ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্কটি বেশ অম্ল-মধুর। সাহিত্য থেকে যেমন ইতিহাসের অনেক তথ্যপ্রাপ্তি ঘটে, আবার অনেককেই জনপ্রিয় পুরনো সাহিত্যগুলো  ইতিহাসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে দেখা যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোনো এলাকার জনসাধারণের মধ্যে বহুল প্রচলিত বা প্রিয় কোনো সাহিত্যের চরিত্র ও ঘটনাগুলোকে সত্য বলে ধরে নেয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। অতীতে তাদের অস্তিত্ব ছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। যদিও বাস্তবধর্মী সাহিত্যের অপ্রতুলতাও নেই, সেগুলো নিশ্চয়ই ইতিহাসের উপাদান। স্বীকার করতে আপত্তি নেই ইতিহাস ও সাহিত্যের সীমারেখা স্পষ্টীকরণের দায় ঐতিহাসিকের ওপরও বর্তায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অকাট্য প্রমাণের অভাবে এ সত্যাসত্য নিরূপণ করা সম্ভব হয় না। বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর নিয়ে এমন একটি লোকবিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। বগুড়া জেলার গোকুল মেধ প্রত্নস্থলটি বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর বলে প্রচলিত রয়েছে। প্রশ্ন ওঠে গোকুল মেধ বাস্তবেই কি বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর ছিল? বর্তমান লেখায় পাঠককে সেই প্রশ্নেরই জবাব দেয়ার চেষ্টা করা হলো।

বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনী জানে না বাংলাদেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অসংখ্য খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় আর জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীমাতৃক বাংলাদেশে সাপ একদিকে খুবই পরিচিত একটি সরীসৃপ,  অন্যদিকে এটি একটি আতঙ্কের নাম। বিষাক্ত সাপের কামড়ে প্রতি বছর বহু মানুষের প্রাণনাশ হয়। তাই সাপকেন্দ্রিক কেচ্ছা-কাহিনী এ দেশের ছেলে-বুড়ো সবাইকে আকৃষ্ট করে আসছে। বহু বছর ধরে মনসামঙ্গল কাব্যটি বাংলায় জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। মনসামঙ্গল কাব্যে বিধৃত আছে চাঁদ সওদাগর ছিলেন শিবের উপাসক। শিবের কন্যা মনসা (সাপের দেবী) চাঁদ সওদাগরকে তার উপাসনা করার প্রস্তাব দিলেও চাঁদ সওদাগর প্রত্যাখ্যান করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মনসা চাঁদ সওদাগরকে শাপ দেয় যে তার প্রত্যেক পুত্র সাপের কামড়ে মারা যাবে। এভাবেই লখিন্দর ব্যতিরেকে চাঁদ সওদাগরের সব পুত্রের মৃত্যু হয়। একজন গণকের থেকে চাঁদ সওদাগর জানতে পেরেছিলেন লখিন্দরের বাসর রাতে সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হবে।  বেহুলা যদিও অতি সতর্কতা অবলম্বনের পরও সাপ ওই ঘরে ঢুকে লখিন্দরকে দংশন করেছিল বলে মনসামঙ্গলে বিধৃত আছে, সেটি আমাদের বর্তমান আলোচনার বিষয় নয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে রচিত এই কাব্যে বিধৃত বেহুলা লখিন্দরের বাসরঘর হিসেবে ঠিক কবে থেকে গোকুল মেধকে জনসাধারণ চিহ্নিত করে আসছে সেই প্রশ্নটি আপাতত তোলা থাক। গোকুল মেধকেই সেই ঘর হিসেবে চিহ্নিতকরণের পেছনে আদৌ কোনো যৌক্তিকতা আছে কিনা সেটি একটু আলোচনা করা যাক। 

গোকুল মেধের প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এ আলোচনাকে সহজ করতে পারে বলে মনে হয়।  বগুড়া সদর উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত গোকুল গ্রামে অবস্থিত এ প্রত্নস্থল মহাস্থানগড় থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। ১৯৩৪-৩৬ সালে ননী গোপাল মজুমদার কর্তৃক খননের ফলে এখানে একটি বিশাল স্থাপনার ভিত্তি উন্মোচন হয়েছে। ইটের তৈরি এ ভিত্তি স্তরে স্তরে উঁচু করে কুঠুরি নির্মাণ রীতিতে তৈরি (terraced cellular style of construction)। এখানে ১৭২টি কুঠুরি বিভিন্ন তলে মাটি দিয়ে ভরাট করে নিচ থেকে ওপরের দিকে ক্রমহ্রাসমান করে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে এগুলো কোনো সুউচ্চ মন্দির বা ভবনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এরূপ নির্মাণশৈলী প্রাচীন বাংলার একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য। বন্যার পানির হাত থেকে বাঁচাতে এভাবে উঁচু ভিত্তির ওপর স্থাপনা নির্মাণ করা হতো। গবেষকদের মতে, নবম শতাব্দীতে (পাল যুগ) এখানে একটি বৌদ্ধ মঠ নির্মিত হয়েছিল। এখানে ছয়-সাত শতকের (পরবর্তী গুপ্ত যুগের) কিছু পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে। পরবর্তী সময়ে এগারো-বারো শতকের দিকে (সেন যুগে) এখানে বারান্দাসহ একটি শিব মন্দির তৈরি করা হয়। এ মন্দিরে বহু গর্তযুক্ত একটি ছোট পাথরের টুকরোর সঙ্গে ষাঁড়ের প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ একটি সোনার পাত পাওয়া গেছে। এ থেকে ধারণা করা হয় যে এটি একটি শিব মন্দির ছিল। তবে বর্তমানে গোকুল মেধ বলতে যেটুকু দেখা যায় তা কেবলই স্থাপনাটির ভিত্তির অংশ। কালের বিবর্তনে মূল স্থাপনাটি ধ্বংস হয়ে গেছে। অর্থাৎ বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর হিসেবে এর কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পাঠক ভাবতেই পারেন শিব মন্দির কী করে বাসরঘরের তকমা পেল। জনসাধারণ নিশ্চয়ই হঠাৎ করে একদিন এ ঢিবিকে বেহুলা লখিন্দরের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেনি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মিথ তার জনগণের প্রথা ও পরম্পরার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকে। সেই বিষয়টি চিন্তায় রেখেই আলোচনার ইতি টানা যাক কয়েকটি কথায়। প্রথমত, গোকুল মেধের বিচিত্র নকশাই এটিকে মনসামঙ্গলের সেই নিশ্ছিদ্র ঘর বলে মনে করার কারণ হয়ে থাকতে পারে। ভূমি থেকে সুউচ্চ ভিত্তির ওপর যে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল সেটি শিব মন্দির হোক আর যাই হোক, সাপের পক্ষে সেখানে প্রবেশ করা অসম্ভব না হলেও কিছুটা প্রতিবন্ধকতার তো বটে। দ্বিতীয়ত,  চাঁদ সওদাগর ছিলেন শিবের উপাসক। গোকুল মেধের শিব মন্দিরকে তাই জনগণ পুত্রের জন্য নির্মিত চাঁদ সওদাগরের ঘর ভেবে থাকতে পারেন। 

সহায়ক গ্রন্থাবলি

১. বাংলাপিডিয়া

২. বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া 

৩.  World Heritage Journeys of UNESCO 

খুরশিদ জাহান: প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