বাঙালি শিশুর অক্ষর পরিচয়ের শুরু একটি ফলের হাত ধরে। অ-তে অজগর আসছে তেড়ে; আ-তে আমটি আমি খাবো পেড়ে। কচি রিনরিনে গলায় এ বীজমন্ত্র আউড়ে এগিয়ে চলে তার প্রথম পাঠ। জীবনের সেই ঊষালগ্নে বাঙালি শিশুর মনোভূমে আমের যে মিষ্টি মধুর গোড়াপত্তন হয়, তা চিরদিন থাকে অটুট। অক্ষয়। অজর।
অজগর ও আমের মধ্যে কোনো কার্যকর সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা বৃথা। আমের স্বাদ পেতে অজগরের আগ্রহ নিয়ে প্রাণিবিজ্ঞানীদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ চোখে পড়ে না। বনচর অজগর গৃহস্থের বাড়ির অঙিনায় বা পথেঘাটে চরে বেড়ায় না। যদিও আমগাছ ও আমের অঙ্গে শিশুর পরিচয় প্রায় জন্ম থেকেই, কিন্তু অজগরের সঙ্গে তার চাক্ষুষ পরিচয় বাল্যে আদৌ কখনো ঘটে কিনা সন্দেহ। তাহলে এ ভয়াল প্রাণীটিকে শিশুতোষ পাঠের গোড়াতেই টেনে আনা কেন? অ-এর সঙ্গে আ-এর ধ্বনিগত নৈকট্য ও বর্ণের ক্রমানুসারের বাধ্যবাধকতার কারণে অজগরের পরই আমের স্থান দেয়া হয়েছে। এছাড়া অ বর্ণটির সঙ্গে পড়ুয়ার পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য একটি দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তুর একান্ত প্রয়োজন ছিল; যার নামের শুরু হবে অ বর্ণ দিয়ে। অজগরের মতো বিপুলকায় চিত্রিত প্রাণীটি ছাড়া এ প্রয়োজন এত ভালোভাবে আর কে মেটাতে পারে?
নির্বিষ অজগর শারীরিক গঠনের কারণেই কাউকে তেড়ে আসতে পারে না। তবু এর সামান্যতম উল্লেখই শিশুর মনে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। এই দমবন্ধ পরিবেশ থেকে শিশুকে স্বস্তির আবহে ফিরিয়ে আনতে তাই দ্বিতীয় বাক্যটিতে অতিদ্রুত তার কচি মুঠোয় গুঁজে দেয়া হলো বাংলার মধুর মিষ্টি ফল আম। পরিত্রাতার ভূমিকায় আমের এ আবির্ভাব শিশুর মনে যে চিরস্থায়ী আসন গড়ে তোলে, তা কি অন্য কোনো ফল কখনো কেড়ে নিতে পেরেছে? এরই মধ্যে অভিভাবকদের কেউ হয়তো রবীন্দ্রনাথের আমসত্ব দুধে ফেলে, কলা সন্দেশ মাখা পিঁপড়ে কাঁদানো রসসিক্ত মিষ্টি ছড়াটি শিশুটিকে পড়ে শুনিয়েছিলেন। সেই নিস্তব্ধ দুপুরে বালক রবির ছড়ার হাপুসহুপুস শব্দের জলতরঙ্গে আমাদের নবীন পড়ুয়ার ভেসে যেতে বিন্দুমাত্র অনীহা দেখা যায়নি। আরেকটু বড় হয়ে আমাদের তরুণ পড়ুয়াটি ছাপা হরফের আলোছায়া মাখা, কিছুটা বোঝা আর কিছুটা না বোঝা শব্দের পথ ধরে যেতে যেতে সাক্ষাত্ পেল এক বালকের। বয়সে একটু বড় এ ছেলেটির নাম খোকা। লেখাপড়ার বালাই সম্ভবত ছিল না এর। মাথায় কিসের বোঝা জিজ্ঞেস করায় উত্তর এল—
আমের ঝাঁকা।
খাসনি কেন?
দাঁতে পোকা।
বিলাসনি কেন?
ওরে বাবা!
মনে হয় না খোকা দাঁতে পোকার কারণে আম খেতে পারে না। আবার আম বিলিয়ে দেয়ার অধিকারও তার নেই। সে আম বহনকারী মাত্র। ফলের আস্বাদন তার আয়ত্তের বাইরে। খোকার অধিকার তবু কর্মে। ফলে নয়, বিদ্যার অধিকার তো নয়ই। আমাদের পড়ুয়ার মনে অবশ্য ছড়াটি পড়ার পর এত সঠিক তত্ত্ব মাথায় আসেনি, এসেছিল অনেক অনেক পরে পরিণত বয়সে। এতক্ষণে আমের ঝাঁকা মাথায় নিয়ে ভারবাহী পশুর মতো খোকা ধীরে ধীরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে গেছে। হয়তো আজো এমনি করে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের রৌদ্রদগ্ধ দুপুরে আমের ঝাঁকা মাথায় নিয়ে সে হেঁটে চলে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে।
এত দিন পর্যন্ত আমাদের পড়ুয়া ছিল তবু শ্রোতা বা দর্শকমাত্র। এবার তার সকর্মক হওয়ার পালা, বয়সও একটু বেড়েছে, সময় এসেছে তার বালক বীরের বেশে হাজির হওয়ার। হয়তো এসেছে নতুন খেলার উপকরণ, নতুন অস্ত্র— আম পাতা জোড়া জোড়া, এটাই তার চাবুক, এবার খোকা মারবে চাবুক চলবে ঘোড়া। বীরের আম পাতার চাবুকের ঘায়ে কাল্পনিক ঘোড়া ছুটে চলেছে ত্রাহি রবে, সঙ্গে বালক বীরের মুখে উচ্চকিত সতর্কবাণী নিরীহ জ্যেষ্ঠ ভগিনীর উদ্দেশে: ‘ওরে বুবু সরে দাঁড়া, আসছে আমার পাগলা ঘোড়া’। সেই যে ঘোড়া ছুটল, তা শত শত বছর পেরিয়ে শাশ্বত বাংলায় আজো অবিরাম ছুটে চলেছে। এমনি করে চিরন্তন বাংলার চিরন্তন শিশুর সঙ্গে যুগ যুগ ধরে ঘটে চলে আমের নব নব পরিচয় বিভিন্ন প্রেক্ষিতে, জীবনের ভিন্ন ভিন্ন বাঁকে।
বাল্মিকীর রামায়ণ বোঝার বা হাতে পাওয়ার অনেক আগেই শুরু হয়েছে তার নিজস্ব ভাষায়, নিজস্ব ভঙ্গিতে, নিজ মনোভূমে সঞ্জাত এক অপূর্ব শিশুকাব্য, যাকে আমায়ন বললে খুব বেমানান হবে না। এই আমায়ন প্রজন্মের পর প্রজন্ম রচনা করেছে শিশুরা তাদের কল্পনার কালি-কলম দিয়ে। এ রচনার কোনো শুরুও নেই শেষও নেই। এখানে আশোক বনে নেই, নেই কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, নেই কোনো পরাজিত, পুত্রহারা স্বজন হারা বিতর্কিত নিন্দিত রাজন্যের বিলাপ। বানর বা কাঠবিড়ালি রাক্ষস-খোক্কস তার কল্পনার জগতে থাকতে পারে, কিন্তু নেই কোনো অগ্নিপরীক্ষা বা বনবাসের মতো কোনো নিষ্ঠুর অনুজ্ঞা। এই আমায়ন যেন এক ‘ফিলগুড’ আমায়ন। এখানে বিষাদ বা বিয়োগান্তক পর্ব সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এ এক চিরমধুর, চিরসবুজ, চির আনন্দে জড়ানো আমায়ন, অন্তত সুখের এক অক্ষয় ভাণ্ডার।
দুই.
সেই ধূসর অতীত থেকে আম আমাদের রসনাকে তৃপ্ত করে চলেছে। এই আশ্চর্য স্বাদের ফলটি নিয়ে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছে নানা কাহিনী। রাজা-বাদশাহ থেকে সর্বস্তরের মানুষ গ্রীষ্মের এই রসে মজেছে। আমে অরুচি এমন মানুষ খুঁজলেও মিলবে না। এমন আমের প্রশস্তি রয়েছে পুরাণ, মহাকাব্য, ইতিহাস ছাড়িয়ে আরো পেছনে।
হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধদের বিভিন্ন মঙ্গলানুষ্ঠানে আম ও আম পাতার ব্যবহার যুগ যুগ ধরে শুভ চিহ্নরূপে স্বীকৃত।
খ্রিস্টপূর্ব ১৬০ অব্দে ভারতে সাঁচি বৌদ্ধস্তূপ নির্মিত হয়। এই স্তূপের ভাস্কর্যে আমসহ আমের অর্থে কয়েকটি নকশা খোদিত রয়েছে। আমের প্রাচীনত্বের এটি একটি শৈল্পিক নিদর্শন। ইলোরা ও অজন্তার গুহায় প্রাচীন চিত্রকলা ও ভাস্কর্যে আমগাছ, আম পাতা পুষ্পমঞ্জরিকে শৈল্পিক দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলমে বনজ্যোত্স্নার সঙ্গে আমের বিয়ে ধুমধাম করে দেয়া হয়েছিল। কালিদাস এ বিয়ে নিয়ে অগাধ প্রশস্তি শ্লোকও লিখেছিলেন। সংস্কৃতিতে আমকে নানা নামে ডাকা হয়, যেমন সহকার, রসাল এবং চ্যুত। কালিদাসের এই নাটকে আম্রমঞ্জরির উল্লেখ রয়েছে। কবি আমের মুকুলকে প্রেমের দেবতা মদনের পঞ্চশরের একটি শর হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
‘হে মধুকর, তুমি নতুন মধুর লোভে আকৃষ্ট হয়েছ। তুমি আমের মুকুলকে চুম্বন করে এখন কমলে বাস করে আনন্দিত চিত্তে এই চ্যুত মঞ্জরিকে ভুলে গেলে কিভাবে?’ কালিদাস তার বিখ্যাত মেঘদূত কাব্যে মেঘমালাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন যে পর্বতের সঙ্গে, সেটির নাম আম্রকূট।
ভগবত্ পুরাণে কৃষ্ণের লীলা প্রসঙ্গে বারবার উচ্চারিত হয়েছে চ্যুতবৃক্ষের প্রসঙ্গ। কৃষ্ণের অস্ত্র ছিল আম। অন্যকে আম খাইয়ে অনেক কাজ নাকি কৃষ্ণ করিয়ে নিতেন। তাই আমের আরেক নাম কেশবায়ুধ, অর্থাত্ কেশবের (কৃষ্ণের) আয়ুধ বা অস্ত্র— কেশবায়ুধ।
আবার রামায়ণে নাকি হনুমান লংকায় গিয়ে প্রথম অবিষ্কার করে রাবণের অধিকারে অসাধারণ একটি ফল আছে। সেটি হাতিয়ে হনুমান চলে আসে এপারে মূল ভূখণ্ডে। কে জানে হয়তো তার জন্যই তামিল ভাষায় আমকে বলে ‘ম্যান-কে’ বা ‘ম্যান গো’। একেই অনুসরণ করে পর্তুগিজরা বলত ‘ম্যাঙ্গা’। হয়তো এ থেকেই ইংরেজিতে ম্যাঙ্গো শব্দটির জন্ম। জাতক কথা অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধকে এক ভক্ত উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন একটা গোটা আম বাগান। বুদ্ধ সেই বাগানে এসে মাঝে মাঝে ধ্যানমগ্ন হতেন। তবে আমকাহিনী বুদ্ধের অনেক আগের পুরাণ কাহিনীতেও পাওয়া গেছে বলে গবেষকদের দাবি। সপ্তম থেকে দশম শতাব্দী পর্যন্ত বাগদাদের খলিফারা আমের স্বাদ নিতেন বাদশাহি সুরার রসে। আমের রস তাদের প্রাসাদে বিশেষভাবে তৈরি কক্ষে ছয় মাস ধরে রাখা হতো। সেই রস থেকে তৈরি হতো সুরা। এ খলিফাদের সূত্রে আম মাহাত্ম্য পারস্য হয়ে পৌঁছে মিসরে আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টাব্দে।
সপ্তম শতাব্দীতে এ দেশে আসা চীনের পরিব্রাজক হিউয়েন সাং আম খেয়ে এত মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, ফেরার সময় কিছু আম সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে ইতিহাসের দাবি। হিউয়েন সাং ভারতীয় আমের সেই যে বন্দনার সূচনা করেছিলেন, পরবর্তীকালে পারসিক, মোগল, পর্তুগিজ, ডাচ, ইংরেজ— সব রসিকের মুখেই শুনি রসালের সুখ্যাতি। কেউ বলেছেন, উপমহাদেশের আম ‘প্রিন্স অব ফ্রুট’। আবার কারো মতে, দ্য ফ্রুট অব দ্য ম্যাগনিফেরা ইন্ডিকা, আপেল বা আঙ্গুরের সঙ্গে আমের কোনো তুলনাই হয় না।
পনেরো শতকে বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের গৌড় দরবারে চীনের মিং সম্রাটের এক দল রাজদূত উপস্থিত হয়েছিলেন। এই দূতরা তাদের রাজকীয় প্রতিবেদনে বাংলার আমের মিষ্টতার কথা লিখে গেছেন।
হোসেন শাহের পুত্র সুলতান নুশরাত শাহ ১৫২৩ খিস্টাব্দে রাজশাহী শহর থেকে ২৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পদ্মা নদীর তীরে বাঘা নামের স্থানে একটি বড় মসজিদ নির্মাণ করেন। এ মসজিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পোড়ামাটির ফলকে তৈরি ফুল, লতা, পাতা প্রভৃতি মোটিফের অলঙ্করণ। মূল মেহরাবের পাশের ছোট মেহরাবটিতে রয়েছে কাঁঠাল ও আমের পোড়ামাটির ফলকের অলঙ্করণ। বাঘায় হোসেন শাহি আমলে প্রচুর আমের চাষ হতো। মসজিদের মেহরাবে বাস্তবসম্মতভাবেই এ শিল্পকলাটি ধরে গেছেন সে আমলের শিল্পীরা।
দ্বাদশ শতকে রচিত কবিতার সংকলন গ্রন্থ সদুক্তি কর্ণামৃত রাজা লক্ষ্মণ সেনের মন্ত্রী কবি উমাপতি ধর, আমের মঞ্জরি ও ফল নিয়ে সংস্কৃত ভাষায় একটি চমত্কার কবিতা লিখে গেছেন। পরবর্তীকালে ড. সুকুমার সেন একটু পরিবর্তন করে কবিতাটির বঙ্গানুবাদ করেছেন। কবিতাটি নিচে উদ্ধৃত করা হলো—
‘কোন কোন বৃক্ষ ফুল ফোটাবার কালে সুগন্ধি হয়,
কোন কোন বৃক্ষের কাঁচা ফল হয় সুরভি ও সুস্বাদযুক্ত,
কোন কোন বৃক্ষ আবার ফল পাকলে হয় মনোরম,
কিন্তু ফুল ফোটাবার কাল থেকে ফল পেকে যাওয়া পর্যন্ত—
আগাগোড়া মাধুর্য এ জগতে একমাত্র আম্রবৃক্ষেই প্রকটিত।’
কবি উমাপতি ধর সেই প্রাচীন আমলে তার কবিতার মাধ্যমে আম ও আম গাছের পৃথক বৈশিষ্ট্য এবং বিশালত্বের কথা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে গেছেন।
মোগল বাদশাহরা হিন্দুস্তানে ফলচর্চায় বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলন, তা আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী ও আকবরনামায় লেখা রয়েছে। তিনি শুধু এ দেশের উদ্যানবিদদের উত্সাহ দিয়েছেন তা নয়, তাদের আগ্রহে ইরান-তুরান থেকেও অনেক বিশেষজ্ঞ এসে এ দেশে আনা শৌখিন ফলের চাষ শুরু করেন। দেশী ফলগুলোকে স্বাদ হিসেবে আবুল ফজল তিন ভাগে ভাগ করেছেন— মিষ্টি, টক ও ঝাঁঝাল ফল। মিঠে ফলের তালিকায় সবার প্রথমেই রয়েছে আমের স্থান, তার পর আনারস, কমলা, কাঁঠাল, কলা ইত্যাদি। আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরীতে সুবাহ বাংলার ভাটি নামে একটি নতুন বিজিত দেশের আম গাছের বর্ণনা আছে, ‘এই নতুন সংযুক্ত দেশের আমগাছগুলো একজন মানুষের মতো দীর্ঘকায়, মানুষের চেয়ে উঁচু নয়।’ ১৫৭০ থেকে ১৫৮০ সালের মধ্যে মোগল সম্রাট আকবর গোটা হিন্দুস্তান থেকে সংগ্রহ করে এনে বিহারের দারডাঙ্গায় রোপণ করলেন বিভিন্ন প্রজাতির এক লাখ আমের চারা। সেই এক লাখ আম গাছ নিয়ে যে বাগান, তার নাম লক্ষবাগ। তাহলে অনুমান করা যেতে পারে যে, এ দেশের আমের পরিকল্পিত চর্চা শুরু করেন প্রথমে সম্রাট আকবর। বাদশাহ জাহাঙ্গীরের আমচর্চার বিচিত্র তথ্য সম্রাটের স্মৃতিকাহিনী তুজুখের পাতা ওল্টালেই চোখে পড়বে। তিনি সাম্রাজ্যের সব সুবাহ থেকে নানা জাতের আম সংগ্রহ করে প্রতিটির গুণমান ও স্বাদের মূল্যায়ন করিয়েছিলেন। আমির-ওমরাদের আমের উত্কর্ষ বাড়ানোর লক্ষ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্সাহ দিতেন। তার এক অনুগত ওমরাহ, মুকাব্বর খান বাদশাহকে একই বাগান থেকে ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ অক্টোবর দুই মাস ধরে অসময়ের আম খাইয়ে তাজ্জব করে দিয়েছিলেন। অসাধারণ মনে হওয়ায় ঘটনাটির বিবরণ তুজুখে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, এ কথা সম্রাট নিজেই বলে গেছেন। আমচর্চায় সাফল্যের জন্য মুকাব্বর খানকে পুরস্কৃত করতে সম্রাটের বিলম্ব হয়নি। পিতা বাদশাহ জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে প্রকৃতির ফল, পশু-পাখি ও ফুল নিয়ে তীক্ষ পর্যবেক্ষণশক্তি ও গভীর অনুসন্ধিত্সার গুণটি সম্রাট শাহজাহান উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিকদের অভিমত। শিল্প, সংস্কৃতি ছাড়াও বাদশাহ শাহজাহান আরো একটি অক্ষয় কৃতি রেখে গেছেন, যা তার অন্যান্য অর্জনের তুলনায় কোনো অংশে হীনপ্রভ নয়। তার এ অক্ষয় কৃতিটি হলো বাদশাহি ফরমান জারি করে তিনি আম চাষ বা আমচর্চার সুযোগ আমজনতার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শাহজাহানের এই সংস্কারমূলক কাজটিকে আমের গণতন্ত্রীকরণ বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না।
এই শাহি ফরমান জারির আগ পর্যন্ত তামাম হিন্দুস্তানে আমের উন্নত মানের বাগিচা তৈরি করা, নতুন জাতের আমের চারা তৈরির জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব অধিকারই ছিল শাহি পরিবারের সদস্য, দরবারের আমির-ওমরাহ এবং বাদশাহর আজ্ঞাবহ অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে কুক্ষিগত। বাদশাহর এ ফরমানের দৌলতে ভালো জাতের আমের বাগান, ভালো চারা উত্পাদন, আম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এই প্রথম সাধারণ মানুষের হাতে এল। আম চাষের ওপর থেকে সম্রাট রাষ্ট্র আরোপিত সব খাজনাও তুলে দিলেন। শাহজাহানের এই ফরমানকে বিলাতের ইতিহাসের অনুকরণে আমের ‘ম্যাগনা কার্টা’ বললে বাড়াবাড়ি নাও হতে পারে। বিকল্প হিসেবে এই ফরমানকে আমের গধহমড় ঈধত্ঃধ বললে আক্ষরিক অর্থেই যথার্থ বলা হবে বলে মনে হয়। সম্রাট শাহজাহানের নানা বিষয়ে আগ্রহের কথা ইতিহাসে সুবিদিত। তিনি আমের মতো সমৃদ্ধশালী এবং অসাধারণ ফলটির স্বভাব-চরিত্র ভালোই বুঝতেন। আমের খুঁটিনাটি নিয়ে তার তীক্ষ পর্যবেক্ষণশক্তির প্রশংসায় শাহি দরবারি লেখকদের প্রাচ্যে সুলভ অতিশয়োক্তির অভিযোগ থাকলেও বাদশাহর অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণশক্তির ভিত্তি একেবারে নড়বড়ে ছিল না বলেই মনে হয়।
তার সম্পর্কে একটি বহুল প্রচারিত কাহিনী এ রকম: একবার কোনো দূরবর্তী সুবাহ থেকে দ্রুতগামী ডাকবাহকের মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থায় সযত্নে বাছাই করা উত্কৃষ্ট মানের কিছু আম বাদশাহ নামদারের জন্য রাজধানীতে পাঠানো হয়েছিল। সেই আমের একটি বাদশাহ হাতে তুলে নিয়ে ভালো করে দেখলেন, তার পর একটির ঘ্রাণ নিয়ে কিছুক্ষণ পর নাকি বলেছিলেন যে, আম গাছ থেকে পেড়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় মাটিতে রাখা হয়েছিল। ফলে এর ঘ্রাণ ও স্বাদ সামান্য হলেও হ্রাস পেয়েছে। পরবর্তীতে অনুসন্ধান করে দেখা গেল, বাদশাহর অনুমান অভ্রান্ত। শাহজাহানের সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল ঘ্রাণশক্তির দাবিতে যারা অতিশয়োক্তির আভাস পান, তাদেরও পুরোপুরি দোষ দেয়া যায় না। তবু আধুনিক যুগের টি টেস্টার বা ওয়াইন টেস্টার নামের গন্ধ ও স্বাদ বিশ্লেষকদের বিশেষ ক্ষমতা সম্বন্ধে সবিনয়ে অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করবে। বিদেশে এবং আমাদের দেশের চা শিল্পে ‘টি টেস্টার’ নামে একটি মোটা বেতনের চাকরি দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও চা শিল্পে আজো এ পদটি অপরিহার্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। চা কোম্পানি নিলামে যেসব চা কেনাবেচা করে, তার গুণমান স্থির করেন এই টি টেস্টাররা— যন্ত্রপাতি বা রাসায়নিক বিশ্লেষণের পরও এদের যন্ত্রবিহীন পরীক্ষা চায়ের গুণগত মান সম্পর্কে শেষ কথা। এরা চা শুকে এবং সামান্য চায়ের লিকার জিভে আস্বাদন করে চায়ের মান স্থির করেন। এরা কেউ কোনো অতীন্দ্রিয় শক্তির অধিকারী বা রসায়ন শাস্ত্রে বিশাল ডিগ্রিধারী নন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। ঘ্রাণশক্তির তীক্ষতা, জিভের আস্বাদনক্ষমতার ওপর নির্ভর করেই চা কোম্পানি এদের মতামতকে বিনা বাক্যে মেনে নেয়। ইউরোপ-আমেরিকায় মদের কোম্পানিগুলো ওয়াইন টেস্টারদের মোটা অঙ্কের বেতন দেয়, তাদের নাসিকা নামক প্রত্যঙ্গটির ক্ষমতা-দক্ষতার জন্য— এই ক্ষমতা প্রকৃতি প্রদত্ত। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এই প্রকৃতিদত্ত ক্ষমতাকে পরিশীলিত করেছে মাত্র। বাদশাহ শাহজাহানের বেলায় হয়তো এমনটি ঘটেছিল।
আমের চর্চা মোগলদের পর ইংরেজ আমলেও থেমে থাকেনি। সেই আমলে ভারতের ইংরেজ প্রশাসকদেরও আমের সুলুকসন্ধান নিতে দেখা গেছে। আমাদের দুটি বিখ্যাত আম ল্যাংড়া ও ফজলির সঙ্গে দুই ইংরেজ সাহেবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। প্রথমটির সঙ্গে পাটনার ডিভিশনাল কমিশনার কর্কবান ও দ্বিতীয়টির সঙ্গে মালদহ জেলার কালেক্টর র্যাভেনশ সাহেবের অনুষঙ্গ আজো অনেকের মনে আছে।
তিন.
বাংলার নবাবদের কল্যাণেই আর নবাবি সংস্কৃতির হাত ধরেই বাংলার আমের সুখ্যাতি। সুতরাং আমচরিত শেষ করার আগে তাদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা না করা অনুচিত হবে।
বাংলার নবাবদের উদ্যোগে দেশের নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন জাতের আমের চারা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় তাদের সংকরায়ণ ঘটানো, পরিচর্যা ও রসাস্বাদন জন্ম দেয় এক নিজস্ব সংস্কৃতির— যার পরতে পরতে ছিল রাজকীয়তার ছোঁয়া। আমচর্চার জন্য নবাবি আমলে বিশাল বিশাল আম বাগানে নানা প্রজাতির আমের চাষ হতো। এসব বাগানের দেখভাল করার জন্য থাকত নানা শ্রেণীর কর্মচারী, ছিলেন আম বিশেষজ্ঞ। কোন আম কখন খাওয়ার উপযুক্ত হয়েছে, কোন আমকে কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, তা দেখভাল করতেন আমের দারোগারা। সে সময় বিচক্ষণ ও সমঝদার দারোগা হিসেবে আরজুমান্দের বিশেষ সুনাম ছিল। আমের স্বাদ পরীক্ষা করার জন্য ছিলেন ‘পয়মান’ বা টেস্টার। আম পাড়া হতো এক ধরনের কাপড়ের তৈরি থলির সাহায্যে— এর স্থানীয় নাম ‘টুসি’। আম পাড়া হলে সেগুলোকে ‘আম্বাখানা’য় সংরক্ষণ করা হতো। সেখানে ভিন্ন জাতের আমকে পৃথকভাবে রাখার ব্যবস্থা ছিল। মুর্শিদাবাদের লালবাগে এখনো একটি ভগ্ন আম্বাখানার অস্তিত্ব চোখে পড়ে।
আমের মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে খানদানি যেমন কোহিতুর-কালাপাহাড়— এদের রাখা হতো তুলার বিছানায়। পাকার জন্য এগুলোকে তিন-চার ঘণ্টা অন্তর এপিঠ-ওপিঠ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে রাখা হতো।
নবাবি আমলে আম কাটার জন্য বিশেষ এক ধরনের সরু ছুরি
ব্যবহার করার রেওয়াজ ছিল। খোসা ছাড়ানো হতো কাগজের মতো পাতলা করে। গোড়া থেকে শুরু করে বোঁটা পর্যন্ত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একটানা। আঁটিতে ছুরি লাগলে নাকি আমের স্বাদের পরিবর্তন ঘটে যেত। খোসা ছাড়ানোর পর আস্ত আমটাই পরিবেশন করা হতো। তবে ফজলি, দিলসাদ এসব আমকে লম্বাভাবে ফালা ফালা করে কাটার নিয়ম ছিল। আবার ভবানী চৌরস, ঝুমকা এসব আম চুষে খেতে হতো।
আমের নামের সঙ্গেও মিশে আছে নবাবি আমলের ইতিহাস। নবাব ফেরাদুন জার মা, রাইসুন্নেসা বেগমের নামে ‘বেগম পছন্দ’, ফেরাদুন জার ফেরদৌস মহল সাহেবার নামে ‘ফেরদৌস পছন্দ’, নবাব মুবারক দৌলার পৌত্র নবাব সফদার জং বাহাদুরের নামে ‘সফদার পছন্দ’ এসব নামকরণ হয়। নাটোরের রানী ভবানীর বিশেষ পছন্দের আমটির নাম করা হয় ‘ভবানী চৌরস’। তোতা পাখির ঠোঁটের মতো গোড়ার দিকটি দেখতে ছিল বলে একটি আমের নাম রাখা হয় ‘তোতা আম’। ওই আমটি নাকি নবাব ওয়াসিম আলি মির্জা তার বাগান থেকে নবাব রইস মির্জাকে উপহার দেন। ‘মির্জা পছন্দ’ আমটির উত্পত্তি মির্জা কোকার বাগানে। বর্তমানে অবশ্য এসব আমের অধিকারক দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। তবু এদের নামের মধ্যেই এরা এখানো বেঁচে রয়েছে। নবাবি আমলের যে আমের উল্লেখ না করলে আমচর্চার আলোচনা অসম্পূর্ণ রইবে। সেই আমের নাম কোহিতুর, যাকে বলা হতো আমের রাজা। তোয়াজে আর আদরে মানুষ হওয়া মুর্শিদাবাদের এই আমের চরিত্রে আছে নবাবি মেজাজের সব ওঠা-নামা, ভালো-মন্দ সব লক্ষণ। নবাব ওয়ালাকাদার সৈয়দ হোসেন আলি মির্জার তৃতীয় পুত্র নবাব আলি মির্জা এই আমের প্রবর্তন করেন। কালাপাহাড় প্রজাতির আমের সঙ্গে বিশেষ সংকরায়ণের মাধ্যমে তৈরি এই আম যখন পাড়া হয়, তখন মাটিতে পেতে রাখা হয় তুলার বিছানা। প্রতিটি আম রাখতে হবে তুলার বাক্সে। লোহার ছুরি বা বঁটি আমের গায়ে ছোঁয়ানোর প্রশ্নই ওঠে না। হয় রুপার ছুরি নতুবা বাঁশের ছাল তীক্ষ করে সেটা দিয়ে কাটতে হবে এই বিলাসী আম। জন্মলগ্ন থেকে অতি আদর পেয়ে এই আমের স্বভাব বড় স্পর্শকাতর এবং কিছুটা একগুঁয়ে। আমটি কেটে ব্যস্ত হয়ে অন্য কাজে হাত দেয়া যাবে না। খোসা ছাড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে না খেলে আভিমানী এই আম মিনিটে স্রেফ বরফের মতো গলে যাবে। পরিতাপের বিষয়, এই প্রবাদপ্রতিম আমটি আজ লুপ্তপ্রায়। আম গবেষক সমৃদ্ধ দত্ত যথার্থই লিখেছেন, ‘ইতিহাস প্রসিদ্ধ আমটি ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছে ইতিহাসেই। সামান্য কয়েকটি আমগাছ বেঁচে আছে।’ অনেক পুরনো আম ব্যবসায়ী এর নাম শুধু শুনেছেন, চোখে দেখার সৌভাগ্য তাদেরও হয়নি।
চার.
বাদশাহি ও নবাবি কালচারের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পে চমত্কার চিত্রধর্মী গদ্যে আজো অভ্রান্ত প্রমাণিত হয়ে জ্বলজ্বল করছে। প্রচুর সুলম্ব পরিচ্ছদ, প্রচুর শিষ্টাচার এবং প্রচুর অবকাশ— এ তিনটি বাদশাহি আর নবাবি কালচারের হল-মার্ক। প্রচুর অবকাশ ও শিষ্টাচারের জারক রসে আপ্লুত নবাবি সংস্কৃতির দৌলতে বাংলার নবাব, বেগম, রাজা-রানীদের আমচর্চায় মুর্শিদাবাদ ঢাকা লক্ষৌয়ের নবাবি দরবার হয়ে উঠেছিল নানা কেতা ও শিষ্টাচারে বাহুল্যের জন্য বহুল নিন্দিত ও নন্দিত। ফলে আম উপভোগ করার জন্য নানা আভিজাত্যপূর্ণ শিষ্টাচার, বিস্তর নিয়ম-কানুন এবং হাস্যকর বাধা-নিষেধ নিয়ে সম্ভব-অসম্ভব কেচ্ছা-কাহিনীর জন্ম হতে খুব বেশি দিন লাগেনি এই তিন ক্ষহিষ্ণু নবাবি সংস্কৃতির কেন্দ্রে।
অনেক রসিক ব্যক্তির মন্তব্য, আম একটি ফলমাত্র নয়, আম একটি বিশেষ সময়ের সংস্কৃতির সংজ্ঞাবিশেষ। কেউ কেউ আরো একধাপ এগিয়ে বলেন, আমচর্চা কাব্যচর্চার মতোই সুস্থ রুচির ব্যাপার। লক্ষৌয়ের এক নবাব নাকি বলেছিলেন, যারা নিজের স্ত্রীকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করে সম্মান দিতে পারেন না বা চান না, তারা সূক্ষ্ম আমচর্চার মীড়, গমক, তান কী করে উপলব্ধি করবেন?
আমের সমঝদারদের একাংশের দৃষ্টিতে আম নিজেই একটি অনুষ্ঠান। তাদের যুক্তি মোটেই উপেক্ষণীয় নয়, তাদের যুক্তির সপক্ষে দেয়া তথ্যও প্রমাদশূন্য— নির্ভুল। আম বাগান তৈরিতে প্রচুর সহূদয় যত্ন ও বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন। আমের চারা বড় হলে মঞ্জরি হতে ফল পাকানো, পাকা ফল পরম মমতায় গাছ থেকে নামানো, তুলার বিছানা তৈরি করে সেই পাকা ফলকে লালন, কচি শিশুর মতো কিছু ফল পর পর পাশ ফিরিয়ে দেয়া, ঠাণ্ডা পানিতে ডুবিয়ে রেখে দিয়ে বাঁশ, রুপা কিংবা হাতির দাঁতের ছুরিতে কেটে পাথর বা চীনামাটির পাত্রে পারিবেশন— এসবই তো এক বিশাল অনুষ্ঠান। জাপানিদের চা-পরবের মতো অনুষ্ঠান বাঙালির আম-পরবও প্রশংসার দাবি রাখে।
আম খাওয়া নিয়ে বিস্তর বাছ-বিচারের জন্ম দিয়ে বাংলার নবাব পরিবারের অনেকে আজো গাল্পিক হিসেবে সুখ্যাত হয়ে আছেন। তাদের নামে প্রচলিত অনেক কাহিনী অবশ্যই ভিত্তিহীন, তবু আমচর্চা করতে করতে নবাবদের সর্বনাশ হয়েছিল— এমন অপবাদের পেছনে যে তাদের বাড়াবাড়ি রকমের আমাসক্তির ভূমিকা রয়েছে, তারও কিছুটা আভাস মিলবে।
জনশ্রুতি বলে কোনো কোনো নবাব নাকি গরমের দিনে অন্দরমহল ছেড়ে বেগম-শাহজাদা-শাহজাদি ও নকর-চাকরানিদের সঙ্গে নিয়ে বিশেষ আমগাছের নিচে সংসার পাততেন। কোনো আম গাছের তলায় খুব ভোরে, কোনো গাছের তলায় সূর্য ডোবার পর, কোথাও দুপুরের সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপে এবং কোথাও বা গোধূলিবেলায় কিংবা মধ্যরাত্রিতে স্থান বদল করতেন। ব্যাপারটা পাগলামির লক্ষণ বলে মনে হলেও কিন্তু আসলে তা নয়। এখানে নবাবদের পুরুষাণুক্রমে অর্জিত সূক্ষ্ম বিচারে একটা সাক্ষ্য নাকি পাওয়া যায়। যে আম পূর্বের আকাশে আলোরেখা ফোটার ঠিক আগ মুহূর্তে খাওয়ার কথা, সেটি দুপুরের কাঠফাটা রোদে খেলে শুধু বিস্বাদই মনে হতো না, শরীরের অম্ল, পিত্ত, বায়ু, কফ ইত্যাদি ভীষণ কুপিত হয়ে দেহে বিরাট ওলট-পালট হওয়ার আশঙ্কা থাকত।
জনশ্রুতি এখানেই শেষ হয়নি। আরো আছে। একবার কোনো এক নবাব নাকি জোর করে নিয়ম ভেঙে যে আম সকাল সাড়ে দশটায় খাওয়ার কথা, তা রাত সাড়ে দশটায় খেয়ে ফেলে নিদ্রায় শুধু বিভীষিকাই দেখেননি, প্রচণ্ড উত্তাপে ঘাম ছেড়ে বিছানা ভিজিয়ে ফেলেছিলেন। তার ওপর রাতভর ঘরের ভেতর গ্যাস বেলুনের মতো শূন্যে ভেসে বেড়িয়ে এবং বিয়ের আসরের ব্যান্ড পার্টির মতো আওয়াজে বায়ু ত্যাগ করে সবার ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটিয়েছিলেন প্রচুর। আম নিয়ে বাড়াবাড়ির ফল হিসেবেই এ ধরনের অবাস্তব কাহিনীর জন্ম হয়েছিল।
পাঁচ.
আম বড় অহঙ্কারী ফল। বস্তুত মসৃণ ত্বক, উজ্জ্বল বর্ণ, অনবদ্য অবয়ব আর মন মাতানো সৌরভের মানদণ্ডে আম রীতিমতো দৃষ্টিনন্দন, যেন রূপের রানী। তার মনে অহঙ্কার যদি বাসা বাঁধে তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই। রসাল যে কত দেমাগি, তার গুমর যে কত ভারী, সে খবর মাইকেল মধুসূদনের চেয়ে কে আর বেশি জানেন। মধুকবির রসাল ও স্বর্ণলতিকার কথোপকথন কবিতাটিই তো এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। নীতিকথা শেখানোর উদ্দেশ্যে রচিত হলেও কবিতাটিতে আমের গুণাবলির ফিরিস্তি এবং আমের অহঙ্কারী মনোভাবের একটি চমত্কার রসোত্তীর্ণ আলেখ্য রয়েছে। রসাল স্বর্ণলতিকাকে তাচ্ছিল্য করে বলছে,
‘শুন মোর কথা ধনি,
নিন্দ বিধাতারে!
নিদারুণ তিনি অতি;
নাহি দয়া তব প্রতি;
তৈই ক্ষুদ্রকায়া করি সৃজিলা তোমারে।’
দীন স্বর্ণলতিকাকে ব্যঙ্গ করে বলার মধ্যে রসাল কিছু করুণাও মিশিয়ে দিতে ভোলেনি। এর পরই আত্মগরিমা প্রচারে নেমে গেল রসাল:
‘মধু মাখা ফল মোর বিখ্যাত ভুবনে
তুমি কি তা জান না ললনে?’
কবিতাটির শেষ প্রান্তে রসাল তার অহঙ্কারের কিঞ্চিত্ শাস্তি প্রকৃতির হাত থেকে পেয়েছিল— এমন তথ্যও কবি দিতে ভোলেননি।
আম শুধু অহঙ্কারীই নয়, বেজায় একগুঁয়েও বটে। কৃষিবিজ্ঞানী ও উদ্যানবিদদের সব কলাকৌশলের ফাঁদ এড়িয়ে রসাল ঋতুর নিয়মনিষ্ঠার প্রতি আজো ঐকান্তিক রয়ে গেছে। ফল, ফুল, সবজির চরিত্র আজ বহুদিন হলো ভুলে গেছে মৌসুমের প্রতীক্ষা। সারা বছর ধরেই পাওয়া যায় কমলা কিংবা ফুলকপি বা পুঁই-পালংশাক। কিন্তু ব্যতিক্রম আম। বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় এ ফলটির জন্য আজো ক্যালেন্ডারই ভরসা। এপ্রিল যাব যাব করছে, আর মে দরজায় বাইরে দাঁড়িয়ে— এই হলো আমের আগমনের কাল। সময়সীমার এই বাধ্যবাধকতা ছিল আকবরের কালে। তারও আগে এমনই ঋতুনিষ্ঠ ছিল আম কালিদাসের কালেও। এখন হাইব্রিড ফল, ফুল, সবজি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সাফল্যে সারা বছরই ফলন হয়। কিন্তু আমের একগুঁয়েমিকে এখনো বাগে আনতে পারেননি কৃষিবিজ্ঞানীরা। বিচ্ছিন্নভাবে অন্য ঋতুতে কিছু আমের ফলন হলেও আমজনতার রসনার সমর্থন না পাওয়া এসব তথাকথিত অকালের বা বারোমাসি আম খুব একটা কল্কে পায়নি। আম কেন এমন নাছোড় মৌসুমবাদী, সে যেন এক রহস্য। বিজ্ঞানীরা হয়তো এই রহস্যও একদিন সমাধা করে ফেলবেন। যারা আমচর্চায় মগ্ন, তারা আমের আরো একটি রহস্যের সদুত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন। সে রহস্যটি হলো ‘অফ ইয়ার’ আর ‘অন ইয়ারে’র অনিশ্চিত। যে বছর আমের প্রচুর ফলন হয়, তাকেই বলা হয় ‘অন ইয়ার’। আর যে বছর আম উত্পাদন কম তার নাম ‘অফ ইয়ার’। এক বছরে কোনো কোনো এলাকার বাগানে আমের বাম্পার ফলন। আর পরের বছর একই মাটি, একই আবহাওয়া, একই সার, একই বীজ এবং একই পরিচর্যায় নিয়মের পৌনপুনিকতা সত্ত্বেও বাগানে ফলন খুব সামান্য। কেন এমনটি হয়? এই প্রশ্নের এখনো জবাব মেলেনি। প্রশ্ন রয়েছে আরো। এমন নয় যে, এ বছর আমের অন ইয়ার হলো, ফলে আসছে বছর অফ ইয়ার হবে। এমনটিও সবসময় হয় না। পর পর দুই বছর অন ইয়ার। এমনটি অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু কোন বছর আমের অন ইয়ার আর কোন বছর অফ ইয়ার হবে, তার নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী সম্ভব নয়। আমের জীবনবৃত্তান্ত আজো রহস্যে ঘেরা।
বাংলাদেশে আমের চাষ প্রতি বছরই বেড়ে চলেছে। নানা নামের, বিচিত্র স্বাদের, বৈচিত্র্যময় রঙের অজস্র আম থাকলেও বাংলাদেশে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আম নিয়ে মাতামাতি কিন্তু সীমাবদ্ধ কয়েকটি প্রজাতি নিয়ে। হিমসাগর, গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাত, ল্যাংড়া আর ফজলি আম— বাঙালির হিরো হিমসাগর। হিমসাগরের মুকুট ছিনিয়ে নেয়ার জন্য প্রতীক্ষা করছে ল্যাংড়া, ফজলি। এর বাইরে যেসব আম বাজারে পাওয়া যায়, সেগুলো এলাকাভিত্তিক জনপ্রিয় আম যেমন— রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা, দিনাজপুরের সূর্যমুখী। কিছু আম রয়েছে, যার পরিচিতি কম; কিন্তু স্বাদে-গন্ধে উত্কৃষ্ট। এগুলো সাধারণত বাজারে ওঠে না— ব্যক্তিগত বাগানের এসব আম পরিবারের সদস্য ও বন্ধু-বান্ধবের মাঝে বিলানো হয়। এই গোত্রের একটির নাম ‘মধু গুগগুলি’, কুলবরইয়ের চেয়ে একটু বড়, খেতে হয় চুষে চুষে— কারণ আম এত ছোট যে, কাটলে আর কিছুই থাকে না। খেতে ভারি মিষ্টি এই আম কখনো বাজারে দেখিনি।
ছয়.
রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে আম নিয়ে বেশকিছু রসালো গল্প রয়েছে। এসব গল্পের মূলে রয়েছে ‘অরুণ-বরণ’ আমের প্রতি কবির তীব্র আকর্ষণ। এই পছন্দের ফলটির সঙ্গে সাময়িক বিচ্ছেদও যেন তার পক্ষে ছিল কষ্টকর। শিলাইদহে তার সংসারের ভাণ্ডারে আম ফুরিয়ে এলে তত্ক্ষণাত্ চিঠি যেত স্ত্রীর ‘ভাই দুটি’র কাছে কলকাতা থেকে আম পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে। শিলাইদহে অবশ্য কবির হাতের কাছেই মজুদ ছিল খুলনা, রাজশাহীর হিমসাগর, ল্যাংড়া, ক্ষীরসাপাত— নানা জাতের সুমিষ্ট আম। তবে মনে হয়, কবির রুচির স্বাদের চাহিদা মেটাতে এসব স্থানীয় আমের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না, নতুবা কলকাতায় আমের বরাত যেত না। সম্ভবত কবি ছেলেবেলা থেকেই রাজধানী কলকাতার বাজারের চালানি আম খেয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কলকাতার আম বলতে তখন এবং এখনো বোঝায় মুর্শিদাবাদ, বিহার, কাশীসহ উত্তর প্রদেশের নানা বাগানের উত্কৃষ্ট ল্যাংড়া, হিমসাগর, দশেরী, চৌসা ইত্যাদি আম। শিলাইদহের আশপাশে এদের সচরাচর দেখা মিলত বলেই অনুমিত। স্ত্রীর পাঠানো আমের মধ্যে কোন কোন প্রজাতির আম কবির রসনার আকাশে রোহিনী হয়ে উদিত হয়েছিল, আজ আর তা জানার উপায় নেই।
কবি নিজে আম ভালোবাসতেন, বোলপুরে অতিথি অভ্যাগতদের আম দিয়ে আপ্যায়িত করে তৃপ্তি পেতেন। একবার আমের মৌসুমে তার আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনে অতিথি হয়েছেন বিদেশ থেকে বেড়াতে আসা এক প্রিয় বন্ধু। বন্ধুর সঙ্গপ্রত্যাশী রবীন্দ্রনাথের ভারি ইচ্ছা, তিনি আরো ক’টা দিন থেকে যান। কিন্তু অতিথি কিছুতেই রাজি না হওয়ায় শেষ চেষ্টা হিসেবে কবি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন এই বলে যে, এখন আমের ভরা মৌসুম চলছে, এমন সময়ে তাড়াহুড়ো করে বোলপুর ছাড়তে নেই।
আমের লোভ দেখিয়ে প্রিয়জনকে ধরে রাখার কবি-প্রচেষ্টার এ গল্পটি ভারত চন্দ্রের বিদ্যা সুন্দরের কাহিনীই যেন মনে করিয়ে দেয়। বিয়ের পর নায়ক সুন্দর যখন বিদ্যাকে ছেড়ে কাঞ্চীপুরে ফিরে যেতে চাইল, তখন বিদ্যাও স্বামীকে সুমিষ্ট আমের মৌসুমের কথা মনে করিয়ে দিয়ে আরো কয়েকটা দিন কাছে পেতে চেয়েছিলেন।
‘জ্যৈষ্ঠ মাসে পাকা আম এ দেশে বিস্তর
সুধা ফেলে খেতে আশা করে পুরন্দর’
বিদ্যা চিহ্নিত এ আমটির নাম অবশ্য ভারত চন্দ্র কোথাও উল্লেখ করেননি। করলে আমাদের কাজে লাগত আজ।
বাংলাদেশের আম-কাহিনীর কোনো সমাপ্তি টানা সম্ভব নয়, কারণ আমাদের জাতীয় চেতনাও ইতিহাসের সঙ্গে আম-কাহিনীর স্রোত বিপুল গৌরবে প্রবহমান। একদা একটি প্রহসনমূূলক যুদ্ধের ছলে এবং আত্মপ্রতারণার নিলাজ উল্লাসে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিল ভাগীরথী নদীর তীরে এক অখ্যাত আম বাগানে— পলাশীর আম বাগানে। দুইশ বছর পর লক্ষ প্রাণের আত্মত্যাগে, বীরের রক্তস্রোতে আর মায়ের অশ্রুধারায় সেই চরম গ্লানিকে অতিক্রম করে বাংলার স্বাধীনতার বিজয় কেতন আবার উড়ল এ দেশেরই এক আম বাগানে। বৈদ্যনাথের আম বাগান মেহেরপুরে মুজিবনগরে বাংলাদেশের স্বাধীন সরকার গঠনের ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে। আমাদের ত্যাগ, শৌর্য ও বীরত্বে এই বিজয়গাথা চিরজীবী হোক, হোক চিরভাস্বর।
লেখক: গবেষক, সাবেক রাষ্ট্রদূত






