ভয়াবহ এক মহামারীর মুখোমুখি বিশ্ব টলমল। এক নভেল আর প্রাণঘাতী প্লেগ পৃথিবীর চারপাশে তার শুঁড় বিস্তার করে চলেছে। এটি মানব জনগোষ্ঠীকে বিনাশ করতে শুরু করেছে এবং একই সঙ্গে তাদের পরস্পর সংযুক্ত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে উত্তরোত্তর দুর্বল করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অভিজাত একটি দল একটি প্রশ্ন সামনে রেখে একত্র হয়, বিশ্বব্যাপী এ স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় কী করা যেতে পারে?
এ গল্পের
রূপরেখা কমবেশি
সবারই পরিচিত।
কিন্তু এখানে
মোটেও কভিড-১৯-এর
প্রসঙ্গ টানা
হয়নি। বরং
কালজয়ী এক
সাহিত্যকর্মের প্লটের
কথা মনে
করিয়ে দেয়া
হচ্ছে। তা
হলো বৈশ্বিক
প্লেগ সম্পর্কিত
১৮২৬ সালে
ছাপা হওয়া
মেরী শেলীর
ভবিষ্যকল্প উপন্যাস,
‘দ্য
লাস্ট ম্যান’।
তার এ
উপন্যাসে বৈশ্বিক
প্লেগের রাজনৈতিক
কারণ এবং
এর যৌথ
সমাধানের ইঙ্গিত
রয়েছে।
শেলী মনে
করতেন, মহাদেশব্যাপী
ব্যাপ্ত এমন
একটি মহামারী
রাজনীতির দ্বারা
সৃষ্ট। আন্তর্জাতিক
হওয়ার সুযোগ
থাকার পরও
এ রাজনীতি
যার যার
অবস্থান থেকে
অত্যন্ত গভীরভাবে
ব্যক্তিগত। সর্পিল
এ স্বাস্থ্য
সংকট সৃষ্টির
কারণ হয়তো
জনতা এবং
তাদের নেতারা
যেসব কর্মকাণ্ড
সংঘটিত করেছেন
এবং আন্তর্জাতিক
অঙ্গনে যা
যা সম্পাদন
করতে ব্যর্থ
হয়েছেন—বাণিজ্য, যুদ্ধ
ও আন্তঃব্যক্তিগত
দরকষাকষি, চুক্তি,
সমঝোতা আর
দ্বন্দ্ব, যা
তাদের সামনের
দিকে এগিয়ে
নেয়।
বরাবরই বিজ্ঞানীদের
এমন সতর্কবাণী
শুনে আসছি
যে আমরা
‘মহামারীর
যুগে’
প্রবেশ করতে
যাচ্ছি। ঠিক
এমন এক
সময় আমরা
‘দ্য
লাস্ট ম্যান’ পড়ে
খানিকটা হলেও
লাভবান হতে
পারি। কারণ
এ উপন্যাসের
মাঝে মেরী
শেলী তার
পাঠকদের মানবসৃষ্ট
বৈশ্বিক বিপর্যয়ের
ঝুঁকি যৌথভাবে
মোকাবেলার জন্য
একটি অস্তিত্ববাদী
মানসিকতা প্রদান
করেছেন।
‘দ্য লাস্ট ম্যান’ এমনই
যে উপন্যাসটি
কারো পড়া
না থাকলেও
এর মূল
গল্প বা
প্লট আসলে
সবারই জানা।
বৈশ্বিক প্লেগ
থেকে আপাতভাবে
বেঁচে যাওয়া
একমাত্র ব্যক্তির
আকর্ষণীয় এক
ইতিহাসের বয়ান
এখানে উপস্থাপিত
হয়েছে। ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-এর
মতোই ‘দ্য লাস্ট
ম্যান’ বৈজ্ঞানিক
কল্পকাহিনীগুলোতে বারবার
পুনর্নির্মিত হয়ে
আসছে। এডগার
অ্যালান পোর
সৃষ্টিকর্ম থেকে
শুরু করে
১৯৬৪ সালে
নির্মিত ভিনসেন্ট
প্রাইসের রোমহর্ষক
পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র
‘দ্য লাস্ট ম্যান
অন আর্থ’সহ
আরো অসংখ্য
জিন্দালাশের মহাপ্রলয়সংবলিত
সৃষ্টিকর্ম এ
উপন্যাসের দ্বারা
অনুপ্রণিত। এ
সিনেমায় দেখতে
পাওয়া যায়,
অতিমারাত্মক এক
সংক্রমণে আক্রান্ত
মানুষ ভ্যাম্পায়ারে
পরিণত হওয়ার
পর কীভাবে
বিশ্বের সর্বশেষ
জীবন্ত মানুষটিকে
হত্যা করে
পৃথিবী থেকে
মানুষ নামের
জীবটিকে চিরদিনের
জন্য বিদায়
নিতে বাধ্য
করে।
১৮১৬-এর
গ্রীষ্মে লর্ড
বায়রন তার
