পশ্চিম ক্যারিবিয়া থেকে পূর্বের সিঙ্গাপুর, মালয় ও হংকং পর্যন্ত বিশ্ব মানচিত্রের বড় অংশ ছিল ব্রিটিশ দখল ও বশ্যতার অধীনে। আফ্রিকা ভূখণ্ডের অধিকাংশই একসময় ছিল রাজকীয় গোলাপি রঙে ঢাকা।
পঞ্চাশের দশকের বেশ আগেই ব্রিটিশ রাজত্বের গোলাপি আভা ফিকে হতে শুরু করে। ডুবে গেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দম্ভিত সূর্য। অন্যতম উপনিবেশ ভারত থেকে ততদিনে সরে যেতে হয়েছে ব্রিটিশদের। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রসার ঘটছে জাতীয়তাবাদী চেতনার। যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে হাজির সোভিয়েত রাশিয়া। অন্যদিকে স্বাধীন বিশ্বের নেতা হিসেবে স্বনিযুক্ত ভূমিকায় উৎসাহ জুগিয়ে চলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে যুদ্ধকালীন বড় রকমের দেনা দিয়ে ব্রিটেনের পাবলিক ফিন্যান্সের করুণ দশা; যদিও তারা যুদ্ধোত্তর কঠোরতা কাটিয়ে ওঠার জোর চেষ্টায় নিয়োজিত। কিন্তু বিভিন্ন পরাশক্তির উত্থান ঘটলেও ব্রিটিশরা তাদের মানতে প্রস্তুত ছিল না। তাদের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো ছিল খানিকটা এমন—আমাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে, আমরা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী একটি আসনের অধিকারী, পূর্ব-পশ্চিম উভয় গোলার্ধে আমাদের সেনাবাহিনী বিদ্যমান, তাছাড়া বিশ্বব্যাপী নিখরচায় পণ্য-বেসাতি প্রেরণে আগ্রহী হিসেবে আমরা এখনো নিজেদের বণিক পরিচয় অটুট রেখেছি—তাই জাতি হিসেবে আমাদের কর্তৃত্ব কমেনি।
সময়টা ১৯৫৪। মিসরের ক্ষমতা গ্রহণ করেন গামাল আবদেল নাসের। আধুনিক মিসর গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি দেশের উন্নয়নের অংশ হিসেবে নীল নদের ওপর আসওয়ান বাঁধ নিমাণের পরিকল্পনা হাতে নিলেন। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র আর ব্রিটেন এ কাজের জন্য নাসেরকে ঋণ প্রদানে সম্মত হলেও পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মিসরের কূটনৈতিক সম্পর্কের ধুয়ো তুলে বাঁধ নির্মাণে সহায়তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্রের এ চালে ক্ষেপে যান নাসের। এদিকে সুয়েজ খাল তখনো ছিল ব্রিটিশদের অধীনে। মিসরে ব্রিটিশ উপনিবেশের অবসান ঘটলেও সুয়েজ খালের কর্তৃত্ব ধরে রেখেছিল তারা। ব্রিটিশদের দাবি, খালটি এভাবে সব দেশের জন্য উন্মুক্ত রাখা সম্ভব। কিন্তু বাঁধ নির্মাণ দ্বন্দ্বের জেরে নাসের সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিলেন ও জলপথটি জাতীয়করণ এবং এর ওপর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের ওপর টোল বসালেন। মূলত নাসের চেয়েছিলেন এভাবে আসওয়ান বাঁধ নির্মাণের খরচ তুলে নিতে।
নাসেরের পদক্ষেপটি মেনে নিয়ে পারেনি তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার। এর জবাব দিতে ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে। তাছাড়া নাসেরের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে ওই তিন দেশেরই বিরোধ চলছিল। তাই এ ঘটনাকে ইস্যু করে ইসরায়েলকে দিয়ে সুয়েজ খাল আক্রমণ করাটা ছিল ব্রিটিশ কূটনীতিরই অংশ। তবে সুয়েজ আক্রমণের নেপথ্যে আরো একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন অভিপ্রায় ছিল ব্রিটিশদের, তা হলো নিজেদের নীতিগত ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব জাহির; বিশেষ করে সাম্রাজ্য বিস্তারের দিনগুলোয় ব্রিটিশরা স্বভাবতই ওই বোধ তাড়িত ছিল।
উল্লিখিত যুক্তিটি আজ খেয়ালি কিংবা স্বপ্রণোদিত মনে হলেও ব্রিটিশরা ব্যাপক ও গভীরভাবে ব্রিটেনের ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্য, নিজের জনগণকে সমাজতন্ত্র ও অন্যান্য রূপকতা থেকে রক্ষার দায়বদ্ধতা অনুভব করত।





