আইন ও বিধি জটিল হওয়ায় ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমবায়ের সুবিধা নিতে পারেন না। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে অনিয়ম করছে। সমবায় ব্যবস্থাকে ক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজে লাগানোর কথা থাকলেও বর্তমান কাঠামোয় তা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও আইনের কঠোর বিধি সমবায়ের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। এসব বাধা দূর হলে সমবায় বড় আকারে ভূমিকা রাখতে পারত। ‘সমবায় সমিতি আইনের সংস্কার: ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমবায় বিকাশের সুযোগ’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে অংশ নিয়ে এ কথা বলেন বক্তারা। অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও বণিক বার্তা যৌথভাবে গত ২০ ফেব্রুয়ারি এর আয়োজন করে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারস্থ বণিক বার্তার কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংলাপে সম্মানিত অতিথি ছিলেন সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম ও অতিরিক্ত নিবন্ধক (অডিট ও আইন) মো. নবীরুল ইসলাম। সূচনা বক্তব্য দেন এএলআরডির চেয়ারপারসন ও মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা

1

খুশী কবির

চেয়ারপারসন

এএলআরডি ও মানবাধিকার কর্মী

সমবায়র সূচনা অনেক আগে থেকে। আসলে ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমবায় থেকে খুব বেশি সুযোগ পাচ্ছিল না। বিশেষ করে ৮০ দশকে দেখতে পেলাম যে, নোয়াখালীতে বিপুল পরিমাণ খাসজমি পাওয়ার জন্য সমবায়ের আইন, নিয়ম আর ব্যবস্থাপনা এত জটিল যে খাসজমি পাওয়ার লক্ষ্যে ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যারা উৎপাদনে দক্ষ, তারা এই প্রশাসনিক কাগজপত্রের জটিলতায় পিছিয়ে পড়ছেন। কুমিল্লা মডেলেও দেখা যায় যে, যারা বেশ সচ্ছল, তারাই আইনগত এই জটিলতাগুলো মোকাবেলা করছে, যেখানে ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বেড়াজালে আটকে যেতেন। ফলে সমবায়ের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং কৃষকরা প্রত্যাশিত সুবিধা পান না, যা এখনো রয়ে গেছে এই আইনের মধ্যে। মাইক্রোক্রেডিটের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণের সুযোগ পেয়ে গঠিত সমিতিগুলোর কোনো লিগ্যাল এনটিটি নেই। বরং সমবায়ের মাধ্যমে সমিতিগুলোর একটি কার্যকর লিগ্যাল এনটিটি থাকলে কৃষকরা জমি, ঋণ বা ব্যাংকের সহায়তা সরাসরি পেতে পারতেন, কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হতো না। তাই বর্তমানে পরিবর্তিত সময়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমরা সমবায় ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে পারি। একই সাথে সমবায় ব্যবস্থার আইন ও বিধিমালাকে বর্তমান বাস্তবতায় কীভাবে কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে এখনই কাজ শুরু করা উচিত।

2

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

বণিক বার্তা

বৈশ্বিক অর্থনীতির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে অনেক বড় বড় উদ্যোগ সমবায়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আমরা যদি ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংকর নাম শুনে থাকি, ‘‌ক্রেডিট এগ্রিকোল্ড’ যা সমবায়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি ব্যাংক। হারভেস্টিংয়ের আগে কৃষকদের যে ঋণের চাহিদা রয়েছে মূলত সেটাকে কেন্দ্র করেই এই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়। একইভাবে জার্মানির শীর্ষস্থানীয় রিটেইলার ‘আর ই ডব্লিউ’, সেটাও সমবায়ভিত্তিক। পৃথিবীতে এ ধরনের অসংখ্য সফল উদ্যোগ রয়েছে, যা সমবায়ভিত্তিক। বিশেষ করে ব্রাজিল, জাপান ও সাউথ কোরিয়ায় বড় বড় উদ্যোগ সমবায়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশেও স্বাধীনতার আগে সমবায়ের কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও স্বাধীনতার পর তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এসব উদ্যোগ হারিয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো সফলভাবে কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশকেও সেসব ইতিবাচক অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে হবে।

