২৯ নভেম্বর ২০২০ ইকো কোঅপারেশনের সহযোগিতায় নিজেরা করি ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে ভূমি আইন ব্যবহারের সমস্যা’ শীর্ষক একটি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে এ ক্রোড়পত্র
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
সম্পাদক
বণিক বার্তা
আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং এর সংকটের ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গ্রাম পর্যায় থেকে শহর-রাজধানী সবখানে স্বার্থগোষ্ঠীর সংঘাত ও বঞ্চনার পেছনে বড় মাত্রায় জুড়ে আছে ভূমি। কিছুদিন আগে আয়োজিত এক ওয়েবিনারে উঠে এসেছে, যারা কৃষিকাজ করছেন তাদের ৪০ শতাংশেরই কোনো ভূমি নেই। কৃষিকাজই তাদের জীবন ও জীবিকা, অথচ কোনো রকম ভূমি মালিকানায় তারা নেই। খাসজমির ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা রয়ে গেছে। বিতরণ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে দখলি স্বত্ব নিশ্চিতের ক্ষেত্রে আছে নানা বিবাদ-বিসংবাদ। শেষ পর্যন্ত প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলো খাসজমি পেলেও তারা দখলি-স্বত্ব ধরে রাখতে পারে না। সার্বিকভাবে ভূমি প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও অনেক ধরনের বিতর্ক রয়েছে। আবার শহরাঞ্চলেও আমাদের কৃষি-অকৃষি জমি কমে যাচ্ছে। বড় বড় উন্নয়নকাজ করতে গিয়েও অনেকে ভূমিহীন হচ্ছে। আমরা জেনেছি যে ল্যান্ড অ্যাক্ট, ২০২০ নামে একটি আইন হচ্ছে। এরই মধ্যে এর খসড়া প্রণীত হয়েছে। এর ওপর মতামত চাওয়া হচ্ছে। আশা করব যে বাংলাদেশে ভূমি আইন ব্যবহারের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে নতুন আইনের যে উপস্থাপন সরকারি দিক থেকে করা হচ্ছে, সে বিষয়েও আমরা কিছু জানতে পারব।
ড. আবুল বারকাত
প্রধান উপদেষ্টা
এইচডিআরসি
সভাপতি
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি
‘নিজেরা করি’-এর উদ্যোগে আমরা একটি গবেষণা পরিচালনা করছি। গবেষণা কার্যক্রম এখনো চলমান, অপেক্ষমাণ চূড়ান্ত বিশ্লেষণ। গবেষণার প্রাথমিক, কিন্তু গুরুত্ব বিচারে জরুরি কিছু ফলাফল নিয়ে আমার আজকের উপস্থাপনা। প্রথমে আসি উদ্দেশ্য বিষয়ে। আমাদের গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের খাসজমি ও জলা অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল এবং ভূমি ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত আইন ও নীতিমালাগুলোর বাস্তবায়ন অবস্থা বিশ্লেষণ করা এবং দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষ ও নারীর ন্যায়সংগত ভূমি অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে সুপারিশ উত্থাপন।
প্রথমে আসা যাক কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৭ বিষয়ে। নীতিমালায় কী আছে, বাস্তব প্রয়োগ কেমন, সেটি পর্যালোচনা করেছি। আলোচ্য নীতিমালার তিন থেকে পাঁচ অনুচ্ছেদে প্রথমেই আছে কমিটি। জাতীয় কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটি। এর পরের ধাপে আছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত কমিটি। প্রথম কথা হলো, এসব কমিটির নিয়মিত কোনো সভা হয় না। দ্বিতীয় কথা হলো, এসব কমিটিতে কোথাও নারীর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। থাকলেও জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয় কিংবা দলীয়। বড় কথা, যেসব নারী প্রতিনিধিত্ব করছেন, আমাদের গবেষণায় দেখা, তাদের বড় একটি অংশের স্বামী রেন্ট সিকার বা জমি দখল করা লোক। তাদের দেয়া হয়েছে কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব। অথচ নীতিমালা সম্পর্কে যারা ভালো জানেন, তাদের কোনো বৈঠকে ডাকা হয় না। এ নীতিমালার আরেকটি ধারায় কৃষি খাসজমি চিহ্নিতকরণ ও উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ঠিকমতো চিহ্নিত করা হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রেই বেদখল হওয়া জমি উদ্ধার করা হয় না। খাসজমি বরাদ্দ কর্মসূচি সম্পর্কে ব্যাপকভাবে প্রচারের কথা নীতিমালায় বলা আছে। এর ন্যূনতম প্রচারও নেই। এ নীতিমালার ৫ (খ)-এর ৭ ধারায় উপজেলা কমিটিকে খাসজমি নথিভুক্ত এবং বন্দোবস্ত করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। নীতিমালায় পাঁচটি ধাপ অনুসরণ করে ভূমিহীন বাছাই প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। সরেজমিনে তদন্ত করে প্রকৃত ভূমিহীনদের পরিচয় যাচাই, ইউপি চেয়ারম্যান-সদস্য কর্তৃক সত্যায়িত ছবি—এগুলো কোনো কিছু করা হয় না। কোনো ধাপই মানা হয় না। নীতিমালায় আছে বরাদ্দকৃত জমি উত্তরাধিকার সূত্র ব্যতীত হস্তান্তর করা যাবে না। এগুলো সমানেই বিক্রি হচ্ছে!