ডাক্তার পলিডরি
ও শেলী
দ্বয়—পার্সি
ও তার
স্ত্রী মেরী—জেনেভা
হ্রদের পাশে
ছোট্ট একটি
বাড়িতে জড়ো
হন। সেখানে
বেড়ানো, নৌকা
চালনা ও
মজার সব
গল্প পড়ে
সময় কাটানোর
এক পর্যায়ে
এ নিয়ে
তাদের মাঝে
বাজি হয়,
তাদের মাঝে
কে সবচেয়ে
সেরা রোমহর্ষক
গল্পটি লিখতে
পারে। এ
বাজির পর
জন উইলিয়াম
পলিডরির লেখা
‘দ্য
ভ্যাম্পায়ার’ লোককাহিনীর
বাইরে পশ্চিমা
বিশ্বের প্রথম
ভ্যাম্পায়ার গল্প।
এর পরের
রাতগুলোয় মেরী
শেলী অদ্ভুত
সব দুঃস্বপ্ন
দেখতে থাকেন।
তার এসব
স্বপ্ন থেকেই
কালজয়ী উপন্যাস
ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের জন্ম।
বারবার পড়ার
মতো, মাত্র
১৮ বছর
বয়সী একটি
মেয়ের আবিষ্কার
বিয়োগান্তক ক্ষমতাসম্পন্ন
বর্ণনাধর্মী এ
উপন্যাস একটি
চিরকালীন পুস্তক
হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের
মহাসড়কে স্থায়ী
জায়গা করে
নেয়। ঠিক
এমন অনিশ্চিত
এক সময়ে
উপন্যাসটি লেখা
হয়, যখন
মানবজাতির প্রতি
প্রাকৃতিক বিশ্ব
তার মহাপ্রলয়ের
অদ্ভুত আপাত
আগাম বার্তার
সব আলামত
হাজির করছিল।
নির্বাসন আর
বিচ্ছিন্নতা মেরী
শেলীর দ্য
লাস্ট ম্যানের
মূল বিষয়বস্তু।
এ বিষয়বস্তুগুলোর
বাস্তব উদাহরণ
লাইনেল ভারনেই
এ গল্পের
শেষ অবধি
একমাত্র জীবিত
ব্যক্তি। ধীরে
ধীরে সে
অবলোকন করে,
তার ভালোবাসার
মানুষেরা আর
তাকে ঘিরে
থাকা সবাই
মহামারী প্লেগে
আক্রান্ত হয়ে
একে একে
মৃত্যুর কোলে
ঢলে পড়ে
সভ্যতাকে অচল
করে দিচ্ছে।
সর্বশেষে সে
শুধু বই
আর প্রকৃতির
যাবতীয় ঐশ্বর্যের
মাঝে নিজেকে
সম্পূর্ণ একা
আবিষ্কার করে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
ধারার জন্মের
বেশ আগে
মেরী শেলী
এটি লিখেছেন
বলে বর্তমানে
একে পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপ্টিক
তথা মহাপ্রলয়-পরবর্তী
ও ভবিষ্যদ্বাদী
উপন্যাস বলে
গণ্য করা
হয়। কারণ
এ উপন্যাসের
বেশির ভাগ
ঘটনাই সংঘটিত
হয় সুদূর
ভবিষ্যতে। ২০৯০
থেকে শুরু
করে ২১০০
সাল পর্যন্ত
সামাজিক যাবতীয়
অবিচার, আনাচার
ও প্রচণ্ড
দুর্ভোগের মাঝে
প্লেগের এক
মহামারীতে ইউরোপের
সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠী—সম্ভবত
বিশ্বের সব
মানুষের, যদিও
শেষ পর্যন্ত
তা অজানাই
থেকে যায়—বিলুপ্তির
ঘটনা চিত্রিত
হয়েছে।
ভাববাণী জানতে
পারা যেত
সিবল গুহা
বলে কথিত
এমন এক
প্রাচীন গুহার
ভেতর চাপা
পড়ে থাকা
পাথরের খণ্ডের
মাঝে। ১৮১৮
সালে এ
গল্পের সন্ধান
মেলে। প্রাচীন
সেই পাথরের
খোদাইকর্মের মাঝে
অতীতের স্মৃতিচারণ
হিসেবে ভবিষ্যৎ
প্রজন্মের জন্য
একুশ শতক-পরবর্তী
ধ্বংসাত্মক প্লেগ
মহামারীর কথা
সংরক্ষিত আকারে
পাওয়া যায়।
এর কথক
সাঁইত্রিশ বছর
বয়সী লাইনেল
ভারনেই। যে
কিনা তার
জানামতে পৃথিবীর
সর্বশেষ জীবিত
মানুষ। সমুদ্রে
পাড়ি জমানোর
আগে ২১০০
সালে সে
তার এ
বিবরণ লিপিবদ্ধ
করে রেখে
যায়। একজন
আকর্ষণীয়, কাণ্ডজ্ঞানহীন
পিতার সন্তান
হিসেবে লাইনেল
তার শিশুবেলার
বর্ণনা করেছেন,
যিনি একজন
আত্মবিশ্বাসী ও
প্রজাপ্রিয় ইংরেজ
রাজা হলেও
রানীর দ্বারা
ত্যক্তবিরক্ত। রাজার
মৃত্যুর পর
এতিম লাইনেল
ভারনেই ও
তার ছোট
বোন পার্দিতা,
অভিজাত বৃত্ত
থেকে ছিটকে
পড়ে। এভাবে
বাধ্য হয়ে
হতদরিদ্র অবস্থায়
তারা জীবন
ও জীবিকার
সন্ধানে পথে
নামে।
বাইবেলের বুক অব রিভিলেশনের
সময় থেকেই
পৃথিবী ধ্বংসের
দুশ্চিন্তা সাংস্কৃতিকভাবেই
ব্যাপকতা পেয়ে
আসছে। যদিও
মেরী শেলী
যখন দ্য লাস্ট
ম্যান
লেখেন, ধাপে
ধাপে বাড়তে
থাকা অসুস্থতা
বা প্লেগ
একসময় পুরো
মানবজাতিকে ধ্বংস
করে ছাড়বে
এমন বিষয়
ইতিহাস ও
রাজনৈতিক আলোচনার
টেবিলগুলোয় বিশেষ
গুরুত্ব পেয়ে
এলেও সেই
রোমান্টিক যুগে
তা লেখার
বিষয়বস্তু হিসেবে
অপরিহার্যতাই খুব
একটা জনপ্রিয়
ছিল না।
ব্রিটিশ রোমান্টিক
যুগের লেখকদের
খুব কমই
ব্যক্তিগত জীবন
ও ধর্মের
নিরিখে তাদের
নিজস্ব ও
সামগ্রিক নীতিনৈতিকতা
প্রতিবিম্বিত করতে
মহাপ্রলয়ের আতঙ্ক
ও সংক্রামক
প্লেগের মতো
উপাদান ব্যবহার
করতে দেখা
যায়। আরো
সুনির্দিষ্ট করে
বললে উনিশ
শতকের লেখকেরা
খুব কমই
মানবসত্তার নৈতিক
ও ধর্মীয়
ত্রুটিগুলোকে একটি
উপদেশাত্মক রূপক
হিসেবে সভ্যতার
লয়কে চিত্রিত
করেছেন।
মেরী শেলীর
দ্য
লাস্ট ম্যান ছিল
তার স্বামী,
পার্সি বিস
শেলীর মৃত্যুর
পর লেখা
তার প্রথম
উপন্যাস। তার
ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতি
ও শোক
উপন্যাসের উপাদানগুলোর
ও মহাপ্রলয়ের
একটি রূপক
সৃষ্টির সিদ্ধান্তের
মধ্য দিয়ে
ফুটে উঠেছে।
অনেক সমালোচক
তবু তার
লেখার মধ্য
দিয়ে সর্বজনীন
ও ব্যক্তিগত
বিশ্বের সঙ্গে
তার এ
সংযোগ স্থাপনকে
একটি দুর্বলতা
বলে চিহ্নিত
করেন। এ
প্রসঙ্গে সাংস্কৃতিক
ইতিহাসবিদ ও
বিখ্যাত সাহিত্য
সমালোচক মেরী
পুভী বলেন,
এ উপন্যাস
হলো ‘আত্মকরুণার একটি
সরল প্রবৃত্তি।’ অন্যান্য
সমালোচকও গতানুগতিক
মানে তুলনা
সম্ভব নয়
এমন একটি
কাহিনী হিসেবে
দ্য
লাস্ট
ম্যানের অবস্থানকে
খারিজ করে
দেন। এ
দলের একজন
হলেন অ্যান
কে মেলোর।
তার মতে,
শেলী ভীষণভাবে
অন্যদের ওপর
নির্ভরশীল ছিলেন।
একইভাবে মাইকেল
এবারলে-সিনাত্রা
দাবি করেন
যে উভয়
শেলীর প্রথম
ও মেরী
শেলীর তৃতীয়
উপন্যাস একটি
সংগ্রামের সাক্ষী।
এর প্যারাটেক্সট
তথা লেখার
অন্যান্য উপাদান
ও টেক্সট
অর্থাৎ লেখার
মাঝে তাকে
একাধারে একজন
প্রচ্ছন্ন পুরুষ
লেখক, একজন
নারী লেখক,
অবস্থানচ্যুত লেখক
অথবা একজন
অনির্ণীত লৈঙ্গিক
লেখক হিসেবে
উপস্থিত থাকতে
হয়েছে। তার
এ সংগ্রাম
ছিল এমন
এক সংগ্রাম,
যার মাঝে
একাধারে ‘আতঙ্ক’ ও
‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ মূল
নিয়ন্তা হিসেবে
কাজ করেছে।
সাধারণত এ
উপন্যাসের সমালোচনাগুলোয়
তার স্বামীর
স্মৃতিচারণ ও
উপন্যাস মধ্যস্থ
অ্যাংলোকেন্দ্রিকতার নজিরসহ
আত্মজৈবনিক উপাদানগুলোর
ওপর নজর
দেয়া হয়েছে।
সোহরাব সুমন: কবি ও অনুবাদক





