গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৬৩ শতাংশ গৃহশ্রমিক শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে শুধুমাত্র ৮ শতাংশ অভিযোগ করার সাহস পান। এছাড়া প্রায় ৯০ শতাংশ নাগরিকই ‘গৃহশ্রমিক কল্যাণ নীতি-২০১৫’ সম্পর্কে অবহিত নন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আইনি সুরক্ষায় আনতে ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যেখানে গৃহশ্রমিকদের আংশিকভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে । তবে এই অগ্রগতি সত্ত্বেও নিয়োগপত্র, ন্যূনতম মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধার মতো মৌলিক বিষয়গুলো এখনো আইনি কাঠামোর অস্পষ্টতায় রয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে বণিক বার্তা ও অক্সফ্যামের যৌথ উদ্যোগে এবং কানাডা সরকারের সহায়তায় ২১ জানুয়ারি, ২০২৬, বণিক বার্তার প্রধান কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত হয় ‘গৃহশ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তায় সংশোধিত শ্রম আইন: সুযোগ, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপ। এ সংলাপে বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। তারা একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি, খণ্ডকালীন ও পূর্ণকালীন শ্রমিকদের জন্য পৃথক মজুরি বোর্ড গঠন এবং শ্রম আদালতকে তৃণমূল পর্যায়ে সহজলভ্য করার ওপর জোর দেন। গৃহশ্রমিকদের মর্যাদা রক্ষা ও আইএলও কনভেনশন ১৮৯-এর বাস্তবায়নই হতে পারে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন উন্নত বাংলাদেশ গড়ার মূল চাবিকাঠি। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। বণিক বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে সংলাপের শুরু হয়। এরপর গৃহশ্রমিকদের নিয়ে নির্মিত একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়। সংলাপটি সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সহকারী সম্পাদক এবং বিশেষ সংবাদদাতা মো. বদরুল আলম এবং ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের জেন্ডার জাস্টিস ও সোশ্যাল ইনক্লুশন স্পেশালিস্ট রওশন আক্তার ঊর্মি।

ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া
সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়
সরকারের একার সবকিছু করার মতো সক্ষমতা নেই—এটা একটি বাস্তবতা। কারণ অসরকারি প্রতিষ্ঠান যেভাবে ঘরে ঘরে কাজ করতে সক্ষম, সরকারের সেই সক্ষমতা এবং সেই লোকবল নেই। সবচেয়ে বড় কথা, এটি সরকারের একার সমস্যা নয় বরং প্রতিটি ঘরের সমস্যা। কেননা এখানে একটি কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট ইস্যু আছে। এ কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হলো—যিনি নিয়োগকারী তিনি মনে করেন গৃহশ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত হলে তারা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই জায়গায় আসলে দুইপক্ষের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অবগত করানোতে কাজ করতে হবে। গৃহশ্রমিকদের নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব-দুটোই ভালোভাবে রপ্ত করানোর জন্য কার্যকর প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা আরো ভালোভাবে তাদের কাজ সম্পন্ন করে। তবে সবার আগে দরকার আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। এখানে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নিয়োগকারীর—তাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন খুব জরুরি। এ লক্ষ্যে পরিস্থিতি পরিবর্তনে সব পক্ষকে ঘরে ঘরে একসঙ্গে কাজ করতে এবং সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এখানে সরকারের পাশাপাশি এনজিও, আইনজীবী, ভলান্টারি সংগঠন এবং শ্রমিক নেতাদের দায়িত্ব রয়েছে। গৃহশ্রমিকও যে একজন মানুষ—সে নারী হতে পারে, এমনকি শিশু—এই বোধটাই আমাদের সমাজে এখনো যথেষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পাশাপাশি উভয়েরই মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও ভাবতে হবে। সরকার একটি আইনি কাঠামো দিয়েছে, অন্যান্য যে সহযোগিতা দরকার, তা সরকার দেবে। আইন বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্ব সরকারের আর এর অংশীদার আপনারা সবাই। যদি আপনারা মনে করেন যে এটা ‘গৃহপরিচারক’ না হয়ে শব্দটা ‘গৃহশ্রমিক’ হওয়া দরকার, তাহলে সরকার সেই শব্দ পরিবর্তন করে ফেলবে। সেই প্রস্তাব আপনারা নিয়ে আসেন। কারণ সরকার যখন কোনো আইন করে বা তার সংশোধন করে তখন সব অংশীজনের সঙ্গে কথা বলেই করে এবং যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সরকার বিধিমালা প্রণয়নের কাজ করছে এবং সেখানে যেসব বাস্তব সমস্যা ও প্রস্তাব উঠে আসছে, সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বাস্তবতা হলো এটি অন্যান্য ইনফরমাল সেক্টরের মতোই নানা জটিলতায় ভরা একটি খাত। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতে হবে, তা হলো গৃহশ্রমিকদের পেশাগত দক্ষতা। পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে; যেমন কারো যদি হাউজকিপিং, কেয়ারগিভিং ইত্যাদি কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে, তাহলে সে কিন্তু দরকষাকষি এবং সম্মানজনক বেতন দাবি করতে পারবে। আমরা চাইলেই ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো হয়ে যেতে পারব না। এর জন্য দরকার সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, ধারাবাহিক চেষ্টা এবং লেগে থাকা। সরকার এরই মধ্যে আইনি কাঠামো দিয়েছে। কাজ করতে গিয়ে যেখানে সমস্যা হবে, সরকার সেখানে হস্তক্ষেপ করবে।

