স্যার আহমেদ
ফজলুর রহমান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
কিংবদন্তি উপাচার্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম
বাঙালি ও
মুসলমান উপাচার্য
হিসেবে দায়িত্ব
নেন ১৯৩৪
সালের ১
জুলাই। ১৯৩৬
সালের ডিসেম্বরের
শেষ দিন
পর্যন্ত তিনি
এ দায়িত্ব
পালন করেন।
১৯৩৪-৩৬
সালে তিনটি
সমাবর্তনে উপাচার্য
হিসাবে দেয়া
তার বক্তৃতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ইতিহাস আলোচনায়
গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের
সে সময়ের
বিভিন্ন বিষয়
তার বক্তব্যে
এসেছে এবং
সেগুলো মনোযোগ
দিয়ে পাঠ
করলে আমরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
সে সময়ের
গতিপ্রকৃতির হদিস
পাব। এখানে
সমাবর্তন বক্তৃতা
থেকে বাছাইকৃত
অংশ অনূদিত
হয়েছে—
উপাচার্যের বক্তৃতা, ১৯৩৪
আচার্যকে
আমন্ত্রণ জানিয়ে
এ এফ
রহমান তার
ভাষণ শুরু
করেন। তিনি
আশা প্রকাশ
করেন যে
বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য
ও বাংলার
গভর্নর স্যার
জন অ্যান্ডারসন
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন
সমস্যা সমাধানে
তার সহায়তার
হাত বাড়িয়ে
দেবেন। এ
সুযোগে উপাচার্য
বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান
বিভিন্ন কার্যক্রমের
বিবরণ আচার্যের
সামনে উপস্থাপনের
ইচ্ছা প্রকাশ
করেন। এ
পর্যায়ে স্যার
এ এফ
রহমান মে
মাসে লেবঙে
(দার্জিলিং) স্যার
জন অ্যান্ডারসনের
ওপর হয়ে
যাওয়া হামলা
থেকে দৈবক্রমে
তার রক্ষা
পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের
পক্ষ থেকে
সহমর্মিতা জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের
নিয়োগ, অবসর
এবং পদ-পরিবর্তন
সম্পর্কে কিছু
তথ্য দেয়া
হয়। যেমন
দীর্ঘকাল উপাচার্যের
দায়িত্ব পালন
করার পর
মিস্টার ল্যাংলি
অবসর গ্রহণ
করেছেন। এরপর
তিনি বলেন,
‘উল্লেখ
করতে চাই
গবেষণা শিক্ষার্থীদের
জন্য ড.
কৃষ্ণান ৫০
টাকা মূল্যমানের
তিনটি পুরস্কার
(বৃত্তি) চালু
করতে চান।
গণিত, পদার্থবিজ্ঞান
ও রসায়ন
বিভাগের যেসব
শিক্ষার্থী সেরা
মৌলিক গবেষণা
উপস্থাপন করবেন,
বছর শেষে
তাদের পুরস্কৃৃত
করা হবে।
পুরস্কারগুলো যথাক্রমে
মি. রামানুজন,
স্যার সিভি
রমন ও
স্যার পিসি
রায়ের নামে
দেয়া হবে
এবং এ
সেশন থেকেই
শুরু করার
জন্য তিনি
১৫০ টাকা
অনুদান দিয়েছেন।
তিনি জানিয়েছেন,
বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে
যদি তিনি
না ফেরেন,
তাহলে তার
প্রভিডেন্ট ফান্ডে
থাকা ৩
হাজার টাকার
মুনাফা থেকে
যেন এ
বৃত্তি চালু
রাখা হয়।
আরো উল্লেখ
করতে চাই,
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার
খান বাহাদুর
নাজিরুদ্দিন আহমেদের
স্ত্রী বেগম
সামসুন্নেছা খানম
সাহেবার পক্ষ
থেকে দুটি
বৃত্তির জন্য
৫০০ টাকা
প্রদান করা
হয়েছে। মুসলিম
হলের ছাত্রদের
জন্য রোশন
আখতারের নামে
এ বৃত্তি
প্রদান করা
হবে।
ড. কৃষ্ণান
ও বেগম
সামসুন্নেছা খানমকে বিশ্ববিদ্যালয়ের
পক্ষ থেকে
ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
১৯৩৪ সালের
মার্চের শেষে
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা
৯৬১; গত
বছরের তুলনায়
সংখ্যায় কম।
কিন্তু স্নাতক
পর্যায়ের ছাত্রের
সংখ্যা যেকোনো
বছরের তুলনায়
বেশি। স্নাতকোত্তর
ও উচ্চতর
পর্যায়ে শিক্ষার্থী
সংখ্যা আগের
মতোই আছে।
জুলাইয়ের শেষে
সব অনুষদ
মিলিয়ে এ
সংখ্যা ৮৪২।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা
কিছুটা কম
দেখা যাচ্ছে।
তবে তা
এ প্রদেশের
অর্থনৈতিক দুরবস্থার
ফল।
ড. আশুতোষ
সেনের পদবি
‘রিসার্চ
ফেলো ইন
এগ্রিকালচার’ থেকে
‘এগ্রিকালচারাল
রিসার্চ কেমিস্ট’
করা হয়েছে
এবং অবসর
পর্যন্ত তিনি
এ পদে
নিয়োগলাভ করেছেন।
এ পদ
পরিবর্তন অনুমোদন
করতে গিয়ে
এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল
উপলব্ধি করেছে,
ইম্পেরিয়াল কাউন্সিল
ফর এগ্রিকালচারাল
রিসার্চ থেকে
পাওয়া অনুদানের
পাশাপাশি কৃষির
উন্নতিকল্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের
নিজস্ব তহবিলের
অর্থায়নে নিয়োগ
করা গবেষকরাও
বড় ভূমিকা
রাখতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মনে
করে গণমানুষের
সম্পদে পরিণত
হতে হলে
প্রদেশের উন্নতির
জন্য কাজ
করতে হবে।
ঢাকা থেকে
কৃষির উন্নতিকল্পে
কাজে লাগানোর
মতো দক্ষ
জনসম্পদ রয়েছে।
আমরা আশা
করছি, ইম্পেরিয়াল
কাউন্সিল থেকে
অনুদান আসা
অব্যাহত থাকবে।
প্রস্তাব উপস্থাপন
করা হয়েছে।
আমরা আশা
করছি, এ
প্রদেশের কৃষির
গুরুত্ব অনুধাবন
করে কৃষি
সমস্যা সমাধানের
লক্ষ্যে বৈজ্ঞানিক
অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে
সরকারের কাছ
থেকে সহযোগিতা
পাওয়া যাবে
এবং আমাদের
প্রস্তাব অনুসারে
একটি কৃষি
অনুষদ স্থাপন
করা হবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়টি হচ্ছে,
নারী শিক্ষার্থীদের
আবাসন আরো
দুই বছরের
জন্য নিশ্চিত
করা গেছে।
এ আবাসন
ব্যবস্থাপনায় সহসা
কোনো বদল
আসছে না,
কিন্তু নারী
শিক্ষার্থীদের ভর্তির
এ হার
অব্যাহত থাকলে
আরো বেশিসংখ্যক
ছাত্রীর আবাসন
নিশ্চিত করার
পদক্ষেপ গ্রহণ
করতে হবে।
১৯২২-২৩
সালে ২৩
জন ছাত্রী
থাকলেও ১৯৩৪
সালে তা
বেড়ে ৩৪
জনে দাঁড়িয়েছে।
বৃহদাকারে আবাসন
নির্মাণ বাদেও
এ ছাত্রীদের
নির্দেশনা ও
তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন
এবং বিশ্ববিদ্যালয়
মনে করে
প্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকাদের
মধ্য থেকে
যার এ
ধরনের প্রশিক্ষণ
আছে তিনিই
কাজটির জন্য
উপযুক্ত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক
অবস্থা সংকটাপন্ন।
ব্যয়সংকোচন ও
সাময়িকভাবে কর্মীদের
বেতনের একটি
অংশ উৎসর্গ
করার মাধ্যমে
পরিস্থিতি মোকাবেলা
করা হচ্ছে।
কিন্তু স্বীকার
করতে হবে
সরকারি সহায়তা
ব্যতিরেকে নিকট
ভবিষ্যতে এ
অবস্থা থেকে
বের হওয়া
সম্ভব হবে
না। খুব
দ্রুতই বিশ্ববিদ্যালয়ের
আয় বৃদ্ধির
কোনো সম্ভাবনা
নেই। আবার
প্রদেশের বর্তমান
অবস্থা দেখে
মনে হয়
না যে
ব্যক্তিগত দানের
মাধ্যমেও খুব
বেশি আগানো
যাবে। এ
কথাও সমভাবে
সত্য যে
এমন নবজাত
একটি প্রতিষ্ঠানকে
দৃঢ়করণ ও
ক্রিয়াশীল রাখতে
বিস্তৃত হওয়ার
অনুমতি দেয়া
প্রয়োজন। তাই
লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরিসহ
বিভিন্ন খাতে
অনুদান আগের
মতো নিশ্চিত
না করা
হলে এবং
বেতন হ্রাস
বন্ধ করতে
না পারলে
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা
খারাপ হতে
থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে বিভিন্ন
প্রকল্পে যত্ন
ও সতর্কতার
সঙ্গে কাজ
করা হয়েছে
এবং বেশকিছু
কাজ হাতে
রয়েছে। এটা
এখন নিশ্চিত
যে আধুনিক
বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে
গণমানুষের সম্মান
লাভ করতে
সামাজের উন্নতিকল্পে
নানা আন্দোলনের
ক্ষেত্রে সম্মুখে
থাকতে হয়।
এ লক্ষ্যে
(কৃষি ও
বিজ্ঞানের উন্নতিকল্পে)
বোটানি ও
ব্যাক্ট্রিওলজি ডিপার্টমেন্ট
ঢাকার কৃষি
বিভাগের আধুনিক
সরঞ্জাম নিয়ে
কাজ করবে।
উপাচার্যের বক্তৃতা, ১৯৩৫
এ
সমাবর্তন অনুষ্ঠান
থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের
পক্ষ থেকে
মহামান্য রাজা
ও রানীকে
তাদের ঘটনাবহুল
শাসনের ২৫
বছর পূর্তি
উপলক্ষে আমাদের
আনুগত্য ও
অভিনন্দন জানাই।
আমি গভীর
দুঃখের সঙ্গে
আমাদের ভূতপূর্ব
ট্রেজারার দেওয়ান
বাহাদুর শারদাপ্রসাদ
সেনের মৃত্যুতে
শোক প্রকাশ
করছি। তিনি
সরকারের বিচার
বিভাগের একজন
সম্মানিত সদস্য
ছিলেন।
গত
সেশনে উল্লেখযোগ্য
কিছু অনুদান
এসেছে: বাবু
জগমোহন পালের
উইলের এক্সিকিউটর—শ্যামচন্দ্র
বসাক, নিবারনচন্দ্র
গুহ মুস্তফি
ও যোগেন্দ্রনাথ
সেন মিলে
বাবু জগমোহন
পালের নামে
একটি মেডিকেল
কলেজ তৈরির
জন্য ৪
লাখ রুপি
প্রদানের সিদ্ধান্ত
গ্রহণ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
দ্রুতই একটি
সম্ভাব্য স্থান
নির্বাচন করে
সরকারের কাছে
একটি পরিকল্পনা
প্রস্তাব করা
হবে। সন্দেহ
নেই, পরিকল্পনাটি
সর্বাত্মক সমর্থন
লাভ করবে।
বার্ষিক একটি
রৌপ্য পদক
প্রদানের জন্য
রায় সাহেব
দেবেন্দ্র কুমার
রায়ের পক্ষ
থেকে তিন
কিস্তিতে ১০০
টাকা অনুদান
দেয়া হয়েছে।
সংস্কৃত স্নাতকে
সর্বোচ্চ নম্বর
প্রাপ্তকে এ
পুরস্কার দেয়া
হবে। তার
এ দানের
জন্য বিশ্ববিদ্যালয়
তার প্রতি
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
করে।
ভয়াবহ অর্থনৈতিক
দুরবস্থার পরও
শিক্ষার্থী ভর্তির
পরিমাণ সন্তোষজনক।
৩১ মার্চ
১৯৩৫-এর
হিসাব অনুসারে
শিক্ষার্থী সংখ্যা
৯৬০ এবং
এর মধ্যে
৩৯ জন
ছাত্রী; গত
বছরের সর্বোচ্চ
সংখ্যার তুলনায়
যা সমান্য
কম। আইন
বিভাগের শিক্ষার্থীর
সংখ্যা সামান্য
কমেছে কিন্তু
স্নাতক, স্নাতকোত্তর
ও উচ্চতর
শিক্ষার ক্ষেত্রে
আগের অবস্থা
বজায় রাখা
সম্ভব হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চমান
ধরে রাখার
সর্বোচ্চ চেষ্টা
হয়েছে। সব
বিভাগেই গবেষণার
কাজ গতিশীল
হয়েছে এবং
বার্ষিক প্রতিবেদনে
এর প্রমাণ
রয়েছে যে
শিক্ষক ও
শিক্ষার্থীরা নিজের
যোগ্যতার প্রমাণ
রেখেছেন। কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
মি রাকেশ
রঞ্জন শর্মাকে
পিএইচডিতে ভূষিত
করা হয়।
এ বিশ্ববিদ্যালয়
নলিনীকান্ত ভট্টশালী,
কামাক্ষ্যারঞ্জন সেন
ও নগেন্দ্র
আ নারায়ণ
চৌধুরীকে ডক্টরেট
ডিগ্রি প্রদান
করেছে। একাডেমিক
প্রায় সবক্ষেত্রে
শিক্ষার্থীদের সাফল্যের
হারও বেড়েছে।
গত বছর
আমি রসায়ন
গবেষণাগারে গুরুত্বপূর্ণ
কাজের কথা
বলেছিলাম, যা
কৃষিক্ষেত্রে সহায়ক
হতে পারে।
এখানে বেশ
উঁচুমানের কাজ
হয়েছে এবং
এখান থেকে
বোঝা যায়
বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ
থেকে বিস্তৃত
কাজের সম্ভাবনা
রয়েছে, যা
বৃহত্তর ক্ষেত্রে
মানুষের উপকারে
আসবে। দি
ইম্পেরিয়াল কাউন্সিল
অব এগ্রিকালচার
রিসার্চ থেকে
অনুদান চালু
রাখা হয়েছে
এবং এর
ফলে ড.
এসি বসুকে
কৃষি রসায়নে
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট
হিসেবে নিয়োগ
করা সম্ভব
হয়েছে। কাজের
সুবিধার্থে ল্যাবরেটরির
পরিধিও বাড়ানো
হয়েছে। আমরা
আশা করছি
কৃষি বিভাগ
চালু করার
বিষয়টি সরকার
বিবেচনা করবে
এবং পরিমিত
মূলধন প্রদানের
পাশাপাশি এ
বছর মৃত্তিকাবিজ্ঞান
বিভাগ চালু
করার অনুমোদন
দেয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক
অবস্থা সংকটাপন্ন
এবং সরকারের
সহযোগিতা ছাড়া
তার উন্নতি
সম্ভব নয়।
(অর্থনৈতিক অবস্থার
বিবরণ ও
আশাবাদ সম্পর্কে
বিগত বছরের
প্রতিধ্বনি—অনুবাদক)
সরকার ও
আমরা আন্তরিকভাবে
বিশ্বাস করি
যে আমাদের
জরুরি প্রয়োজন
অনুধাবন করে
সরকার সহমর্মিতার
সঙ্গে একটি
ব্যবস্থা গ্রহণ
করবে। গত
বছর আমি
বলেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়
পক্ষ থেকে
মূল উৎস
থেকে তথ্য,
উপাদান গ্রহণ
করে বাংলার
ইতিহাস লেখার
চিন্তা করছে।
প্রাথমিক কিছু
কাজ সম্পন্ন
হয়েছে, বিশেষজ্ঞরা
এ নিয়ে
কাজ করছেন
এবং তথ্যাদি
জোগাড় করার
কাজ চলছে।
কিন্তু এ
রকম বড়
কাজের জন্য
প্রচুর অর্থ
প্রয়োজন, নইলে
গতি কমে
যায়। এখন
এ বিষয়ে
বিশ্ববিদ্যালয় আশা
করে যে
অর্থায়নের কিছু
অংশ গ্রামীণ
উন্নয়নের জন্য
বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়া
হবে, যার
দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে নির্দিষ্ট
এলাকায় জরিপ
করে গ্রামীণ
উন্নয়ন কার্যক্রমের
সমন্বয় এবং
গঠনের কাজ
শুরু করা
হবে।
উপাচার্যের বক্তৃতা, ১৯৩৬
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ
থেকে এ
সমাবর্তনে আমি
ভারতের সম্রাট,
মহামান্য রাজা
পঞ্চম জর্জের
মৃত্যুতে গভীর
শোক প্রকাশ
করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্র, কর্মী
ও কার্যনির্বাহী
পর্ষদের বৈঠক
থেকে রাজপরিবারের
প্রতি সমবেদনা
প্রকাশ করা
হয়েছে। এ
সময়েই মাহামান্য
রাজা অষ্টম
এডওয়ার্ডের সিংহাসন
প্রাপ্তি উপলক্ষে
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
তার প্রতি
শ্রদ্ধা জ্ঞাপন
করা হচ্ছে।
তার ওপর
কাপুরুষোচিত হামলার
কথা জেনে
আমরা হতাশা
প্রকাশ করছি
এবং মহামান্য
আচার্যকে অনুরোধ
করছি আমাদের
শ্রদ্ধা এবং
হামলার বিপক্ষে
নিন্দার কথা
তিনি মহামান্য
সম্রাটকে অবগত
করবেন।
শিক্ষা সংস্কারের
জন্য মহামান্য
আচার্যের পক্ষ
থেকে গৃহীত
ধারাবাহিক পদক্ষেপের
জন্য বিশ্ববিদ্যালয়
গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
তার এসব
পদক্ষেপের মধ্য
দিয়ে শিক্ষিত
জনসংখ্যার বেকারত্ব
দূর করে
দেশের কাজে
নিযুক্ত করা
সম্ভব হয়েছে।
আপনার কর্ম
বাংলার জন্য
একটি বড়
প্রাপ্তি এবং
সে কারণে
আপনাকে সম্মানিত
করার লক্ষ্যে
বিশ্ববিদ্যালয় এর
সাম্মানিক স্নাতক
হিসেবে আপনার
নাম যোগ
করছে। আপনাকে
সম্মানিত করার
মাধ্যমে আমাদের
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান
বৃদ্ধি পেয়েছে।
আজ আমরা
স্যার রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর, স্যার
আব্দুর রহিম,
স্যার জগদীশ
চন্দ্র বসু,
স্যার প্রফুল্ল
চন্দ্র রায়,
স্যার যদুনাথ
সরকার, স্যার
মুহম্মদ ইকবাল
এবং মি
শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে
সাম্মানিক ডক্টরেট
প্রদান করছি।
এ নামগুলো
সমস্ত ভারতবর্ষে
সম্মানিত; বুদ্ধিজীবী
মহলে তাদের
স্থায়ী আসন
রয়েছে এবং
তাদের কাজ
তরুণদের অনুপ্রেরণার
উৎস। দেশের
জন্য তাদের
মহৎ কীর্তির
কারণে বিশ্ববিদ্যালয়
তাদের সম্মানিত
করছে।
১৯৩৪ সালে
বলা হয়েছিল
বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী
শিক্ষার্থীদের জন্য
প্রয়োজনীয় নির্দেশনা
এবং কল্যাণের
জন্য যা
যা করা
প্রয়োজন, এক
বা একাধিক
শিক্ষিকার তত্ত্বাবধানে
তা করার
সর্বোচ্চ চেষ্টা
থাকবে। এ
নীতি কার্যকর
করা এবং
ছাত্রী সংখ্যা
বৃদ্ধির লক্ষ্যে
বিশ্ববিদ্যলায়েরই একজন
মেধাবী ও
দায়িত্বশীল শিক্ষার্থী
করুণাকণা গুপ্তকে
ইতিহাস বিভাগের
এক শিক্ষকের
স্টাডি লিভের
সুযোগে ওই
বিভাগের প্রভাষক
হিসেবে নিয়োগ
করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক মন্দা
চলমান থাকা
সত্ত্বেও গত
বছর শিক্ষার্থী
ভর্তির পরিমাণ
সন্তোষজনক। ৩১
মার্চ ১৯৩৬
সালের হিসাব
অনুসারে ৪৬
জন ছাত্রীসহ
মোট ১
হাজার ২১
জন শিক্ষার্থী
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন
করছে। বিগত
সেশনের তুলনায়
এ সংখ্যা
কিছুটা হলেও
বেশি। কলা
ও বিজ্ঞান
অনুষদের শিক্ষার্থী
সংখ্যা নিয়মিত
হারে বৃদ্ধি
পাচ্ছে কিন্তু
আইন বিভাগে
শিক্ষার্থী সংখ্যা
কিছুটা কমেছে।
আইন অনুষদের
অধ্যাপক জেএন
গুপ্তকে কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
‘ডক্টর
অব ল’
ডিগ্রি প্রদান
করা হয়েছে।
এছাড়া পরেশ
চন্দ্র দত্ত
এবং পুলিন
বিহারী সরকার
নামে দুজন
ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে ‘ডক্টর
অব সায়েন্স’
প্রদান করা
হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের
অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার
ক্ষেত্রেও সব
অনুষদের শিক্ষার্থীদের
ফলাফল সন্তোষজনক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক
ব্যবস্থার একটি
অন্যতম বৈশিষ্ট্য
হলো শিক্ষার্থীদের
যৌথ জীবনের
শিক্ষায় শিক্ষিত
করা এবং
এ কথা
জানিয়ে আনন্দিত
হচ্ছি, হলগুলো
দক্ষ ও
সহানুভূতিশীল কর্মীর
নির্দেশনায় থাকার
মাধ্যমে সেক্ষেত্রে
কাজ এগিয়ে
যাচ্ছে। বর্তমান
এবং পুরনো
শিক্ষার্থীদের জমায়েতের
আয়োজনের মধ্য
দিয়ে তাদের
মধ্যে আবেগ,
অনুভূতি ও
দায়িত্বশীল আচরণ
বৃদ্ধি পায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গত
সেশন রাজনৈতিক
অস্থিতিশীলতার কারণে
বাধাগ্রস্ত হয়নি।
তবে উল্লেখ
করা প্রয়োজন
যে গত
সেশনের সময়
গুটি বসন্ত
রোগের প্রাদুর্ভাব
মহামারীর ন্যায়
ছড়িয়ে পড়লে
মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন
ও সিভিল
সার্জনের পরামর্শে
১ মার্চ
বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ
অবকাশ শুরু
হয় এবং
বিএ ও
বিএসসি সম্মান
পরীক্ষা জুন
পর্যন্ত পেছানো
হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক
অবস্থা আমাদের
দুশ্চিন্তার কারণ
হয়ে উঠছে।
এ সেশনে
বিশ্ববিদ্যালয়কে অতিরিক্ত
১০ হাজার
টাকা অনুদান
প্রদানের কারণে
আমি সরকারকে
ধন্যবাদ জ্ঞাপন
করছি। কিন্তু
এ কথা
ভেবে মর্মাহত
হচ্ছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের
জন্য আমরা
যে নিয়মিত
অনুদান আশা
করেছিলাম তা
সম্ভবত নিকট
ভবিষ্যতে মঞ্জুর
হবে না।...আমরা
সরকারের বর্তমান
অর্থনৈতিক অবস্থা
সম্পর্কে সচেতন
কিন্তু এ
কথাও জানাই
যে প্রতিষ্ঠানের
দক্ষতা একটি
নির্দিষ্ট মাত্রায়
রাখা সরকারেই
দায়িত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়
কর্তৃপক্ষের ন্যায়
বাংলার সরকারও
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের
নেপথ্য কারণ
সম্পর্কে অবগত
এবং সে
উদ্দেশ্য পূরণের
জন্য প্রয়োজনীয়
অর্থনৈতিক সহায়তা
দেয়ার জন্য
আমি সরকারের
কাছে আবেদন
রাখব।
মৃত্তিকাবিজ্ঞান অনুষদ
চালু করার
বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের
আবেদন এখনো
সরকারের বিবেচনার
অপেক্ষায় রয়েছে।
আমরা উল্লেখ
করেছি, ঢাকায়
কৃষি উন্নতির
লক্ষ্যে কাজ
করার সুযোগ
ও সুব্যবস্থা
রয়েছে এবং
ভবিষ্যতে এখানে
বিস্তর উন্নতি
করা সম্ভব
বলে মনে
করি। আমাদের
গবেষণাগারে এ
ধরনের বিষয়ে
উচ্চমানের কাজ
হয়েছে।
এ সুযোগে
আমি জানাতে
চাই, প্রস্তাবিত
‘হিস্টোরি
অব বেঙ্গল’
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন
লাভ করেছে
এবং আমরা
আশা করছি,
এ বছরের
শেষ নাগাদ
বিশেষজ্ঞদের কাছ
থেকে প্রথম
কিস্তির কাজ
পেয়ে যাব।
এ কাজের
উপযুক্ত অর্থায়নের
জন্য আমাদের
আবেদনে সরকারের
পক্ষ থেকে
এখনো তেমন
কোনো সাড়া
আসেনি। আমরা
সামান্য অনুদান
লাভ করেছি,
তবু কাজ
চালিয়ে যাওয়ার
চেষ্টা করা
হচ্ছে। আমি
বাংলার উদার
ব্যক্তিদের কাছে
আবেদন করছি,
যেন এমন
উঁচুমানের একটি
কাজ শেষ
করা যায়।
আমরা সরকারের
কাছেও অনুদানের
আবেদন করছি
এবং বিশ্বাস
করি সরকার
বাংলার প্রামাণিক
ইতিহাস রচনার
ক্ষেত্রে উপযুক্ত
অনুদান প্রদান
করে কাজটিতে
অংশগ্রহণ করবে।
(স্যার
আহমেদ ফজলুর
রহমান তার
প্রতিটি সমাবর্তন
ভাষণে শিক্ষার্থীদের
উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক
কিছু কথা
বলেছেন। প্রতিবারই
তিনি জীবন
গঠন, শিক্ষাক্ষেত্রে
উন্নতির পাশাপাশি
শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা
এবং দেশের
জন্য কাজ
করার প্রতি
উদ্বুদ্ধ করেছেন।
১৯৩৫ সালের
সমাবর্তন ভাষণ
থেকে এমন
একটি অংশ
এখানে তুলে
ধরা হলো)
গত সেশনের
বেশকিছু আনুষ্ঠানিকতার
সময়ে আমি
আপনাদের অনেক
কথা বলেছি।
আমি আপনাদের
জীবন পরিকল্পনার
প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর
চেষ্টা করেছি।
একজন স্থপতি
যেভাবে একটি
দালানের পরিকল্পনা
করেন, জীবন
গড়ার জন্য
সেভাবে পরিকল্পনা
করতে হবে।
নকশার ক্ষেত্রে
তাকে ওই
দালান তৈরির
উদ্দেশ্য জানতে
হয়। পরিকল্পনাটি
তিনি সব
সময় নিজের
সামনে রাখেন,
যেন মূল
উদ্দেশ্যটি প্রতি
মুহূর্তে তার
মনের মধ্যে
কাজ করে।
...আসলে
গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে
জীবনে কোন
আদর্শ আপনি
তৈরি করছেন,
সমাজে আপনি
কী অবদান
রাখছেন। যত
বৃহৎ অবদান
রাখবেন, সমাজের
জন্য নাগরিক
হিসেবে আপনি
তত মূল্যবান
হয়ে উঠবেন।
...বিশ্ববিদ্যালয় আপনাদের
এসব বিষয়
শেখানোর চেষ্টা
করেছে। আপনারা
কেবল শিক্ষিত
হওয়ার জন্য
শিক্ষিত হননি;
শিক্ষার মূল
উদ্দেশ্য জীবনে
এ শিক্ষা
ব্যবহার করা
এবং বলা
চলে মূলত
সমস্ত জীবনই
শিক্ষার অংশ।
আমরা অভিজ্ঞতা
অর্জনের জন্য
বাঁচি, যেন
অবচেতনে থাকা
সম্ভাবনার কুঁড়ি
একদিন ফুটে
ওঠে। শিক্ষা
মূলত এক
ধরনের শৃঙ্খলা,
যা জীবনের
সম্ভাবনা সমূহের
পূর্ণ ব্যবহার
নিশ্চিত করে।
উচ্চাশা মূলত
আমাদের অর্জনের
মূল চালিকাশক্তি,
যার মাধ্যমে
ভাগ্যকে গড়ে
তোলা যায়।
আপনাদের উচ্চাভিলাষ
হওয়া উচিত
এমন একটি
সমাজ গড়ে
তোলা, যেখানে
সবাই ভালো
থাকবে। আমরা
যে সমাজে
বসবাস করি
তা আমরাই
গড়ে তুলি
এবং মনে
করিয়ে দিই,
অ্যারিস্টটল বলেছিলেন,
‘সমাজের
উদ্দেশ্য বন্ধুত্ব’
এবং ‘বন্ধুত্বের
মূল চালিকাশক্তি
হলো সম্পূর্ণতা,
উদারতা ও
বিশ্বাস’।
সমাজ বদলের
ক্ষেত্রে আমরা
বাইরের অবস্থা
বদলের পাশাপাশি
ভেতর থেকে
সমাজকে বদলে
উন্নত করতে
পারি। কিন্তু
সমাজ মূলত
ব্যক্তি দ্বারা
গঠিত হয়,
তাই ব্যক্তির
উন্নতির মাধ্যমেই
সমাজ উন্নত
হয়। সে
কারণে সমাজের
মানুষের কেমন
হওয়া উচিত,
আপনারা এক
একজন তার
জীবন্ত উদাহরণ
হয়ে উঠবেন,
কারণ দৃষ্টান্ত
খুবই শক্তিশালী
সামাজিক শক্তি।
এজন্য নিজেকে
পরীক্ষা করতে
কিছু সময়
ব্যয় করতে
হবে, নিজের
ভেতরকার সত্য
খুঁজে বের
করতে হবে
এবং উচ্চ
আদর্শ বজায়
রাখতে অযাচিত
সবকিছু ত্যাগ
করতে হবে।
আপনি অন্যের
ব্যর্থতাকে মেনে
নেবেন কিন্তু
নিজের ক্ষেত্রে
নয়। নিজেকে
বিচার করা
আমাদের অন্যতম
প্রধান দায়িত্ব,
গড্ডলিকায় গা
ভাসানোর ব্যাপারটি
কঠিনভাবে দমন
করতে হবে।
বার্নার্ড শ’-এর
ভাষায়, ‘ভেসে
যাওয়ার মানে
নরক লাভ
আর হাল
ধরলে স্বর্গবাস।’
আপনাদের সামনে
এই হলো
আদর্শ, নতুনভাবে
আমরা যা
কিছু দেখতে
চেষ্টা করছি,
এই দেশের
ভবিষ্যৎ চিন্তা
ও কাজের
ক্ষেত্র সেখানেই
নিহিত। নতুন
দায়িত্ব ও
কর্তব্য পালনের
ক্ষেত্রে আমি
আন্তরিকভাবে তোমাদের
সাফল্য কামনা
করি। ঈশ্বর
আপনাদের সহায়
হোন।
সূত্র:
অধ্যাপক সিরাজুল
ইসলাম চৌধুরী
সম্পাদিত Dhaka University: The Convocation Speeches vol.
1: 1923-1946 (প্রকাশকাল:
১৯৮৮)
অনুবাদ: আলী আমজাদ





