একবারের নবাব নন, তিন বছরের ব্যবধানে দুবার বাংলার নবাব হয়েছিলেন তিনি। প্রথমবার ১৭৫৭ থেকে ১৭৬০ পর্যন্ত। দ্বিতীয়বার ১৭৬৩ থেকে ১৭৬৫।

তিনি দুবার বিশেষ অপরাধে বাংলার বকশীর পদ থেকে অপসারিত হয়েছেন। নবাবের পর প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদ বকশী। প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব থেকেও সাময়িক অব্যাহতি পেয়েছিলেন। সিরাজউদ্দৌলার চেয়ে অনেক বেশি সময় বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবের পদ ধরে রাখার পরও ইতিহাস এবং সাহিত্যে সিরাজ হয়ে রইলেন নায়ক আর মীর জাফরের পরিচিতি প্রতিষ্ঠিত হলো খলনায়ক হিসেবে। এমনকি ফিরিঙ্গি বণিকরাও মীর জাফরকে মনে করতেন ‘ক্লাইভের গর্দভ’।

কলকাতা বা ঢাকা নয়—মুর্শিদাবাদ তখন বাংলার রাজধানী। দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন, ঢাকায় বহিঃশত্রুর আক্রমণ সম্ভাবনা, সর্বোপরি নবাবি খেয়াল—এসব মিলেই রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হয়।

মুর্শিদাবাদে বাংলার নবাব

১. মুর্শিদকুলি খান (১৭১৭-১৭২৭)

২. সুজাউদ্দিন মুহম্মদ খান (১৭২৭-১৭৩৯)

৩. সরফরাজ খান (১৭৩৯-১৭৪০)

৪. আলিবর্দি খান (১৭৪০-১৭৫৬)

৫, সিরাজউদ্দৌলা (১৭৫৬-১৭৫৭)

৬. মীর জাফর আলী খান (১৭৫৭-১৭৬০)

৭. মীর কাশিম (১৭৬০-১৭৬৩)

৮. মীর জাফর আলী খান (১৭৬৩-১৭৬৫)

(দ্বিতীয় নবাব সুজাউদ্দিন মুর্শিদকুলি খানের জামাতা, তৃতীয় নবাব সরফরাজ খান সুজাউদ্দিনের পুত্র, পঞ্চম নবাব সিরাজউদ্দৌলা আলিবর্দি খানের কনিষ্ঠ কন্যার পুত্র, ষষ্ঠ নবাব মীর জাফর আলিবর্দি খানের বৈমাত্রেয় ভগ্নিপতি। সপ্তম নবাব মীর কাশিম মীর জাফরের জামাতা। অষ্টম নবাব আবার মীর জাফর।

প্রথমে রাজকোষ এবং পরে প্রশাসনিক সদর দপ্তর কলকাতায় স্থানান্তরিত হলে মুর্শিদাবাদ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে)

মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতাই কার্যত বাংলার স্বাধীনতা বিলুপ্ত করে ফেলে। নাম-কা-ওয়াস্তে নবাব থাকলেও বস্তুত তারা হয়ে পড়েন ক্লাইভ ও তার উত্তরসূরিদের আজ্ঞাবহ।

‘বিশ্বাসঘাতকতা’ ও ‘মীর জাফর’ সিনোনিমাস বা সমার্থক হয়ে ওঠে।

পলাশীর প্রান্তরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্নেল ক্লাইভের সঙ্গে আঁতাত, সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ক্রমান্বয়ে বাংলা তথা ভারতের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয় ইংরেজের কাছে। তারপর ১৯০ বছর ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস।

পলাশীর ঘটনার পর আড়াইশ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বিশ্বাসঘাতককে বলা হয় মীর জাফর।

ক্লাইভের গর্দভ

মহারাষ্ট্রে অন্তর্কলহ ও বিদ্রোহ দমন করতে নবাব আলিবর্দি খাঁ ভগ্নিপতি মীর জাফর আলী খানকে সেনাপতি করে পাঠিয়ে দিলেন, তিনি ছিলেন সিপাহসালার; ইংরেজি পদবি কমান্ডার-ইন-চিফ এবং পে-মাস্টার জেনারেল অব ফোর্সেস। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করে মহাসমারোহে মেদিনীপুর পর্যন্ত পৌঁছে বিলাসিতা ও সম্ভোগে মেতে রইলেন। শ্রী অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় লিখেছেন, তাঁহার চরিত্রে বীরোচিত সদগুণরাশি যতদূর বিকশিত হইবার সুযোগ পাইয়াছিল, তাহা অপেক্ষা যৌবনোচিত বিলাসবাসনাই সমধিক স্ফূর্তি লাভ করিয়াছিল। তিনি কোন দিনই সাহসী বীরপুরুষ বলিয়া পরিচিত হইতে আগ্রহ প্রকাশ করেন নাই। ইংরাজের ইতিহাসেও মীর জাফর ক্লাইবের গর্দ্দভ বলিয়া পরিচিত। কেবল নবাবের অন্তরঙ্গ বলিয়া সেনাপতি পদে আরোহণ করিয়াছিলেন। আলিবর্দি কুটুম্বের সমরভীতির সংবাদ পাইয়া আতাউল্লা নামক আর একজন বিশ্বস্ত রণকুশল সেনাপতিকে পাঠাইয়া দিলেন।’

মীর জাফর আলী খানের জন্ম ১৬৯১ সালে, মৃত্যু ৫ ফেব্রুয়ারি ১৭৬৫। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় নবাবিরও অবসান ঘটে। তিনি তখনকার তুর্কি সাম্রাজ্যের অভিজাত পারসিক পরিবারের সদস্য। তার পিতামহ এখনকার ইরাকের নাজাফ শহরের গভর্নর ছিলেন। তার পিতা ভাগ্যান্বেষণে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে এসেছিলেন। নিজ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তায় একটি আদালতের প্রধান বিচারপতির পদও অলংকৃত করেছেন। মীর জাফর আলী খানকে এগিয়ে নিয়ে গেছে তার কূটবুদ্ধি এবং উপদলীয় কোন্দল সৃষ্টির মেধা। তিনি এমনকি তার চাকরিদাতা আলিবর্দি খানকে ক্ষমতাচ্যুত করতেও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। বিহারে নবাবের কর্মচারী হিসেবে তার চাকরি শুরু। গিরিয়ার যুদ্ধে সরফরাজ খানকে হারিয়ে নবাবের প্রিয়ভাজন হন এবং ১০০ টাকা বেতনের কর্মচারী হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।

নবাব তার বৈমাত্রেয় বোন শাহ খানুমকে তার সঙ্গে বিয়ে দেন। তারপর সেনাপ্রধান পদেও নিযুক্তি লাভ করেন।

নাটকের সিরাজউদ্দৌলা ও মীর জাফর

সিরাজ: আপনারা সবাই মিলে নবাবের মর্যাদা যেকোনো মূল্যে বিক্রি করে দিতে চান, এই তো?

মীর জাফর: এ কথা বলে নবাব আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনতে চাইছেন। এই অযথা দুর্ব্যবহার আমরা হূষ্ট মনে গ্রহণ করতে পারব কিনা সন্দেহ।

সিরাজ: বাংলার নবাবকে ভয় দেখাচ্ছেন সিপাহসালার? দরবারে বসে নবাবের সঙ্গে কী রকম আচরণ করা বিধেয়, তাও আপনাদের স্মরণ নেই? এ মুহূর্তে আপনাকে বরখাস্ত করে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব আমি নিজে গ্রহণ করতে পারি। আপনি, জগৎ শেঠ, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ—সবাইকে কয়েদখানায় আটকে রাখতে পারি। হ্যাঁ, কোনো দুর্বলতা নয়। শত্রুর কবল থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে আমাকে তাই করতে হবে।...

আমি অন্তহীন সন্দেহ-বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে ভরসা নিয়েই আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি শুধু আপনাদের কাছে আমার একমাত্র অনুরোধ যে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে আপনারা আমাকে বিভ্রান্ত করবেন না।

(সিরাজের ইঙ্গিতে প্রহরী তাঁর হাতে কোরআন শরিফ দিল। সিরাজ দুই হাতে কোরআন শরিফ নিয়ে চুমু খেয়ে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর মীর জাফরের দিকে এগিয়ে দিলেন এবং মীর জাফর নতজানু হয়ে দুই হাতে কোরআন ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করলেন।)

মীর জাফর: আমি আল্লাহর পাক কালাম ছুঁয়ে ওয়াদা করছি, আজীবন নবাবের আজ্ঞাবহ হয়েই থাকব।

