সাতসকালে মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়া এটাকেই বলে! সকাল সাড়ে আটটার দিকে সাতচল্লিশ বছর বয়সী সাইফুল তার মুদিদোকান খুলেছিল প্রতিদিনের মতোই। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের বসতি লেকসার্কাস মহল্লায় তার মুদিদোকান। তিন গজ বাই দশ গজের অপরিসর ঊষা জেনারেল স্টোরের দক্ষিণের দেয়ালের সাথের মেঝেতে বসানো ছিল ছোট দুটো ডিপ ফ্রিজ এবং একটা সাধারণ ফ্রিজ— নাতিদীর্ঘ। উত্তরের দেয়ালের সাথে পাশাপাশিতে ছিল চার ফুট উচ্চতার দুটো আলমারি। সাবান, টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, নারকেল তেল, এয়ার ফ্রেশনার, স্যানিটারি ন্যাপকিন ইত্যাদি মনিহারি দ্রব্যে ঠাসা ছিল আলমারিগুলো। দোকানে ঢুকতেই বসানো ছিল পাঁচ ফুট উচ্চতার এবং সাড়ে সাত ফুট দৈর্ঘ্যের আরেকটা আলমারি। উত্তরে দেয়াল থেকে সেটা বিস্তৃত হয়েছিল দক্ষিণের দেয়াল পর্যন্ত। আর তা’তে করে দোকানে ঢোকার জন্য তৈরি হয়েছিল দেড় ফুটের সরু একটা পথ। সামনের আলমারিটার র্যাকগুলোয় ভর্তি করা ছিল বিভিন্ন ধরনের বিস্কিট এবং কর্নফ্লেক্সের বড় বড় সব প্যাকেট। আর আলমারিটার সামনের প্রায় দু’ফুট প্রস্থের ফাঁকা জায়গাটায় সাইফুল রেখেছিল আলু, পেঁয়াজ ও মুড়ির বস্তা। এছাড়া মুদিদোকানটার উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমের দেয়ালজুড়ে দোকানের মাঝ থেকে ছাদ বরাবর উঠে গিয়েছিল কাঠের তৈরি অনেকগুলো র্যাক। সেসব র্যাকে ডাই করা ছিল কোকাকোলা, স্প্রাইট, মিরিন্ডা, মাউন্টেন ডিউ এবং বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকের বোতল, হারপিক, ডেটল, সয়াবিন তেল, সর্ষের তেল, লবণ, চিনি, মসলা ইত্যাদি। এসব জঙ্গলের ভেতরে মেঝেটার যতটুকু অংশ ফাঁকা ছিল, সেই জায়গাটা প্রতিদিনের মতো পহেলাতেই যত্ন করে ঝাঁট দিয়েছিল সিরাজদীখানের সাইফুল। তার পর সে দোকানের আলমারিগুলো এবং বিভিন্ন র্যাকে রাখা সব জিনিসপত্তর গোছাতে বসেছিল। সিলিং ফ্যান চল্লেও ভাদ্র মাসের গরমে খুব ঘামছিল সে। তখন তার মুদিদোকানে পাউরুটি কিনতে এসেছিল পাশের বাসার অল্পবয়সী কাজের ছেলে মমিন। পাউরুটি নিয়ে দাম পরিশোধ করতে করতে মমিনের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছিল আলুর বস্তাটার দিকে এবং সে মুচকি হাসিতে সাইফুলকে জিজ্ঞাসা করেছিল: কী সব আলু আনছেন মিয়া? মনে হইতাছে, মুন্সীগঞ্জের ক্ষেত থেইকা আলু তুইলা নিয়া সুজা দুকানে ঢুকছেন। আলুর উপরে এত ময়লা ক্যান?
খোঁচা খেয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে সাইফুল উত্তর দিয়েছিল: আলু নিলে নিবি, না-নিলে না নিবি। তর এত কথার তো দরকার নাই!
