আদিকালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মরণীয় এক উপাচার্য ছিলেন তিনি—কেবল এ তথ্যটুকু ছাড়া স্যার এ এফ রহমানের অপরাপর বিশিষ্ট সত্তার কথা সাধারণ বিদ্যোৎসাহী জনগণ বিশেষ জানেন বলে মনে হয় না (তার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হল হয়েছে বলে বাঁচোয়া, নইলে একালের অনেক ছাত্র-ছাত্রী সম্ভবত তার নামটিও জানতে পারতেন না!)। কিন্তু স্যার এ এফ রহমান যেমন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে ছিলেন অসাধারণ, তেমনি ইতিহাসের একজন শিক্ষক হিসেবেও ছিলেন তুলনারহিত কৃতিত্বের অধিকারী। দুর্ভাগ্যক্রমে তার ইতিহাসবিষয়ক বাংলা রচনা খুব একটা সুলভ বর্তমানে নয়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের দুই কৃতী শিক্ষক প্রফেসর ড. আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মিলটন কুমার দেব স্যার এ এফ রহমানের একটি দুর্লভ প্রবন্ধ উদ্ধার করে আমাদের সমৃদ্ধ ও কৃতজ্ঞ করেছেন। প্রবন্ধটি ধরেই স্যার এ এফ রহমানের ঐতিহাসিক সত্তা ও সমকালীন ইতিহাসের ব্যাখ্যাদাতা হিসেবে তার প্রজ্ঞা নিয়ে দু-চার কথা বলার চেষ্টা করব।

পুরান ঢাকা থেকে প্রকাশিত, নলিনীকিশোর গুহ সম্পাদিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার কথা এখন খুব একটা শোনা যায় না। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী নলিনীকিশোর রাজনৈতিক তত্পরতা ছেড়ে এ পত্রিকা শুরু করেন, অফিস ছিল বর্তমানের বিউটি বোর্ডিং ভবনে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পত্রিকাটির নাম রেখেছিলেন। শামসুর রাহমানসহ বাংলাদেশের অনেক স্বনামধন্য লেখকের প্রথম লেখাটি ছাপা হয়েছিল এখানেই। দেশ ভাগের কয়েক বছর পর পত্রিকাটি অনুমেয় কারণেই বন্ধ হয়ে যায়। নলিনীকিশোরও দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এ সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’-র ১৯৩৪ সালের শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় স্যার এ এফ রহমানের এক অসামান্য প্রবন্ধ, ‘হিটলার ও নািস সমস্যা’। উল্লেখ্য, স্যার এ এফ রহমান তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। পত্রিকায় প্রকাশের সময় লেখাটির শুরুতেও সে তথ্য মুদ্রিত হয়েছিল। প্রবন্ধটি আকারে খুব বড় নয়, কিন্তু ভাবনার বিস্তার ও প্রাজ্ঞতার প্রকাশের দিক থেকে রীতিমতো ওজনদার। রচনাটি ছাপা হচ্ছে যখন, সেই সময়কার প্রেক্ষাপট এখানে খানিক উল্লেখ করা দরকার। ১৯৩৪-এর দোসরা আগস্ট জার্মানির প্রেসিডেন্ট পল ভন হিন্ডেনবার্গ মৃত্যুবরণ করেন। হিন্ডেনবার্গের মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে তখনকার জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলার চ্যান্সেলর ও প্রেসিডেন্ট এ দুই পদের একত্রীকরণ ঘটিয়ে নিজে রাষ্ট্রের সর্বশক্তিধর ‘ফুরের’ হয়ে বসেন।

উপনিবেশকালের বাঙালির মনে হিটলারকে নিয়ে তখন থেকেই দ্বিধা ছিল, এমনটি বলা যাবে না। বরং ইংরেজ শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট বাঙালি সমাজের একাংশ হিটলারের হাত ধরে মুক্তি আর স্বাধীনতা মিলবে, তিনি বাঙালিদের হাতে ধরে টেনে তুলবেন—এমন অবাস্তব কল্পনায় মশগুল হয়ে পড়েছিল। এবং তা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে। আদতে ভেতরে ভেতরে বাঙালি হিন্দু-সমাজের গোঁড়া অংশ হিটলারের মধ্যে আর্যগৌরবের দেখা পেয়েছিল, এমনকি বিপ্লবীদের মধ্যেও অনেকে হিটলারের মধ্যে নিজেদের ‘মেসিয়াহ’-কে খুঁজে পান; আর তাদের ‘মিরর ইমেজ’ বাংলার কট্টর মুসলমানরাও আড়ালে খুশি হয়েছিল হিটলারের উত্থানে। হিটলারের জেনারেল রোমেল বাংলার কিছু মানুষের কাছে তাই আদরণীয় হয়ে ওঠেন; কথাসাহিত্যিক প্রফুল্ল রায় যেমনটা লিখেছেন, তখন থেকেই দেশভাগপূর্ব বিক্রমপুরে বাঙালির ছেলের নাম রোমেল রাখার চল শুরু হতে তিনি দেখেছেন। এমনকি নৃশংস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও বহু বাঙালির হিটলারপ্রীতিকে টাল খাওয়াতে পারেনি।

এমন প্রেক্ষাপটে, স্যার এ এফ রহমানের ‘হিটলার ও নািস সমস্যা’ রচনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের এক বিশ্লেষণ নিয়ে হাজির হয়েছিল। স্যার এ এফ রহমান হিটলারের উত্থানের বিপদ ও এর ফলে বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে, তা শান্ত অথচ দৃঢ় ভাষায় বিশ্লেষণ করেছিলেন। যখন হিটলার প্রবর্তিত ‘জাতীয় সমাজতন্ত্র’-এর (প্রকৃতপক্ষে বিকৃত আদর্শ) মধ্যে বাংলার কোনো কোনো বিপ্লবী-ভাবনার বিভ্রান্ত মানুষ খুঁজে পাচ্ছিলেন সাম্যবাদের দিশা, কিংবা তার ‘মাইন কাম্ফ’ কারো কারো কাছে উঠেছে আদরণীয়—তখন স্যার এ এফ রহমান শক্তভাবে তার প্রবন্ধের শুরুতেই লিখেছেন ‘[হিটলারের ইশতেহারের] পঁচিশটী কর্ম্মসূচী এবং বর্ত্তমান জার্মান যুবকদের বাইবেল স্বরূপ হিটলারের আত্মচরিতখানার প্রতি লক্ষ্য করিলেই বোঝা যায় যে, জাতীয় সমাজতন্ত্র একাধারে ধ্বংসমূলক ও সংগঠনমূলক মতবাদ।’

হিটলারের ধ্বংসের লক্ষ্য তাহলে কী হতে পারে? স্যার এ এফ রহমান ব্যাখ্যা করেন, ‘...সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক আদর্শ এবং গণতান্ত্রিক শাসনযন্ত্র—যাহার মূল কথাই হইল মানুষের সমানাধিকার স্বীকার করা—জাতীয় সমাজতন্ত্র তাহা অস্বীকার করে।...হিটলার মানুষের অসাম্যে বিশ্বাসী। তাহার মতে সম্পূর্ণ সাম্য সম্ভবও নয়, বাঞ্ছিতও নয়। এবং যদি সাম্যই লাভ করিতে হয়, তবে তিনি মনে করেন তাহা কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বা সমগ্রের ভোটাধিকার দ্বারা লভ্য নহে। কারণ গণতান্ত্রিক শাসনে জনসাধারণের প্রভুত্ব লাভ একটা ভ্রান্তি মাত্র।...সুতরাং জাতীয় সমাজতন্ত্রীরা ব্যক্তির নেতৃত্ব চাহে।...’ বাঙালি বামপন্থীদের মধ্যেকার একটি অংশ তখন হিটলারের ‘সহায়তায়’ ইংরেজদের শাসন থেকে মুক্তির আশা করছিল ঠিকই, কিন্তু স্যার এ এফ রহমান সরাসরি জানিয়ে দেন ওই প্রবন্ধেই, ‘[হিটলার] জার্ম্মানীর সোশিয়েল ডিমোক্রাটদের সমাজতান্ত্রিক মতবাদ এবং কার্ল মার্ক্স ও লেনিনের সমানাধিকারবাদের ঘোরতর শত্রু।...’

‘নামে তালপুকুর, কিন্তু ঘটিও ডোবে না’ কিসিমের হিটলারের তথাকথিত ‘নামধারী’ জাতীয় সমাজতন্ত্রের আদর্শের মধ্যেকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফাঁকিটিও ঠিক ঠিক চিহ্নিত করেছিলেন স্যার এ এফ রহমান, চিনিয়ে দিয়েছেন সমাজতন্ত্রের সঙ্গে এর পার্থক্যও— ‘সমাজতন্ত্রবাদ এবং জাতীয় সমাজতন্ত্রবাদের মধ্যে প্রধান পার্থক্যই হইতেছে যে, একমাত্র জার্ম্মান জাতির প্রয়োজনের উপরেই জাতীয় সমাজতন্ত্রবাদ প্রতিষ্ঠিত; এবং যদিও সর্ব্ববিষয়ে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ সমর্থন করে, কিন্তু উৎপাদনের উপায়গুলির উপর রাষ্ট্রের প্রভুত্ব স্বীকার করে না।...’ কিন্তু হিটলারের ক্ষমতায় বসা ও ক্রমাগত উত্থানের নেপথ্যে কি জার্মানদেরও দায় নেই? স্যার এ এফ রহমান জানান, আছে। এমনকি ইহুদিদের ওপর হিটলারের যে নির্যাতন, তা দেশের কথিত ‘আদি জার্মান’ মধ্যবিত্তদের অর্থনৈতিক কদর্য উচ্চাশা থেকেই উদ্ভূত—‘অর্থনীতিগত স্বার্থ সংঘাত’: ‘দেশের মধ্যবিত্তরাও ইহাই চাহিয়াছিল। কারণ, ইহুদি-বিতারণের ফলে তাহারাই বেশি লাভবান হইয়াছে।’ আদতে, ‘জার্ম্মান জাতির গণতন্ত্রবিরোধী মনোবৃত্তি হিটলারকে সাফল্যের পথে সাহায্য করিয়াছে। জার্ম্মানগণ সামরিক জাতি; নাগরিক অধিকার ভোগের চাইতে কর্ত্তব্যের প্রতিই তাহারা বেশি জোর দেয়।...’

ব্রিটিশবিরোধী মনোভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিটলারের প্রশংসা করার প্রয়াস পেয়েছিলেন সে যুগের কতিপয় বাঙালি, এ কথা আগেই বলেছিল। হিটলার ক্ষমতার চূড়ান্ত মসনদে আরোহণের পর তিনি জার্মানির বেকার সমস্যা ‘দূর করে দিয়েছেন’—এমন বয়ানও কেউ কেউ লিখিত আকারে প্রকাশ করেন। এর যুক্তিপূর্ণ পাল্টা জবাব পাই স্যার এ এফ রহমানের লেখায়। অল্প কটি শব্দেই উঠে আসে হিটলারের রাষ্ট্রব্যবস্থার তাবৎ ফাঁক ও ফাঁকিও— ‘...জার্ম্মানীতে বেকার সমস্যা অত্যন্ত হ্রাস পাইয়াছে, ১৯৩৩ সালে হিটলারের শাসনতন্ত্রের দায়িত্ব গ্রহণের সময় বেকার সংখ্যা ছিল ৬০ লক্ষ, কিন্তু এখন বেকার সমস্যা ১০ লক্ষও হইবে না। হিটলারের এই প্রচেষ্টা সাময়িক। অস্ত্র নির্মাণের কারখানায় বরাবর এত বেকার কাজে লাগানো চলিবে না।...’ ‘হোক না অস্ত্র কারখানায়, তবু তো চাকরি মিলেছে’ এমন কথায় ‘সহমত’ পোষণ করার মতো লোক সম্ভবত তখনকার বাংলাতেও ছিল, তাই তাদের উদ্দেশ্যে স্যার এ এফ রহমানের এ মন্তব্য। ঠিক এর পরেই তিনি যে কথাটি লিখেছিলেন, ভবিষ্যতে তা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল। একে তাই ‘প্রফেটিক’ বলা হয়তো অত্যুক্তি হবে না—‘...কথা হইতেছে, যদি কোন ব্যাপক ও স্থায়ী অর্থনৈতিক সুব্যবস্থা হিটলার না করিতে পারেন, তবে হয়তো ডিক্টেটারদিগের শেষ অবলম্বন স্বরূপ তিনি জাতিকে আবার এক মহাযুদ্ধে টানিয়া নামাইবেন। কিন্তু যুদ্ধে তো সব সময় লাভই হয় না, প্রায়শঃ ইহা ধ্বংসকেই ডাকিয়া আনে।’

‘জাতীয় সমাজতন্ত্র’-এর নামধারী নািস শাসনযন্ত্র শুধু জার্মানির ওপরেই নয়, পুরো বিশ্বের বুকেই কী নির্মম ধ্বংস ডেকে এনেছিল তা ওয়াকিবহাল পাঠকমাত্রেই আজ জানেন। হিটলারের জার্মানির ‘ফুরের’ হয়ে ওঠার মাত্র দুই মাসের মাথায় প্রকাশিত প্রবন্ধে হিটলারের বিনাশী কর্মপন্থা ও এর ফলে সৃষ্ট হতে যাওয়া ভবিষ্যতের করুণ সম্ভাব্য পরিণতিকে স্যার এ এফ রহমান ঐতিহাসিকের যে দূরদৃষ্টি দিয়ে চিনিয়ে দিয়েছিলেন, তাকে কুর্নিশ আজ তাই জানাতেই হয়। স্মরণে রাখতে হয় সম্পাদক নলিনীকিশোর গুহকেও। এবং পুনর্বার অধ্যাপক আবু মোঃ দেলোয়ার হোসেন ও মিলটন কুমার দেবকে কৃতজ্ঞতা—স্যার এ এফ রহমানের ইতিহাস-লেখক সত্তার এ জরুরি নিদর্শনটি এক ‘উজ্জ্বল উদ্ধার’ হয়ে থাকল।

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক