সাসুনদের তথা
সাসুন পরিবারকে
প্রায়ই ‘রথচাইল্ডস
অব দি
ইস্ট’ বলে
সম্বোধন করা
হয়। তবে
দ্য সাসুন
ডাইনেস্টির লেখক
সেসিল রথ
অবশ্য এ
উপাধির ক্ষেত্রে
ভিন্নমত পোষণ
করেন। তার
মতে, মোটা
দাগে তিনটি
কারণে বলা
যায় যে
সাসুন পরিবারটি
রথচাইল্ডসদের মতো
ছিলেন না।
প্রথমত রথচাইল্ডসরা
ছিলেন অর্থলগ্নিকারী,
অন্যদিকে সাসুনরা
ছিলেন মূলত
বণিক, পাশাপাশি
উৎপাদনমুখী শিল্পেও
তাদের আগ্রহ
ছিল। দ্বিতীয়ত
হাউজ অব
রথচাইল্ডস পাঁচটি
কেন্দ্রে সমভাবে
বিভক্ত ছিল
এবং তারা
কখনো তাদের
ঐক্য হারায়নি।
কিন্তু সাসুনরা
অসমভাবে বিভিন্ন
অঞ্চলে ছড়িয়ে
গিয়েছিল। তৃতীয়ত
দুই পরিবারের
ব্যাকগ্রাউন্ড ও
বিকাশ ছিল
বেশ ভিন্ন।
রথচাইল্ডসরা ছিল
ইউরোপীয়, তাদের
পূর্বপুরুষরা প্রাচীনকাল
থেকেই ইউরোপের
অধিবাসী। অন্যদিকে
ঊনবিংশ শতাব্দীতে
সাসুনদের একটি
অংশ লন্ডনে
প্রতিষ্ঠিত হওয়ার
আগে তাদের
এশিয়ার বাইরে
কোথায় যাওয়ার
ইতিহাস নেই।
তবে এসবের
চেয়েও একটি
বড় পার্থক্য
রয়েছে—ইতিহাসে
রথচাইল্ডসদের আগমন
কোনো সম্ভ্রান্ত
পরিচয় নিয়ে
ঘটেনি, তাদের
পরিবারের প্রথম
যে সদস্যরা
ইতিহাসের আলোয়
হাজির হয়েছিলেন
তারা ছিলেন
সাধারণ মানি-চেঞ্জার।
সেটা অষ্টাদশ
শতাব্দীর শেষ
দিকের ঘটনা।
অন্যদিকে সে
সময়ে সাসুনরা
ছিল বাগদাদের
অভিজাত নাগরিক,
তার পূর্বপুরুষরাও
তেমনটা ছিলেন।
সাসুন পরিবারকে
পরিস্থিতির চাপে
আপাদমস্তক পরিবর্তনের
মধ্য দিয়ে
যেতে হয়েছিল—কখনো
কর্মস্থল, কখনো
পোশাক-ভাষা
বদলাতে হয়েছে
তাদের। একসময়
তাদের মাথায়
ছিল প্রাচ্যের
পাগড়ি আর
গায়ে আলখাল্লা,
বাগদাদ থেকে
ভারতে এসেও
তাদের এ
পোশাক বদলায়নি।
কিন্তু পরবর্তী
সময় ইংল্যান্ডে
গিয়ে পরতে
হয়েছে টপ-হ্যাট
আর ফ্রক-কোট।
ভাষা হয়েছে
ইংরেজি। সাসুন
সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা
ডেভিড সাসুন
ছিলেন আপাদমস্তক
একজন প্রাচ্যদেশীয়
কলুপতি ও
বণিক। লন্ডনে
হাজির হওয়ার
আগে তার
পুত্রদের কেউ
পশ্চিমা পোশাক
পরেননি। তারা
ইংল্যান্ডের রাজা
সপ্তম এডওয়ার্ডের
ঘনিষ্ঠ মহলের
সদস্য ছিলেন।
সাসুনদের বংশধররা
হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের
বিশিষ্ট কবি,
পাবলিক ওয়ার্কস
বিভাগের প্রশংসিত
কমিশনার এবং
বিখ্যাত অ্যাথলেট।
সাসুন পরিবারের সংগ্রহ ছিল আকর্ষণীয়। একদিকে তারা ছিলেন ধনী, অন্যদিকে প্রাচ্যের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছিলেন তারা। দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, ইহুদি ধর্মীয় বিভিন্ন আর্টিফ্যাক্টসহ নানা রকম পুরনো জিনিস ছিল তাদের সংগ্রহে—সময়কাল একাদশ থেকে দ্বাদশ শতাব্দী এবং ভৌগোলিকভাবে ইউরোপ থেকে দূর পূর্ব দ্বীপভূমি। ইহুদি সম্প্রদায়ের বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জন, শিল্প ও সংস্কৃতি রক্ষায় তাদের বড় অবদান ছিল। ডেভিড সলোমন সাসুন অনেক দুর্লভ বই সংগ্রহ করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল ইয়েমেনাইট পাণ্ডুলিপি, এগুলোর অনেক স্বর্ণের কারুকাজ করা স্ক্রল। নিজেদের বিপুল সম্পদ দিয়ে ডেভিড সাসুন ইরাক ও ভারতের মুম্বাই, পুনেতে অনেক ইহুদি ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। জেরুসালেমে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বেত মেনাশেম সিনাগগ, ইরাকের হিলাহতেও একটি সিনাগগ নির্মাণ করেন। হংকং ও সাংহাইতে তৈরি করেন জিউশ সেমিট্রি। মুম্বাইতে স্থাপন করেন ডেভিড সাসুন লাইব্রেরি ও রিডিং রুম, ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগ। পুনেতে ওহেল ডেভিড সিনাগগ, ডেভিড সাসুন জেনারেল হসপিটাল।
ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের
প্রতি আনুগত্য
ও পুবের
দুনিয়ায় ব্রিটিশ
বাণিজ্য বিস্তারে
সহায়তা করার
স্বীকৃতিস্বরূপ ডেভিড
সাসুনকে ব্রিটিশ
নাগরিকত্ব দেয়া
হয়েছিল। এমনকি
তিনি ভালো
ইংরেজি বলতে
পারেতন না।
তার ভাষা
ছিল হিব্রু,
আরবি, ফার্সি,
তুর্কি ও
হিন্দি। ১৮৫৭
সালের সিপাহি
বিদ্রোহের সময়
ডেভিড সাসুন
ব্রিটিশ প্রশাসনকে
সমর্থন করেন।
১৮৬৪ সালের
৭ নভেম্বর
সাবাথের দিন
ডেভিড সাসুন
পুনেতে মারা
যান, তাকে
ওহেল ডেভিড
সিনাগগের চত্বরে
সমাধিস্থ করা
হয়। তার
মৃত্যুর পর
টাইমস অব
ইন্ডিয়া লিখেছিল,
‘বোম্বে
তার সবচেয়ে
উদ্যমী, বিত্তশালী,
দানবীর নাগরিককে
হারাল...তার
ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য,
চালচলন এবং
পাবলিক লাইফ
ছিল স্মরণীয়।’
ডেভিড সাসুনের
মৃত্যুর পর
পরিবারের নেতৃত্বে
আসেন তার
দ্বিতীয় পুত্র
এলিয়াস ডেভিড
সাসুন। তার
জন্ম ১৮২০
সালে, বাগদাদে।
সে সময়
তার দাদা
বাগদাদে নিজের
প্রভাবশালী অবস্থান
হারিয়েছেন। পিতা
ডেভিড সাসুন
যখন ১৮৪৪
সালে চীনে
বাণিজ্য বিস্তারের
সিদ্ধান্ত নেন,
তখনই এলিয়াসের
প্রতিভা টের
পাওয়া যায়।
পরিবারের বড়
সন্তান অ্যালবার্ট
সাসুন নয়
বরং চীনে
পাঠানো হয়
দ্বিতীয় সন্তান
এলিয়াসকে। তার
বয়স তখন
মাত্র ২৪।
চীনে বাণিজ্য
সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায়
মাসের পর
মাস তাকে
জাহাজে ঘুরতে
হয়েছে এবং
সেগুলো মোটেও
আরামদায়ক ছিল
না। পিতা
ডেভিড সাসুনের
হাতে ১৮৩২
সালে সেকালের
মুম্বাইতে প্রতিষ্ঠিত
ডেভিড সাসুন
অ্যান্ড কোম্পানি
স্বর্ণযুগের শুরু
হয় সুদূর
পুবদেশে এলিয়াসের
ওডেসির মাধ্যমে।
একের পর
এক বাণিজ্যকেন্দ্রে
তাদের শাখা
ও এজেন্সি
স্থাপিত হতে
থাকে। এসব
নতুন বাণিজ্য
শাখা দেখভালের
দায়িত্ব দেয়া
হচ্ছিল সাসুন
পরিবারের সদস্যদের।
এ অভিযান
শেষে ভারতে
ফেরার পর
তিনি পিতা
ডেভিড সাসুনের
ডান হাত
হয়ে ওঠেন।
বলা হয়
এলিয়াসের ঠাণ্ডা
মস্তিষ্ক ও
দূরদর্শিতার কারণেই
১৮৬১-৬৫
সময়কালের শেয়ারম্যানিয়াতে
ডেভিড সাসুন
অ্যান্ড কোম্পানি
অংশ নেয়নি,
অথচ তখন
মুম্বাইয়ের সব
বড় ব্যবসায়ী
হাউজগুলোও এতে
অংশ নিয়েছিল।
আমেরিকার গৃহযুদ্ধ
তখন ভারতীয়
তুলার বিরাট
চাহিদা সৃষ্টি
করে। আর
তাতে সবাই
এতে অর্থলগ্নি
করতে শুরু
করে। কিন্তু
দিনশেষে এ
বুদবুদ ধসে
যায়। অনেক
হাউজই বিরাট
আর্থিক ক্ষতির
মুখে পড়ে।
এলিয়াসের দূরদৃষ্টি
সেদিন বাঁচিয়ে
দিয়েছিল তাদের
পারিবারিক কোম্পানিকে।
কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর এলিয়াস অস্বস্তিতে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন তার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করতে পারছেন না। পারিবারিক ব্যবসার নেতৃত্ব তার বড় ভাই অ্যালবার্ট সাসুনের হাতে। কিন্তু এলিয়াস কারো ওপর নির্ভরশীল হতে চাইছিলেন না। দুই ভাইয়ের মধ্যে অপ্রকাশিত দ্বন্দ্ব পরবর্তী ইতিহাস জানিয়ে দেয়। ১৮৬৭ সালে চূড়ান্ত পদক্ষেপটি নিলেন এলিয়াস, তার ২৪ বছর বয়সী পুত্র জ্যাকবকে পার্টনার হিসেবে নিয়ে মুম্বাইতে চালু করলেন মেসারস. ই. ডি. সাসুন অ্যান্ড কো.। এটি ডেভিড সাসুন অ্যান্ড কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়।
নিজের কোম্পানি
প্রতিষ্ঠার কয়েক
বছর পর
এলিয়াস তার
পুত্র জ্যাকবকে
পাঠালেন সুদূর
পুবদেশে। ঠিক
এক প্রজন্ম
আগে যেভাবে
তিনি যাত্রা
করেছিলেন। তাবে
বলাই বাহুল্য
জ্যাকবকে তার
পিতার মতো
অত কষ্ট
করতে হয়নি।
হংকং, সাংহাইসহ
বড় শহরে
প্রতিষ্ঠিত হলো
মেসারস. ই.
ডি. সাসুন
অ্যান্ড কো.