তখন মমিন তাদের লেকসার্কাস মহল্লায় গড়ে ওঠা নতুন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের প্রসঙ্গটা তুলেছিল! সাইফুলকে মমিন বলেছিল, এএসটি সুপার শপ নামের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটায় পরিষ্কার আলু বিক্রি হয়। শুধু তাই-ই নয়, সেখানে এক কেজি করে আলু মোড়কজাত করে র্যাকে সাজানো থাকে। কাজেই আলু কিনতে মাপামাপিরও কোনো প্রয়োজন পড়ে না— স্টোরে গিয়ে র্যাক থেকে আলু তুলে নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে দাম দিলেই হলো।
এ পর্যায় থেকেই আসলে মেজাজ খারাপ হতে শুরু হয়েছিল মুদিদোকানদার সাইফুলের। মমিনকে সে সরোষে বলেছিল: তাইলে তুই যা গা তর বড় দুকানে! এইহানে তরে আইতে কইছে কেডা? শালার দুকানডার কী একখান নাম! উচ্চারণই করা যায় না!
মমিন যুক্তি দিয়েছিল যে বাসার ঠিক নিচেই সাইফুলের দোকান বলে সে এখানে কেনাকাটা করতে আসে। সাইফুলের দোকানে আসার লাভটা হলো এই যে মমিনকে আর সদাই করতে মহল্লার বাইরের পান্থপথ, বশিরউদ্দিন রোড, গ্রিন রোড, ডলফিনের গল্লি অথবা কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে যেতে হয় না। এতে করে সময় ও শক্তি দুই-ই বেঁচে যায় তার। তবে যেহেতু সাইফুল ময়লা আলু আর পচাধচা পেঁয়াজ বিক্রি করে, কাজেই সে এখন থেকে মহল্লার নতুন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটাতেই সদাই করতে যাবে। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে জিনিসপত্তরের দামের ওপর ট্যাক্স কাটে— এটা ঠিক, তবে সেখানে কেনাকাটা করতে যাওয়াটা সুবিধাজনক। সেখানে টাটকা আলু, পেঁয়াজ ইত্যাদি কিনতে পাওয়া যায় এবং প্রয়োজনে দুধের প্যাকেট কিনতে গিয়ে একই জায়গা থেকে একবারে প্লাস্টিকের বালতি অথবা বিবিসাহেবের জন্য চুল রাঙানোর জন্য রঙও কিনে আনা যায়। মমিনের এই যুক্তি শোনার পরই চূড়ান্তভাবে মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল মুদিদোকানদার সাইফুলের এবং সে মমিনকে রামধমক লাগিয়েছিল এই বলে: ভাগ ব্যাটা এইহান থিকা! ফের যুদি আমার দোকানে আসছস তো তর টেংরি ভাইঙা দিমুনে কইলাম! ‘গরম ভাত দিলে তো বিলাই বেজার হইবই!’— এমন একটা উপসংহার টেনে তখন হাসতে হাসতে পাউরুটি হাতে নিয়ে সাইফুলের মুদিদোকান থেকে বের হয়ে গিয়েছিল মমিন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, লেকসার্কাস মহল্লার আলতাফ সাহেব যখন তার ৩৮ নম্বর বাসাটা ভেঙে দিয়ে নিজেই অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং তোলার পরিকল্পনা করেছিল, তখন সে নকশার ভেতরে বেইজমেন্টে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর অন্তর্ভুক্ত