প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর।
কোয়ান্টাস এয়ারলাইন্সের বিমান অস্ট্রেলিয়া অভিমুখীন। মাহিম কলম্বো প্ল্যান স্কলারশিপে ওই দেশে যাচ্ছে। ঢাকা থেকে ব্যাংকক, ব্যাংকক থেকে সিডনি, তারপর অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী শহর ক্যানবেরায়। সবসুদ্ধ ১৩-১৪ ঘণ্টার আকাশপথ। এর আগেও সে প্লেনে চড়েছে, তবে খুব অল্প দূরত্বে হেলেদুলে চলা ডিঙি বা কোসা নাওয়ের মতো ছোট ছোট প্লেনে। এ প্লেনটা বেশ বড় আকৃতির। এ মাথা থেকে ওই মাথা বেশ দূরে। প্রতি ফ্লাইটে নাকি ৩০০ প্যাসেঞ্জার টানে।
দুই.
উড্ডীন উড়োজাহাজটিতে রাত গভীর হতে থাকলে সব বাতি নিভিয়ে দেয়ার ঘোষণা আসে। বড় বড় ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া উড়োজাহাজে নৈশভোজের পর যাত্রীদের ঘুমের ব্যবস্থা। নিবু নিবু বাতিতে পুরো প্লেনে সুনসান নীরবতা, ভুতুড়ে আলোছায়ার হাতছানি। মাহিম এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে, গভীর নিদ্রায় মগ্ন কেউ নাক ডাকছে, কারো মাথা ঝুলে পড়েছে, তন্দ্রার আবেশে ঢুলছে কেউ। অনেকে আবার হেডফোন লাগিয়ে সিনেমা দেখছে, গান শুনছে। ঠিক পাশের সিটের বিদেশী মেয়েটা কটা চোখে কম্বল জড়িয়ে নিজের সিটের ওপর সুইচের আলোয় বইয়ে নিরুদ্বিগ্ন নিলীন; ক্ষণে ক্ষণে রুপালি চুল পাঁচ আঙুলের ফাঁকে পেছনে ফেলছে।
মাহিমের চোখে কিন্তু ঘুমের লেশমাত্র নেই। চলন্ত গাড়িতে, বিশেষত প্লেনে কখনো ওর ঘুম আসে না। এ কথা বললে অন্যরা হেসে লুটোপুটি খায়, কিন্তু মাহিম খুব সিরিয়াস। সবকিছু সবসময় হালকা করে দেখতে নেই, বিশেষত যদি হয় মৃত্যুর ব্যাপারস্যাপার। ক্ষুদিরাম ছাড়া এ পর্যন্ত হাসতে হাসতে কেউ মৃত্যুবরণ করেছে বলে তো মনে পড়ে না। ধরা যাক, যদি ঘুমের মধ্যে প্লেনটা ক্র্যাশ করে বা বাস খাদে পড়ে? জেগে থাকলে তো অন্তত ঝাঁপ দিয়ে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা করা যায়, তাই না? লাইফ ইজ মোর ইম্পর্ট্যান্ট দ্যান স্লিপিং। বেঁচে থাকলে জীবনে অনেক ঘুমানো যাবে; এখন জেগে জেগে কষ্ট করাই বেহতর কাজ।
ককপিট থেকে ক্যাপ্টেনের ঘোষণা মাহিমের কানে বাজে: ‘প্লেনটি এখন ৩৩ হাজার ফুট ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৯০০ কিলোমিটার বেগে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে বাম্পিং হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তবে ভয়ের কিছু নেই, আপনি ভ্রমণ উপভোগ করুণ, সিট বেল্ট বেঁধে রাখুন ইত্যাদি ইত্যাদি...।’
তিন.