(সিরাজ প্রহরীর হাতে কোরআন শরিফ সমর্পণ করলেন এবং অন্য প্রহরীর হাত থেকে তামা, তুলসী ও গঙ্গাজলের পাত্র গ্রহণ করলেন। তাঁর ইঙ্গিত পেয়ে একে একে রাজবল্লভ, জগেশঠ, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ নিজের নিজের প্রতিজ্ঞা উচ্চারণ করে গেলেন।)

রাজবল্লভ: আমি রাজবল্লভ, তামা, তুলসী, গঙ্গাজল ছুঁয়ে ঈশ্বরের নামে শপথ করছি আমার জীবন নবাবের কল্যাণে উৎসর্গীকৃত।

রায়দুর্লভ: ঈশ্বরের নামে প্রতিজ্ঞা করছি, সর্বশক্তি নিয়ে চিরকালের জন্য আমি নবাবের অনুগামী।

উমিচাঁদ: রামজিকি কসম, ম্যায় কোরবান হু নওয়াবকে লিয়ে।


একে একে সবাই নিজ নিজ সৃষ্টিকর্তার কসম খেয়ে নবাবের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিলেন। কিন্তু কেউ কথা রাখেননি। উদ্ধৃত নাট্যাংশ সিকান্দার আবু জাফরের ‘সিরাজউদ্দৌলা’ থেকে নেয়া।

যারা চলচ্চিত্রের সিরাজউদ্দৌলাকে দেখেছেন, কেউ ভোলেননি অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের সেই সংলাপ—

‘বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার মহান অধিপতি, তোমার শেষ উপদেশ আমি ভুলিনি জনাব। তুমি বলেছিলে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের প্রশ্রয় দিয়ো না, তুমি বলেছিলে তারা এ দেশ কেড়ে নেবে, আমি তাদের প্রশ্রয় দেব না।’

সিরাজ তাদের প্রশ্রয় দেননি, কিন্তু প্রশ্রয় দিয়েছেন তার সিপাহসালার বিশ্বাসহন্তারক মীর জাফর আলী খানকে এবং এর চরম মূল্য দিতে হয়েছে তাকে ও বাঙালি জাতিকে। কবি নজরুলের কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে:

বাঙালীর খুনে লাল হলো হেথা ক্লাইভের খঞ্জর

ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে ভাই ভারতের দিবাকর।

ঘষেটিও কম যাননি

নবাব আলিবর্দি খানের এক কন্যার জামাতা মীর জাফর আলী খানের পাশাপাশি তার বড় মেয়ে মেহের-উন-নিসা বেগমের নামও উচ্চারিত হয়ে থাকে। তিনি ঘষেটি বেগম নামেই বেশি পরিচিত। সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে তার ভূমিকা মীর জাফরের চেয়ে এতটুকু কম নয়। নিঃসন্তান ঘষেটি বেগমের স্বামী নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান মোগল অভিজাতদের একজন এবং ঢাকার উপপ্রধান প্রশাসক ছিলেন। এ দম্পতি সিরাজউদ্দৌলার ছোট ভাই ইকরামুদ্দৌল্লাকে দত্তক নিয়েছিলেন, শৈশবেই তার মৃত্যু হয়। ঘষেটির স্বামী ১৭৫৫ সালে মারা যান। সিরাজ বিধবা খালাকে নৈঃসঙ্গের যাতনা থেকে মুক্তি দিতে রাজপ্রাসাদের অন্তঃপুরে নিয়ে এলেন। এতে ঘষেটির ষড়যন্ত্রের দ্বার আরো উন্মোচিত হলো। বাংলার প্রথম নারী নবাব হওয়ার বাসনা তার ছিল। ‘কাশিমবাজারের ইংরেজ সওদাগরেরা জানতেন যে যাহারা ঘষেটি বেগমের পক্ষপাতী বলিয়া, আজি হউক, কালই হউক আর দশ দিন পরেই হোক, বৃদ্ধ নবাবের মানবলীলা অবসানপ্রাপ্ত হইলেই সিরাজউদ্দৌলার সহিত তাহাদিগের তুমুল সংঘর্ষের সূত্রপাত হইবে।’

ঘষেটি বেগম ইংরেজ বণিক এবং একই সঙ্গে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে হাত মেলালেন।

স্মরণ করা যেতে পারে পুত্রহীন, তিন কন্যার জনক আলিবর্দি খান সবচেয়ে ছোট কন্যার পুত্র সিরাজকে উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নিয়ে পারিবারিক কলহকে নিজের অজান্তেই উসকে দেন। দ্বিতীয় কন্যার পুত্র শওকত জংকে ক্ষমতায় বসানোর স্বপ্ন দেখানো হতে থাকে।

রমেশচন্দ্র মজুমদার (ও অন্য তিনজন) লিখিত ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ দ্বিতীয় খণ্ডে এটা স্পষ্ট করা হয়েছে যে সিরাজের নবাবি লাভ তার ঈর্ষাপরায়ণ স্বজনরা কেউই মেনে নেয়নি। ঘষেটি বেগম ও শওকত জং সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। সিংহাসনের স্বপ্ন দেখতেন আলিবর্দি খানের বৈমাত্রেয় ভগ্নির স্বামী মীর জাফর আলী খান।

‘আলিবর্দির ন্যায় মীর জাফরও নিঃস্ব অবস্থায় ভারতে আসনে এবং আলিবর্দির অনুগ্রহেই তাহার উন্নতি হয়... আলিবর্দি প্রতিপালক প্রভুর পুত্রকে হত্যা করিয়া নবাবি লাভ করিয়াছিলেন। মীর জাফরও তাহারই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া সিরাজকে পদচ্যুত করিয়া নিজে নবাব হইবার উচ্চাক্ষাঙ্ক্ষা মনে মনে পোষণ করিতেন।’ ঘষেটি, মীর জাফর উভয়েই সিংহাসন লাভে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে মুর্শিদাবাদ আক্রমণে উৎসাহিত করেন। দেরিতে হলেও সিরাজ ঘষেটি বেগম ও শওকত জংকে শত্রু মনে করতে থাকেন। তিনি ঘষেটি বেগমকে বন্দি করেন এবং শওকত জংয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। কিন্তু মীর জাফরকে শুরুতে বিশ্বস্তই মনে করেছেন। অচিরেই বিশ্বাস ভেঙে যায়।

রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন:

সিরাজ নবাব হইয়া সেনাপতি মীর জাফর ও দিওয়ান রায়দুর্লভকে পদচ্যুত করেন এবং জগেশঠকে প্রকাশ্যে অপমানিত করেন। এ তিনজনই ছিলেন সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রধান উদ্যোক্তা। সিরাজের বিরুদ্ধে ঘষেটি বেগমের যথেষ্ট আক্রোশের কারণ ছিল—সুতরাং তিনিও অর্থ দিয়া ইহাদের সাহায্য করিতে প্রস্তুত হইলেন। উমিচাঁদ নামক একজন ধনী বণিক সিরাজের বিশ্বাসভাজন ছিলেন। তিনিও ষড়যন্ত্রে যোগ দিলেন।

চার্লস স্টুয়ার্টের মীর জাফর

‘মীর জাফর: জাঁহাপনা কি আমাদের আচরণে সন্দেহ প্রকাশ করছেন?

সিরাজ: আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাবার কোনো বাসনা আমার নেই। আমার নালিশ আজ আমার নিজের বিরুদ্ধে। বিচারক আপনারা। বাংলার প্রজা সাধারণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধান করতে পারিনি বলে আজ তাদের কাছে অপরাধী। আজ সেই অপরাধের জন্য আপনাদের কাছে বিচারপ্রার্থী।’

সিরাজউদ্দৌলা নাটকের সংলাপ। চার্লস স্টুয়ার্ট যদিও তার হিস্ট্রি অব বেঙ্গল: ফ্রম দ্য ফার্স্ট মোহামেডান ইনভেশন আনটিল দ্য ভার্চুয়াল কনকোয়েস্ট অব দ্যাট কান্ট্রি বাই দ্য ইংলিশ গ্রন্থে সিরাজউদ্দৌলাকে উঠেপড়ে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন, তারপরও মীর জাফরের কিঞ্চিৎ গুণগান করা ও তার ষড়যন্ত্রের বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। আবু জাফরের অনুবাদ:

এতমধ্যে নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ এমন বৃদ্ধি পায় যে কর্নেল ক্লাইভ মনে করেন সন্ধিচুক্তি (নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক মৈত্রীচুক্তি) বাতিল করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।... একটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব আসে মীর জাফর খানের কাছ থেকে। ওই প্রস্তাবে বলা হয় যে প্রতিদিন জীবনের ভয়ে থেকে তিনি আত্মরক্ষার জন্য নবাবকে উত্খাত করতে ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হয়েছেন। দেওয়ান রায়দুর্লভ, ঘষেটি বেগম, শেঠরা এবং সৈন্যবাহিনী অনেক প্রধান অফিসার তাকে সমর্থন করেন বলে জানান। ইংরেজরা যদি তার সঙ্গে যোগ দেয় তাহলে নিঃসন্দেহে সফলতা আসবে। এ ধরনের সহায়তার জন্য তিনি তাদের সবচেয়ে সুবিধাজনকভাবে ক্ষতিপূরণ দেবেন এবং তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সব ধরনের সুবিধা প্রদান করবেন।

চালর্স স্টুয়ার্ট লিখেছেন, কলকাতার গভর্নর এবং কাউন্সিল মনে করেছেন মীর জাফরের প্রস্তাব তাদের জন্য সৌভাগ্য বহন করছে এবং এ প্রস্তাবের বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন।

নবাবের দরবারে কোম্পানির আবাসিক প্রতিনিধি ওয়াটস সাহেব ফার্সি ভাষায় কোম্পানির সঙ্গে মীর জাফরের একটি সদূরপ্রসারী চুক্তিনামা প্রণয়ন করেন এবং শপথ করে মীর জাফর সেই চুক্তিতে সই করেন।

কিন্তু এই চুক্তির বিষয় ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সিরাজউদ্দৌলা তা অবহিত হন এবং মীর জাফরকে গৃহবন্দি করে ফেলেন। কিন্তু ততক্ষণে কর্নেল ক্লাইভের কুড়িটি কামানসহ সশস্ত্র বাহিনী হুগলি অতিক্রম করে এগোতে থাকে। বিচলিত নবাব মীর জাফরের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন এবং মীর জাফরের সঙ্গে সন্ধি করতে গুটিকয় বিশ্বস্ত অনুচর নিয়ে পালকিতে চড়ে তার বাড়িতে যান। মীর জাফর কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ করেন ইংরেজের বিরুদ্ধে নবাবের যুদ্ধে তিনি ইংরেজদের পক্ষাবলম্বন করবেন না বা নিষ্ক্রিয় থাকবেন না। নবাবও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি পিতৃসমতুল্য মীর জাফরের কোনো ক্ষতি করবেন না, তাকে পরিবার-পরিজন ও সম্পদসহ সম্পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করবেন।

১৬ জুন ১৭৫৭ মীর জাফর গোপন চিঠিতে কর্নেল ক্লাইভকে জানান, নবাবের সঙ্গে তার চুক্তি কেবল একটি বাহ্যিক সমঝোতা মাত্র; তার প্রকৃত চুক্তি কোম্পানির সঙ্গেই এবং তিনি তার আশু বাস্তবায়ন কামনা করেন।

ক্লাইভ মীর জাফরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি। তিনি গুপ্তচর ও সংবাদবাহক পাঠান। মীর জাফরই সংবাদ দেন যে কাশিমবাজারের মাত্র ছয় মাইল দক্ষিণে মানকারা গ্রামে তাঁবু স্থাপন করে নবাব ও তার বাহিনী যাত্রাবিরতি করেছে। তারই প্রস্তাব একটি ভিন্ন পথ অনুসরণ করে ইংরেজ বাহিনী নবাব ও তার বাহিনীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালালে বিজয়ের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ক্লাইভের বাহিনী পলাশী পর্যন্ত পৌঁছতেই নবাবের বাহিনীও সন্নিকটে। নিজের তাঁবুতে ফিরে আসার পর পরই মীর জাফর কর্নেল ক্লাইভের কাছে চিঠি লিখেন: ‘অবিলম্বে অগ্রাভিযান করুন এবং রাতে শিবির আক্রমণ করুন।’ কিন্তু আতঙ্কিত সংবাদবাহক চিঠিটি কর্নেল ক্লাইভের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। (জন স্টুয়ার্টের বাংলার ইতিহাস, আবু জাফর অনূদিত)

২৩ জুন ১৭৫৭ মাত্র ৯ ঘণ্টার যুদ্ধে ক্লাইভ ও মীর জাফরচক্রের বিজয় হয়; বাংলার স্বাধীনতা প্রায় ২০০ বছরের জন্য লুপ্ত হয়ে যায়।

২৯ জুন ১৭৫৭ কর্নেল ক্লাইভ দ্বিধান্বিত মীর জাফরকে হাত ধরে টেনে নিয়ে বাংলার মসনদে বসালেন।

কোম্পানির ক্রীড়নক হয়ে গেলেন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব বাহাদুর।

পলাশীর পর: রমেশচন্দ্রের বিবরণে মীর জাফর

পলাশীতে পরাস্ত হওয়ার পর সিরাজ ‘যে প্রভাতে মুর্শিদাবাদে প্রত্যাগমন করেন, সেই প্রভাতে মীর জাফর ও (তার পুত্র) মীরণের সঙ্গে দাদপুরের ব্রিটিশ শিবিরে পলাশী বিজেতা কর্নেল ক্লাইভের শুভসন্দর্শন। চতুর ক্লাইভ মীর জাফরকে কালাতিপাতের অবসর না দিয়া অবিলম্বে মুর্শিদাবাদে উপনীত হইয়া সিরাজউদ্দৌলাকে কারারুদ্ধ করিয়া রাজকোষ হস্তগত করিবার উপদেশ দান করেন।’

মীর জাফর নিবন্ধের জন্য ১৩০৪ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত শ্রী অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় রচিত সিরাজউদ্দৌলার আরো দুটো অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করা আবশ্যক।

‘মীর জাফর রাজধানীতে শুভাগমন করিবামাত্র শুনিতে পাইলেন যে শিকার হাতের বাহির হইয়া গিয়াছে। তিনি আর কি করিবেন? অবিলম্বে হীরাঝিলের শূন্য রাজসিংহাসন অধিকার করিয়া সিংহাসনাধিপতি সিরাজউদ্দৌলাকে কারারুদ্ধ করিবার জন্য চারিদিকে লোকলস্কর প্রেরণ করিতে আরম্ভ করিলেন...

রাজধানী শত্রুশূন্য হইল তথাপি মীর জাফর মসনদে উপবেশন করিতে সাহস পাইলেন না। সকলে বুঝিল যে অতঃপর তিনিই বাংলা বিহার উড়িষ্যার শূন্য সিংহাসন উজ্জ্বল করিবেন তথাপি মীর জাফর সেই শূন্য সিংহাসন সম্মুখে করিয়া ক্লাইভের শুভাগমনের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। ক্লাইভ সহসা রাজধানীতে পদার্পণ না করিয়া নগর উপকণ্ঠে কালযাপন করিতেছিলেন, ২৯ জুন (১৭৫৭) দুইশত গোরা এবং পাঁচশত কালাসপাহী সমভিব্যাহারে ইংরাজ সেনাপতি শুভাগমন করিলেন। ক্লাইভ বলিয়া গিয়াছেন সে দিন যত লোক রাজপথ পাশে সমবেত হইয়াছিল, তাহারা ইংরেজ নিধনে কৃত সংকল্প হইলে কেবল লাঠিসোঁটা এবং লোস্ট্রনিক্ষেপেই তত্কার্যসাধন করিতে পারিত।’

ক্লাইভ ক্ষণমাত্র কালবিলম্ব না করিয়া পাত্রমিত্রগণের সাক্ষাতে দরবার কক্ষে মীর জাফরের নিকটবর্তী হইলেন এবং তাহাকে মসনদে বসাইয়া দিয়া কোম্পানি বাহাদুরের প্রতিনিধিস্বরূপ স্বয়ং সর্বপ্রথমে নজর প্রদান করিয়া মীর জাফরকে বঙ্গ বিহার উড়িষ্যার সুবেদার বলিয়া অভিবাদন করিলেন।

একটি নব মূল্যায়ন:

মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ও ইতিহাসের সব সত্য স্বীকার করে নিয়ে এটাও বলা হচ্ছে তার বিশ্বাসঘাতকতাই খুলে দেয় আধুনিক ভারতের সিংহদ্বার। পুরনো ধারা অব্যাহত থাকলে মক্তব ও টোলে পাঠ গ্রহণের উপরে ওঠা হয়তো সম্ভব হতো না। আধুনিকতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইউরোপীয় সংস্কৃতি, পুঁজিবাদ—সবই ঢুকেছে তার বিশ্বাসঘাতকতা থেকে সৃষ্ট ইংরেজ উপনিবেশ থেকে, সে অর্থে তিনি কি আধুনিক ভারতের অগ্রদূত নন?

বিষয়টি বিতর্কিত সন্দেহ নেই কিন্তু উপক্ষেণীয় নয়।

 

এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা