[বল্লাল চরিতম রচনা করেছিলেন গোপাল ভট্ট, ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে। এ গ্রন্থে বাবা আদমকে বায়াদুম নামে সম্বোধন করা হয়েছে। বাবা আদম সংস্কৃত উচ্চারণে হয়ে গেছেন বায়াদুম—গবেষকরা এমনটাই মনে করেন। লেখক গোপাল ভট্ট এখানে বায়াদুমকে ম্লেচ্ছ বলে অভিহিত করেছেন। তবে বাবা আদম ও বল্লাল সেনের মধ্যকার লড়াইয়ের কারণ হিসেবে এখানে তেমন কিছু উল্লেখ নেই। যা বলা আছে তাতে মনে হয় ‘আচমকা উপদ্রব’ হিসেবে বল্লালের রাজত্বে রামপালে হাজির হয়েছিলেন বাবা আদম। আছে উত্তর ভারতের জওহর প্রথার সগৌরব বর্ণনা। বাংলায় এমন ঘটনার উল্লেখ আর কোনো সূত্রে পাওয়া যায় কিনা লেখক গোপাল ভট্ট কিংবা এ তার আগে থেকেই এ ঘটনা প্রচলিত ছিল কিনা, থাকলে তাতে কতটা ইতিহাস আর কতটা ঘটনাকে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলার প্রবণতা ছিল তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। এখানে বল্লাল চরিতম থেকে বাবা আদম ও বল্লাল সেনের যুদ্ধ ও পরিণতির অংশটি সংকলিত হলো]
বিক্রমপুরমধ্যে চ রামপাল গ্রামে তথা।
বায়াদুম নাম ম্লেচ্ছোহসৌ যুদ্ধার্থং সুসমাগতঃ॥২৯ ॥
যযৌ যুদ্ধে চ বল্লালঃ বিপক্ষসম্মুখং তথা।
প্রণম্য মাতরং স্ত্রীভ্যো দত্ত্বালিঙ্গনচুম্বনম্॥৩০ ॥
স্ত্রিয়োহব্রুংস্তু রাজানং বাষ্পাকুলিতলোচনৈঃ।
যদি স্যাদশিবং যুদ্ধে কিং নো নাথ গতিস্তদা॥৩১ ॥
ততোহবদদুসৌ রাজা সংচুম্ব্যালিঙ্গ্য তাঃ পুনঃ।
দুরাত্মযবনাদ্ধর্ম্মং সতীত্বং রক্ষিতুঞ্চ বৈ।
শ্রেয়ো মৃত্যুশ্চ যুষ্মাকং চিতাদাহেন নিশ্চিতম্॥৩২ ॥
কপোতযুগলং দূতং মমামঙ্গলসূচকম্।
পূর্ব্বপ্রস্তুতচিতায়াং দৃষ্টৈব মরণং ধ্রুবম্॥৩৩ ॥
দারুণ দৈববশে বিক্রমপুরের অন্তর্গত রামপাল নামক গ্রামে বায়াদুম নামে এক ম্লেচ্ছ (বল্লালের সহিত) যুদ্ধ করিতে আসিলেন।২৯ বল্লাল, মাতাকে প্রণাম এবং স্ত্রীদিগকে আলিঙ্গন ও চুম্বন করিয়া শত্রুর অভিমুখে যুদ্ধযাত্রা করিলেন।৩০ তাঁহার স্ত্রীগণ অশ্রুপূর্ণনয়নে তাঁহাকে কহিলেন, ‘নাথ! যদি যুদ্ধে কোন অমঙ্গল ঘটনা হয়, তাহা হইলে আমাদের গতি কি হইবে?’৩১ অনন্তর সেই রাজা তাঁহাদিগকে পুনব্বার চুম্বন ও আলিঙ্গন করিয়া বলিলেন, ‘দুরাত্মা যবনের হস্ত হইতে ধৰ্ম্ম ও সতীত্ব রক্ষা করিবার জন্য চিতাতে দগ্ধ হইয়া মরাই তোমাদিগের পক্ষে নিশ্চয় শ্রেয়ঃ।৩২ তোমরা পূর্ব্ব হইতেই চিতা প্রস্তুত করিয়া রাখিবে; যদি আমার কোন অমঙ্গল হয়, তাহা হইলে এক যোড়া পায়রা দূত হইয়া তোমাদিগের নিকট উপস্থিত হইবে; তাহা দেখিলেই তোমরা (চিতায় পড়িয়া) নিশ্চয় মরিবে।’৩৩
ইত্যুক্তা৷ স চ বঙ্গেশো জগাম সমরং যথা।
বভূত বিজয়ী ম্লেচ্ছৈঃ সংগ্রামে তত্র তৈঃ সহ॥৩৪ ॥