তামাকের গন্ধ ভেসে আসে; শর্টসার্কিট থেকে আগুনে কিছু পুড়ছে না তো? ভীত চোখে মাহিম একটু পেছনে তাকিয়ে দেখে, বেশ কজন যাত্রী জাহাজের লেজের দিকটায় টয়লেটের পাশে সিগারেট ফুঁকছে। এ মুহূর্তে মাহিমেরও একটা সিগারেট খেতে নেশা জাগে আর পকেটে সিগারেট ও ম্যাচ আছে। সে চেইন স্মোকার না হলেও নিয়মিত সিগারেট টানার অভ্যাস ছোটকাল থেকেই। এখন দুশ্চিন্তায় নিকোটিনের অভাব আরো বেশি তীব্রভাবে বোধ করছে? মৃত্যুর ভয়, অনেকগুলো ভাই-বোন নিয়ে বাবা-মা জেরবার, ফেলে আশা নববধূ ইত্যাদি।
এ মুহূর্তে আরো একজনের মুখও তার মানসপটে ভেসে ওঠে। সে হচ্ছে মহুয়া। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ‘ডি’ সেকশনে মাহিমের সঙ্গেই পড়ত। আয়ত চোখ, লম্বা কালো ঘন চুল পিঠ বেয়ে কোমর পর্যন্ত বিছানো। ধর্মসাগরের পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে কিংবা পার্কের বেঞ্চে বসে বাদাম খেতে খেতে কতবার মাহিম ওকে বলেছে, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ’, ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকায...।’ বেশ কিছুদিন পড়াশোনার নোট চালালির পর মন চালাচালিও চলল। কিন্তু ব্যাটে-বলে সংযোগ হলো না বড় মামার জন্য? ‘বুঝলে বুবু, ভাগ্নে বিয়ে দিতে হবে খুব বড় বাড়িতে। তোমার ছেলেকে বিয়ে দিতে হবে আমলার মেয়ের সঙ্গে...।’ সব শুনে মাহিম প্রতিবাদ না করে ‘কাপুরুষের’ মতো চুপ করে ছিল। না থেকে উপায় কী, খুব ছোট বয়সে চার-পাঁচটা ভাই-বোন রেখে বাবার মৃত্য ঘটলে এ মামাই কোলেপিঠে করে মাহিমদের মানুষ করেছে। হ্যাঁ, তার মেধা ছিল এটা সত্যি, কথা কিন্তু এ দেশে অর্থের অভাবে অনেক মেধা নষ্ট হয়। সুতরাং ‘মজনু’ হয়ে মামার বিরুদ্ধে মুখ খোলা একটু ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া যা হওয়ার তা হয়েছে। পাস্ট ইজ পাস্ট। বিয়ে করেছে এটাই বড় কথা; পুরনো প্রেমিকা নিয়ে ভাবতে চাইছে না বা চাওয়া ঠিক নয়। তবে এটা তো ঠিক যে, প্রথম প্রেমের স্মৃতির মূর্ছনা মুছতে চাইলেও মোছা বেশ কঠিন।
চার.
সিগারেট টানতে টানতে মাহিম টের পেল, টয়লেটলাগোয়া একটা সিটে এক লোক মদ খেয়ে বুঁদ হয়ে আছে। চোখ ফেলতেই বাংলায় শুধায়, ‘হ্যালো, চলবে নাকি এক পেগ?’ লোকটির কথায় তার প্রচণ্ড রাগ ধরে। ফাজিল কোথাকার, মদ খেয়ে যেন কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। মনে মনে গালিও দিল, ‘শালা, তুই জাহান্নামে যেতে চাস যা, আমাকে টানিস কেন।’ মাহিম এমনিতে মদ খায় না, যদিও ঢাকা ছাড়ার আগে অনেকে বলেছে ঘুম না এলে একটা বা দুটা বিয়ার খেয়ে নিতে। ছোটবেলায় দেখেছে মদ্যপ শচীন কাকু মাসিমাকে খুব মারধর করত। সারা পাড়ায় হইচই বাধিয়ে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাত। মদ পান মানেই মাতলামি করা। যে দেশে যাচ্ছে, সেই অস্ট্রেলিয়া নাকি পৃথিবীর অন্যতম বিয়ার পানকারী দেশ; নিশ্চয় ওখানকার মানুষ ঘরে-বাইরে, সকাল-বিকাল বিয়ার খায় এবং কথায় আছে, বি রোমান হোয়েন ইন রোম। ওই দেশে পার্টিপুর্টিতে বিয়ার না খেয়ে কী করে থাকবে, সে দুশ্চিন্তাও আপাতত তাকে ফালা ফালা করছে।
পাঁচ.
ধূমপান শেষে মাহিম নিজের সিটে ফিরে আসে। পাশের মেয়েটি তখনো মাথা নিচু করে বই পড়ায় মগ্ন। এজন্যই তো ওদের দেশে উন্নতি ঘটে। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর প্লেন উড়ছে। মাঝে মধ্যে বাম্পিং জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে, আর মেয়েটি কিনা মৃত্যু চিন্তা ফেলে দিয়ে ভাবলেশহীন নির্বিকার বই পড়ছে। অথচ দোয়াদরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দিতে দিতে মাহিমের গলা প্রায় শুকিয়ে যাচ্ছে। আর ওই যে বাঙালি লুচ্চা হারামজাদাটা, সে নিশ্চয় এতক্ষণে টাল হয়ে রংধনু দেখছে।
ছয়.
সিটের ডান দিকের সারির শেষ মাথায় বিদেশী এক মেয়ে ও এক ছেলে ঢলাঢলিজাতীয় আপত্তিকর দৃশ্যে মেতে আছে। ‘ওয়াস্তাগ ফিরুল্লাহ নাউজুবিল্লাহ মিনজালেক’ পড়ে মাহিম চোখ সরিয়ে নিল। তার মা বলতেন, হাসরের মাঠে শরীরের সব অঙ্গই সাক্ষী দেবে; সুতরাং চোখকে সে সুযোগ দেয়া যাবে না। আচ্ছা, এদের কি মৃত্যুর ডর-ভয় নেই? আরে করবি তো কর একটু রাখঢাক রেখে কর, আগে প্লেনটা নামতে দে, তাই না? ওদের পাপের শাস্তি না জানি সবাইকে পেতে হয়। দুশ্চিন্তায় মাহিমের শরীর যেন হিম হয়ে গেল।
সাত.
‘ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সিডনি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অবতরণ করব। যার যার সিটে বসে সিট বেল্ট বেঁধে রাখুন। কোয়ান্টাসে ফ্লাই করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা করি, আবার দেখা হবে...।’ পাশের সিটের মেয়েটি জানালার শেড তুলে দিলে ভোরের আলোয় নীল আকাশ চোখে পড়ে। হঠা? মাহিমের মনে পড়ল, আরে এতক্ষণ ধরে মেয়েটির নাম পর্যন্ত জানা হলো না, এ কেমন কথা?
ঃ হোয়াট ইজ ইওর নেম?
ঃ মাই নেম ইজ নিশা উইলিয়ামস, ইওরস?
ঃ মাই নেম ইজ মাহিম। গ্লাড টু মিট ইউ। গোয়িং টু অস্ট্রেলিয়া।
ঃ ওহ, গ্রেট। আই অ্যাম ফ্রম অস্ট্রেলিয়া।
মাহিম আর কথা বাড়াল না। আসার আগে শুনেছে, অস্ট্রেলয়ীদের ইংরেজি ভালো না। ওরা ‘ডে’কে বলে ‘ডাই’। একবার এক বাঙালি ছাত্রকে বলা হলো, হ্যভা ইউ কাম টু ডাই? ছেলেটির তা?ক্ষণিক উত্তর— নো, নো, আই হ্যাভ নট কাম টু ডাই ইন অস্ট্রেলিয়া, আই হ্যাভ কাম টু স্টাডি!
অবশেষে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে দেখে, তার আগে জনা চারেকের মধ্যে একজন মহিলা। লম্বা চুল ও আয়ত চোখে ঠিক যেন মহুয়ার মতো। ‘ধ্যা?, কী যে এলেবেলে ভাবছি আমি, এবার মাথাটা একবারে গেছে। মহুয়া এখানে আসবে মরতে নাকি?’ ইমিগ্রেশন ফরমালিটিজ শেষ করে মহিলা যেই না নিচে রাখা ব্যাগটা তুলতে গেছে, মাহিম দেখল, খুব দ্রুত ধাবমান সেই মহুয়া। ডাকতে যাওয়ার মুহূর্তে ‘নেক্সট প্লিজ’ বলে হাতে ইঙ্গিত করে ইমিগ্রেশন অফিসার।
বেল্ট থেকে লাগেজ তুলে নিয়ে মাহিম ট্যাক্সিতে ওঠে। ঠোঁটের কোণে জ্বলন্ত সিগারেটে লম্বা টান আর কপালের ভাঁজে একরাশ চিন্তার চিহ্ন।