3

ড. রিজওয়ানুল ইসলাম

অধ্যাপক

আইন বিভাগ

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

আমরা সমবায় আন্দোলনকে অনেকটা আইনের কাঠামো বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা করেছি। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সমবায়ের মাধ্যমে যে সুবিধাগুলো পাওয়ার কথা ছিল, তা অন্য গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে জলমহালগুলো জেলেদের পাওয়ার কথা, সেখানে কোনো প্রকৃত মৎস্যজীবী নেই। এই সুবিধাগুলোকে কুক্ষিগত করার জন্য এমন কিছু মানুষ সমবায় সমিতির সদস্য হচ্ছেন, যারা প্রকৃতপক্ষে ওই গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিনিধিত্ব করেন। একই সাথে সমবায়কে নারীবান্ধব, কৃষিবান্ধব এবং আদিবাসীবান্ধব করা প্রয়োজন।

4

শামসুল হুদা

নির্বাহী পরিচালক

এএলআরডি

সমবায় সমিতি আইনটি ২০০১ সালে হলেও ২০০২ এবং ২০১৩ সালে তা সংশোধন করে যে অবস্থায় আছে সেটা নিয়ে আজকের আলোচনা। ইতিমধ্যে সমবায় আন্দোলনে কুমিল্লা মডেলের কথা উঠে এসেছে। আসলে সমবায় হচ্ছে একটি গঠনমূলক আন্দোলন। তবে সমবায় সমিতি আইনে সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং হস্তক্ষেপ, নিবন্ধন জটিলতা, আইনের অপব্যবহার, দুর্বল আর্থিক তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে সমবায় আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠতে পারছে না; যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমবায়ের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। আর সমবায় সমিতিগুলো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে বিদ্যমান সমবায় সমিতি আইন-২০১৩। ভিয়েতনাম বাংলাদেশের চার বছর পর স্বাধীন হলেও সেখানে সমবায় আন্দোলন আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। জাপানের জিডিপিতে সমবায়ের বড় অবদান আছে। বাংলাদেশে সমবায়ের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা এশিয়ার অন্য কোনো দেশের তুলনায় কম নয়। সমবায়ের নিবন্ধন প্রক্রিয়া এখনো যথেষ্ট জটিল এবং স্বাধীন তত্ত্বাবধান ছাড়াই আমলাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাছাড়া সমবায় সমিতি আইনটি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই সংবিধানের সঙ্গে সংগতি রেখে সমবায় আইনের পরিবর্তন করতে হবে। বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়নকে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে সমবায় শিক্ষা ও প্রান্তিক পর্যায়ে সমবায়গুলোকে প্রাণবন্ত করার প্রচেষ্টায় সমন্বয় সাধনের সক্ষমতা বাড়ানো উচিত। সামগ্রিক সমবায় পরিচালনার জন্য স্থায়ী একটা কমিশন হতে পারে। যেখানে সব অংশীজনের প্রতিনিধি থাকবে। সমবায় অধিদপ্তরকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নয়, বরং সহায়কের ভূমিকা পালন করতে দেয়া জরুরি।

5

শামসুল ইসলাম দীপু

মিশন চিফ

স্পিড ট্রাস্ট্র

বরিশাল

অনেকেই বলছেন সমবায় ভালো এবং আইনটাকে খুব সহজ- সরলভাবে দেখছেন। তাহলে তৃণমূল পর্যায়ে ৫০-৬০টা রেজিস্ট্রেশন আটকে থাকে কেন? আসলে বাস্তব চেহারাটা কঠিন। শুধু পরিদর্শনপূর্বক মূল্যায়ন না করে কতগুলো সমবায় সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় আছে, এগুলো জরিপ করা দরকার।

6

মো. সাইয়েদুজ্জামান খোকন

নির্বাহী পরিচালক

গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা (গ্রাউস) ময়মনসিংহ

সমবায় পরিদর্শনে এসে সরকারি কর্মকর্তারা সুন্দর কথা বললেও তারাই আবার রেজিস্ট্রেশনের জন্য নিরুৎসাহিত করেন। আরেকটা বিষয় হলো অনেক সময় স্থানীয় নেতারাই সুবিধাভোগী হয়ে যান এবং প্রকৃত সমবায়ীরা সুবিধাবঞ্চিত হন। এগুলোও সুষ্ঠুভাবে দেখা জরুরি।

7

শরীফা আক্তার নিপা

সভানেত্রী

চড়ুইকুল জনসমবায় দল চাটমোহর, পাবনা

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক অবস্থা থেকে বের হয়ে একটু ওপরে ওঠার জন্য আমরা মুষ্টি চালের মাধ্যমে ১১টি দল গঠন করি। সে দলের নাম দিয়েছি জনসমবায়। কিন্তু নিবন্ধন না থাকায় বড় শক্তি নিয়ে আমরা সরকারের কাছে যেতে পারছি না।

8

মো. শরিফুল ইসলাম

নিবন্ধক ও মহাপরিচালক

সমবায় অধিদপ্তর, ঢাকা

সমবায় আইন সংস্কারে সরকার আইন প্রণয়ন করে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য। সমিতির অভ্যন্তরীণ সমস্যায় সমবায় কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করতে পারে, কিন্তু আইনগত বিষয়ে দেওয়ানি আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। সরকার যেকোনো তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নিতে পারে, তবে নিবন্ধক নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারে না। সমবায় ব্যবস্থায় কিছু প্রতিষ্ঠান মূলধন কম দেখিয়ে অনিয়ম করছে, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপ-আমেরিকার মডেল অনুসরণের পরিবর্তে দেশীয় সফল সমবায় সমিতিগুলো অনুসরণ করা উচিত। বাংলাদেশে সমবায়ের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে, যা সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাজে লাগানো সম্ভব। পুঁজি গঠনের সহজতম উপায় হচ্ছে সমবায়, যা বিনিয়োগেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। বর্তমানে দেশে ১১ হাজার গ্রাম উন্নয়ন সমিতি রয়েছে, যেগুলো কার্যকর করতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সমবায় নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনকল্পে অনলাইনে আবেদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কারন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে, যেখানে মানুষের পরিবর্তন হলেও সিস্টেমের কোনো পরিবর্তন হবে না। বাংলাদেশের সমবায় ব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এটি মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। বর্তমানে দেশে ১১ হাজার গ্রাম উন্নয়ন সমিতি রয়েছে, যেগুলো কার্যকর করতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি বছর পূর্বের তুলনায় অধিকসংখ্যক সমবায়ের নিবন্ধন দেয়া হচ্ছে। সমবায়ের নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করতে অনলাইনে আবেদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কারণ প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনায় মানুষের পরিবর্তন হলেও সিস্টেমের কোনো পরিবর্তন হবে না।

9

রফিকুল ইসলাম

কর্মসূচি কর্মকর্তা

এএলআরডি

আইনের সঙ্গে বাস্তবতার যে মিল রাখা দরকার সে বিষয়টাকে মনে হয় আমাদের প্রাধান্য দেয়া দরকার। ২০০৪ সালে সমবায় আইনের যে বিধিমালা হয়েছে সেখানে বলা আছে যে, সমবায়ের কতগুলো শ্রেণী হবে। বিধিমালায় বলা আছে ২০ ধরনের বা তারও বেশি সমবায় সমিতি হতে পারে। সেই শ্রেণী তালিকায় প্রথমেই কৃষক সমবায়ের নাম রয়েছে। কিন্তু এখানের আলোচনায় যা উঠে এসেছে, তাতে সমবায় বলতে অনেকে ঋণ দেয়া-নেয়াকে বুঝেন, যা কোনো ভাবেই কাম্য নয়। কাজেই এই আইন সেটা পারমিট করে কিনা তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আবার ২০১২ সালে জাতীয় সমবায় নীতিমালা ঘোষণায় কেন সমবায়, কার জন্য সমবায় সেগুলোর উল্লেখ রয়েছে। আইনের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো দেখলে অনেক জটিলতা কমে যাবে।

10

রাহেলা আক্তার

উজ্জীবক

মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ

সমবায়ের মানে হলো সমমনা, সমপেশা, সম-উদ্দেশ্য এবং সমকর্ম। এগুলোর সমন্বয়ে সমবায় গঠিত হয়। দলগুলোর সদস্যদের সঞ্চয়ের মাধ্যমে যে পুঁজি গঠন হয়, সেটা দিয়ে আমরা কৃষিকাজ করি। জমি বন্ধক, ছাগল পালনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা আমাদের পুঁজি বিনিয়োগ করি। এগুলো সব আমরা যৌথভাবে করছি। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে আমরা যৌথ সিদ্ধান্ত নিই। এর থেকে যেগুলো উৎপাদন হয়, সেগুলো আমরা স্থানীয় বাজারে সমবায়ের ভিত্তিতে বিক্রি করি। আমরা সবাই প্রান্তিক মানুষ, সমবায়ের ভিত্তিতে কাজ করলেও শুধু নিবন্ধন না থাকায় অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আমরা চাই, আমাদের দলগুলোকে সমাবায়ের নিবন্ধন দেয়া হোক।

11

মো. নবীরুল ইসলাম

অতিরিক্ত নিবন্ধক

(অডিট ও আইন) সমবায় অধিদপ্তর, ঢাকা

ভুমি সংস্কার মূলত আমাদের কাজ না। এখানে সমবায় অধিদপ্তরের কোনো ভূমিকা নাই। বাংলাদেশে সমবায় সমিতি নিবন্ধনের মতো সহজ বিষয় আর নেই। খুব সহজেই আপনারা তা পেতে পারেন। গত বছর প্রায় ৬ হাজার ৭০০ সমবায় সমিতির নিবন্ধন অধিদপ্তর দিয়েছে। দল গঠনের ক্ষেত্রে ২০ জন সদস্যের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা সরকারি আইন। কাজেই আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে আপনারদেরকে কোনো পর্যায়ের কর্মকর্তাই নিবন্ধন দিতে পারবেন না। তবে যেকোনো সমিতির নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা সমাধানে আমার সাথে কেউ যোগাযোগ করলে আমি সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করব।

12

অজয় এ. মৃ

নির্বাহী পরিচালক

এসিডিএফ

মধুপুর, টাঙ্গাইল

আইন সংস্কারের সময় প্রান্তিক আদিবাসীদের বিষয় মাথায় রাখার অনুরোধ করছি। মূলধারায় অনেকে ব্যাংক ঋণ নিয়ে কৃষিকাজ করছে। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে যারা কাজ করেন, তারা এসব সুবিধা পান না। প্রান্তিকে শুধু পুরুষ নয়, নারীরাও কৃষিকাজ করেন। এছাড়া আমরা যখন কোনো সমিতি রেজিস্ট্রেশনের জন্য সমবায় অফিসে যাই, তখন কর্মকর্তারা এমন ভাব করেন যেন আমরা ভিক্ষা চাইতে এসেছি। তাই রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া আরো সহজ করার জন্য অনুরোধ করছি।

13

নূরে আলম সিদ্দিকী

নির্বাহী পরিচালক

ভূমিহীন উন্নয়ন সংস্থা চাটমোহর, পাবনা

মৎস জীবী সমিতিতে সুবিধা কারা পান, সেটা খতিয়ে দেখা জরুরি। আসল মৎস জীবীরা সেখানে গেলে রেজিস্ট্রেশনের জন্য তাদেরকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে সনদ আনতে বলা হয়। অর্থাৎ প্রকৃত মৎসজীবীরা সুবিধা না পেলেও চেয়ারম্যানের মদদপুষ্ট, প্রভাবশালী কিংবা বিত্তবানরা এক্ষেত্রে সুবিধা পেয়ে থাকেন। এ বিষয়গুলো তদারকি করার কথা সমবায় অধিদপ্তরের। আবার কৃষি অফিস থেকে সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদি দেয়া হলেও প্রান্তিক কৃষকরা তা পান না। আইন সংস্কার করে এগুলো যদি সমবায়ের মাধ্যমে দেয়া হয়, তাহলে তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র কৃষকরা লাভবান হতেন।

14

চামেলী খাতুন

সভানেত্রী

লালপুর জনসমবায় নারী দল রাজশাহী

জনপ্রতি সাপ্তাহিক মুষ্টির চাল তুলে এবং তা বাজারে বিক্রি করে যৌথ মূলধন দিয়ে এই সমিতি তৈরি হয়েছে। আমরা ১০টি দল একসাথে কাজ করি, যেখানে অনেক আদিবাসীও রয়েছে। কিন্তু আমরা কৃষিকাজ করলেও কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ পাই না, কৃষি যন্ত্রপাতি ও কৃষি কার্ড পাই না। তাই আমাদের যদি এইসব সুবিধাগুলো দেয়া হয়, তাহলে উন্নয়নে অংশীদার হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারব।