করেই রাজউক থেকে প্ল্যান পাস করিয়েছিল। লেকসার্কাস মহল্লার মানুষজন, যাদের সিংহভাগই অবস্থাপন্ন ঘরের, তত দিনে পান্থপথে গড়ে ওঠা একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই নিজেদের মহল্লায় আলতাফ সাহেব ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বসাচ্ছে জেনে তারা স্বস্তির নিঃশ্বাসই ফেলেছিল, কেননা সেক্ষেত্রে তাদের আর পান্থপথের অনড় ট্রাফিক জ্যাম পার দিয়ে রাস্তার উত্তরের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কেনাকাটা করতে যেতে হবে না। লেকসার্কাস মহল্লার মানুষরা স্বস্তির সম্ভাবনা দেখলেও মুদিদোকানদার সাইফুল এবং একই পেশার দুলাল তখন ঘাবড়ে গিয়েছিল। আটান্ন বছর বয়সী দুলালের বাড়ি ছিল চাঁদপুরে। তারা পরস্পরের ভেতরে বলাবলি করেছিল: প্রায় কুড়ি বছর ধরে লেকসার্কাস মহল্লায় মুদিদোকান করছে তারা। এবার না ব্যবসা গুটিয়ে গাট্টিবোঁচকা বেঁধে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে হয়! তাদের সেই আশঙ্কা যে সত্য হতে চলেছে, তা সাইফুল প্রথম বুঝেছিল ৪৩ নম্বর বাসার কাজের ছেলে মমিনের বাগাড়ম্বর থেকে। তাই সে লেকসার্কাস মহল্লার তানজিনা জেনারেল স্টোরের দুলালের কাছে গিয়ে বলেছিল: ভাইজান! খবর কিন্তুক খারাপ! পাবলিক তো ফাল দিয়া আলতাফ সাবের বড় দুকানে যাইতে শুরু কইরা দিছে!
তখন পুনর্বার দুশ্চিন্তিত হয়েছিল সাইফুলের দীর্ঘদিনের প্রতিযোগী দুলাল এবং সে সাইফুলের কাছে একই রকমের সংশয় প্রকাশ করেছিল: এই মহল্লায় আর মুদিদুকান চালানো যাইব না মনে কয়! পোলাপাইন নিয়া অহন না-খাইয়া মরতে হইব! সে খ্যাচম্যাচও করেছিল সাইফুলের সঙ্গে। সাইফুলকে সে বলেছিল: এই যে আমরা দুই দিন পর পর এক টাকা-দুই টাকা কইরা মালসামানার দাম বাড়াইতাছি, হেইডা কি ঠিক হইতাছে? দেখ, অহন গেল পাঁচ মাস ধইরা আলতাফ সাব তার স্টোরের মালসামানার দাম একই রাখছে— বাড়াইতাছে না! তা হইলে হেয় ব্যবসা করব, না আমরা করুম!
এছাড়া তারা তাদের নিজেদের দুর্বিপাক নিয়ে নানা আলোচনা করছিল বটে। কিন্তু আলতাফ সাহেবের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সাথে টক্কর দেয়ার কোনোও পথই খুঁজে পাচ্ছিল না তারা। এমন একটা সময়ে একদিন বন্ধুবান্ধব নিয়ে দুলালের দোকানে চা খেতে এসেছিল ২৮ নম্বর বাসার মোটা রবি— যুবকদের কোনো একটা দলের কলাবাগান শাখার নেতা। মোটা রবি তখন কলাবাগান এলাকার কমিশনার পদের আসন্ন নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার জন্য জনসংযোগ শুরু করেছে। সেই মুহূর্তে দুলালের দোকানের ভেতরে বসে নিচু স্বরে দুলালের সঙ্গে শলাপরামর্শ করছিল চিন্তিত সাইফুল। চা খেতে খেতে তাদের দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়েছিল মোটা রবি এবং সে দুলালকে জিজ্ঞসা করেছিল: কিরে দুলাইল্যা! কী এত গুজুর-গুজুর, ফুসুর-ফাসুর করস তরা? দুলাল তখন তাদের সমস্যাটা সংক্ষেপে ভেঙে বলেছিল মোটা রবিকে। মোটা রবি তাদের মুক্তির রাস্তা বাতলে দিয়েছিল এভাবে: খরচাপাতি কর। তা হইলে আমি আলতাফ সাবের নয়া স্টোর ভাইঙা দিয়া আসি! মোটা রবি তাদের এমন একটা ধারণা দিয়েছিল যে, এক লাখ টাকা খরচা করলেই হবে। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি, কেননা সাইফুল বা দুলাল কেউই আর তাদের পুঞ্জি ভাঙতে চায়নি। বলে রাখা প্রয়োজন যে, সাইফুল তার মুদিদোকানে পাঁচ লাখ টাকা লগ্নি করে রেখেছিল এবং দুলাল লগ্নি করেছিল তিন লাখ টাকার মতো।
রবি চলে যাওয়ার পর সাইফুল আগ বাড়িয়ে দুলালকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিল: ভাইজান! সিরাজদীখান গিয়া যেই কয়েক শতক ধানি জমি রইছে তাই-ই বিক্কিরি কইরা আসুম নেকি? সেই কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়েছিল দুলাল এবং সে সাইফুলকে বলেছিল: হারামজাদা! মোটা রবিরে ঘুষ দিতে গিয়া সর্বস্বান্ত হইতে চাস তুই? তর কি মাথা খারাপ হইছে? জমি বেচন যাইব না! আলতাফ সাবের স্টোরের ঠ্যালায় আমাগো দুকান উইঠা গেলে পরে তো ধান চাষ কইরা খাওনেরও জায়গা থাকব না তহন! কাজেই দুলালের কথামতো জমি বিক্রির পরিকল্পনা বাদ দিয়েছিল সাইফুল। তবে সে দুলালকে এটুকু বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, সেই মুহূর্তেই একটা কিছু করার দরকার ছিল। তা না হলে আলতাফ সাহেবের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর সহসাই তাদের গিলে খেয়ে ফেলবে একদম! দুলাল তা বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছিল। সেই মতো দু’টো প্রতিরোধক কর্মপন্থা স্থির করেছিল দুলাল: একদিন গভীর রাতে সবার অলক্ষে পেট্রল ঢেলে আলতাফ সাহেবের স্টোর জ্বালিয়ে দিতে হবে এবং তাছাড়া শাটারের নিচ দিয়ে স্টোরের ভেতরে ছেড়ে দিতে হবে দশ-বারটা ধেড়ে ইন্দুর। উপায়ন্তর না দেখে দুলালের সেই দুটো কুপ্রস্তাবেই অনুসমর্থন দিয়েছিল সাইফুল। তার মাথা কাজ করছিল না কিছুতেই।
কিন্তু কার্যত জ্যারিক্যানে পেট্রল ভরে নিয়ে তারা দুজন যখন কৃষ্ণপক্ষের এক রাতে আলতাফ সাহেবের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে গিয়ে পৌঁছেছিল, তখন তাদের সামনে ভোজবাজির মতো উদয় হয়েছিল মহল্লার রাত-পাহারাদার গাজী। গাজীর হাতে ধরা পড়ে যাওয়ার মূল্যও দিতে হয়েছিল তাদের। লেকসার্কাস মহল্লার মানুষজনদের স্টোরে আগুন দেয়ার প্রচেষ্টার কথা বলবে না— এমন শর্তে তাদের কাছ থেকে পাঁচশ টাকা ঘুষ নিয়েছিল গাজী। পরে অবশ্য গাজীর সাহায্য নিয়েই কোনো এক রাতে আলতাফ সাহেবের স্টোরের শাটারের নিচ দিয়ে সাইফুল আর দুলাল মিলে তিনটা ধেড়ে ইন্দুর চালান করে দিয়েছিল। তাদের ভাবনা ছিল যে, ইন্দুরেরা স্টোরে অবস্থান নিয়ে জিনিসপত্তর সব কাটাকুটি করে ফেলুক; তারা বাচ্চা ফুটাক; ইন্দুরদের একটা বড় দল গঠিত হোক এবং ইন্দুররা সবাই মিলে স্টোরের মালসামান, কংক্রিটের দেয়াল-মেঝে, লোহার র্যাক, ক্যাশ মেশিন, ইলেকট্রিক ওয়্যারিং এমনকি জেনারেটরটা পর্যন্ত খেয়ে ফেলুক! কিন্তু তার ঠিক তিনদিন পরই দুঃখজনকভাবে দেখা গিয়েছিল যে, স্টোরটার সামনে পড়ে আছে মৃত তিনটা ধেড়ে ইন্দুর। দুলাল সেই ইন্দুরগুলোকে ঠিকই শনাক্ত করতে পেরেছিল, কেননা তার দোকানে কল পেতে গাঢ় ছাই রঙের ইন্দুরগুলোকে একদা দুলাল নিজেই ধরেছিল।
সেই ব্যর্থতার পর পরই ব্যবসায় উন্নতির লক্ষ্যে হলুদ রঙের আকিক পাথরের আংটি বাম হাতের অনামিকায় ধারণ করেছিল সাইফুল ও দুলাল দু’জনেই। আংটি দুটো তারা খরিদ করেছিল ফকিরাপুলের কুদরতি জেমস হাউজ থেকে। কুদরতি জেমস হাউজের জ্যোতিষরাজ সগির আলী মুলতানির সঙ্গে সাইফুল ও দুলালের যোগাযোগ হয়েছিল আকষ্মিকভাবেই। বেচাকেনা তেমন একটা নেই বলে বিষণ্ন-বদনে যার যার মুদিদোকানে তখন বসে থাকছিল তারা। তাই একদিন ‘চুলার ভিতরে যাক ছাতার এইসব দুকানদারি!’ বলে সাইফুলকে নিয়ে গ্রিন রোডের জিঞ্জিরা হোটেলে চা খেতে গিয়েছিল দুলাল। জিঞ্জিরা হোটেলে বসে তারা নিজেদের ব্যবসার পড়তি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে করতে চা খাচ্ছিল। তখন তাদের কথা কান পেতে শুনছিল পেছনের টেবিলে বসে থাকা খালেক মিয়া নামের জনৈক ব্যক্তি, যা কিনা টেরই পায়নি সাইফুল অথবা দুলাল! স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কাঁঠালবাগান বাজারের মুরগি ব্যবসায়ী খালেক মিয়া তাদের বলেছিল: যত মুশকিল তত আসান! ভাইবেন না মিয়ারা। আংটি পরলে ব্যবসা বাড়ব, শত্রুনাশ হইব, জীবনে নতুন মাইয়া মানুষও আসব— আরো কত কী! এভাবে চারশ টাকার বিনিময়ে তাদের ফকিরাপুলের জ্যোতিষরাজ সগির আলী মুলতানির কাছে নিয়ে গিয়েছিল খালেক মিয়া।
জ্যোতিষরাজ সগির আলী মুলতানির রত্নপাথরের দোকানের শোকেসে সাজানো ছিল নানা রকমের রত্ন ও উপরত্ন পাথর— সবুজ পান্না, নীল রত্নমণি, ফিরোজা, গোমেদ, রাজপট্ট, রক্তমুখী পাথর, বৈদুর্যমণি, আকিক, চুনি, পোখরাজ ইত্যাদি। পাথর না চিনলেও পাথরের ঔজ্জ্বল্যের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল সাইফুল আর দুলাল। জ্যোতিষরাজ সগির আলী মুলতানি নিশ্চয় তাদের মুগ্ধতা ধরতে পেরেছিল! কাজেই চটজলদি তাদের দুজনের হাতের রেখা পাঠ করে নিয়ে জ্যোতিষরাজ বলেছিল যে, তাদের সমস্যা আসলে অনেকগুলোই: তাদের ওপর বৃহস্পতি ও রাহুর যুগপৎ কুপ্রভাব পড়েছে। তাই সর সর করে পড়ে যাচ্ছে তাদের মুদিদোকানের ব্যবসা। এ কারণেই তারা ভয়ানকভাবে বিষাদগ্রস্ত। দীর্ঘদিনের বিষাদগ্রস্ততা থেকে তাদের সমুখে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও স্পৃহা দুই-ই কমে গেছে। কাজেই পাথর ধারণ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই এখন। প্রাথমিকভাবে কমপক্ষে চারটা পাথর বসানো আংটি পরা বাঞ্ছনীয়। বাম হাতের আঙুলে দুটো ও ডান হাতের আঙুলে দু’টো করে প্রতিটি তিন রতি ওজনের আংটি ধারণ করা যেতে পারে। জ্যোতিষরাজ আরো বলেছিল: রাহু থেকে মুক্তি পেতে হলে লাগবে সিলনি গোমেদ; বৃহস্পতির অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে পোখরাজ; বিষাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সবুজ পান্না এবং সর্বোপরি ব্যবসা প্রসারের জন্য লাগবে সোলেমানি আকিক পাথর। তখন জ্যোতিষরাজকে পাথরগুলোর দাম জিজ্ঞাসা করেছিল দুলাল। জ্যোতিষরাজ তাদের বলেছিল যে, একই শ্রেণীর রত্নপাথরের বিভিন্ন মান থাকতে পারে; মানভেদে দামও হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন। খাঁটি রত্নপাথরের মান নির্ভর করে পাথর কতটুকু রেখাদোষ, বিন্দুদোষ ইত্যাদি বিভিন্ন দোষ থেকে মুক্ত— তার ওপর। রত্নপাথরকে দোষমুক্ত করতে তাই দুধ, মধু, গোলাপজল ইত্যাদি দিয়ে পাথর শোধন করতে হয়। তাছাড়া উৎসভেদেও পাথরের দাম ভিন্ন হতে পারে। জ্যোতিষরাজের এসব প্যাঁচের কথায় রত্নপাথরের আংটি কেনা বাবদ বিস্তর অর্থ খসে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখেছিল সাইফুল এবং তাই সে প্রায় আর্তনাদ করে বলে উঠেছিল: আমাগো কিন্তু বেশি ট্যাকা নাই! আমরা তো আর গার্মেন্টেসের মালিক না-আমরা সামান্য মুদিদোকানদার!
তখন জ্যোতিষরাজ সগির আলী মুলতানি তাদের আস্বস্ত করে বলেছিল যে, সস্তার ভেতরেই খাঁটি রত্নপাথরের আংটি সে গড়িয়ে দিতে পারবে। যেমন? যেমন, তিন রতি ওজনের রক্তবর্ণ সোলেমানি আকিকের দাম পড়বে মাত্র ৪ হাজার টাকা; ব্রাজিলের সবুজ পান্নার ৬ হাজার; লালচে বাদামি সিলনি গোমেদের ৭ হাজার ও হরিদ্রাভ সিলনি পোখরাজের ১৪ হাজার টাকা। স্বভাবতই রত্নপাথরের এমন ধারার দাম শুনে মাথায় বাজ পড়েছিল মুদিদোকানদার সাইফুল ও দুলাল দু’জনেরই। তাই রত্নপাথরের দাম নিয়ে খুন খুন করতে শুরু করেছিল দুলাল: এত ট্যাকা কই পামু? এবং শেষ পর্যন্ত সে জ্যোতিষরাজকে বলেছিল: আগে রাহু থিকা মুক্তি লই। পরে বৃহস্পতি থিকা ছুটুমনে। সাহস সঞ্চয় করা আর ব্যবসা বাড়ানির চেষ্টা না হয় আর কয় দিন পরে করা যাইব। আপতত, আমাগো গোমেদ পাথর দিয়াই আংটি বানায়া দেন ভাই!
জ্যোতিষরাজ সগির আলী মুলতানি দুলালের প্রস্তাবে নাখোশ হয়েছিল এবং সে বলেছিল: এ জন্যই তো বাঙালিগো কোনো উন্নতি হইব না কুনুদিন! বৃহস্পতি আর রাহুর প্রভাব থিকা একসাথে মুক্তি পাইতে হয়। অহন আপনেরা পয়লাতেই পড়লেন রাহু লয়া। খালি এক গোমেদ পাথর লয়া আপনেগো কতটুকু লাভ হইব— তা ভাই কইতে পারুম না। কাজ না হইলে পরে কিন্তু দুইষেন না আমারে!
এভাবে তার ঠিক পরদিন জমানো টাকা নিয়ে ফকিরাপুলের কুদরতি জেমস হাউজে গিয়েছিল সাইফুল ও দুলাল। শেষমেশ প্রতিটা ৭ হাজার টাকা মূল্যের লালচে বাদামি রঙের সিলনি গোমেদ পাথর বসানো দুটো আংটি কিনেছিল তারা। রত্নপাথরের প্রতি ভক্তিতে গদগদ হয়ে দুলাল তখন সাইফুলকে বলেছিল: দেহিস রাহু কাইটা যাইব এই বার! আমাগো ব্যবসা উঠবই উঠব। দুলালের সে কথায় বিশ্বাস করেছিল সাইফুল। সে আবার দোকানে নতুন মাল তুলেছিল; মনোযোগ নিয়েই খদ্দেরের আশায় বসে থাকছিল দিনভর। তার মুদিদোকানে বেচাকেনা চলছিল ঢিমেতালেই। নিস্তরঙ্গ দোকানে বেড়ে উঠছিল ধেড়ে ইন্দুর ও নেংটি ইন্দুরদের বংশ। সেই সব ইন্দুর কলে পড়ছিল না; তারা ইন্দুর মারার বিষও খাচ্ছিল না কিছুতেই। প্রতিদিনই লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ইন্দুরদের মুদিদোকান থেকে তাড়ানোর জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল সাইফুল। তবু সাইফুলের আশা ছিল যে, আংটির বদৌলতে আলতাফ সাহেবের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে তার পুরনো খদ্দেররা জলদি ফিরে আসবে। তবে সপ্তাহ তিনেক ধরে খদ্দেরদের প্রত্যাবর্তনের কোনো নাম-নিশানা দেখা গেল না। বরং দেখা গেল, যে ক’জন খদ্দের নিয়মিতভাবে তার মুদিদোকানে আসছে, তারা আবার অন্য কিছু কিনতে সময় সময় পেছলেও যাচ্ছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটায়। এবং সে ঘৃণাভরে প্রত্যাশা করছিল— ভয়ঙ্কর কোনো একটা দুর্ঘটনা ঘটুক, ধরা যাক, ভূমিকম্পই হোক আর বেজমেন্টসহ ভেঙে পড়ুক আলতাফ সাহেবের নতুন অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংটা। তবে তা আর হয়নি। উল্টো পুঞ্জি ভেঙে খেতে শুরু করেছিল সাইফুল, দুলালও বটে। দিনের বেশির ভাগ সময়ে অনতিদূরের ঢালিপাড়ার বাসায় বউ-বাচ্চা নিয়ে শুয়ে-বসে থাকছিল সাইফুল। আর দুলাল তার মৃতপ্রায় মুদিদোকানে চা-সিঙাড়ার পাশাপাশি শাকসবজির বিক্রিবাটা চালু করেছিল।
এমতাবস্থায় সাইফুল দুলালকে জিজ্ঞাসা করেছিল: ধারদেনা কইরা পোখরাজের আংটি লমু নাকি একখান? ‘ফালায়া রাখ তর আংটি!’— এই বলে দুলাল তখন তিনদিন ধরে শাপশাপন্ত করে চলেছিল আলতাফ সাহেবকে। দুলাল বারবার সাইফুলকে বলছিল: স্টোক হইয়া হারামজাদা যিন অহনই আজিমপুর গোরস্তানে চইলা যায়। তিনদিন পরই অবশ্য স্তিমিত হয়েছিল দুলালের আস্ফাালন। তখন সে ঠাণ্ডা মাথায় হিসাব কষে সাইফুলকে বলেছিল যে, আলতাফ সাহেবের ডািপার্টমেন্টাল স্টোরের সাথে প্রতিযোগিতা করে বাজারে টেকা যাবে না। লেকসার্কাসের মানুষজনদের আয়-উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাদের রুচিও তখন পাল্টে গেছে। কাজেই এই ভালো যে সে আগামী চার-পাঁচ মাসের ভেতরে দোকানের মাল যতটুকু পারা যায় বেচে দিয়ে সে খোকনের টেলিভিশন কেবল নেটওয়ার্কের ব্যবসায় অর্থ লগ্নি করবে। দুলাল আরো বলেছিল: সাইফুল! তুই কী করবি তা ভাইবা দেখ ভাই! আর সাইফুল ভাবছিল, মুদিদোকানে সে যে পাঁচ লাখ টাকা লগ্নি করে রেখেছে তার সিংহভাগ তুলে আনতে হলে তাকে অপেক্ষা করতে হবে বছরের পর বছর। তাহলে কী করা? দুলাল তখন তাকে পরামর্শ দিয়েছিল: লেকসার্কাসের মতোন বড় লোকগো মহল্লায় আর মুদিদোকান চলব না রে, সাইফুল! তুই অন্য কুনু মহল্লায় গিয়া দুকান দে গা, যেই হানে অল্প পয়সার মানুষজন থাহে! ধর, তুই মধুবাজার না— হইলে রায়েরবাজার না-হইলে হাজারীবাগ গিয়া মুদিদোকান খুল্লি। ওইসব জায়গার চিপার ভেতরে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর যাইতে অহনও মেলা দেরি আছে।
দুলালের কথার বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছিল সাইফুল এবং সে সন্দিগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকেছিল তার আঙুলে ধারণ করা গোমেদ পাথরের আংটিটার দিকে। উত্তেজিত হলেও সে ভেবে বের করেছিল যে, সহসাই সে মুধবাজারনিবাসী তার বড় সম্বন্ধির সঙ্গে দেখা করবে। প্রথম কাজ হলো— কলাবাগানের ঢালিপাড়া থেকে বাসা পরিবর্তন করে সপরিবারে মধুবাজার চলে যাওয়া। তার পর সুস্থির হয়ে সে মধুবাজার এলাকায় একটা মুদিদোকান খুলতে চেষ্টা করবে এবং লেকসার্কাস এলাকার বর্তমান দোকান থেকে সে মালসামান সব নতুন দোকানে সরিয়ে নিয়ে যাবে। ধানমন্ডি উনিশ নম্বর থেকে পশ্চিমে ঢুকে গেছে মধুবাজারের সরু গল্লিটা। সেখানে কোনো রকমে দুটো রিকশা পাশাপাশি চলতে পারে। গল্লিটায় একটা মোটরকার ঢুকলে পরে তার পাশ দিয়ে কোনো রিকশার যাতায়াতের জায়গা পর্যন্ত থাকে না! ঢাকা শহরের তেমন একটা ঘিঞ্জি এলাকায় কেউ কোনো দিন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বসাতে যাবে নাকি? মনে তো হয় না!
পরদিন সকালে তার মুদিদোকান খুল্লে সাইফুল দেখেছিল, দোকানের মেঝে, আলমারিগুলোর ছাদছোঁয়া সব র্যাক এবং ফ্রিজগুলোর ওপর লাফালাফি করছে শত শত ক্ষুধার্ত ইন্দুর।