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ
শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং নির্বাহী পরিচালক, বিলস্
সংশোধিত শ্রম আইন অবশ্যই একটি অগ্রগতি। তবে এটাও সত্য, এ আইনে এখনো নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা, ঘাটতি ও জটিলতা রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো—আইনে গৃহশ্রমিকদের নিয়োগপ্রক্রিয়া ও নিয়োগপত্রের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ আইনি সুরক্ষা পাওয়ার মূল ভিত্তিই হলো একটি স্বীকৃত নিয়োগ ব্যবস্থা। এছাড়া গৃহশ্রমিকদের মজুরি, পরিচয়, মর্যাদা, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়গুলোও আইনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বাস্তবতা হলো এ মুহূর্তে দেশের সব গৃহশ্রমিককে একসঙ্গে মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা দেয়া হয়তো সম্ভব না হলেও পাইলট ভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে এটি চালু করা যেতে পারে। মাসে ২ হাজার টাকা করে তিন বা চার মাস সহায়তা দেয়া হলে তা একজন গৃহশ্রমিকের মাতৃত্বকালীন সময়ে বড় ধরনের সহায়তা হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে—আইন ছাড়া আসলে কোনো টেকসই পরিবর্তন হয় না। এ আইনের একটি ইতিবাচক দিক হলো গৃহশ্রমিকদের সংগঠন করার এবং অভিযোগ জানানোর অধিকার স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু অভিযোগ জানাতে আদালতে যেতে হবে—এটা বাস্তবসম্মত নয়। দরকার ছিল স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক অভিযোগ ডেস্ক। আমরা জাতীয় মনিটরিং সেলের একটি কাঠামো প্রস্তাব করেছিলাম, যেখানে কমিউনিটি এনগেজমেন্ট ও স্থানীয় প্রশাসনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর সঙ্গে আরেকটি অত্যন্ত জরুরি বিষয় হলো ‘তথ্য মনিটরিং’। আমাদের কাছে এখনো কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার নেই—দেশে কতজন গৃহশ্রমিক আছেন, তারা কীভাবে নিবন্ধিত হবেন, সেই ব্যবস্থাও স্পষ্ট নয়। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই এজেন্সিনির্ভর গৃহশ্রমিক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এ এজেন্সি ব্যবস্থাকে যদি পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনা না যায়, তাহলে গৃহশ্রমিকরা ‘দ্বিগুণ’ শোষণের শিকার হবেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘কেয়ারওয়ার্ক’ এবং ‘ডমেস্টিকওয়ার্ক’—এই দুটি শব্দের অর্থগত পার্থক্য বোঝা। গৃহশ্রমিক নিয়োগ করে তাকে দিয়ে রোগীর সেবা করানো যাবে না—বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকা জরুরি। সবশেষে বলতে চাই, রাজনৈতিক অঙ্গীকারই এখানে সবচেয়ে বড় বিষয়। আইন থাকলেই হবে না, সমাজকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে।

শাহীন আনাম
নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
আইনের পাশাপাশি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হওয়াটাও সমানভাবে জরুরি। কারণ কেবল ভালো আইন থাকলেই হবে না, মানসিকতার পরিবর্তন না হলে সেই আইন কার্যকরভাবে ফলপ্রসূ হয় না। আমাদের সমাজ আজও গভীরভাবে শ্রেণীবিভক্ত ও বৈষম্যে জর্জরিত। এরই ফল হিসেবে আমরা এখনো শ্রমের যথাযথ মর্যাদা দিতে শিখিনি। ফলে যারা মেধাশ্রম করে, তারা বেশি সম্মান পায়; আর যারা কায়িক শ্রম করে, তারা তুলনামূলকভাবে অবহেলিত থেকে যায়। অথচ অবৈতনিক হিসেবে গৃহিণীরা প্রতিদিন তাদের গৃহে যে গৃহকর্ম সম্পাদন করেন, আমরা কি তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিই? এ অসম্মান ও অবমূল্যায়নের সংস্কৃতির কারণেই দেশে গৃহস্থালি সহিংসতার মতো ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রায় সবার বাড়িতেই গৃহশ্রমিক কাজ করেন, কিন্তু আমরা কি নিজ নিজ জায়গা থেকে তাদের আইনি অধিকার ও মর্যাদার বিষয়গুলো জানাই বা বোঝানোর চেষ্টা করি? এখানে সরকারের বড় দায়িত্ব হলো গৃহশ্রমিকদের আইন ও অধিকার বিষয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো। নিয়োগদাতাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশু গৃহশ্রমিক। এদের সংখ্যাও কম নয়। শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে শিশুদের দিয়ে ৩৬টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ না করানোর বিধান রয়েছে। অথচ দুঃখজনকভাবে সেই ৩৬টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের তালিকায় গৃহশ্রম এখনো অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সারা দেশের গৃহশ্রমিকদের সংগঠিত করতে হলে নিয়োগকারীদের মৌখিকভাবে নিয়োগ দেয়ার প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে এবং ঘরে ঘরে এ বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।

আবুল হোসাইন
সমন্বয়কারী, গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্ক
গৃহপরিচারক শব্দটির সংশোধন আনতে হবে। তিনটি অধ্যায় নিয়ে কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তিনটি অধ্যায়ই বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন। যেমন সংগঠন করব কিন্তু কীভাবে করব, কীভাবে ক্ষতিপূরণ আদায় করব, আদালতের দ্বারস্থ হওয়া তো আরো জটিল বিষয়। আশা করি, বিধিমালায় এর সব কিছুর পরিষ্কার নির্দেশনা থাকবে । আমাদের জন্য যে তিনটি সংশোধন আনা হয়েছে, সেগুলো পরিষ্কার করা প্রয়োজন, যাতে আমরা এর অন্তর্ভুক্ত সুযোগ-সুবিধা পাই।

