‘কামান-ই-কিয়াম দার অমাদ বা-জিহ

ইয়েকি গুফত বা-সিতান, ইয়েকি গুফত দিহ’

(অর্থ—রাজকীয় কামান পরিপূর্ণ সাজে সজ্জিত। একজন বলল পাকড়াও করো, আরেকজন বলল ধরো।)

যুদ্ধের ময়দানের চিত্র বর্ণনায় ঐতিহাসিক বাদায়ুনি এ কাব্যের উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধ মানেই শোরগোল। তবে আপাতদৃষ্টিতে চরম বিশৃঙ্খলা মনে হলেও যুদ্ধের রয়েছে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও কৌশল। সুনিপুণ কৌশলের কারণে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। পরাক্রমশালী মোগলদেরও যুদ্ধ পরিচালনার সুনির্দিষ্ট ছক ছিল। যুদ্ধের ময়দানে সৈনিকরা সমবেত হওয়ার পর শিঙ্গা বেজে উঠত এবং একজন ঘোষক যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দিতেন। যুদ্ধের ময়দানে সৈনিকদের সারিবদ্ধ করাকে বলা হতো ‘সফ অরাস্তান’। ফার্সি ‘সফ’ শব্দের অর্থ সারি। ‘সফ অরাস্তান’ অর্থ সারিবদ্ধ করা। এ দায়িত্বে থাকতেন প্রধান বখশি তথা ‘বখশি-উল মামালিক’। যুদ্ধ আসন্ন হলে তিনি আক্রমণের রূপরেখা তৈরি করতেন, সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করতেন, প্রতিটি ভাগের অবস্থান নির্ধারণ করতেন এবং প্রতিটি দলের সেনাপতির নাম ঘোষণা করতেন। খসড়া তৈরি করে তা চূড়ান্তকরণের জন্য সম্রাটের কাছে পেশ করা হতো। সম্রাটের অনুমোদন পাওয়ার পর প্রধান বখশি পূর্বনির্ধারিত দিনে সম্রাটের সামনে সেনাদলের একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতেন। 

তারপর শুরু হতো যুদ্ধ। প্রথমে থাকত সেনাবাহিনীর ছোট একটি দল। তাদের বলা হতো কারাওয়াল। প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের মাধ্যমে গরম হতো যুদ্ধের ময়দান। তাদের পেছনে সারিবদ্ধভাবে থাকত গোলন্দাজ বাহিনী। তাদের রক্ষার দায়িত্বে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী বাহিনীকারীকে (রকেট ম্যান) মোতায়েন করা হতো। কামানগুলো শেকল দিয়ে এক সারিতে বাঁধা থাকত। তার কিছুটা পেছনে ডানে ও বামে সেনাবাহিনীর দুটি দল অবস্থান গ্রহণ করত। কিছুটা দূরত্বে থাকত সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় দল। সে দলের নেতৃত্বে থাকতেন স্বয়ং সম্রাট। তিনি রাজকীয় হাতির পিঠে বসে যুদ্ধের সার্বিক তদারকি করতেন। তার সামনে থাকতেন একজন প্রহরী। তাকে বলা হতো ‘ইলিমশ’। দুই পাশের দুই রক্ষীর নাম ‘তারাহ’। পেছনে কিছুটা দূরত্বে থাকে একজন প্রহরী। তিনি লটবহর ও নারীদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকতেন। তাকে বলা হতো ‘চন্ডবুল’। 

মোগল সেনাবাহিনীর অন্যতম শক্তি ছিল অশ্বারোহী বাহিনী। সে কারণে মোগলরা যুদ্ধের জন্য বাধাহীন উন্মুক্ত প্রান্তর বেছে নিতেন। অন্যথায় অশ্বারোহী সৈনিকদের পক্ষে ঠিকভাবে যুদ্ধ করা সম্ভব হতো না। পাহাড়ি অঞ্চলে মোগল সেনাবাহিনীকে অনেক সমস্যা পোহাতে হতো। সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের গেরিলাদের কাছে মোগল অশ্বারোহীদের নাকাল হতে হতো। এসব কারণে যুদ্ধের ময়দানে সামান্য ঝোপঝাড়ও তাদের বরদাশত হতো না।

অশ্বারোহী বাহিনীর পর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত গোলন্দাজ বাহিনী। এ বাহিনীর কামানগুলো এক সারিতে শেকলে বাঁধা থাকত বিধায় এর নাম ছিল ‘জনজিরা বন্দ’। এর অর্থ শেকলাবদ্ধ। কয়েক গজ দূরে ‘সুইভেল গান’ (এমন কামান, যার একটি অংশ ঘুরলেও অন্য অংশটি স্থির থাকে) স্থাপন করা হতো। এগুলোকে বলা হতো ‘রাহকালাহ’। এ কামানগুলোর বাহনের চাকা লোহার শেকল দিয়ে শক্ত করে বাঁধা থাকত। প্রতি দুটি সুইভেল গানের মাঝখানে পাঁচজন করে সৈন্য মোতায়েন করা হতো। তারা আবক্ষ বর্ম পরিহিত থাকত। 

সাধারণত প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর গর্জে উঠত কামান। প্রক্ষিপ্ত গোলা গিয়ে আঘাত হানত প্রতিপক্ষের সৈন্য শিবিরে। তবে অধিকতর শক্তিশালী কামানগুলো থেকে গোলা নিক্ষেপ করা এবং পুনরায় প্রক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করতে সময় আরো বেশি লাগত। কোনো কোনো কামানের ক্ষেত্রে প্রতি দুই গোলা নিক্ষেপের ক্ষেত্রে ৩ ঘণ্টা সময়ও লেগে যেত। এক্ষেত্রে মোগল সেনাপতি হায়দার কুলি খানের অধীন সৈনিকদের যোগ্যতা ও দক্ষতা অন্যদের ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কামান পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের দ্রুততা ও নিপুণতার কথা ইতিহাসে বিশেষ স্থান লাভ করেছে। তবে সম্রাট বাবরের সময়ে কামানের গোলা নিক্ষেপের হার অনেক কম ছিল। কনৌজের যুদ্ধে তার গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান উস্তাদ কুলি খান প্রথম দিন আটবার কামান থেকে গোলা নিক্ষেপ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দ্বিতীয় দিন সে সংখ্যা ষোলোয় পৌঁছেছিল।  তৃতীয় ও চতুর্থ দিনেও একই হার বজায় রাখতে পেরেছিলেন উস্তাদ কুলি খান। সম্রাট বাবর তার উচ্চকিত প্রশংসা করেছিলেন। কনৌজের যুদ্ধে উস্তাদ কুলি খান যে কামানটি ব্যবহার করেছিলেন, তার নাম ছিল ‘বিজয়ীর কামান’। চিতোরের রানার বিরুদ্ধেও কামানটি ব্যবহার করা হয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে এ কামানের সাফল্যের কারণে এর নাম রাখা হয়েছিল ‘গাজি’। যখন যুযুধান দুটি পক্ষের মধ্যে কামানের ব্যবহার শুরু হতো, তখন অবশিষ্ট সেনাবাহিনী কামানগুলোর পেছনে কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকত।

গোলন্দাজ বাহিনী সফলভাবে প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙে দেয়ার পর অশ্বারোহী বাহিনী তাদের কাজ শুরু করত। তারা দুই পাশ থেকে অস্ত্র সহকারে প্রতিপক্ষের সৈনিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। তলোয়ার, গদা ও বর্শা দিয়ে তারা শত্রুসেনাদের ঘায়েল করত। অনেক সময় তারা ‘ম্যাচলক’ নামে বিশেষ ধরনের বন্দুক ব্যবহার করত।

যুদ্ধক্ষেত্রে রণ হুংকারের বেশ গুরুত্ব ছিল। তার ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতো চারপাশ। মোগলদের রণ হুংকার ছিল ‘আল্লাহু আকবর’। সেই সঙ্গে তারা ‘দ্বিন’, ‘দ্বিন’ (অর্থ - ধর্ম) বলেও চিৎকার করত। সম্রাট আকবর যুদ্ধক্ষেত্রে ‘ইয়া মুয়িন’ বলে ডাক দিতেন। ‘মুয়িন’ আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম। এর অর্থ সাহায্যকারী। তাছাড়া ‘বা-কাশ’, ‘বা-কাশ’ বলেও সৈনিকরা হাঁক ছাড়ত। ফার্সি শব্দটির অর্থ ‘হত্যা করো’।

যুদ্ধক্ষেত্রে প্রধান সেনাপতি কিংবা সম্রাটের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান সেনাপতি পালিয়ে গেলে কিংবা নিহত হলে অথবা তাকে হাতির পিঠে দেখা না গেলে সৈনিকরা মনোবল হারিয়ে ফেলত। তারা আর যুদ্ধ করার অনুপ্রেরণা পেত না। অধিকাংশই তৎক্ষণাৎ যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে নিরাপদে পলায়ন করত। এতেই যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ণয় হয়ে যেত। এ কারণেই মোগলরা সামোগড়ের যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল। সে যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন যুবরাজ দারা শুকো। যুদ্ধের একপর্যায়ে তিনি ঘোড়ায় চড়ার জন্য হাতির পিঠ থেকে নেমেছিলেন। একইভাবে ১৭০৭ সালের ১৮ জুন উত্তর প্রদেশের জাজাউ, ১৭০৯ সালে হায়দরাবাদ, ১৭১২ সালের ১৫-১৮ মার্চ লাহোর, একই বছরের ১০ ডিসেম্বর আগ্রা, ১৭২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসানপুরে হওয়া যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ণিত হয়েছিল। জাজাউর যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি আজম শাহ এবং তার দুই পুত্র নিহত হয়েছিলেন।

বিজিত পক্ষের সম্পদের প্রতি বিজয়ী সৈনিকদের লোভ ছিল। অনেক সময় যুদ্ধ পরিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ার আগেই অনেক সৈন্য সেসব সম্পদ আহরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। সেই সুযোগে প্রতিপক্ষ তাদের আক্রমণ করে পর্যুদস্ত করে দিত। এভাবে মাঝেমধ্যে অনেক সময় বিজয়ও হাতছাড়া হয়ে যেত। 

যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক সময় সৈনিকরা পরস্পরকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করত। কোনো কোনো সময় অশ্বারোহী সৈনিকদের পদাতিক সৈন্য হিসেবেও ভূমিকা পালন করতে হতো। এ কৌশলকে বলা হতো ‘উতারাহ’। অর্থাৎ, ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে যুদ্ধ করা। 

যুদ্ধক্ষেত্রে হালকা অস্ত্র বহনকারী এবং ক্ষেত্রবিশেষে গেরিলা আক্রমণকারী সৈনিকদের বলা হতো ‘কাজাকি’। এ ধরনের বেশকিছু পরিভাষা যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহার করা হতো। আক্রমণ বোঝাতে ‘হাল্লাহ’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো। এটি সম্ভবত ‘হামলা’ শব্দের অপভ্রংশ।

অবশেষে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর ঢাক পিটিয়ে বিজয়ের ঘোষণা দেয়া হতো। এ ঘোষণা দেয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট এক বা একাধিক ব্যক্তি নিয়োজিত থাকতেন।

যুদ্ধের ময়দানে মোগলদের সেনাবিন্যাস ও যুদ্ধকৌশল সমসাময়িক অন্যান্য সাম্রাজ্যের তুলনায় উন্নত ও আধুনিক ছিল। তাই তারা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এক সুবিশাল সাম্রাজ্য নিজেদের অধীনে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু কালক্রমে মোগল শাসকরা সময়ের সঙ্গে তাদের সমর কৌশলকে এগিয়ে নিতে পারেননি। ফলে তাদের ক্ষয় শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে তারা শাসনক্ষমতা হারান। তথাপি মোগলদের স্বর্ণযুগে তাদের যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল এখনো পর্যন্ত গবেষক ও সমরবিদদের মনোযোগের কেন্দ্রে আছে।  

আহমদ শাকিল: লেখক