গুগি ওয়া টিঅঙগো  রূপান্তর: শওকত হোসেন

বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে কেনিয়াকে আমরা সাহিত্যিক ঘাঁটিতে পরিণত করতে চাই।

১৯৬৯ সালে নাইরোবি থেকে আনুমানিক শ’খানেক মাইল দূরের শহর নিয়েরিতে গাকাম্বা নামে এক বাইসাইকেল মিস্ত্রি এক ধরনের স্কুটার এঞ্জিনের খোঁজ পাওয়ার পর তা ব্যবহার করে, এবং পেছনের উঠোনে পাওয়া লোহালক্কড় দিয়ে একটা অ্যারোপ্লেন নির্মাণ করেছিলেন, সেটার নাম দিয়েছিলেন তিনি কেনিয়া ওয়ান। প্লেনটা অল্প কয়েক মাইল ওড়ার পর নামার সময় একটা গাছের সঙ্গে টক্কর খেয়ে বিধ্বস্ত হয়। সম্প্রতি স্বাধীনতা লাভকারী কেনিয়া প্রজাতন্ত্রের সেই সময়ের অ্যাটর্নি জেনারেল চার্লস নজোঞ্জো এভিয়েশন লাইসেন্স বিনা বিমান চালানোর ব্যাপারে গাকাম্বার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন: তাঁর আদিম বিমানটি নিশ্চিতভাবেই ইউরোপে যারা বিমান নির্মাণ করেন, তাদের নির্ধারিত মাণদণ্ড পূরণ করেনি।

আমি গাকাম্বাকে বিমান চালানো থেকে নজোঞ্জোর বিরত রাখার বাস্তবতার চেয়ে বরং স্বদেশ ভূমির প্রতি এ দুজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী। গাকাম্বা সম্ভবত মাধ্যমিক স্তরের বেশি পড়াশোনা করেননি, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার ফোর্ট হেয়ার ইউনিভার্সিটি ও লিংকন’স ইন, লন্ডন থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন নজোঞ্জো, যা তাকে ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ও তাঁর সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ শিক্ষিত কেনীয়তে পরিণত করেছিল।

নজোঞ্জো এতই ভালো ইংরেজি জানতেন যে, এমনকি নাকে-মুখেও অনর্গল ইংরেজি বলতে পারতেন তিনি, ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীদের বেলায় যেমনটা বলতাম আমরা। অন্যদিকে গাকাম্বা ইংরেজিতে সাবলীল ছিলেন না, তবে সম্ভবত গিকুউ ভাষায় সাবলীলের চেয়ে ভালো ছিলেন। কথাটা হলো; গিকুউভাষী কামার, হুয়া কালি বা রাস্তার ধারের কারুশিল্পী যেখানে বলেছেন যে, কেনিয়াতেই আমরা প্লেন বানাতে পারি এবং সেটা প্রমাণ করতে সত্যিই একটা বিমান বানিয়েওছেন, সেখানে শিক্ষিত ইংরেজি-ভাষী অ্যাটর্নি বলেছেন, আমরা তা পারব না। গাকাম্বা নিজের স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিলেন; নজোঞ্জো অন্যদের স্বপ্নে মাহাত্ম্য লাভ করেছেন। গাকাম্বা অসম্ভব থেকে সম্ভবকে উদ্ধার করতে চেয়েছেন। শিক্ষিত কেনীয় নিখুঁত ইংরেজি টানে বলেছেন, ‘এমনকি চেষ্টাও করতে যেও না।’

এখানেই কেনিয়ার দুটি বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল: গাকাম্বার দৃষ্টিভঙ্গি বলছে, আফ্রিকা নানা জিনিস বানাতে পারে। নজোঞ্জো বলছেন, ওসব ইউরোপের হাতে ছেড়ে দাও।  কেনিয়াকে কখনই ছেড়ে যাবেন না এমন একজন প্রখর মেধাবী মানুষের সাহায্যে আসার বদলে সক্ষম, ভ্রমণকারী কেনীয় নজোঞ্জো ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন গাকাম্বার স্বপ্ন। পরিণাম, সেটা ইচ্ছাকৃত হোক বা না হোক, গাকাম্বার উদ্ভাবন আর কেনিয়ার অভ্যন্তরে সাধারণ কেনীয়দের হাতে কী হতে পারে, তার মডেল ও কল্পনা হিসেবে কাজ করবে না।