রাজেকুজ্জামান রতন
সহকারী সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় কমিটি (বাসদ) ও সদস্য, শ্রম সংস্কার কমিশন
পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছাড়া যেমন একটি শহর অচল, তেমনি গৃহশ্রমিক ছাড়া একটি পরিবার এবং গৃহের ভেতর-বাইরের দৈনন্দিন কাজও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এ বাস্তবতা মাথায় রেখেই বলতে হয়, গৃহশ্রমিকদের জন্য তিনটি বিষয় অপরিহার্য: রিকগনিশন (স্বীকৃতি), রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন) এবং রেমুনারেশন (ন্যায্য পারিশ্রমিক)। স্বীকৃতির জন্য প্রয়োজন একটি স্পষ্ট ও শক্তিশালী আইন, যার মাধ্যমে গৃহশ্রমিকরা সংগঠন করার অধিকার পাবে। আমরা চেয়েছিলাম আইনের মধ্যে ‘গৃহশ্রমিক’ শব্দটি, কিন্তু বাস্তবে তারা এখনো ‘গৃহকর্মী’ হিসেবেই থেকে গেছেন। অথচ যিনি মজুরির বিনিময়ে নিয়োজিত হন, তিনি শ্রমিক; আর ‘কর্মী’ শব্দটি স্বেচ্ছাসেবী বা ভলান্টারি কাজের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারে। এ নামকরণগত বিভ্রান্তি গৃহশ্রমিকদের ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পথে একটি বড় বাধা। গৃহশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য আমাদের অবশ্যই একটি আলাদা মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। এ বোর্ড থাকলে খণ্ডকালীন ও পূর্ণকালীন কাজের ধরন এবং দক্ষতার ভিত্তিতে পৃথক ও ন্যায্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য যখন আলাদা মজুরি বোর্ড থাকতে পারে, তখন দেশের বিপুলসংখ্যক গৃহশ্রমিকের জন্য কেন একটি স্বতন্ত্র মজুরি বোর্ড থাকবে না? বর্তমানে গৃহশ্রমিকদের মজুরি অনেক ক্ষেত্রে ‘পাওয়ার রিসোর্স অ্যাপ্রোচ (PRA)’ পদ্ধতিতে নির্ধারিত হয়, যেখানে তারাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এলাকাভিত্তিক মজুরি ঠিক করে নেন। এটি একটি সাময়িক সমাধান হলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে টেকসই ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই একমাত্র পথ। প্রত্যেক গৃহশ্রমিককে নিবন্ধনের আওতায় আনতে না পারলে তার জন্য কোনো চুক্তিপত্র বা আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গৃহশ্রমিকদের মর্যাদা, তাদের পেশাগত দক্ষতা, মানসম্মত জীবনযাপন এবং এর সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ—সবকিছুই এ নিবন্ধনের সাথে জড়িত। আমরা গৃহশ্রমিকদের সামাজিক স্বীকৃতি, শ্রমিক হিসেবে মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি এবং তাদের জীবনকে বিকশিত করার সুযোগ চাই। পাশাপাশি তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে সহায়তা—এসব নিশ্চিত করার জন্য একটি কালেকটিভ ফান্ড বা যৌথ তহবিল গঠন করা যায় কিনা তা নির্ধারণ করতে হবে।

রোকসানা সুলতানা
নির্বাহী পরিচালক, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স
সংগঠিত হওয়ার অধিকার যেহেতু এরই মধ্যে স্বীকৃত হয়েছে, সেহেতু আমার দৃঢ় বিশ্বাস—এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর জন্য কাজ করার পরিসর আরো বহুগুণে বাড়বে। আমি নিজেকে ‘সুনিতী’ মনে করি। সুনীতি প্রকল্পের একটি চমৎকার থিম সং রয়েছে, যা গৃহশ্রমিকদের কাজ, অবদান ও মর্যাদাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে। সবশেষে আমি এটুকুই বলতে চাই, এ খাতে কেবল গৃহশ্রমিকদের নয়, নিয়োগকর্তা বা এমপ্লয়ারদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।

সানজিদা সুলতানা
অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক, কর্মজীবী নারী
আজকের আলোচ্য বিষয় বাংলাদেশের অদৃশ্য ও সবচেয়ে অবহেলিত শ্রমিক, গৃহশ্রমিকদের নিয়ে। আমার সুনির্দিষ্ট মতামত, আইনে তাদের সংজ্ঞাটি স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সুনীতি প্রকল্পের কাজের অভিজ্ঞতা ও গবেষণা বলে, ৯০ শতাংশ নাগরিক ‘গৃহশ্রমিক কল্যাণ নীতিমালা’র বিষয়টি জানে না, ৬৩ শতাংশ গৃহশ্রমিক শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয় এবং মাত্র ৮ শতাংশ তাদের অভিযোগ রিপোর্ট করে। ইন্দোনেশিয়া গৃহশ্রমিকদের সংজ্ঞা নির্ধারণের জটিলতায় ভুগেছে। আমরা সুযোগ পেয়েও সেই সংজ্ঞাটি কেন অস্পষ্ট রেখে দিলাম, এর উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে। সংশোধিত আইনে আদালত যাওয়ার প্রবণতা থেকে বের হয়ে সিটি করপোরেশনের অধীনে এলাকাভিত্তিক অভিযোগ দায়েরের জন্য ‘হেল্প ডেস্ক’ এবং হটলাইন সেবাও চালু করা যায়। গৃহশ্রমিকদের দায়িত্ব কিন্তু নিয়োগকারী কোনো না কোনোভাবে আদায় করে নেয়, কিন্তু নিয়োগকারীর দায়দায়িত্ব আদায়ের বিষয়টি কে নিশ্চিত করবে, সেটি নির্ধারণ করা জরুরি।

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম
উপপরিচালক (অ্যাডভোকেসি)
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস্)
শ্রম আইন সংশোধন অধ্যাদেশে গৃহশ্রমিকদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা হলো দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে শ্রম আদালতের সুবিধা। এটি নিঃসন্দেহে একটি অগ্রগতি। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—১৮ বছরের নিচে বিপুল পরিমাণ শিশু গৃহশ্রমিক এ আইনের সুবিধাগুলো কতটুকু বাস্তবে ভোগ করতে পারবে? একজন শ্রমিকের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে তার জীবনে ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। কারণ গৃহশ্রমিকরা প্রতিদিন আগুন, পানি, বিদ্যুৎসহ নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তাদের সুরক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার না দিলে, সরাসরি ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা সবার জন্যই চ্যালেঞ্জিং হবে। বিশেষ করে যারা একাধিক বাড়িতে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার দায় ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আরো জটিল হয়ে দাঁড়াবে। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের ‘এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম’ যদি গৃহশ্রমিকদের জন্য কার্যকর করা যায়, তাহলে সেটি একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান হতে পারে। সংশোধিত আইনে জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান যুক্ত করা, ট্রেড ইউনিয়নের জন্য এলাকা নির্ধারণ, কালেকটিভ বার্গেনিং কার সঙ্গে হবে—সে বিষয়ে গাইডলাইন দেয়া প্রভৃতি উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সংশোধিত আইনে সামাজিক সংলাপের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সঙ্গে সব অংশীজনের আলোচনার মাধ্যমে যে বিধিমালা প্রণীত হবে, সেখানেই এ সংলাপের বাস্তব ফলাফল প্রতিফলিত হবে বলে আমরা আশা করি।

তারেক আজিজ
প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী, অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ
সংখ্যা যেহেতু নেই, তাই বলা হচ্ছে অদৃশ্য ও সবচেয়ে অবহেলিত গৃহশ্রমিকদের সংজ্ঞাটি স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। আট বছর ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ৯০ শতাংশ মানুষ ‘গৃহশ্রমিক কল্যাণ নীতিমালা’র বিষয়টি জানে না। ৬৩ শতাংশ গৃহশ্রমিক শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। ৮ শতাংশ কেবল তার নির্যাতনের বিষয়টি রিপোর্ট করে। ইন্দোনেশিয়া গৃহশ্রমিকদের সংজ্ঞা নির্ধারণে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগিয়েছে। আমরা সুযোগ পেয়েও সেই সংজ্ঞাটি কেন রেখে দিলাম, এর উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে। যৌথ দরকষাকষির জায়গায় বলতে চাই, ক্ষমতার কোন কাঠামোতে একজন নিয়োগকারী এবং একজন গৃহশ্রমিক দাঁড়িয়ে দরকষাকষি করবেন, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শ্রম মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব নিতে হবে, যে সেলের কথা বলা হয়েছে, তাকে কার্যকর করতে হবে। আদালতের মতো কঠিন জায়গায় না গিয়ে সিটি করপোরেশনের অধীনে এলাকাভিত্তিক অভিযোগ দায়েরের জন্য ‘হেল্প ডেস্ক’ এবং হটলাইন সেবাও চালু করা যায়। অধিকারকে দয়াদাক্ষিণ্য থেকে দেখা বন্ধ করতে হবে। কারণ গৃহশ্রমিকদের দায়িত্ব কিন্তু নিয়োগকারী আদায় করে নেয়, তাহলে নিয়োগকারীর দায়দায়িত্ব আদায়ের বিষয়টি কে করবে, সেটি নির্ধারণ করা জরুরি। এটি তাদের আইনি পাওনা, কোনো দান নয়। অক্সফ্যাম সবসময় অনিয়ম, অন্যায্য ও বৈষম্যের লেন্স থেকে বিষয়গুলো দেখে। বৈষম্য ও নির্যাতন কোথায় হচ্ছে, সেই লেন্সটি আমাদের আরো শক্তিশালী করতে হবে। সবশেষে আমি বলব, প্রণীত আইনটি যেন কেবল লোক দেখানো বা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। এটি যেন শ্রমিকদের সত্যিকারের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

মাহমুদা বেগম
নির্বাহী পরিচালক, সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশন
আমি যখন ২০০৫ সালে একটি স্লোগান দিয়ে গৃহশ্রমিকদের নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম, আর তা হলো ‘ঝাড়ু নয় আমাকে বই দাও’। ২০১৫ তো আমরা গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষা ও নীতিমালা পেলেও তার প্রচার-প্রচারণা ছিল না। প্রায় আট বছর বয়সে যে শিশুটি গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেছে, তাকে যদি দক্ষ করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে সে অন্তত নির্যাতন থেকে বাঁচবে। পাশাপাশি তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করতে হবে। তাদের এই দিকটি উপেক্ষিত। বিশেষ করে যারা দেশের বাইরে গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, তাদের বেশির ভাগের মানসিক স্বাস্থ্য নাজুক থাকে।

রওশন আক্তার ঊর্মি
জেন্ডার ও ইনক্লুশন স্পেশালিস্ট, অক্সফ্যাম
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় গৃহশ্রমিকরা এক অপরিহার্য চালিকাশক্তি হলেও দীর্ঘদিন ধরে তারা ‘অবহেলিত শ্রমশক্তি’ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। মূলত গৃহস্থালি কাজকে ‘অনানুষ্ঠানিক ও পারিবারিক সহায়তা’ হিসেবে দেখার প্রবণতার কারণে এই বিপুল জনগোষ্ঠী শ্রম আইনের মূল সুরক্ষা কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে। ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো ব্যাপক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৬৩ শতাংশ গৃহশ্রমিক শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে শুধুমাত্র ৮ শতাংশ অভিযোগ করার সাহস পান। এছাড়া প্রায় ৯০ শতাংশ নাগরিকই ‘গৃহশ্রমিক কল্যাণ নীতি-২০১৫’ সম্পর্কে অবহিত নন। বিশেষ করে নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, ন্যূনতম মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধার মতো মৌলিক বিষয়গুলো সংশোধিত আইনে এখনো স্পষ্টভাবে নয়।

মর্জিনা সুলতানা
সাধারণ সম্পাদক, গৃহকর্মী জাতীয় ফোরাম-বাংলাদেশ
১৮ বছরের নিচে যে শিশু গৃহশ্রমিকরা রয়েছে, তারা এ আইনের সুবিধা কি পাবে, সে বিষয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। এত ছোট বয়সে একজন শিশু তখনই গৃহশ্রমে যুক্ত হয়, যখন তার নিজ বাড়িতে ভাতের নিশ্চয়তা থাকে না। তারা তাদের লেখাপড়া বাদ দিয়ে গৃহশ্রমে নিযুক্ত হয়। গৃহশ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন কোনো সরকার এমন একটি আইন, এমন একটি নীতি তৈরি করবেও যা দৃষ্টান্তমূলক হবে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিক যখন দরকষাকষিতে যায়, তখন তার পাশে মালিক পক্ষ-শ্রমিক পক্ষ-সরকার পক্ষকে পাশে পায়। আমি শুধু বলব এমন একটি অধ্যাদেশ, একটি নীতিমালা, একটি আইন তৈরি করা হোক, যা সারা জীবন ইতিহাস হয়ে থাকবে।

জাকিয়া সুলতানা
সভাপতি, গৃহকর্মী জাতীয় ফোরাম-বাংলাদেশ
আইন শুধু প্রণয়ন করলেই হবে না, সেটি যেন সত্যিকার অর্থে শ্রমিকবান্ধব হয় এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়—সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আইন ও বিধিবিধান বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা অপরিহার্য। কারণ আমরা গৃহশ্রমিকরা বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করি। সেসব গৃহের শোবার ঘর পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে রান্না করা, শিশুদের লালন-পালনসহ প্রায় সব ধরনের গৃহস্থালি কাজই আমাদের করতে হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে যে আইন ও বিধিবিধান তৈরি হচ্ছে, সেগুলো সম্পর্কে অধিকাংশ নিয়োগকর্তাই জানেন না। তাই এসব তথ্য তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া অত্যন্ত জরুরি। অক্সফ্যামের সুনীতি প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা প্রায় ১৬ হাজার গৃহশ্রমিক জানতে পেরেছি যে শ্রমিক হিসেবে আমরা শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং আইনি অধিকার ভোগ করার সুযোগ রাখি। কিন্তু এর বাইরে যে বিপুলসংখ্যক গৃহশ্রমিক রয়েছেন, তারা এখনো জানেন না যে এসব আইন, বিধিবিধান ও নীতিমালা কী এবং আইন অনুযায়ী তাদের কী করণীয় বা কী অধিকার আছে। এর মূল কারণ হলো আইন প্রণয়ন হলেও তা নিয়ে পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা হয় না, যা অত্যন্ত জরুরি। আমরা মনে করি, সবার আগে দেশে গৃহশ্রমিকদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের বাইরে যারা গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, সেই নারীদের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। তারা শুধু অবহেলিতই নন, অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে নানাক্ষেত্রে ঘৃণার শিকারও হন। এ বাস্তবতা পরিবর্তনে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

শাহাজাদী বেগম
প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ
গৃহশ্রমিকদের নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা এবং এ নিবন্ধন কোথায়, কীভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে সে বিষয়ে দ্রুত ও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি। কারণ এ নিবন্ধনের সঙ্গে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ও কার্যক্রম সরাসরি সম্পর্কিত। আমরা নিবন্ধিত শ্রমিকদের মাধ্যমেই কার্যক্রম শুরু করতে চাই। এতে স্বাভাবিকভাবেই একটি ইতিবাচক সাড়া তৈরি হবে এবং পরবর্তী সময়ে আরো অনেক মানুষ নিবন্ধনের প্রতি আগ্রহী হবে। একই সঙ্গে গৃহশ্রমিকদের পেশাগত দক্ষতা অর্জন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা বাড়লে তাদের কাজের মান যেমন উন্নত হবে, তেমনি তাদের দরকষাকষির সক্ষমতাও বাড়বে। এক্ষেত্রে একটি সুস্থ, সম্মানজনক ও টেকসই কর্মসম্পর্ক গড়ে তুলতে কেবল শ্রমিকদের নয়, নিয়োগকর্তাদেরও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। কারণ ‘নিয়োগকর্তার ঘরই হচ্ছে একজন গৃহশ্রমিকের অফিস’—এ পেশাগত মনোভাব ও পেশাদারত্বের চর্চা উভয় পক্ষের জন্য সমানভাবে প্রয়োজন।

শারমিন সুলতানা মৌসুমি
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সংশোধনের আগেই আমরা স্পষ্টভাবে বলেছিলাম—‘গৃহপরিচারক’ নয়, আইনে তাদের ‘গৃহশ্রমিক’ হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করা হোক। কারণ শ্রম খাতে তাদের যে বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়াই ছিল আমাদের মূল দাবি। এখন যেহেতু তারা আইনে সংজ্ঞায়িত হয়েছেন, পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত তাদের অধিকারগুলো বাস্তব ও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা। বর্তমান আইনে গৃহশ্রমিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তাই গৃহশ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো মৌখিক সমঝোতা নয়, বাধ্যতামূলকভাবে লিখিত নিয়োগপত্র থাকতে হবে। কারণ কোনো গৃহশ্রমিক যদি আইনের আশ্রয় নিতে চান, নিয়োগপত্র না থাকলে তার অভিযোগ প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আইন প্রণয়ন হওয়ার পরও গৃহশ্রমিকদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা খুবই সীমিত। তাই আইনে যে ‘সংগঠন করার অধিকার’ দেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তাদের সচেতন করতে হবে।