15

অবন্তি নুরুল

আইনজীবী

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

একজন আইনজীবী হিসেবে সমবায় আইনে কি ধরনের ত্রুটি আমি দেখতে পেয়েছি, সেই বিষয়গুলো নিয়েই আমি আলোকপাত করবে। প্রথমেই নিবন্ধন-সংক্রান্ত বিষয়গুলো রয়েছে আইনের ১০ ধারায়। এই ধারায় নির্ধারিত ফরমে নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্ট সমবায় সমিতিকে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হয়। যদি নিবন্ধক সন্তুষ্ট হন যে কোন সমবায় সমিতিকে তারা নিবন্ধন দেবেন, তাহলে ৬০ দিনের মধ্যে সনদ ইস্যু করাসহ এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। এই ৬০ দিনের মধ্যে ৩০ দিনের ভেতরে তারা ওই সমবায় সমিতির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য চাইতে পারেন এবং যদি প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে স্থানীয় তদন্তও করতে পারবেন। অর্থাৎ যদি প্রয়োজন মনে করেন এই ‘‍যদি’ শব্দটার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত নিবন্ধকের ওপর দিয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন সময়ে অনেক দুর্বল সমবায় সমিতিকেও নিবন্ধন পেতে দেখা গেছে। এই শর্তটা যেখানে আবশ্যক পূর্ব-শর্ত হওয়ার দরকার ছিল, সেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের সমূহ সম্ভাবনার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। আবেদনটা নাকচ করার ক্ষেত্রেও কিছু ফাঁকফোকর আছে। একই ধারায় বলা হয়েছে, আবেদন নাকচ হলে ৩০ দিনের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে হবে। সেখানে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। আবার নিবন্ধক নিজেই যদি নামঞ্জুর করে দেন, তাহলে আপিলের কোনো বিধান নেই। যিনি নাকচ করেছেন, ওনার কাছেই রিভিউ করতে হবে। এখন দুই ক্ষেত্রেই তো মূল বিষয় নিবন্ধনের আবেদনপত্র নাকচ করা। একটা স্তরে রিভিউ ছাড়া আপিল, আরেকটা স্তরে আপিল ছাড়া রিভিউ। নিবন্ধক যদি আবেদন নামঞ্জুর করেন, তার কাছেই আবার রিভিউ করা কতটা যুক্তিসংগত? আইনের ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, সদস্যদের সমন্বেয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনেও পরস্পরবিরোধী ও সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট উল্লেখ দেখা যায়। আবার আইনের ২২ ধারায় স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। সমিতি যদি কোনো কারণে দেউলিয়া হয়ে যায়, তাহলে সরকার কোনো সাধারণ সভা ডাকা ছাড়াই দায়ী কোনো ব্যক্তিকে নিবন্ধক বহিষ্কার করে দিতে পারেন অথবা কমিটিটাই ভেঙে দিতে পারেন। এর মাধ্যমে সরকারেরই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। সাধারণ সদস্যকে গুরুত্ব দেয়ার কোনো বিধান রাখা হয়নি।

16

আ ন ম ফজলুল হাদী

নির্বাহী পরিচালক

বেনিফিশিয়ারিজ ফ্রেন্ডশিপ ফোরাম, ফরিদপুর

সমবায় করার ক্ষেত্রে আইনে খুব বেশি একটা প্রতিবন্ধকতা দেখি না। তবে সমবায় করার পর কিছু সমস্যা দেখা যায়। এক্ষেত্রে ফাইলের সংস্কারের চেয়ে মনিটরিং, মানসিকতা ও চর্চার সংস্কার বেশি দরকার। না হলে শুধু আইনের পরিবর্তন করে কিছু করা সম্ভব নয়। বরং আইন যিনি প্রয়োগ করবেন ও যার ওপর প্রয়োগ হবে, উভয়কে আইন যথাযথভাবে মানার মানসিকতা রাখতে হবে। তাহলেই কেবল সমবায় উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা ভালো ভূমিকা রাখতে পারব।

17

আফজাল হোসেন

নির্বাহী পরিচালক

রুলফাও

রাজশাহী

একদম প্রান্তিক কৃষক, অথবা যাদের কোনো জমি নাই, সে রকম একটা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে আমরা সমবায় শুরু করলাম মুষ্টি চাল তোলার মাধ্যমে। কিছু সঞ্চয় করলাম। কিন্তু আমরা সেই টাকা কোথায় পাব, আমাদের তো জমি নেই। জমি নিতে গেলে নানান ফ্যাঁকড়া। অনেক কিছু তো সংস্কার হলো, কিন্তু ভূমি সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেয়া হলো না। ভূমি সংস্কার করা গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে জমি দেয়া যেতো। তারা সমবায়ের ভিত্তিতে যদি উৎপাদন করতে পারত, তবে উৎপাদন খরচ অনেক কম হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যারা প্রান্তিক কৃষক অর্থাৎ যাদের জমি নেই, অর্থ নেই তাদের কেউ সহযোগিতা করছে না।