রয়টার সবসময় চেয়েছেন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, সাংবাদিকের মতামত নয়। ১৮৭৮ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। অবসরে গেলেও পল ইউলিয়াস রয়টার বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনার লক্ষ্যে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। তিনি চেয়েছেন যা ঘটেছে, কেবল তার বিবরণ— রঙ মেশানো বিশেষণ লাগানো বর্ণনা নয়; রয়টারের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহূত হওয়ার সুযোগ দিতে তিনি অসম্মত ছিলেন। তার প্রচেষ্টায় কেবল সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে নয়, সংবাদ সংস্থাগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে, দেরিতে হলেও কোনো এজেন্সির ভৌগোলিক একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙেছে, সরকারের আনুকূল্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে

 

শুভ দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী পল ইউলিয়াস ফ্রাইহার ফন রয়টার। দেশ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষ যে একটিই সম্প্রদায়, আপনি তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন এবং কিছুটা সফল হয়েছেনও। আপনাকে পুনরায় অভিনন্দন।

বাবা স্যামুয়েল লেফি ইয়োসেফাত একজন র্যাবাই— ইহুদি ধর্মযাজক মা বেটি সান্ডার্স। ইসরায়েল বিয়ার ইয়োসেফাতের জন্ম ১৮১৬ সালের ২১ জুলাই জার্মানির কাসেলে। ৩০ বছর বয়সে লন্ডনে সেন্ট জর্জের জার্মান লুথারিয়ান চ্যাপেলে ধর্মান্তরিত। নব্য প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান ইসরায়েলের নাম হলো পল ইউলিয়াস রয়টার। জার্মানি ছেড়ে লন্ডন যাওয়ার সময় তিনি নিজেই নামের খানিকটা সংশোধন করে ইউলিয়াস ইয়োসেফাত করে নিয়েছিলেন। ১৩ বছর বয়সেই তাকে জীবিকার প্রশিক্ষণ নিতে গোটিগেনে তার চাচার ব্যাংকে পাঠানো হয় এবং তিনি সাগ্রহে কাজ শেখেন। সেখানে গোটিগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত শিক্ষক গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল ফ্রেডরিখ গসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তার স্নেহধন্য হন। পরিচিতির সূত্র হচ্ছে, তিনি ব্যাংকে মুদ্রা ভাঙাতে গিয়ে বিনিময় মূল্যের হিসাবে ভুল করছিলেন, এই বালক তা সংশোধন করে দেন। এই বিজ্ঞানী তখন ইলেকট্রোটেলিগ্রাফি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। বিষয়টি তাকে খুব আকৃষ্ট করে। ১৮৪০-এ তিনি তার এক বন্ধুর সঙ্গে সীমিত আকারের একটি প্রকাশনা ব্যবসায় নামেন। রাজশাসনামলে তিনি গণতান্ত্রিক চেতনা ও চর্চার ওপর কিছু পুস্তিকা ও প্রচারপত্র প্রকাশ করে অচিরেই কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হন এবং বার্লিনে বসবাস তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৮৪৮-এ তিনি বার্লিন ছেড়ে প্যারিসে চলে আসেন। ১৮৪৮-এ ইউরোপজুড়ে রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন চলছিল। শুরুটা সিসিলিতে, তার পর ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও অস্ট্রীয় সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপীয় উদারপন্থীদের এ আন্দোলন কঠোর নিপীড়নের মাধ্যমে দমন করা হয়। প্রাথমিকভাবে আন্দোলনটি ব্যর্থই হয়।

তার আগে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার ঠিক এক সপ্তাহ পর বার্লিনের এক ব্যাংকার কন্যা আইডা মারিয়া এলিজাবেথকে একই চ্যাপেলে বিয়ে করেন। রয়টার সুদর্শন ছিলেন না, কিন্তু আইডা সৌন্দর্যের জন্য সুখ্যাত ছিলেন। তার আপ্রাণ স্বামীকে সহযোগিতা করার কাহিনী প্রচলিত আছে।

প্যারিসে এসে রয়টার অনুবাদের কাজ হাতে নিলেন। দিনের প্রয়োজনীয় সংবাদগুলো সংক্ষেপে ফরাসি থেকে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে পাঠাতে শুরু করলেন। কিন্তু ফরাসি সরকারের কঠোর বিধিবিধানের কারণে নিজের নিউজ এজেন্সি দাঁড় করাতে পারলেন না। বাধ্য হয়ে ফ্রান্সের হাভাস এজেন্সির অনুবাদক হিসেবে কাজ করতে থাকলেন। কিন্তু নিজের ইচ্ছা তাতে পূর্ণ না হওয়ায় আবার ফিরে এলেন জার্মানিতে। একেবারে পশ্চিম সীমান্ত শহর আখেনে। সেখানে একটি নিউজ এজেন্সি স্থাপন করলেন। তার মাথায় তখন কাজ করছে ‘কবুতর ডাক’— পিজিয়ন পোস্ট।

রোমান সাম্রাজ্যে দূরের ডাক আনা-নেয়ায় কবুতর কাজে লাগানো হতো। ১৮৪০-এ লন্ডন ব্রাসেলস ও প্যারিসের মধ্যে কবুতর ডাকের প্রচলন ছিল। ১৮৪৫ ইউরোপের প্রধান সবক’টি শহরে কবুতর ডাক চালু হয়ে যায়। ১৮৪৬-এ বেলজিয়ামের ফ্লেমিশ অধ্যুষিত শহর অ্যান্টওয়ার্পে পত্রবাহী কবুতরের সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার।

পল ইউলিয়াস রয়টার ব্রাসেলসে হেনরিখ গেলার নামক একজন ব্যাংকার, মাদক চোলাইকারী ও কবুতর ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে সংবাদ পরিবহনে তার সহায়তা চান। গেলার রয়টার দম্পতিকে কিছুদিন নিজবাড়িতে রাখেন এবং ব্যবসায়িক কাজে তার গ্যারান্টার হন। ১৮৫০ সালে ২৬ জুলাই রয়টার-গেলার চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী গেলারের ৪০টি প্রশিক্ষিত কবুতর ব্রাসেলস থেকে ৭৬ মাইল দূরে আখেন পর্যন্ত সংবাদ আনা-নেয়ার দায়িত্ব পালন করবে। পাতলা কাগজে খবরটি লিখে সিল্কের হালকা ব্যাগে বেঁধে কবুতরের গায়ে সেঁটে দেয়া হবে। পাছে কোনো কবুতর গন্তব্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয় এ আশঙ্কায় শুরুতে একই খবর পরিবহনের জন্য তিনটি কবুতরকে বেছে দেয়া হতো। আখেন পর্যন্ত টেলিগ্রাফ আইন থাকায় রয়টারের আখেন অফিসের কর্মচারীরা তা টেলিগ্রাফের মাধ্যমে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠিয়ে দিতেন।

তত দিনে বার্লিন-আখেন টেলিগ্রাফ লাইন একেবারে বেলজিয়াম সীমান্তের কাছাকাছি ভ্যালেন্স পর্যন্ত টানা হয়ে গেছে। আট মাস পরেই রয়টারকে পিজিয়ন পোস্ট সার্ভিস থেকে সরে যেতে হলো। তত দিনে বহু প্রশিক্ষিত কবুতর কার্যত বেকার হয়ে পড়ে।

ব্রাসেলসে রয়টারের অফিস থেকে নতুন গন্তব্যের দূরত্ব মাত্র পাঁচ মাইল। এই পাঁচ মাইলের জন্য ঘোড়ার ডাকের (ভারতে শেরশাহর শাসনকালে, ১৫৪০-৪৫, ঘোড়ার ডাকের প্রচলন হয়) শরণাপন্ন হন। কয়েকজন অশ্বারোহী নির্দিষ্ট সময় পর পর এপারের সংবাদ ওপারে দিয়ে আসত, ওপারেরটা নিয়ে আসত এপারে।

ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফের বিস্তার খুব নির্মমভাবে তাত্ক্ষণিকভাবেই কবুতর ডাক ব্যবস্থা নিশ্চিহ্ন করে দিল। কবুতরের বহু আগে ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফ সংবাদ পৌঁছে দিতে পারে। অবশ্য তখন কেউ ভাবেননি একইভাবে ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফকে একদিন অন্য কোনো প্রযুক্তি এসে হটিয়ে দেবে।

১৮৫২ সাল পর্যন্ত টেলিগ্রাফের তার কতটা সম্প্রসারিত ছিল, সেটির একটি হিসাব পাওয়া যায়—

যুক্তরাষ্ট্র: ২৩ হাজার মাইল

ব্রিটেন: ২ হাজার ২০০ মাইল

প্রুশিয়া (জার্মানি): ১ হাজার ৪০০ মাইল

অস্ট্রিয়া: ১ হাজার মাইল

কানাডা: ৯০০ মাইল

ফ্রান্স: ৭০০ মাইল

অস্ট্রেলিয়া: তখনো লাইন বসেনি।

ভূগর্ভস্থ লাইন হলেও তখনো সাগর-মহাসাগর পেরোনো যায়নি। রয়টারের সমবয়সী জার্মান বিজ্ঞানী ও শিল্পোদ্যোক্তা ওয়ার্নার সিমেন্স তাকে পরামর্শ দিলেন, স্বাধীনভাবে বড় কাজ করতে হলে লন্ডনই হবে তার জন্য উত্তম স্থান।

তিনি দ্রুত লন্ডন চলে এলেন, বাসা নিলেন ফিনসবুরি স্কয়ারে, দুই রুমের অফিস নিলেন ১ নম্বর রয়াল এক্সচেঞ্জ ভবনে। তার মূল আগ্রহ শেয়ারবাজার। সব বিনিয়োগকারী তার কেনা শেয়ারের সর্বশেষ অবস্থান জানতে চাইবেন এবং নতুন বিনিয়োগকারীর জন্য শেয়ারবাজারের গতিবিধি জানা অত্যাবশ্যক। সুতরাং গাঁটের পয়সা খরচ করে তারা এ খবর কিনবেন।

শুরুতে তারটি ছিল মূলত টেলিগ্রাফ অফিস। তার প্রাথমিক আগ্রহ শেয়ারের দর জানানো বাণিজ্যিক টেলিগ্রাম। কিন্তু সংবাদপত্রের বিস্তার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংবাদপত্রকে তার পণ্যের গ্রাহক করতে শুরু করলেন। শেয়ারবাজারের খবর সংবাদপত্রে ছাপা হলে বিশেষ এক ধরনের পাঠকগোষ্ঠী পত্রিকাটি কিনতে থাকবে। ধীরে ধীরে তিনি অন্যান্য সংবাদের দিকেও মনোযোগী হলেন। ১৮৫৯-এ রয়টার যখন নেপোলিয়নের পুরো ভাষণ লন্ডনে পাঠিয়ে দিলেন, সাজ সাজ রব পড়ে গেল। তত দিনে সাগরতলা দিয়ে কেবল লাইন পাঠানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। রয়টার সব মহাদেশে অফিস খুলে বসলেন। তিনি তার ‘সংবাদ’কে পণ্য হিসেবেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবেন।

রয়টার ও বার্নহার্ড ভুলফ দুজনই প্যারিসে হাভাসের এজেন্সিতে কাজ করতেন। ভুলফ নিউজ এজেন্সি জার্মানির প্রধান সংবাদ সংস্থা আর রয়টার ব্রিটেনের। ফ্রান্সে হাভাস তো রইলই। এ সংস্থাটিই পরবর্তী সময়ে হয় এএফপি।

 

পল ইউলিয়াস রয়টারের পণ্য বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও সাধারণ সংবাদ। আর এর বাজার হচ্ছে মানুষের মন। তিনি অত্যন্ত সস্তায় এ পণ্য সংবাদ পাঠকের কাছে পৌঁছাতে চান।

সে সময়কার ‘ফ্রি প্রেস মুভমেন্ট’-এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের কাছে সস্তায় সংবাদপত্র পৌঁছাতে হবে। তখন লন্ডনে মোট সংবাদপত্র বিক্রি হয় এক লাখ কপি, এর অর্ধেকের বেশি বাজার লন্ডন টাইমসের দখলে। পত্রিকার দাম ৫ পেনি। আন্দোলনের একজন নেতা লর্ড রাসেল বললেন, টাইমসের স্বেচ্ছাচার ধ্বংস করতে হবে। বাজারে এল টেলিগ্রাফ (১৮৫৫), দাম ২ পেনি। ক’দিন পর দাম আরো কমিয়ে দিল ১ পেনি। সংবাদপত্র জগতে বিশাল এক বিপ্লব ঘটে গেল। অল্পদিনেই লন্ডন শহরে পত্রিকার সার্কুলেশন পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গেল। এ আন্দোলনে সক্রিয় সমর্থন দিয়েছেন ইউলিয়াস রয়টার। তিনি যখন লন্ডনে টেলিগ্রাফ অফিস স্থাপন করলেন, তখন লন্ডনের সঙ্গে গোটা ইউরোপের টেলিগ্রাফ সংযোগ স্থাপিত হতে চলেছে। তিনি প্যারিস স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করলেন। ১৮৬৩ সালে আয়ারল্যান্ডের সর্বশেষ দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত ক্রুকহ্যাভেনে নিজ খরচে টেলিগ্রাফ সংযোগ ও টাওয়ার স্থাপন করলেন। ক্রুকহ্যাভেনের কাছে, আমেরিকা থেকে ইউরোপের দিকে আসা স্টিমার ওয়াটার প্রুফ ক্যানেস্তারায় ভরা সংবাদসহ এগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দিত। রয়টারের ছোট জাহাজের তত্পর কর্মীরা এসব ক্যানেস্তারা উদ্ধার করে টেলিগ্রাফ অফিসে নিয়ে আসতেন। জাহাজ কর্ক বন্দরে পৌঁছার বহু আগে ক্রুকহ্যাভেনের টেলিগ্রাফ অফিস আমেরিকা থেকে আসা সংবাদ লন্ডন পৌঁছে যেত।

পরে এ ইউলিয়াস রয়টার এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন যে, ১৮৭২ সালে ইরানের শাহ নাসির-আল-দীন দেশটির রেলপথ, খাল, খনি, বনাঞ্চল এবং ভবিষ্যতের সব শিল্প তার কাছে স্বল্প সুবিধার বিনিময়ে হস্তান্তরের চুক্তি করেছিলেন। জর্জ নাথানিয়েল কার্জন তখন মন্তব্য করেছিলেন এমন আত্মসমর্পণের নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। গণ-অসন্তোষের মুখে পরের বছর চুক্তিটি রহিত করা হয়।

 

সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে কেবল টানার পর রয়টারের সংবাদ-বাণিজ্য ভুবন ক্রমেই সম্প্রসারিত হতে থাকে। কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়ে যান ফ্রান্সের হাভাস ও জার্মানির ভুলফ। ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে হাভাস ও ভুলফ নিজ নিজ দেশ ছাড়াও ইউরোপের একাংশ এবং দক্ষিণ আমেরিকায় একচ্ছত্র অধিকার নিয়ে নেয়। সংবাদের কেন্দ্রভূমি ব্রিটেনসহ ইউরোপের কিছু অংশ থেকে যায় রয়টারের হাতে। আর উত্তর আমেরিকায় এপির সঙ্গে তো তার আগে থেকেই চুক্তি ছিল। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভৌগোলিক ভিত্তিতে সংবাদের একচ্ছত্র আধিপত্য চলে যায়।

আনুষ্ঠানিকভাবে রয়টার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫১ সালে। ১৮৫৭তে এই জার্মান নাগরিক পল ইউলিয়াস রয়টারকে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোন তাকে রানী ভিক্টোরিয়ার কাছে উপস্থাপন করেন। তাকে ব্যারন ঘোষণা করা হয়।

এরপর রয়টার দ্রুত অন্যান্য মহাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ করেন, সেখানে রয়টারের অফিস স্থাপিত হয়।

একটি ছোট চিঠিতে তিনি সংবাদ পরিবেশনের নীতিমালা ও বিষয় ঠিক করে দেন। তিনি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ চান, সাংবাদিকের মতামত নয়। ১৮৭৮ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তার ছেলে হার্বার্ট রয়টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অবসরে গেলেও পল ইউলিয়াস রয়টার বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনার লক্ষ্যে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। তিনি চেয়েছেন যা ঘটেছে, কেবল তার বিবরণ— রঙ মেশানো বিশেষণ লাগানো বর্ণনা নয়; রয়টারের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহূত হওয়ার সুযোগ দিতে তিনি অসম্মত ছিলেন। তার প্রচেষ্টায় কেবল সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে নয়, সংবাদ সংস্থাগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে, দেরিতে হলেও কোনো এজেন্সির ভৌগোলিক একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙেছে, সরকারের আনুকূল্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

২৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ সালে তিনি ফ্রান্সে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে উত্তর লন্ডনের ওয়েস্ট নরউড সিমেট্রিতে সমাহিত করা হয়।

৯৪টি দেশে ২০০ শহরে ২০টি ভাষায় রয়টারের নিউজ সার্ভিস চালু আছে। রয়টার পরিবারের সর্বশেষ জীবিত সদস্য মার্গারিটা ব্যারোনেস দ্য রয়টার ২৫ জানুয়ারি ২০০৯ সালে ৯৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। নিঃসন্তান মার্গারিটা পল ইউলিয়াস রয়টারের দৌহিত্রবধূ।

২০০৮ সালের ১৭ এপ্রিল কানাডার টমসন করপোরেশন ১৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার মূল্য বিবেচনায় রয়টার অধিগ্রহণ করে। এ অধিগ্রহণের সঙ্গে রয়টারের শেয়ারমূল্যে শতকরা ১০ ভাগ পতন ঘটলেও দ্রুত দর বাড়তে থাকে। রয়টার এখন টমসন-রয়টার। হেড অফিস লন্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফে।

রয়টার জানতেন, সংবাদের চেয়ে বড় পণ্য পৃথিবীতে নেই। কাজেই একে বিকৃত হতে দেয়া যাবে না, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহূত হতে দিয়ে কলঙ্কিত হতে দেয়া যাবে না। শিরোনামে মটোতে থাকবে বাঘের গর্জন আর পাতা উল্টালে মিউ মিউ— পল ইউলিয়াস রয়টার এমনটি কখনো আশা করেননি।