স্বসৈন্যৈঃ স্বজনৈস্তত্র বিজয়োন্মত্তভূপতিঃ।
অনবধানযোগেন কপোতোস্বগৃহং গতৌ॥৩৫ ॥
বিহঙ্গ মিথুনং দৃষ্ট্বা কৃতান্তদূত সন্নিভম্।
রাজান্তঃপুরচারিণ্যশ্চক্রুঃ প্রাণবিমোচনম্॥৩৬ ॥
রণক্ষেত্রাত্ততো রাজা আগত্য নিজমন্দিরম্।
দদর্শ ক্ষণমাত্রেণ সৰ্ব্বনাশং সুদুঃসহম্॥৩৭ ॥
দৃষ্টিমাত্রেণ স ক্ষিপ্তস্তূর্ণং ক্ষিপ্তা তু পাবকে।
আত্মানং, সৰ্ব্বসন্তাপং মুমোচ স্ত্রীগণৈঃ সহ॥৩৮ ॥
পরিশিষ্টমিদং পূর্ণং বল্লালচরিতস্য চ।
গোপালভট্টবংশধৃগানন্দভট্টবর্ণিতম্॥৩৯ ॥
সেনভূপালবংশস্য নিধনে নিরুপদ্রবে।
সুগুপ্তং পরিশিষ্টে তচ্চরিতং রচিতং ময়া॥৪০ ॥
এই বলিয়া সেই বঙ্গেশ্বর যুদ্ধে যাত্রা করিলেন; এবং তথায় সেই ম্লেচ্ছদিগের সহিত যুদ্ধে জয়ী হইলেন।৩৪ সেখানে রাজা নিজ সৈন্য এবং অনুচরবর্গের সহিত জয়োন্মত্ত হইয়া রহিলেন; (এদিকে) তাঁহার পায়রা দুইটী অনবধানবশতঃ তাহার গৃহে ফিরিয়া গেল।৩৫
যমদূতের ন্যায় সেই পক্ষিযুগল দেখিয়া। রাজার অন্তঃপুরবাসিনী রমণীগণ (চিতানলে) প্রাণত্যাগ করিল।৩৬ অনন্তর রাজ৷যুদ্ধক্ষেত্র হইতে নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া, ক্ষণকালের মধ্যেই অতীব অসহ্য সর্ব্বনাশ (হইয়াছে) দেখিলেন।৩৭ উহা দেখিয়াই তিনি ক্ষিপ্ত হইয়া শীঘ্রই আপনাকে অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত করিয়া, স্ত্রীদিগের সহিত সকল সন্তাপ মোচন করিলেন।৩৮ গোপালভট্টের বংশজাত আনন্দভট্ট কর্ত্তৃক রচিত-বল্লালচরিতের এই পরিশিষ্ট সম্পূর্ণ হইল।৩৯ এই সেন রাজবংশ ধ্বংস হওয়ায় কোন উৎপাত না থাকাতে এই পরিশিষ্টে আমি সেই বল্লাল রাজার অতিগোপনীয় চরিত বর্ণন করিলাম।৪০
মানৈরন্ধরাজপুত্রৈদর্শনৈশ্চ নবাধিকৈঃ।
শাকেষু দর্মনৈর্মাসে তারাভির্দ্দর্শিতে দিনে।
নবদ্বীপপতেরাজ্ঞাং ময়া বিধৃত্য মূৰ্দ্ধনি।
অস্য চিত্তপ্রসাদার্থং তৎপাণিকমলাপিতম্॥৪১/৪২ ॥
যুগ্মকম্।
ইতি শ্রীবল্লালচরিতে আনন্দভট্টরিচিতং পরিশিষ্টং সমাপ্তম্।
সমাপ্তঞ্চেদং বল্লালচরিতম্।
১৫০০ শকাব্দে আশ্বিন মাসের ২৭শ দিবসে, ৪১ নবদ্বীপের রাজার (কাশীনাথের*) আদেশ শিরোধার্য্য করিয়া তাঁহার চিত্ততোষণের জন্য এই গ্রন্থ তাঁহার করপদ্মে সমর্পণ করিলাম।৪২
ইতি শ্রীআনন্দভট্ট কর্তৃক বিরচিত বল্লালচরিতের পরিশিষ্ট সমাপ্ত
বল্লালচরিত সমাপ্ত।
* এই শকাব্দের সহিত মিল করিয়া ক্ষিতীশ-বংশাবলীচরিত হইতে এই নামটী সংগৃহীত হইল; বস্তুতঃ কাশীনাথের রাজধানী নবদ্বীপে ছিল না, বিক্রমপুরের সন্নিহিত কাঁকদি গ্রামে ছিল। তিনি তথা হইতে বাগোরানে আসেন। তাহার, পৌত্র ভবানন্দ মজুন্দার প্রথম নবদ্বীপের জমীদার হন, এবং ভক্তানদের বৃদ্ধপ্রপৌত্র রাজা রামকৃষ্ণ প্রথম ‘নবদ্বীপাধিপতি’ উপাধি ধারণ করেন।





