানি না তার বোধোদয় কী— কিন্তু তিনি পুঁজিবাদের এই যে সংকট, তার জন্য আবার কার্ল মার্ক্সের দ্বারস্থ হয়েছেন। কথাটা বলা দরকার কারণ আমাদের দেশের এ প্রজন্মের অনেক তরুণ, যাঁরা ফুকুয়ামার অনেক তত্ত্বে প্রভাবিত হন। কিন্তু তার শেষ বক্তব্য পুুঁজিবাদের বিকল্প সে মার্ক্সই হোক বা অন্য যেকোনো মতবাদই হোক, তাদের যে আসতে হবে, সে বিষয়টি তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রশ্নোত্তর পর্ব

অধ্যাপক সুশান্ত কুমার দাস: শ্রোতাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমার একটি প্রশ্ন করতে চাই। এই শোভন সমাজ ধারণাটি নতুন কিনা? ১৯৯৮ সালের দিকে অধ্যাপক অভিসাই মার্গালিট দ্য ডিসেন্ট সোসাইটি শিরোনামে একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন। ফলে ডিসেন্ট সোসাইটির এ ধারণাটা আক্ষরিক অর্থে নতুন না। তবে অধ্যাপক মার্গালিট ডিসেন্ট সোসাইটিকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, আর অধ্যাপক আবুল বারকাত যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন—দুটির মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।

শোভন সমাজ বনাম সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র

অধ্যাপক বারকাত এ গ্রন্থে নিজেই বলেছেন যে, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যা এসেছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অ্যান্টিথিসিস বা বিকল্প হিসেবে। সমাজতান্ত্রিক যে ব্যবস্থার কথা এসেছে, সেখানে শোভন সমাজও এসেছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে। অনেক বিষয় আছে, যা লেখক নিজেও বলেছেন, এমনকি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার যেসব মডেল আছে, তার সঙ্গে তিনি দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সাম্যবাদী সমাজের যে ধারণা মার্ক্স দিয়েছেন, সেসবের সঙ্গে অনেক বিষয়ে তিনি একমত প্রকাশ করেছেন। তবে সেই সমাজ অর্জনের জন্য তাঁর নিজস্ব চিন্তার কথা বলেছেন, যা মার্ক্সের জীবদ্দশায় বা মার্ক্সীয় যাঁরা, তাঁরা অনেক জায়গায় তাঁদের মতো করে বলেছেন।

শোভন সমাজব্যবস্থাও ইউটোপিয়া

গ্রন্থকার বলেছেন, ধারণার দিক দিয়ে এটি ইউটোপিয়া। কারণ যদি বাস্তবে অর্জন করা না যায়, তাহলে ইউটোপিয়া। তবে বহু ইউটোপিয়ার মাধ্যমে পরে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জন্ম হয়েছে।

শোভন সমাজব্যবস্থা ও সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে শ্রমিক শ্রেণী যদি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বা পুঁজিবাদের বিকল্প হিসেবে যদি শ্রমিক শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে, তাহলে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে। এ সম্পর্কে মার্ক্সের ধারণা, যা তিনি ‘গোথা কর্মসূচি’র সমালোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ডিক্টেটরশিপ অব প্রলেতারিয়েত’-এর কথা। অর্থাৎ সাম্যবাদে পৌঁছার আগ পর্যন্ত একটা রাষ্ট্র থাকবে, যে রাষ্ট্র পুঁজিবাদের যে শোষণ তার বিরুদ্ধে কাজ করবে। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষ বা যারা উৎপাদক শ্রেণী—তাদের পক্ষে কাজ করবে। এটাই হলো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটা ঐতিহাসিক পর্যায়কাল। মার্ক্স তাঁর দ্য ক্লাস স্ট্রাগলস ইন ফ্রান্স-এর মধ্যেও বলেছেন, ক্রিটিক অব দ্য গোথা প্রোগ্রাম-এর মধ্যেও বলেছেন।

এ গ্রন্থে অধ্যাপক বারকাত শোভন রাষ্ট্রের যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা বলেছেন, তা অর্জনের দিক দিয়ে মার্ক্সীয় কাঠামোয় যেসব মডেল আছে, তার সঙ্গে হয়তো পার্থক্য আছে। কিন্তু ধারণার দিক দিয়ে সমাজতান্ত্রিক ধারণা থেকে একেবারে বিপরীত—সেটি আমার মনে হয়নি। অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক ধারণা-কাঠামোর মধ্যেই তিনি অবস্থান করে পুঁজিবাদের বিকল্পের সন্ধান দিয়েছেন।

পুঁজিবাদ থেকে উত্তরণ ও শোভন সমাজ ধারণা

এ গ্রন্থে অধ্যাপক নোয়াম চমস্কির কথা এসেছে, যাঁর একটি নিজস্ব চিন্তা আছে। তাঁর মতবাদকে বলা হয় ‘অ্যানার্কো সিন্ডিক্যালিজম’ সেখানে তিনি রাষ্ট্রকে উপেক্ষা করেছেন। মার্ক্সীয় চিন্তার সঙ্গে তাঁর পার্থক্য থাকতে পারে।

পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে উত্তরণের বহু পথ আছে। তার মধ্যে মার্ক্সীয় পরিকাঠামোটি একটি প্রধান ধারা। এছাড়া অন্য ধারণা নেই, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই এবং পৃথিবীতে তার ব্যবহারিক প্রয়োগেরও অনেক জায়গা আছে। ফলে এখন সময় এসেছে; আমাদের এসব বিষয় নিয়ে খুব গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার। মার্ক্সবাদের একটা বৈশিষ্ট্য হলো, সুনির্দিষ্ট বাস্তবে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়া। ফলে শোভন সমাজের যে ধারণার কথা বলা হচ্ছে, সেই ধারণা পুঁজিবাদের একটা বিকল্প হিসেবে আসতেই পারে। তবে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য বিষয়গুলো এখানে থাকতে হবে।

সমাজতান্ত্রিক মডেল ও স্টেট ক্যাপিটালিজম

ড. বারকাত তাঁর গ্রন্থে অনেক মডেলের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন যেমন সোভিয়েত মডেল, পূর্ব ইউরোপীয় মডেল, লাতিন আমেরিকান মডেল প্রভৃতি। কোনো কোনো জায়গায় এসব মডেলের শর্টকামিং সত্ত্বেও এদের সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু সোভিয়েত রাষ্ট্রকে তিনি বলেছেন স্টেট ক্যাপিটালিজম। তিনি বলেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের ৭০ বছরের ইতিহাসে এই স্টেট ক্যাপিটালিজম এক  রকম ছিল না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই স্টেট ক্যাপিটালিজম বলাটা সঠিক বলে মনে করি না। সোস্যালিজম থাকবে আবার স্টেট থাকবে, সে ব্যাপারে অনেকের দ্বিমত আছে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—সাম্যবাদে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত একটা দীর্ঘ ঐতিহাসিক কাল ধরে একটি রাষ্ট্র থাকবে, যেটা জনগণের রাষ্ট্র হবে, উৎপাদক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করবে। নিশ্চয়ই শোষক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করবে না। ফলে সমাজতন্ত্রের এ বিষয়টি, সে শোভন রাষ্ট্র বা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রই হোক—একটা ঐতিহাসিক কালজুড়ে তাকে শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে ডিক্টেটরশিপ প্রয়োগ করতেই হবে।

শোভন রাষ্ট্রে রূপান্তর

গ্রন্থে ড. বারকাত বলেছেন, রাষ্ট্রে রূপান্তর প্রয়োজন। অর্থাৎ রাষ্ট্র শুধু ক্ষমতা দখল করলেই হবে না। শোভন রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রয়োজন হবে এবং জনগণের জন্য অধিকতর গণতন্ত্রে রূপান্তর না হলে সেই রাষ্ট্র আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। ইতিহাসে সে অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে।

অর্থনীতির শ্রেণী বিভাজন প্রসঙ্গে

আমি মনে করি, অর্থনীতিশাস্ত্রের দুটি ভাগ হওয়া উচিত। একটি পুঁজিবাদ রক্ষাকারী অর্থনীতিশাস্ত্র। অন্যটি পুঁজিবাদের বিকল্প অর্থনীতিশাস্ত্র এবং এর পরিকাঠামো কী হতে পারে, সেই অর্থনীতিশাস্ত্র। সেখানে মার্ক্সীয় অর্থনীতিশাস্ত্র থেকে শুরু করে ড. বারকাত যে শোভন অর্থনীতিশাস্ত্র প্রস্তাব করেছেন, কভিড অর্থনীতিশাস্ত্রের কথা বলেছেন—সেসবও থাকবে। এদের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সার্বিকভাবে এরা পুঁজিবাদের বিকল্প।

শোভন সমাজ ও মার্ক্সবাদের মধ্যে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য

মার্ক্সবাদের একটি নির্দিষ্ট পরিকাঠামো আছে। মার্ক্সবাদ মতবাদটাই হলো এমন যে, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি, দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি—এটাই মার্ক্সবাদের মূল কথা।

অধ্যাপক বারকাত তাঁর শোভন মতবাদকেও স্ট্যাটিক বলেননি, ডায়নামিক বলেছেন। অর্থাৎ পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিবর্তিত হবে, আরো পরিশীলিত হবে। মার্ক্সবাদের সঙ্গে এখানে সাযুজ্য রয়েছে। আমি অধ্যাপক বারকাতকে মার্ক্সবাদে বিশ্বাসীদের অনেক বড় বন্ধু বলে মনে করি। তাঁর নিজস্ব কোনো চিন্তা-ধারণা থাকতেই পারে, বৈপরীত্য থাকতে পারে, দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও থাকতে পারে। কিন্তু তাঁর চিন্তাকে আমি গ্রহণ করব এই জায়গা থেকে যে তিনি পুঁজিবাদের বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বিকল্প হিসেবে একটি ‘শোভন সমাজ ও শোভন জীবনব্যবস্থা’র ধারণা প্রস্তাব করেছেন।

