স্যার এ
এফ রহমান
ছিলেন মুসলিম
হলের প্রথম
প্রভোস্ট। পরবর্তী
সময়ে এ
হলের নাম
হয় সলিমুল্লাহ
মুসলিম হল
(এমএম হল),
১৯২১-২৬
পর্যন্ত তিনি
এ হলের
প্রভোস্টের দায়িত্বে
ছিলেন। বলা
হয় এ
পর্যন্ত যত
প্রভোস্ট দায়িত্বরত
ছিলেন, তাদের
মধ্যে সবচেয়ে
জনপ্রিয় ছিলেন
তিনি। তারপর
হয়েছেন ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম
মুসলমান ও
প্রথম বাঙালি
ভাইস চ্যান্সেলর।
তার কাছ
থেকে ভাইস
চ্যান্সেলর হিসেবে
দায়িত্ব গ্রহণ
করার পর
রমেশচন্দ্র মজুমদার
বলেছেন, ‘বিনয়ী
আচরণ এবং
শিক্ষার্থীদের কল্যাণে
তার আন্তরিকতা
তাকে কেবল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
নয়, ঢাকা
শহরেই একজন
জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে
পরিণত করেছিল।’
স্যার এ
এফ রহমান
যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভাইস চ্যান্সেলর
হলেন, তখন
এসএম হলের
শিক্ষার্থীরা তাদের
স্বাগত ভাষণে
বলেছেন: আমাদের
প্রভোস্ট এবং
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রথম ভারতীয়
ভাইস চ্যান্সেলর
জনাব এ
এফ রহমানকে
আমরা অভিনন্দন
জানাই। আমরা
যারা মুসলিম
হলের, তারা
বিশেষভাবে গর্বিত।
এ হলে
তিনি উজ্জ্বল
ঐতিহ্য সৃষ্টি
করে গেছেন।
তিনি স্বাধীন
ও কল্যাণকর,
পূর্ণাঙ্গ মেধার
অধিকারী ছিলেন,
তার দৃষ্টিভঙ্গি
ছিল উদার,
গোষ্ঠীগত ক্ষুদ্রতা
ও বিদ্বেষ
তার মধ্যে
দেখা যায়নি।
১৯২১-২৩
সালে এসএম
হলের বাসিন্দা
জহুরুল ইসলাম
লিখেছেন: আমরা
যখনই মুসলিম
হলের পুরনো
ছবির কথা
ভাবি, সবার
আগে স্পষ্টভাবে
চোখের সামনে
হাজির হন
আমাদের প্রথম
প্রভোস্ট এ
এফ রহমান।
আমি বলব
মিস্টার রহমান
এসএম হলের
চেয়েও অনেক
বড় ছিলেন,
তিনি সৃষ্টি
করেছিলেন মুসলিম
হল, মুসলিম
হল তাকে
সৃষ্টি করেনি।
হ্যান্ডসাম রহমান
সাহেব ঈষৎ
শ্যামবর্ণ, দীর্ঘাঙ্গ,
সমানুপাতিকভাবে গঠিত
শরীর, প্রশস্ত
কপাল, স্বপ্নভরা
চোখ, স্বচ্ছ
ও মধুর
কণ্ঠস্বর, খাঁটি
ইউরোপীয় পোশাক,
তার অভিজাত
আচরণ, সরস
কথোপকথন—সবই
তাকে ঢাকায়
তার সমকালীনদের
মধ্যে উচ্চতর
আসনে অভিষিক্ত
করেছে।
আমি আল্লাহর
কাছে কৃতজ্ঞ
যে তার
কন্যার গর্ভে
আমার জন্ম।
১৯৪৫ সালে
স্যার এ
এফ রহমান
মৃত্যুবরণ করেন,
আমার বয়স
তখন মাত্র
আট বছর।
তবু এখনো
আমি তার
উপস্থিতি ও
ভার স্মরণ
করতে পারি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের
ক্রাইস্ট চার্চ
কলেজ থেকে
আমার নানা
ইতিহাসের গ্র্যাজুয়েট
হন। সেখান
থেকে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনাতেই
শিক্ষক হিসেবে
যোগ দেন,
তাকে মুসলিম
হলের প্রভোস্টও
নিয়োগ করা
হয়।
স্যার ফিলিপ
জে হার্টগ
ও জর্জ
এইচ ল্যাংলির
পর তিনি
ভাইস চ্যান্সেলর
নিযুক্ত হন।
১ জুলাই
১৯৩৪ থেকে
৩১ ডিসেম্বর
১৯৩৬ পর্যন্ত
তিনি এ
দায়িত্ব পালন
করেন। পিতার
মৃত্যুর পর
তার চা
বাগান ও
অন্যান্য সম্পত্তির
ব্যবস্থাপনার জন্য
তার জন্মস্থান
জলপাইগুড়িতে ডাক
পড়ে।
তিনি জলপাইগুড়িতে
ফিরে আসার
এক বছর
পর আমার
জন্ম। আমার
নানা নীলফামারী
সদর আসন
থেকে সাধারণ
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
করেন, কিন্তু
রংপুরের ডিস্ট্রিক্ট
ম্যাজিস্ট্রেটের গোপন
প্রতিবেদনে দেখা
যায় ‘তিনি
এত বেশি
ভালো মানুষ
যে রাজনীতির
খেলায় টিকে
থাকতে পারবেন
না।’ সে
সময়েই তাকে
ইন্ডিয়ান ফেডারেল
পাবলিক সার্ভিস
কমিশনের সদস্য
নিয়োগ করা
হয়। শিগগিরই
তাকে নাইটহুড
প্রদান করা
হয়, তিনি
হয়ে উঠেন
স্যার এ
এফ রহমান।
তিনি কলকাতায়
একটি বাড়ি
নির্মাণ করেন
এবং কলকাতা-জলপাইগুড়ি
আসা-যাওয়া
করতে থাকেন।
তাকে কলকাতার
শেরিফ নিযুক্ত
করা হয়।
তিনি তার
স্বভাবসঞ্জাত একনিষ্ঠতা
ও অদম্য
আগ্রহ নিয়ে
দায়িত্ব পালন
করতে থাকেন।
আমি তার
ছাত্রদের কাছ
থেকে শুনেছি,
এমনকি যারা
তার বিভাগের
ছাত্র ছিলেন
না, তারাও
জানিয়েছেন কতটা
জনপ্রিয় শিক্ষক
তিনি ছিলেন,
তারাও তার
ক্লাসে যোগ
দিতেন।
পাকিস্তানের গভর্নর
জেনারেল গোলাম
মোহাম্মদ আলীগড়ে
তার প্রথম
দিককার ছাত্রদের
একজন। গোলাম
মোহাম্মদ যখনই
ঢাকা আসতেন,
আমার নানি
মিসেস এ
এফ রহমান
শহরে থাকলে
তার সঙ্গে
একবার সাক্ষাৎ
করা তার
কর্মসূচিতে থাকত।
মোনায়েম খান
(গভর্নর), জহরুল
ইসলাম (পঞ্চাশের
শেষ ও
ষাট দশকের
শুরুতে পূর্ব
পাকিস্তান শিক্ষা
বোর্ডের চেয়ারম্যান),
আলতাফ হোসেন
(করাচির ডন
পত্রিকার সম্পাদক)
প্রমুখ মুসলিম
হলে এ
এফ রহমানের
প্রথম দিককার
ছাত্রদের মধ্যে
ছিলেন। আমি
যখন ষাটের
দশকে গভর্নরের
অফিসে ডেপুটি
সেক্রেটারি হিসেবে
যোগদান করি,
গভর্নর উল্লেখ
করেন তিনি
স্যার এ
এফ রহমানের
ছাত্র হিসেবে
গৌরব বোধ
করেন। পূর্ব
পাকিস্তানের একদা
মুখ্যমন্ত্রী এবং
পরে বাংলাদেশের
প্রধানমন্ত্রী আতাউর
রহমান খান
তাকে নিয়ে
১৯৯০ সালে
ইত্তেফাকে একটি
স্মরণীয় স্মৃতিকথা
লেখেন, তাতে
১৯২৬-৩০
পর্যন্ত ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে তার
ছাত্রজীবন এবং
স্যার এ
এফ রহমানের
ব্যক্তিত্ব, চরিত্র
ও পাণ্ডিত্য
এবং অজানা
অনেক বিষয়ে
তুলে এনেছেন।
আমি তার
ছাত্রদের কাছে
জেনেছি, তিনি
মুসলিম হলের
ব্যবস্থাপনায় নতুন
নতুন ধারণার
সংযোজন ঘটিয়েছেন।
পদ্ধতিগতভাবে নতুন
পদ্ধতির প্রয়োগ
নিশ্চিত করেছেন।
তিনি মুসলিম
হল ইউনিয়ন
সংগঠিত করেন
এবং হাউজ
টিউটরদের একজন
ফখরুদ্দীন আহমদের
অধীনে ন্যস্ত
করেন। তিনি
হলে অনেক
সমিতি ও
ক্লাবকে সমন্বিত
করেন। শুরুতে
বিভিন্ন মেসে
ছাত্রদের খাওয়া-দাওয়ার
ব্যবস্থা হতো,
তিনিই প্রথম
ডাইনিং হল
চালু করে
সবার জন্য
এক খাবার
নিশ্চিত করেন।
ডাইনিং হলের
দায়িত্ব দেন
অন্য হাউজ
টিউটর মুহাম্মদ
শহিদুল্লাহকে। তিনি
তার অক্সফোর্ড
ও আলীগড়ের
অভিজ্ঞতা থেকে
এসব করেছেন,
এটা বুঝতে
পারি।
হলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে,
ঢাকার সমাজে
এবং গোটা
দেশে সবাই
জানতেন স্যার
এ এফ
রহমানের ওপর
আর্থিক চাপ
নেই। জলপাইগুড়ির
চা বাগান
থেকে পর্যাপ্ত
আয় আসত
এবং অন্যান্য
স্থাপনা ও
সম্পত্তি থেকেও
আসত। বিশ্ববিদ্যালয়ের
বেতনের ওপর
তাকে নির্ভর
করতে হতো
না। মানুষকে
সেবা করার
একটি সুযোগ
হিসেবে তিনি
বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ
দিয়েছিলেন। অক্সফোর্ড
ও আলীগড়ে
তিনি দেখেছেন
ধনীরাও নির্ধনের
মতো ‘অ্যাকাডেমিক
ক্যারিয়ার’ বেছে
নেন। তিনি
দরিদ্র ছাত্র
এবং হলের
অভাবী কর্মীদের
সাময়িক ঋণ
অথবা অনুদান
হিসেবে পর্যাপ্ত
অর্থ দিয়েছেন
(সৈয়দ শামীম
রাহমানের কাছে
আমি শুনেছি,
ঋণের টাকা
কখনো পরিশোধিত
হয়নি)।
স্যার এ
এফ রহমান
এখনো আলোচনার
বিষয়, তার
ছাত্রদের লেখার
বিষয় এবং
যারা তার
সম্পর্কে শুনেছেন
তাদেরও গবেষণার
বিষয়। প্রকৃত
অর্থে আমি
তার সম্পর্কে
যা জানি
তার সবই
আমার মা
এবং তার
ছাত্রদের কাছে
থেকে শোনা।
২০ জানুয়ারি
১৯৭৬ স্যার
এ এফ
রহমান হল
(তৈরিকালীন নাম
১নং হোস্টেল)
উদ্বোধন করা
হয়। ম্যুরাল
চিত্রটি করার
জন্য মূল
ছবিটি কর্তৃপক্ষের
হাতে তুলে
দিই।
(দুর্ভাগ্যজনক,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
তার কোনো
ছবি সংরক্ষণ
করা হয়নি—অনুবাদক)
[সৈয়দ শামিম আহসানের ইংরেজি লেখাটি ২০০৩ সালে স্মৃতিময় এসএম হল-এ প্রকাশিত]