আমরা ইংরেজি সাহিত্যের বিলুপ্তি চাইনি, বরং আমাদের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এর সম্পর্কের নতুন বিন্যাস চেয়েছি। 

গাকাম্বার উদ্যোগ ও এর পরিণতি আমাকে ষাটের দশকের আরেকটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। ফের ১৯৬৯ সালের কথা। ইউনিভার্সিটি অব নাইরোবির ইংরেজি বিভাগে যোগ দেয়ার খুব বেশি পরে নয়। স্পেন্সার থেকে স্পেন্ডার বা শেক্সপিয়ার থেকে টিএস এলিয়ট পর্যন্ত ইংরেজি জাতীয় সাহিত্য ছিল সিলেবাসের মূল। ইংরেজি জাতীয় সাহিত্য কী কারণে কেনিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল হিসেবে কাজ করবে, জানতে চেয়েছিলাম আমি, ওউওর আনিউম্বা আর তাবান লো লিইয়ং। আমরা ইংরেজি বিভাগের বিলুপ্তির আহ্বান জানিয়েছিলাম।

বাস্তবে আমরা ইংরেজি সাহিত্যের অবলুপ্তি চাইনি, বরং আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে এর সম্পর্কের নতুন বিন্যাস চেয়েছি। আমরা কি ওখান থেকে শুরু করে এখানে আসব— ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া, আত্ম-অস্বীকারকারী প্রক্রিয়া নাকি এখানে থেকে ওখানে যাব— উপনিবেশবাদীবিরোধী, আত্ম-নিশ্চিতকারী, প্রগতিশীল প্রক্রিয়া?

বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে কেনিয়াকে আমরা সাহিত্যিক ঘাঁটিতে পরিণত করতে চেয়েছি। কেনীয়, পূর্ব আফ্রিকান, আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান এবং আফ্রো-আমেরিকান সাহিত্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে তার পর এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং এর পর ইউরোপের সাহিত্য দিয়ে মোটামুটি এ পর্যায়ক্রমে ইংরেজি জাতীয় সাহিত্য বিভাগকে সাহিত্য বিভাগ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। সেই সময়ে ইংরেজি বিভাগ সাহিত্যকে ইংরেজি ভাষায়ই সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিল; আমরা চেয়েছি ইংরেজির সীমা থেকে সাহিত্যকে মুক্ত করে বাকি বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে। এর পরের বিতর্ক, অর্থাত্ বিখ্যাত নাইরোবি বিতর্ক আফ্রিকা ও অন্যান্য জায়গায় এখন উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব নামে পরিচিত বিতর্কের জন্ম দেবে।

১৯৭৪ সালে এখনকার বিখ্যাত সাহিত্য বিভাগ আমাদের স্কুলগুলোয় প্রথমে কেনিয়া, তার পর আফ্রিকা ও সবশেষে বাকি বিশ্বের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হবে- সাহিত্য পাঠের এমন একটি পদ্ধতির প্রস্তাব তুলে ধরেছিল। এর মানে হতো যে, প্রাইমারি স্কুল থেকে পাস করা একজন ছাত্র কেনিয়ার সাহিত্যিক টেক্সটের ধারণার পাশাপাশি এশিয়া ও ইউরোপের টেক্সটের সঙ্গে সেগুলোর সম্পর্কের কথাও জানতে পারত। এভাবে তা বৈশ্বিক সাহিত্যিক নাগরিকের জন্ম দিত, তাদের পা থাকত কেনিয়ার মাটিতে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। কিন্তু মোই শাসকগোষ্ঠী ইংরেজি সাহিত্যকে স্রেফ সাহিত্য পাঠ্যক্রমই বাতিল করে গোটা সিলেবাস শেষ করে দিয়েছিল। শাসগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে কেনিয়ায় সূচিত বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে ইংরেজিকে সম্পর্ক রহিত রাখার দরকার ছিল। শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে ইংরেজি ভাষাতাত্ত্বিক কারাগারকে অবশ্যই সব প্রয়োজনীয় উপায়ে পাহারা দিয়ে রাখার দরকার ছিল, যাতে কেনীয় সাংস্কৃতিক কারাবন্দিরা মুক্তির দিকে পালাতে না পারে।