বিপ্লব অর্থই নতুন একটি রাষ্ট্রকাঠামো। আমরা যে প্রস্তাবই করি না কেন, শোভন সমাজের যে প্রস্তাব ড. বারকাত করেছেন, তা এখন যে ডোমিনেটিং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো আমাদের দেশে বা বিশ্বে চলছে, সেখানে কোনোভাবেই অর্জন সম্ভব নয়। এ অবস্থায় শোভন কোনো কিছু অর্জিত হবে—এটা মনে করার কোনো কারণই নেই। শোভন বা সাম্যবাদী যে ধারণাই হোক, তা শোষক নিয়ন্ত্রিত এ কাঠামোয় অর্জন সম্ভব নয়।

শোভন রাষ্ট্র অর্জন

শোভন রাষ্ট্র অর্জন করতে হলে রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হবে। নতুন একটি রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য একটি রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। অধ্যাপক বারকাত এ গ্রন্থের কোনো জায়গায় এমন কোনো রাজনৈতিক দলের কথা উল্লেখ করেননি। সেই দল কার স্বার্থ রক্ষা করবে? আমি চাইব, তিনি সেই রাজনৈতিক দলের কথা বলবেন, যে দলটি এ রাজনীতি করবে, যারা পরবর্তী সময়ে শোভন রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করবে।

দাম বাড়া ‘গরিবের শত্রু’ আর দাম কমা ‘গরিবের মহাশত্রু’

আমি মনে করি, অধ্যাপক বারকাত দাম বাড়া আর দাম কমা নিয়ে যা বলেছেন, তা অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বলেছেন। আমি তাঁকে এ বিষয়ে পুরোপুরি সমর্থন করি। এ সংকটের সময় দরিদ্র মানুষের পক্ষে এই দাম বাড়া-কমার সঙ্গে কোনোভাবেই ব্যালান্স করা সম্ভব না। এর জন্য নতুন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজন।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ও নিও লিবারেল পলিসি

গ্রন্থটিতে উল্লেখ করা বিষয়টি সত্যি। আমাদের দেশে যারা ক্রনি ক্যাপিটালিজম করেন, তাদের ষড়যন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী না, একটি মতাদর্শকে হত্যা করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধেও লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। শুধু কয়েকজনের বিচার করলেই হবে না। যারা বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তাদেরও বিচার করতে হবে। এদের বিরুদ্ধে লড়াই তা শোভন বলি কিংবা সাম্যবাদী বা অন্য যেকোনো মতাদর্শই বলি, তারই অংশ।

পরিশেষে বলব, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিপক্ষে নতুন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লড়াইয়ে অধ্যাপক বারকাতকে আমি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা বলে মনে করি।

যাঁরা পুঁজিবাদকে শেষ কথা মনে করেন, অসাধারণ এই গ্রন্থ তাঁদের ভালো লাগবে না। অনেক ক্ষেত্রে এ গ্রন্থ তাঁদের রাতের ঘুম কেড়ে নেবে। এ গ্রন্থ সার্বিকভাবে সব ধরনের পুঁজিবাদের মুখোশ উন্মোচন করেছে এবং তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

যারা পুঁজিবাদের বিকল্প ভাবেন, তাদের এ বইয়ের বিষয়বস্তু এবং বক্তব্যকে অনুধাবন করতে হবে গভীরভাবে—নিজেদের প্রয়োজনে, তাতে একমত বা দ্বিমত যা-ই হোন না কেন।

সাধারণভাবে যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন—অধ্যাপক আবুল বারকাতের গ্রন্থটি সমাজতন্ত্রের পক্ষে না বিপক্ষে? উত্তর হবে—

১) পুঁজিবাদের পক্ষের লোকেরা, যাঁরা সমাজতন্ত্রের ঘোর বিরোধী, তাঁরা বলবেন—‘সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে’, কারণ তিনি ‘শোভন সমাজ’-এর কথা বলেছেন, সমাজতন্ত্রের নয়। কিন্তু তিনি যে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বলেছেন—এটা বলবেন না।

২) সমাজতন্ত্রের পক্ষে যাঁরা, তাঁরা বলবেন ‘তিনি সমাজতন্ত্রের পক্ষে বলেননি’। তার মানে, তিনি সমাজতন্ত্রের পক্ষে নন। কিন্তু তিনি যে পুঁজিবাদের বিকল্পের কথা বলেছেন, তা আমলেই নেবেন না হয়তো। দুরাত্মার ছলের অভাব নেই—সতর্কতা এখানেই। কোনো গ্রন্থের ‘মলাট’ দেখে গ্রন্থটির বিচার করা ঠিক নয়—ভেতরে কী আছে সেটাই দেখতে হবে। ধন্যবাদ।