আলোচ্য নীতিমালায় কৃষি খাসজমির সংজ্ঞায়নে বড় সমস্যা আছে। এক্ষেত্রে পৌর এলাকার কৃষিজমি-খাসজমি স্বীকৃতি পায় না। উল্লিখিত এলাকার কৃষিজমিকে অকৃষি জমিতে রূপান্তর করা হয়। ১০ নং অনুচ্ছেদে ভূমিহীন পরিবারের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ভূমিহীন পরিবার কে, সেটি পরিষ্কার লেখা নেই এবং বিভিন্ন উপায়ে ভূমিহীন সাজা যায়। ভূমিহীন তালিকার অগ্রাধিকারের একটা তালিকা আছে। এক্ষেত্রে যারা অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা, তারা থাকে না। আরেকটি কথা আছে, দুস্থ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। তারা অগ্রাধিকার তালিকায় আছে। দুস্থ মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া যায় না। দুস্থ হলেও তারা আসল মুক্তিযোদ্ধা নয়। ফলে ‘দুস্থ’ নয় এমন পরিবার বরাদ্দ পেয়ে যাচ্ছে। ১১ অনুচ্ছেদে (গ) লেখা আছে, সক্ষম পুত্রসহ বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা নারী। এটি সম্পূর্ণই মন্দ নীতি। বলা চলে, এটি বেআইনি আইন। নারীর সমানাধিকারের পরিপন্থী এবং সংবিধানবিরুদ্ধ আইন। তৃতীয় লিঙ্গের কোনো মানুষ খাসজমি পায় না। ১৩ নং অনুচ্ছেদে আছে, বন্দোবস্তযোগ্য কৃষি খাসজমি চিহ্নিত করে এর প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করতে হবে। ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কোনো দিন মৌজা অনুযায়ী খাসজমির তথ্য হালনাগাদ করা হয় না। এ আইনে আরেকটি অনুচ্ছেদে আছে, যোগ্য প্রার্থীরা কোনোভাবে অবহেলিত হতে পারেন না। অথচ আইনটি নিজেই অবহেলিত করার।
ভূমিহীনদের কাছ থেকে আবেদনপত্র গ্রহণের কথা বলা হয়েছে এ নীতিমালায়। আবেদনপত্রের সঙ্গে যা যা চাওয়া হয়, এসব সরবরাহ করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। আবার ফরম এত জটিল যে সবাই পূরণ করতে পারেন না। উপজেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অফিসে কৃষি খাসজমি বণ্টনের নোটিস টানানোর কথা। কোথাও টানানো হয় না। জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটির কার্যক্রম নিয়মিতভাবে হওয়ার কথা। এ কার্যক্রম একেবারে স্থবির।
আলোচ্য নীতিমালার ক্ষেত্রে আমরা কয়েকটি বিষয় সুপারিশ করছি। এক. ‘বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা নারীর পরিবারকে খাসজমি পেতে হলে সেই নারীর সক্ষম পুত্র থাকতে হবে।’ (অনুচ্ছেদ ১১-গ)—এই অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করতে হবে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ খাসজমি পায়, এটি সুনিশ্চিত করতে হবে। দুই. সব পর্যায়ের কমিটির কার্যক্রম ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে তদারকি প্রয়োজন। প্রয়োজন নারী, কৃষক এবং ভূমি অধিকার কর্মীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত কমিটি গঠন এবং তার কার্যপরিধি নির্ধারণ করা দরকার। তিন. ভূমিহীন পরিবারের অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রান্তিক কৃষক, আদিবাসীসহ অন্যান্য ক্ষমতাহীন গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করতে হবে। কৃষি খাসজমি বিতরণের বিষয়টি যথাযথ প্রচারের মাধ্যমে যেন প্রকৃত দাবিদারের কাছে পৌঁছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা এবং সামাজিক চাপ প্রয়োগ ও নজরদারি করতে হবে। চার. খাসজমির হালনাগাদ তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। সংসদে তা উপস্থাপন করতে হবে এবং তথ্যপ্রাপ্তি সহজতর করতে হবে। পাঁচ. পৌর এলাকায় কৃষি খাসজমির স্বীকৃতি এবং তা চিহ্নিত করতে হবে। এসব এলাকায় কৃষিজমির শ্রেণী পরিবর্তন করে অকৃষি করা হচ্ছে। এটা করা যাবে না। যদি করতে হয়, সীমিত আকারে নগর দরিদ্রের আবাসনের জন্য করা যেতে পারে। ছয়. আবেদনের প্রক্রিয়াটি সবার জন্য সহজ করা দরকার, অযথা কালক্ষেপণ যেন না হয়, সেজন্য চাই নজরদারি। সাত. বেদখল জমি উদ্ধার করতে হবে এবং ভূমিহীনদের উদ্ধার করে দখল বুঝিয়ে দেয়া নিশ্চিত করতে হবে।
এবার আসা যাক অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫-এর বাস্তবায়ন সমস্যা বিষয়ে। এখানে দুই নম্বর অনুচ্ছেদে পৌর ও উপজেলা সদর এলাকার জন্য কৃষিযোগ্য খাসজমিও অকৃষি খাসজমি হিসেবে বিবেচিত হবে বলা হয়েছে। জমি দিন দিন যেভাবে অকৃষি জমিতে রূপান্তর হচ্ছে, তাতে এ অনুচ্ছেদ থাকলে সেটি আরো আইনগত বৈধতা পাবে। নগর এলাকা ক্রমাগত বিস্তৃত হয়ে গ্রামে প্রবেশ করছে। এ অবস্থায় কৃষিজমিকে অকৃষি জমি বললে ভূমিহীন কৃষকের জমির ওপর কোনো অধিকার থাকবে না। এটা করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, এখানে প্রচলিত নিয়মে নির্ধারিত মূল্যকে বাজারদর হিসেবে গণ্য করার কথা। বাজারমূল্য নির্ধারণ করার জন্য কোনো কমিটি না থাকায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মূল্য নির্ধারণ সঠিক হয় না; বঞ্চিত হয় দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ। এখানে আইনের তিন নম্বর ধারায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দেয়া হবে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো সুস্পষ্ট গাইডলাইন নেই। একই ধারার (গ-এ) ধারায় আছে, জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত ব্যক্তিদের জমি বন্দোবস্ত দেয়া যেতে পারে। এটি সাংবিধানিক সমঅধিকার নীতিবিরুদ্ধ, এটি মানবাধিকারবিরোধী আইন এবং এতে অযোগ্য ব্যক্তিরা অকৃষি খাসজমি প্রাপ্তির সুযোগ পায়। আরেকটি ধারায় পাহাড় ও পাহাড়ের ঢালু জমি বন্দোবস্ত প্রদানের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক অবস্থার কোনো রূপান্তর না করার শর্ত রয়েছে। এটি মানা হয় না;
এ আইনের ক্ষেত্রে আমাদের সুপারিশ তুলে ধরছি। এক. বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার তালিকা প্রণয়ন। দুই. পৌর এলাকা ও থানা সদর এলাকাভুক্ত কৃষি খাসজমিকে অকৃষি খাসজমি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তিন. কমিটি গঠন এবং তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে জমির বাজারদর নির্ধারণের বিষয়টি স্বচ্ছ করা প্রয়োজন। চার. সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অকৃষি খাসজমি বরাদ্দের বিষয়টির ন্যায্য সুরাহায় সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। পাঁচ. পাহাড়ি জমিতে, বিশেষ করে যার সঙ্গে জীববৈচিত্র্য ও সংশ্লিষ্ট বনজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত, বন্দোবস্ত দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে হবে। প্রাকৃতিক অবস্থার রূপান্তর যেন সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য চাই সামাজিক চাপ প্রয়োগ এবং নজরদারি। ছয়. দীর্ঘ আড়াই দশকের পুরনো নীতিমালা, যার অনেক কিছুই পরিবর্তন করা জরুরি (যেমন থানার স্থলে উপজেলা, উপজেলার সংখ্যা, মেট্রোপলিটন সিটির সংখ্যা প্রভৃতি।
এবার আসা যাক সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি, ২০০৯ সম্পর্কিত বাস্তবায়ন ও নীতিগত সমস্যা বিষয়ে। এখানে প্রথম কথা হলো, ২ নং অনুচ্ছেদে মত্স্যজীবীর সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রকৃত মত্স্যজীবী তারাই, যারা প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ শিকার ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। অথচ নকল মত্স্যজীবী জায়গা দখল করেছে। সমিতিতে যারা আছেন, তাদের একাংশ প্রকৃত মত্স্যজীবী নয়। বলা আছে, কোনো মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তরিত জলমহাল যেন প্রকৃত মত্স্যজীবী সমিতির ব্যবস্থাপনায় যায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ওই মন্ত্রণালয়েরই। এ দায়িত্ব কদাচিৎ পালন করা হয়। একইভাবে বলা আছে, প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী মত্স্যজীবীদের দারিদ্র্য বিমোচন, আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং মত্স্য সম্পদ বৃদ্ধিতে সুফল দিতে না পারলে সংশ্লিষ্ট সমিতির ইজারা বাতিলের বিধান রয়েছে। অথচ সমিতির ইজারা বাতিলের উদাহরণ খুব একটা নেই। উপ-অনুচ্ছেদ ৪(খ)-এ লেখা আছে, বিগত তিন বছরের ইজারা মূল্যের গড়ের ওপর ৫ শতাংশ বর্ধিত হারে ইজারামূল্য নির্ধারিত হবে। প্রকৃত মত্স্যজীবীদের এ অর্থ পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে তারা স্থানীয় প্রভাবশালীদের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়। উপ-অনুচ্ছেদ (৭)-এ বলা আছে, সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার মাননীয় সংসদ সদস্যরা জেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির উপদেষ্টা থাকবেন। সংসদ সদস্যের অযাচিত হস্তক্ষেপ প্রকৃত মত্স্যজীবীদের অধিকার হরণ করে। উপ-অনুচ্ছেদ (৯)-এ বলা আছে, কোনো মত্স্যজীবী সমিতিকে একটির অধিক জলমহাল বন্দোবস্ত দেয়া যাবে না। রেন্ট সিকাররা একাধিক সমিতির ব্যানারে একাধিক জলমহালের বন্দোবস্ত নিয়ে নেয়। বলা আছে, সাব-লিজ দেয়া যাবে না; যদি দেয়া হয়, ইজারা বাতিল হবে। অথচ বিশেষত হাওড়াঞ্চলে ‘ছদ্মবেশী’ সাব-লিজের চর্চা হচ্ছে। ইজারা বাতিলের উদাহরণ নেই বললেই চলে।
এ নীতির ক্ষেত্রে আমাদের সুপারিশগুলো তুলে ধরছি। এক. ‘জাল যার, জলা তার’—এ মৌলিক নীতির পরিপন্থী সব চর্চা রোধ করতে হবে, প্রকৃত মত্স্যজীবী সমিতি নয় এমন সমিতির তালিকা করে তাদের নিবন্ধন অতিসত্বর বাতিলের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন; সাব-লিজ বাতিলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা চাই; প্রয়োজন সংগঠিত সামাজিক তদারকি ও প্রতিরোধ। দুই. প্রকৃত মত্স্যজীবী সমিতি যেন জলমহাল ব্যবস্থাপনার পূর্ণ অধিকার পায়, সে লক্ষ্যে বাস্তবনানুগ প্রচার এবং ন্যায্য ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তিন. প্রাকৃতিক পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিয়মিত তদারকিতে রাখতে হবে। চার. জাতীয় জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সক্রিয় এবং সংবেদনশীল ভূমিকা দেখতে চাই, যা প্রকৃত মত্স্যজীবীর অধিকার নিশ্চিতে নীতি সহায়তা দেবে। তদুপরি, এমন কোনো নীতি যেন না হয়, যা দরিদ্র-প্রান্তিক জলাজীবীর জীবিকার জন্য গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়।
এবার আসা যাক স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭ বিষয়ে। এ আইনে সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা রয়েছে। এ আইনে ব্যবহূত ১৩টি বিষয়ের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আইনে ব্যবহূত আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ বা শব্দগুচ্ছ যেমন ‘জনউদ্দেশ্য’ বা ‘জনস্বার্থ’ ‘ক্ষতিপূরণ’, ‘পুনঃবন্দোবস্তকরণ’ ‘পুনর্বাসন’, ‘দুর্বল ব্যক্তি’, ‘আর্থসামাজিক ব্যয়’, ‘পরিবেশগত ব্যয়’ এবং ‘সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব’—এগুলোর সংজ্ঞা নেই। আইনে লেখা আছে, সম্পত্তি অধিগ্রহণের জন্য প্রাথমিক নোটিস জারি করতে হবে; স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নোটিস প্রদান করতে হবে। অথচ জেলা প্রশাসক কর্তৃক সঠিকভাবে (স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কার্যকর আলোচনা করে) নোটিস জারি করা হয় না; সংবাদপত্র অথবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নোটিস প্রকাশ করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা (বিশেষত আদিবাসীসহ অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী) কোনো নোটিস পায় না।
এক্ষেত্রে আমাদের সুপারিশগুলো তুলে ধরছি। এক. আইনে ব্যবহূত বেশকিছু শব্দ ও শব্দগুচ্ছের সংজ্ঞা নেই, এগুলোর সহজবোধ্য ও দ্ব্যর্থহীন সংজ্ঞায়ন জরুরি। দুই. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নোটিস প্রদানের ক্ষেত্রে নানা অসংগতি থাকে; ন্যায্য ও সুনির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করে যেন কাজটি করা হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তিন. ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রক্রিয়াটির সংস্কার প্রয়োজন; আর্থিক ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি অ-আর্থিক ক্ষতিপূরণ অনেক সময় বেশি জরুরি, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের জন্য। এ-সংক্রান্ত অ-আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিধিবিধান থাকা প্রয়োজন।
এবার আসা যাক জাতীয় ভূমি ব্যবহার আইন, ২০০১ বিষয়ে। প্রথম কথা হলো, এ আইন অনুযায়ী ডিজিটাল জোনিং ম্যাপ তৈরির কথা, একই সঙ্গে জোনিং আইন প্রণয়নের কথা। জোনিং আইনের ক্ষেত্রে আগের মামলাসংক্রান্ত রেফারেন্স পর্যাপ্ত নয় এবং বিস্তারিত কোনো মানদণ্ডও প্রদান করা হয়নি। ফলে পুরো দেশের জন্য এখনো ডিজিটাল জোনিং তৈরি করা যায়নি। জরুরি প্রয়োজনের ক্ষেত্রে নেই কোনো দিকনির্দেশনা। এটি মানুষের অধিকার নিশ্চিতে সহায়ক নয়। এখানে সুউচ্চ ভবন নির্মাণের মাধ্যমে অকৃষি খাতের ভূমি ব্যবহার, অব্যবহূত অধিগ্রহণযোগ্য ভূমির জন্য পদক্ষেপ নেয়া এবং দুই বা তার বেশি ফসল হওয়া উর্বর জমিতে বেসরকারি ভবন নির্মাণ, আবাসন, ইটের ভাটা নির্মাণের মতো অকৃষি উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করার কথা লেখা আছে। এই ধারার লঙ্ঘন হয় হরহামেশা। এর সঙ্গে রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার ভীষণ অভাব। এখানে কৃষিজমি সংকুচিত হওয়ার কারণে গৃহায়ণ সম্পর্কিত নিয়ম-কানুন কঠোরভাবে প্রতিপালন এবং গ্রামীণ জনপদগুলোয় বাসস্থানের অতিরিক্ত জমি ব্যবহার করা যাবে না, সর্বনিম্ন পর্যায়ে এটি রাখতে হবে। এটি মানা হয় না। বাস্তবে এ-সংক্রান্ত পদক্ষেপে রয়েছে সরকারের জবাবদিহিতার অভাব।
এক্ষেত্রে আমাদের সুপারিশগুলো তুলে ধরছি। এক. বিস্তারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে ডিজিটাল জোনিং ম্যাপ করা প্রয়োজন, যেখানে সবার প্রবেশাধিকার থাকবে। দুই. নিয়মনীতিকে উপেক্ষা করে অকৃষি খাতে কৃষিজমির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এটি বন্ধে দরকার শক্ত নজরদারি। তিন. সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়নের মাধ্যমে চর এলাকায় দিয়ারা জরিপ পরিচালিত হওয়া জরুরি। চার. জরুরি ভিত্তিতে উপকূলীয় অঞ্চল চিহ্নিত করার কাজটি বেগবান করতে হবে। পাঁচ. অধিগৃহীত জমির অব্যবহূত, বেদখলকৃত, অপব্যবহূত অংশ পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। ছয়. পরিবেশ সুরক্ষাকে বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
কয়েকটি কথা বলে শেষ করছি। এক. আদর্শ অবস্থান থেকে আইন ও নীতিগুলোর প্রকৃত অবস্থানের দূরত্ব অনেক। প্রকৃত আইন থেকে তার বাস্তবায়নের দূরত্বও অনেক। ‘আইনে’ সবচেয়ে বেশি দূরত্ব সৃষ্টিকারী ক্ষেত্রগুলো হলো প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিতে অসামর্থ্য এবং সুস্পষ্ট সংজ্ঞা-গাইডলাইনের অভাব। সবচেয়ে বেশি সমস্যার ক্ষেত্রগুলো হলো রেন্ট-সিকার গোষ্ঠীর আগ্রাসন, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ণ এবং সমন্বয়হীনতা। তুলনামূলক বিচারে আইন-নীতিতে সমস্যা এবং বাস্তবায়ন সমস্যা—এই দুই বিচারে সবচেয়ে সমস্যাগ্রস্ত হলো জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি, ২০০১। সমস্যাগ্রস্ততার বিচারে দ্বিতীয় আইনটি হলো স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন ২০১৭। তিন. বাংলাদেশের ভূমি আইন সংশ্লিষ্ট আইনি সংস্কার (পরিবর্তন-পরিবর্ধন-পরিমার্জন) সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ‘বাংলাদেশের সংবিধানের মৌল বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে’ বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। আইনে অনেক মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। চার. আইনের সংস্কার যতই হোক না কেন, দরিদ্র-প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ নারীর অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং শোভন রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পাঁচ. রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং গণমানুষের সম্পৃক্ততা আইন বাস্তবায়নে জরুরি।
ড. মিজানুর রহমান
অধ্যাপক, আইন বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও
সাবেক চেয়ারম্যান, মানবাধিকার কমিশন
বিখ্যাত ফরাসি অভিনেতা জেরার্ড ডেপার্ডডিউ অভিনীত একটি সিনেমার সংলাপ ছিল এমন যে সবচেয়ে চমত্কার মালিকানা হলো ভূমির, কারণ তুমি তার ওপরে হাঁটতে পারো। ভূমির ওপর দিয়ে আমরা হাঁটতে পারি বা হেঁটে বেড়াই, এটা অনেক বড় অধিকার ও সুযোগ। হেঁটে বেড়ানো শব্দটিকে আমরা যদি আক্ষরিক অর্থে বিচার করি, তাহলে খুব সীমিত করা হবে। যদি ভূমির ওপর অধিকার না থাকে, তাহলে অন্য কোনো অধিকারের কোনো মূল্য থাকে না। আমাদের সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদে কী কী ধরনের মালিকানা থাকবে, তা খুব স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। তিন ধরনের যে মালিকানার কথা বলা হয়েছে, তার প্রথমটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানা। তারপর বলা হয়েছে সমবায়ভিত্তিক মালিকানা। তৃতীয়তে রয়েছে ব্যক্তিমালিকানা। সংবিধানে যে ক্রমটা অনুসরণ করা হয়েছে, বর্তমানে তা উল্টোভাবে চলছে। ব্যক্তিমালিকানায় সবকিছু চলে গেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় যতটুকু ছিল, সেটাও সংকুচিত হতে হতে আর জায়গা আছে কিনা, তা এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফরাসি দার্শনিক বলেছিলেন, যেকোনো সম্পদই হচ্ছে চুরির ফসল। ভূমির মালিকানা সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ এবং এই চুরির বড়াই আমরা করে বেড়াই। যে যত বেশি চোর, তাকে তত বেশি মর্যাদার আসনে আসীন করতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে সব ভূমির মালিকানা হওয়া উচিত ছিল রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের অর্থই হচ্ছে জনগণের। প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। সেক্ষেত্রে ভূমির মালিকানা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা ঠিক করতে হবে জনগণ কর্তৃক ও জনগণের স্বার্থে। প্রফেসর আবুল বারকাত তথ্য দিলেন যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভূমিহীন কৃষক। অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষই ভূমিহীন। তাহলে ভূমি কার কাছে গেল? অর্থাৎ মালিকদের কাছ থেকে ভূমি চুরি করে অন্যরা আত্মসাৎ করেছে। যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তারা কি দেখবেন না যে কীভাবে জনগণের মালিকানা কেড়ে নেয়া হয়েছে! এবং যদি কেড়ে নেয়া হয়ে থাকে, তাহলে আইনগতভাবে এ মালিকানা তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়াটা কি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পবিত্র একটি দায়িত্ব নয়! ভূমির মালিকানা ব্যক্তিগত হতে পারে না, হওয়া উচিতও নয়, কেননা ভূমি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন হাত ধরে ধরে এগিয়ে চলে। বর্তমানে ভূমির ক্ষেত্রে যে ধরনের সমন্বয়হীনতা, বৈষম্যপূর্ণ আচরণ আমরা লক্ষ করলাম, প্রফেসর আবুল বারকাত যথার্থই বলেছেন, এর সবগুলোই কিন্তু আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যেহেতু সাংঘর্ষিক, তাই সংবিধান অনুসারে এর কোনো বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশে থাকতে পারে না।
ড. শফিকুজ্জামান
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ভূমি। আজ যার পাঁচ বিঘা জমি আছে, সে ধনী। আর শহরে যার এক বিঘা জমি আছে, সে কয়েক কোটি টাকার মালিক। তাই ভূমিদস্যু, ঋণখেলাপিসহ অনেকেরই জমির ওপর লোভ রয়েছে। জিডিপিতে কৃষির অবদান কমেছে, শিল্পের অবদান বেড়েছে। কৃষির অবদান কমে যাওয়ার অর্থ কিন্তু কৃষির গুরুত্ব কমে যাওয়া নয়। কৃষি থেকেই কিন্তু শিল্পায়ন হয়, কৃষিপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ে, শিল্পপণ্যের দাম তার চেয়ে অনেক বেশি হারে বৃদ্ধি পায়। কৃষি শুধু মানুষের জীবনমান, শিল্পায়ন ভিত্তি বা খাদ্যের জোগানই দেয় না, সব ধরনের অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত। সুইডেন, ডেনমার্কে কিন্তু প্রচুর কৃষিজমি। সেখানে ইচ্ছা করলেই নিজের জমিতে কেউ চাষ করতে পারে না। কৃষিপণ্য উৎপাদন ছাড়া নিজের জমিতে কিছু করতে গেলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। আমাদের দেশে আমরা তিনভাবে ভূমি হারাচ্ছি। এক. লোনা পানি ঢোকার ফলে। দুই. কলকারখানা ও বাড়িঘর তৈরিতে। তিন. ভূমিদস্যুদের জমি দখল করে নেয়ায়। ভূমি উন্নয়নের উৎস। সেটাকে আমরা বিভিন্নভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছি। ভূমিদস্যুদের বড় শক্তি তারা ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক। আমাদের আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। এটা ঠিক যে পোশাক শিল্পের মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে। কিন্তু এ শিল্প এখনো বিদেশী ক্রেতার ওপর নির্ভরশীল। ফরোয়ার্ড লিংকেজ সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমরা নিজেরা কীভাবে পোশাক শিল্পের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সেখানে জোর দিতে হবে। এখানে যত বেশি কর্মসংস্থান হবে, আমাদের জন্য তত মঙ্গল। তবে আমাদের কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো কৃষিভিত্তিক শিল্প। প্লাস্টিক পরিবেশ ধ্বংস করে দিচ্ছে। সারা পৃথিবীতে প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। প্লাস্টিকের বিপরীতে আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে বস্তুটি আছে, তা হলো পাট। পাটকে আমরা পলিথিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। জুট পলিমার আবিষ্কার হয়েছে, এটা পরিবেশবান্ধব। আমাদের শিল্পায়নের ভিত্তি হবে কৃষি। অন্যান্য শিল্প, যেমন ইলেকট্রনিক শিল্প, কম্পিউটার শিল্প, তৈরি পোশাক শিল্পকে অস্বীকার করছি না। এ শিল্পগুলোর পাশাপাশি আমাদের কৃষিভিত্তিক শিল্পের ওপর জোর দিতে হবে। আমাদের দেশের ৬২ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষকদের কৃষিপণ্যের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের যদি ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে তাহলে তারা দেশীয় পণ্য ক্রয় করবেন। উঠতি মধ্যবিত্ত ও ধনীদের ব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় বিদেশী পণ্য ক্রয়ে। কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হবে। তাই কৃষিভিত্তিক শিল্পকেও সম্প্রসারিত করতে হবে। কৃষিজমির ওপর রাস্তাঘাট, কলকারখানা ও বাড়ি নির্মাণ করা হয়—এটি নিয়ে কোনো ধরনের নীতিমালা নেই। এভাবে কৃষিবহির্ভূত কাজে যদি কৃষিজমি চলে যেতে থাকে, তাহলে ৪০-৫০ বছর পর আমাদের আবাদি জমি বলতে কিছুই থাকবে না। তখন দেশের সব জনগোষ্ঠীকে খাদ্যনিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে গিয়ে আমরা যদি অতিরিক্ত বিদেশনির্ভর হই, তাহলে অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে। তাই যেকোনো মূল্যে কৃষিজমি রক্ষা করতে হবে। কৃষিপণ্যের উপযুক্ত মূল্য দিতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্পকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের শিল্পায়নে নীতিনির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। পাশাপাশি জলাভূমি ভরাট, নদীদূষণ বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে সরকারকে তত্পর হতে হবে।
শামসুল হুদা
নির্বাহী পরিচালক এএলআরডি
আলোচনায় অর্পিত সম্পত্তি আইনের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। এটি একসময় শত্রু সম্পত্তি আইন নামে পরিচিত ছিল। এটা বাতিল করে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন হয়েছে। এ বিষয়টিতে বাংলাদেশে প্রথম গবেষণা আমরাই সূচনা করেছিলাম। সেই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত একটি তথ্য আমার মনে পড়ছে, এখানে আমি তা উল্লেখ করতে চাই। তথ্যটি হলো, অর্পিত সম্পত্তি যারা আত্মসাৎ করেছে, তাদের ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ভূমি প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটা দিয়ে বোঝা যায় আইনের আসল সুবিধাভোগী কারা। যাদের একটি বড় অংশ হচ্ছে আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত থাকে। ৩০ বছর ধরে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে থাকার ফলে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা হলো আইনের নামে সম্পত্তিগুলোকে আত্মসাৎ করে প্রশাসনের লোক বা তাদের আত্মীয়স্বজন নিয়েছে। সম্পত্তিগুলো কোনো তালিকায় আসেনি। তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে এবং ব্যক্তিমালিকানায় দলিল করে, নামজারি করে, পরিবর্তন করে রেকর্ড করা হয়েছে। এই যে প্রক্রিয়াটি, অর্থাৎ আইন যারা প্রণয়ন করেন, আইন যারা ব্যবহার করেন এবং আইন যারা প্রয়োগ করেন, তাদের মধ্যে এ দুর্নীতি আকস্মিক কোনো বিষয় নয়। এটা একটা সিস্টেমিক বিষয়। অর্থাৎ এ সিস্টেমটাকে যদি পরিবর্তন না করা যায়, যেটা আবুল বারকাত প্রবন্ধ উপস্থাপনার মধ্যে একাধিকবার বলেছেন যে ভূমিদস্যুরা কীভাবে রাজনীতিকে পরিণত হন, আইনপ্রণেতায় পরিণত হন এবং সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করে। ঐতিহাসিক এই জায়গাটায় যদি আমরা পরিবর্তন আনতে না পারি তাহলে আসলে বড় কোনো পরিবর্তন আশা করতে পারি না। আজকের আলোচনায় আইন ও নীতি—দুটোর কথাই এসেছে। আইন ও নীতি যেটাই করা হোক, অবশ্যই তা স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় করতে হবে। প্রত্যেকের মতামত নিয়ে নীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ, বাস্তবায়নের ফলাফল এবং জবাবদিহিতা যদি নিশ্চিত করা যায়, তবে তা ফলপ্রসূ হবে। নারী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, অন্যান্য সাধারণ জনগণ, যারা কৃষির ওপর, ভূমির ওপর নির্ভরশীল, যারা উৎপাদনের মূল শক্তি, তাদের অংশগ্রহণ যদি নিশ্চিত করা যায়, তাহলেই শুধু আমরা এর প্রতিকার আশা করতে পারি। খাসজমি ও কৃষিজমির ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। কৃষিজমি নিয়ে একটি লুকোচুরি খেলা হচ্ছে। আজ থেকে আট কিংবা দশ বছর আগে কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন নামে একটি খসড়া ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে করা হয়েছিল। আমাদের কাছে মতামত চাওয়া হলে আমরা দিয়েছিলাম। খসড়া ওই আইনটি আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। ভূমি আইন, ২০২০ নামে যে খসড়াটির প্রচার করা হচ্ছে, এটি একটি ভয়ংকর খসড়া—কোনোভাবেই এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
খুশী কবির
সমন্বয়কারী
নিজেরা করি
আজকের আলোচনা প্রসঙ্গে বলব, এটা একটা রাজনৈতিক বিষয় বটে। আমরা যারা অরাজনৈতিকভাবে বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে চেষ্টা করছি অধিকার আদায়ের জন্য, মানুষকে সচেতন করছি, তাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যখন গবেষণার মাধ্যমে বিষয়গুলো উঠে আসে তখন এটা থেকে যায়। পাশাপাশি নীতিনির্ধারক, গবেষকসহ বিভিন্ন জন ও জায়গায় তা পৌঁছে। জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি, ২০০১ হয়েছে। এর মধ্যে এমন কিছু দুর্বলতা আছে, যা দিয়ে বোঝা যায় যারা নীতিটি তৈরি করেছেন, তারা মানুষের চেয়ে বা প্রকৃত অবস্থার চেয়ে সম্পূর্ণ দূরে থেকে কাজটি করেছেন। তাই আজকের মতো এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমে আমরা যদি ইস্যুগুলো তুলে ধরতে পারি তাহলে হয়তো আরো বড় আকারে তা সাধারণের কাছে পৌঁছবে। এভাবে আমরা নীতিনির্ধারকদের কাছেও পৌঁছে যেতে চাই। আমাদের সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন তা হচ্ছে, আমাদের ভেতরে একটা উদ্যম সৃষ্টি করতে হবে। ভূমি আমাদের জীবনের খুবই গভীর অংশ। এটা আমাদের জীবনের সঙ্গে, অস্তিত্বের সঙ্গে, অধিকারের সঙ্গে জড়িত। তাই ভূমির সমস্যাগুলো আমাদের সামনে আনতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি প্রকৃত মত্স্যজীবীরা জলাশয় পান না, কিন্তু তারা সংঘটিত হয়ে, তাদের যদি নিজেদের ভয়েজ থাকে, তারা কিন্তু ভুয়া মত্স্যজীবীদের হটিয়ে দিতে পারেন। ওই ভুয়া মত্স্যজীবীরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন। খাসজমির ক্ষেত্রেও এমনটা আমরা দেখেছি। তার মানে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যদি ওই সাহস এবং ওই কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে পারে তাহলে স্বাধীনতার সময় আমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা পূরণ করতে পারব। এ পর্যায়ে একটু উল্লেখ করতে চাই যে ম্রো আদিবাসীদের জমির অধিকার নিয়ে আমাদের সবাইকে সোচ্চার থাকতে হবে। বিষয়টি এ গবেষণার অংশ না হলেও তা আমাদের কাজের অংশ। আমরা সবাই মিলে যে উদ্দেশ্যে আমাদের দেশ স্বাধীন করেছি, আমরা সেই উদ্দেশ্যের কাছে যেন পৌঁছতে পারি। মুজিব শতবর্ষ চলছে, আমরা যদি তার আত্মজীবনীমূলক বই ও অন্যান্য লেখা পড়ি, তাহলে তিনি যেটা চেয়েছিলেন, তা উপলব্ধি করতে পারব। আমরা যদি তাকে শ্রদ্ধা করতে চাই, তাহলে তার আদর্শে ফিরে যেতে হবে। যুগের সঙ্গে কিন্তু আদর্শের পরিবর্তন হয় না।
শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির ও রুহিনা ফেরদৌস