সাহিত্যিক পাঠ্যক্রম বাতিলই কারাপ্রহরীদের ব্যস্ত রাখার বেলায় যথেষ্ট ছিল না। কামিরিথুর ঘটনাও ছিল। এ নিয়ে যথেষ্ট লিখেছি আমি, তো সংক্ষেপেই সারব। কারিমিথু উদ্যোগে ইউনিভার্সিটি অব নাইরোরিব বুদ্ধিজীবীরা নগা’হিকা নদীন্দা’র (যখনই ইচ্ছা বিয়ে করব আমি) অসাধারণ অভিনয় দেখাতে কারখানা ও প্লান্টেশন কর্মী, ভূমিহীন, বেকারদের সঙ্গে হাতে হাত রেখে কাজ করেছিলেন।

সম্ভবত নাইরোবি থেকে আনুমানিক ৪০ কিলোমিটার দূরের কামিরিথু গ্রামের বাসিন্দাদের জন্য গিকুউ ভাষায় রচিত প্রথম উত্তর-ঔপনিবেশিক নাটক ছিল এটা। পেছনের মৌল ধারণাটি ছিল খুবই সহজ: আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে, জনগণই উন্নয়নের বিষয় ও লক্ষ্য, তাহলে আপনি তাদের সঙ্গে কাজ করবেন, তারা যে ভাষায় কথা বলে, কাজ করে, আপনিও সে ভাষায় কাজ করবেন। সাহিত্যিক পাঠ্যক্রমের মতো একই পরিণতি লাভ করার আগে নাটকটি গ্রামের শত শত মানুষের সামনে অভিনীত হয়েছিল।  ১১ নভেম্বর, ১৯৭৭ নগা’হিকা নদীন্দা’ বন্ধ করে দেয়া হয়, নাটকটির একজন সহলেখক হিসেবে আমাকে এক বছরের জন্য সর্বোচ্চ সুরক্ষিত কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।

আফ্রিকান ভাষাগুলো আমাদের সূচনা ছিল, বলেছে কামিরিথু। ইংরেজি আমাদের সূচনা, বলেছেন আমাকে যারা কারাবন্দি করেছিলেন তারা।

এ কথার পর আমরা আবার গাকাম্বার প্লেনের প্রসঙ্গে ফিরে আসছি। এসব ঘটনার প্রতিটিতে বাইরে থেকে এসেছে, এমন কিছুর পক্ষে কোনো জাতীয় উদ্যোগ নাকচ করার ব্যাপার ছিল আমাদের। কেনিয়ার মাটি থেকে গৃহীত সবই সন্দেহজনক; যা কিছু বিদেশ থেকে, বিশেষ করে ইউরোপ থেকে, এসেছে তাই বিনা প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য।

এটা কি কোনো দুর্ঘটনা?

প্রশ্নটি আমাকে চার নম্বর ঘটনায় নিয়ে আসছে। ঘটনাটি ঘটেছিল ঔপনিবেশিক আমলে। মবিউ কোইনাঞ্জে নামে একজন কেনীয় এখানে জড়িত, কেনিয়ায় অ্যালায়েন্স হাই স্কুলে লেখাপড়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া হ্যাম্পটন ইনস্টিটিউট হয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষায় মাস্টার ডিগ্রি নিয়ে পাস করেন তিনি। ১৯৩৮ সালে ফিরে আসেন কেনিয়ায়। তাঁর সাফল্য এবং তাঁকে নিয়ে বাবা এতটাই গর্বিত ছিলেন যে, তাকে একটা পাথুরে বাড়ি বানিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ছেলে বাবাকে মিনতি জানিয়েছিলেন, পাথরগুলো আমরা গিথুনগুরি টিচার’স কলেজের ভিত্তি স্থাপনের কাজে লাগাই। ঔপনিবেশিক কেনিয়ার সর্বপ্রথম উচ্চশিক্ষার ইনস্টিটিউট ছিল সেটা।

বুকার টি. ওয়াশিংটনের প্রচারিত আত্মনির্ভরতার ধারণায় কোইনাঞ্জের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানের ধারণা অনুপ্রাণিত ছিল। ভার্জিনিয়া হ্যাম্পটন ইনস্টিটিউটের স্নাতক ও টাস্কেগি ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ওয়াশিংটন। তাঁর সামাজিক দর্শন হয়তো সন্দেহভাজন ছিল, কিন্তু তাঁর অর্থনৈতিক দর্শন সমীহ অর্জন করেছিল এবং কোইনাঞ্জেকে অনুপ্রাণিত করেছে। গিথুনগুরি সাধারণ কেনীয় নারী ও পুরুষের হাতে নির্মিত হয়েছিল, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের হাতে নয়।

কেনিয়ান আফ্রিকান আত্মনির্ভরতার প্রতীকীবাদকে অবশ্যই গ্লানি, অপমান আর পরাজয়ে পর্যবসিত করার দরকার ছিল। 

আফ্রিকানদের হাতে পরিচালিত স্বাধীন স্কুলগুলোর জন্য শিক্ষক তৈরির লক্ষ্যে কলেজ পরিকল্পিত হয়েছিল। খোদ কার্লিং’আ ও স্বাধীন স্কুল আন্দোলনটিই ছিল গারভেয়িতের আত্মনির্ভরতার (এও ওয়াশিংটন থেকে নেয়া) আহ্বান এবং ‘দেশে-বিদেশে আফ্রিকানরা আফ্রিকানদের জন্য’ স্লোগানে অনুপ্রাণিত একটা ঘটনা। যখনই কোনো স্কুলের কমিটি সদস্যরা মিলিত হতেন, তাদের প্রথম কাজ ছিল বিসর্জন দেয়ার মতো যেকোনো কিছু পকেট থেকে বের করে টেবিলে রাখা। গিথুনগুরিও এ নীতির ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল: সাধারণ নারী-পুরুষ তাদের পক্ষে সম্ভবপর ছোট-বড় যেকোনো কিছু দান করছিল। সংক্ষেপে গিথুনগুরি ও গোটা স্বাধীন স্কুল আন্দোলন এর আগে যে স্বপ্ন দেখা হয়নি; সেই স্বপ্ন দেখার সাহস করেছিল। আমরা কেনীয়রা একটা করতে পারি, বলেছে কেনীয়রা, আমরা তোমাদের তা করতে দেব না, বলেছে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র।

১৯৫২ সালে রাষ্ট্র গিথুনগুরি এবং অন্যসব স্বাধীন আফ্রিকান স্কুল বন্ধ করে দেয়। কয়েকজন সম্পাদককে কারাবন্দি এবং অন্যদের নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে সব আফ্রিকান ভাষার পত্রিকাও নিষিদ্ধ করে। গাকারা’ ওয়া ওয়ানঞ্জাউ আর স্ট্যানলি কাগিকার মতো আফ্রিকান-ভাষী কবিদের নিপীড়ন শিবিরে পাঠায়। পরিচিত ঠেকছে? কিন্তু এ অপমানকে কড়ায়গণ্ডায় ভরিয়ে তুলতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গিথুনগুরিকে কারাগারে পরিণত করে সেখানে রাষ্ট্র কর্তৃক মাউ মাউ নাম রাখা ল্যান্ড অ্যান্ড ফ্রিডমের সৈনিকদের ফাঁসি দেয়া হয়। কেনিয়ান-আফ্রিকান আত্মনির্ভরতার প্রতীককে গ্লানি, অপমান আর পরাজয়ের প্রতীকে পরিণত করতেই হতো।

কেনিয়াকেন্দ্রিক আফ্রিকানদের পরিচালিত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পর পদ্ধতিগতভাবে ইংরেজি-ভাষী, কিন্তু আফ্রিকান ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন অভিজাত গোষ্ঠী তৈরির ব্যাপারটা ঘটে। আর এভাবেই ১৯৫২ সালের পর অবস্থা এমন দাঁড়াল যে কেউ গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ইতিহাসে যতই মেধার পরিচয় দিক— যদি সব প্রশ্নের উত্তর ইংরেজি ভাষায় দিতেও পারে, ইংরেজিতে পাস না করলে পরের ক্লাসে উঠতে পারত না। ইংরেজি পরিণত হয়েছিল শিক্ষা, সর্বজনীন জ্ঞান এবং মেধার সমার্থক। ১৯৬৪ সালে সদ্য স্বাধীন কেনিয়ার আফ্রিকান সরকার প্রতিষ্ঠিত অমিন্দে কমিশন অন এডুকেশন প্রাক-প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে আফ্রিকান ভাষার অপসারণ করে ইংরেজির আবশ্যকতার আহ্বান জানিয়ে এ মানসিকতাকে জাতীয়করণ করে।

ব্যাপারটা এমন নয় যে, ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ হুট করেই কেনীয় ও আফ্রিকানদের ভেতর কেনিয়াবিরোধী, আফ্রিকাবিরোধী মানসিকতা তৈরির বিভিন্ন নীতিমালার দেখা পেয়েছিল। ওয়াল্টার রডনি তাঁর হাও ইউরোপ আন্ডারডেভেলপড আফ্রিকা গ্রন্থে অলিয়াস ফ্রঁসেজ-এর একজন প্রতিষ্ঠাতা পিয়েরে ফোকেইনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ‘বিভিন্ন উপনিবেশকে তাদের প্রগতিশীল মুক্তির অবসানের বিপরীতে সম্ভাব্য ফেডারেশন রূপে খুবই নিরেট আর মনস্তাত্ত্বিক বন্ধনে বেঁধে রাখার দরকার ছিল যাতে ভাষা, ভাবনা ও চেনতায় তারা ফরাসীই থেকে যায়।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় আফ্রিকান ভাষাগুলো নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেখানকার স্পিকারদের ধড়পাকড়ের জন্য অপরাধীতে পরিণত করা হয়েছিল। স্কুলে কোনো শিশুকে আফ্রিকান ভাষা বলতে দেখা গেলে তাকে পকেটে দুর্গন্ধওয়ালা চামড়া বা স্রেফ আমি বোকা লেখা প্লাকার্ড বহনে বাধ্য করা হতো। জন্তুজানোয়ারও একই কায়দায় পোষ মানানো হয়: অনভিপ্রেত আচরণকে যন্ত্রণা আর কাঙ্ক্ষিত আচরণকে আনন্দের সঙ্গে মিলিয়ে দাও। পরে পুরস্কার ও শাস্তির এই ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে সন্তানদের ভেতর বাহিত হয়েছে, যাতে ইংরেজি শব্দই আমাদের আকাঙ্ক্ষায় লালায়িত করেছে আর আফ্রিকান ভাষার শব্দ বিতৃষ্ণায় চুপসে দিয়েছে।

নজোঞ্জো এবং তার ইংরেজি টান কোনো দুর্ঘটনা বা একক ব্যক্তির কর্মকাণ্ড ছিল না। বাস্তবতা হলো, শিক্ষিত আফ্রিকান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভেতর একজন নজোঞ্জো রয়েছে। নজোঞ্জোবাদ এখনো আফ্রিকার সমস্যাই রয়ে গেছে। ইউরোপ আফ্রিকাকে এর উচ্চারণভঙ্গি দিয়েছে; আফ্রিকা ইউরোপকে মহাদেশের সম্পদে প্রবেশাধিকার দিয়েছে। এটা ঠিক যে, তরবারি ইউরোপকে প্রবেশাধিকার এনে দিয়েছে; কিন্তু উচ্চারণভঙ্গি বিজিতদের একটা অংশের নীরব সম্মতি নিশ্চিত করে সে বিজয়কে পূর্ণতা দিয়েছে।

আপনি দুনিয়ার সব ভাষা জানলেও যদি মাতৃভাষা বা আপনার নিজস্ব সংস্কৃতি না জানেন তো সেটা দাসত্বই।

গত বছর আমার অতিসাম্প্রতিক সফরের সময় ইউনিভার্সিটি অব নাইরোবি বিভিন্ন জিনিস তৈরি করছে দেখে খুবই খুশি হয়েছিলাম: রয়্যাল সাতিমা মিনারেল ওয়াটার আর ইউনিভার্সিটি ইয়োগার্ট। ওদের ইয়োগার্ট খেয়েছি, পানি খেয়েছি, দুটোই তৈরি হয়েছে কেনিয়ায়, বেশ লেগেছে। জার্মানিতে আমার দশম সম্মানজনক ডক্টরেট গ্রহণ করতে গেলে মোই ইউনিভার্সিটির একটা দল আমাকে তাদের বানানো কাপড় উপহার দিয়েছিল। অনেক বছরের ভেতর পাওয়া সেরা উপহার ছিল সেটা: কেনিয়ায় বোনা কাপড়ে তৈরি একটা শার্ট। সরকারি এজেন্সিগুলো এসব উদীয়মান কেনীয়-মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ফরমাশ দিলে কেমন হতো? নজোঞ্জো আমাকে আরেকটা প্লেন বানিয়ে দাও বললে কি হতো?

ব্যাপারটা এমনই হওয়া উচিত। উত্তরটা আগে থেকেই আমাদের ভেতর রয়েছে। বন্ধুরা আমার, আসুন নাইরোবি ইউনিভার্সিটি আর মোই ইউনিভার্সিটির মতো বিভিন্ন জিনিস তৈরির পথে এগোই। তবে কেবল পোশাক, ইয়োগার্ট আর মিনারেল ওয়াটার বোতলজাতে থেমে থাকা কেন? বাইসাইকেল নয় কেন? অ্যারোপ্লেন নয় কেন, কেন নয় আমাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষার অস্ত্রশস্ত্র? কোনো জাতির স্থায়ী কোনো বন্ধু নেই, কেবল স্থায়ী স্বার্থ আছে। আজ আপনি যার ওপর অস্ত্রের জন্য নির্ভর করছেন, আগামীকালই সে আপনাকে নিরস্ত্র করতে চাইবে। আজ যে আপনাকে খাবার জোগাচ্ছে, আগামীকাল হয়তো তার খাবার প্রত্যাহার করতে পারে। প্রতিটি জাতির নিজেকে আগে খাবার জোগানোর, বস্ত্রের ব্যবস্থা করার, থাকার ব্যবস্থা করার আর রক্ষার অধিকার রয়েছে। অন্ততপক্ষে এ ক্ষমতাগুলো তার থাকতেই হবে।

আসুন আমরা স্বাধীনতা, মৌলিকত্ব আর উত্কর্ষের জন্য সংগ্রাম করি, নির্ভরতা, অনুকরণ আর ভিক্ষার জন্য নয়। একেই আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হতে হবে, আমরা কেনিয়া আর আফ্রিকাকে কীভাবে দেখি, বিভিন্ন একাডেমি আর অর্থনীতিতে আমরা যেসব সিদ্ধান্ত নিই, পরিকল্পনায় এবং এমনকি আমরা কোনো জিনিস বাইরে পাঠাচ্ছি আর কোনটা গ্রহণ করছি, তার মূল্যায়নকেও অনুপ্রাণিত করতে হবে। একেই জীবনযাত্রার ধরন, জাতি হিসেবে আমাদের চরিত্রের অংশ হতে হবে। আসুন আমরা নির্ভরতা, অনুকরণ আর ভিক্ষার সংস্কৃতিতে বাতিল করি।

অনুকরণকারী সবসময়ই অনুসরণকারী এবং নিজের ওপর বিশ্বাসের ঘাটতি থেকে পরিচালিত হয়, যার শুরু ভাষার ভেতর দিয়ে। আপনি যদি দুনিয়ার সব ভাষা জানেন আর মাতৃভাষা বা নিজের সংস্কৃতি জানা না থাকে, তার মানেই দাসত্ব। আপনি আপনার মাতৃভাষা বা আপনার সংস্কৃতির ভাষা জানলে তার সঙ্গে দুনিয়ার সব ভাষা যোগ করুন, তবে সেটাই ক্ষমতায়ন।

যারা স্বাধীন আফ্রিকান স্কুল চালিয়েছেন এবং গিথুনগুরি টিচারস কলেজ নির্মাণ করেছেন, তাদের কাছ থেকে আমাদের শিখতে হবে। তারা পকেট থেকে বের করে মানুষের কল্যাণ ও ভালোর জন্য দান করেছেন। আজ আমরা ব্যক্তিগত সুবিধা আর কল্যাণের জন্য মানুষের টেবিল থেকে গ্রহণ করছি। তাদের কাছে নেতৃত্ব ছিল মানুষের আস্থা। আজ আমাদের কাছে সরকারি অফিস ব্যক্তিগত ট্রাস্টে পরিণত হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকলেও তারা কেনিয়াকে কেনীয়র চোখেই দেখেছেন এবং খুনে বহিরাগতদের হাত থেকে কেনিয়াকে উদ্ধার করতে চেয়েছেন। আমরা যখনই কেনিয়াকে বহিরাগতের দৃষ্টিতে দেখছি, তখনই কেনিয়ার সাধারণ নারী-পুরুষের রক্ত দিয়ে যুদ্ধ করা একটি দর্শনের সঙ্গে বিদ্রোহ করছি।

আমার উপন্যাস উইপ নট চাইল্ড-এর প্রকাশনার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উদযাপনের সিম্পোজিয়ামে একটি নাট্যদলের বইটির প্রধান থিম বিসর্জনের সেই ইতিহাস পুনর্নির্মিত করতে দেখেছিলাম। শরীরের ভঙ্গিমায় তারা যেসব ইমেজ তৈরি করেছেন, সেগুলো সংগ্রামের যন্ত্রণা ও গর্ব তুলে ধরেছে। প্রতিরোধের নান্দনিকতার নাট্যরূপ দিয়েছেন তারা। এবং তারা গান গেয়েছেন: টিচ মি টু বি মি দেন ইউ উইল সি মি। ইফ ইউ টিচ মি টু বি মি আই উইল বি ফ্রি, অর ইউ এফ্রেইড অভ আ ফ্রি মি?

 

গুগি ওয়া টিঅঙগো:

ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং উত্তর ঔপনিবেশিক সাহিত্যের তাত্ত্বিকের জন্ম ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ৫ জানুয়ারি কেনিয়ার কিয়াম্বু জেলায়। উগান্ডার কাম্পালায় মাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে ইংরেজিতে বিএ ডিগ্রি শেষ করেন। পরের বছর তার প্রথম উপন্যাস উইপ নট, চাইল্ড প্রকাশ হয়। ১৯৬৭ সালে প্রকাশ হয় আ গ্রেইন অব হুইট। এ উপন্যাস তাকে ফ্যাঁনো মার্কসিস্ট হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৭৭ সালে এক নাটক লেখার কারণে কেনিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্টের নির্দেশে তাকে গ্রেফতার করা হয়। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাকে আর নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি ফিরিয়ে দেয়া হয়নি। তার পরিবারকেও বিভিন্নভাবে নাজেহাল করা হয়। ১৯৯২ সালে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্প্যারেটিভ লিটারেচার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আর্ভিংয়ের  ডিপার্টমেন্ট অব কম্প্যারেটিভ লিটারেচার অ্যান্ড ইংলিশের সম্মানিত প্রফেসর। ৩০টিরও বেশি ভাষায় তাঁর বই অনূদিত হয়েছে।