এর শাখা।
এমনকি পরিবারের
জন্মভূমি ইরাকেও
সম্পর্ক স্থাপিত
হয়। নতুন
এ ফার্ম
কয়েক বছরের
মধ্যে তাদের
কার্যক্রম বিস্তার
করে ইউরোপ,
আফ্রিকা ও
আমেরিকার কিছু
এলাকায়, যেখানে
কখনো ডেভিড
সাসুন অ্যান্ড
কোম্পানির পা
পড়েনি।
১৮৮০ সালে
৬০ বছর
বয়সে এলিয়াস
মারা যান
কলম্বো সফরকালে।
ততদিনে তার
কোম্পানি ছড়িয়ে
পড়েছে দুনিয়ার
প্রায় সব
প্রান্তে এবং
সেটা তখন
এক বিরাট
প্রতিষ্ঠান। সব
শাখাতেই সাসুনদের
প্রাথমিককালের রীতি
অনুসরণ করে
ব্যবস্থাপক ও
কেরানিদের বেশির
ভাগই নিয়োগ
করা হতো
ইহুদি সম্প্রদায়
থেকে। এদের
কেউ ভারতীয়
কিংবা বাগদাদি
ইহুদি। তাদের
উপসনার জন্য
কোম্পানি থেকে
নির্মাণ করা
হতো সিনাগগ।
মেসারস. ই.
ডি. সাসুন
অ্যান্ড কো.
কেবল একটি
বাণিজ্যিক হাউজ
ছিল না,
তারা ব্যাংকিং
কার্যক্রমও চালাত।
এলিয়াসের মৃত্যুর
পর তার
পুত্ররা—জ্যাকব
এলিয়াস সাসুন,
এডওয়ার্ড এলিয়াস
সাসুন, মেয়ার
এলিয়াস সাসুন
ও ডেভিড
এলিয়াস সাসুন
মেসারস. ই.
ডি. সাসুন
অ্যান্ড কোংয়ের
হাল ধরেন।
তবে বলাই
বাহুল্য মূল
দায়িত্বটি পালন
করছিলেন জ্যাকবই।
শেষ জীবনে
তার দৃষ্টিশক্তি
প্রায় নিঃশেষ
হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এসব
তাকে ব্যবসার
প্রতি তার
নিবেদিত প্রাণকে
হতোদ্যম করতে
পারেনি। বলা
হয় মধ্যপ্রাচ্যের
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি
নিয়ে তার
মতো জ্ঞানী
তখন দুনিয়াতে
আর কেউ
ছিলেন না।
পুরো প্রাচ্যের
ব্যবসা-বাণিজ্যেই
তার প্রভাব
অনুভূত হতো।
তিনি ব্যবসা
সম্প্রসারিত করেছিলেন
জাপান, পারস্য
উপসাগর, আরবে।
শাখা স্থাপন
করেছেন কলকাতা,
রেঙ্গুন ও
করাচিতে। লন্ডনেও
চালু হয়
তাদের দপ্তর।
১৮৮০ সাল
নাগাদ জ্যাকব
ও মেয়ার
দেখাশোনা করতে
থাকেন লন্ডনের
ব্যবসা। এডওয়ার্ড
চীনে আর
মুম্বাইতে ব্যবসা
দেখাশোনা করতেন
আত্মীয় অ্যারন
মোজেজ গাবে।
পরবর্তী সময়
জ্যাকব ভারতে
ফিরে আসেন
আর লন্ডনে
তার জায়গায়
কাজ শুরু
করেন আরেক
ভাই এডওয়ার্ড।
১৮৮০ সালে
পিতার মৃত্যুর
পর পরই
জ্যাকব বেশ
কয়েকটি কারখানা
স্থাপন করে,
যেগুলো অসাধারণ
সাফল্য পেয়েছিল।
স্থাপন করেন
জ্যাকব সাসুন
মিল, যেটি
ছিল সে
সময়ের ভারতবর্ষের
সবচেয়ে বড়—এতে
ছিল এক
লাখ সুতাকাটার
টাকু ও
দুই হাজার
তাঁত মেশিন।
কটন টেক্সটাইল
ইন্ডাস্ট্রিতে ভারতে
জ্যাকব সাসুনের
পাশে কেবল
একটি নামই
উচ্চারিত হতো,
তিনি পার্সি
জামসেতজী টাটা।
শানজিদ অর্ণব: লেখক ও সাংবাদিক





