ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ। খুলনা থেকে কলকাতার দিকে সাইকেলে করে ছুটে চলেছেন এক ইংরেজ সাহেব। দীর্ঘ ৬২ মাইল পথ পেরিয়ে তিনি পৌঁছবেন বনগাঁয়ে। তাই খুব ভোরে বেরিয়েছেন। আগেই হিসাব কষা আছে, খুলনা থেকে প্রথম পৌঁছবেন ছয় মাইল দূরের দৌলতপুরে, তারপর সিদ্ধিপাড়া পেরিয়ে যাবেন ১৫ মাইল দূরের শবনারাতে। এখানে এসে তিনি দেখলেন, মূল সড়ককে ভেদ করে চলে গেছে রেলপথ, সৃষ্টি হয়েছে অনন্য এক দৃশ্যপটের। মনে হলো সামান্য সময়ের জন্য থামা যায় এখানে। তারপর আবার মাইল ১৫ পাড়ি দেয়ার পর পেলেন সিঙ্গিয়া। নওয়াপাড়া ও মাগুরার মাঝামাঝি আবারো সড়ক ক্রস করে চলে গেল রেলপথ। আরো মাইল দশেক পরে তিনি পেয়ে গেলেন যশোর স্টেশন।

অবশ্য এসবের সঙ্গে সঙ্গে আরো কিছু ছুঁয়ে গেছে তার দুই চোখ, যেমন—মাগুরা পেরোনোর পর পরই অনেকখানি রেলপথ ও সড়কপথ চলে গেছে সমান্তরাল। সাতসকালে এত সুন্দর পথ সাইকেলে পেরোতে পেরোতে তিনি যশোর এসে থামলেন সকালের নাশতা করবেন বলে। আর এর জন্য সেরা স্থান যশোর ডাকবাংলো। প্রতিবার সাইকেলের চাকা ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে তার মনের মধ্যে গেঁথে গেল শহরের বিভিন্ন জনভবন, গণগ্রন্থাগার, কারাগার, দু-দুটো কবরস্থান, চার্চ ও রঘুনাথের ছবিসংবলিত মন্দির— এসব। তিনি দেখলেন চাঁচড়ার রাজাদের পড় পড় বাড়ি আর দেখলেন তার পাশেই চোরমারা নামের বিশাল একটি পুকুর। অনুমানে ধরে নিলেন তিনি, এখানে আসলে প্রজাদের শাস্তি দেয়া হতো।

তারপর যশোর থেকে বনগাঁ আরো ২৭ মাইল। এ রাস্তা এত ভালো যে সাইকেল আরোহী পরবর্তী সময়ে তার বইয়ে লিখেছেন, Well metalled, level and shaded the entire distance, it is, perhaps, one of the best public ways in the Presidency। বনগাঁয়ে পৌঁছান তিনি ঝিকরগাছা ও বেনাপোল পেরিয়ে। যাওয়ার পথে তাকে মুগ্ধতার আবেশে বেঁধে ফেলে শার্শা অবধি তেঁতুল গাছের সারি, কখনোবা মনে হয় তিনি রয়েছেন কোনো উডল্যান্ডে। এরই মধ্যে তিনি পেরিয়েছেন কপোতাক্ষ নদ, পেরিয়েছেন নওভাঙা নদী আর শার্শায় এসে তেঁতুলের ছায়াতল দিয়ে যেতে যেতে অনুভব করেছেন আর মাত্র নয় মাইল দূরেই বনগাঁ, এ পথ এত ভালো যে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে। বনগাঁয়ের মুখেই ইছামতি নদী। তবে আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, সেখানকার ডাকবাংলোটি এ পথে বলতে গেলে সবার সেরা।

দীর্ঘ এ পথই যশোর রোড, কাগজে-কলমে যেটি তখন গ্রান্ড ট্রাংক রোডের অংশ। এ পথেই সাইকেল নিয়ে পরিভ্রমণে বেরিয়েছিলেন ইংরেজ সাহেব ডব্লিউ এস বার্ক। অবশ্য শুধু গ্রান্ড ট্রাংক রোড কেন, সারা বাংলাই সাইকেলে ভ্রমণ করেন তিনি। ১৮৯৮ সালে প্রকাশ পায় এ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা তার বই ‘সাইক্লিং ইন বেঙ্গল’। সাইকেল পর্যটকদের হ্যান্ডবুক হিসেবে বের হলেও এটি সম্ভবত বাংলায় প্রথম সাইকেলে ভ্রমণের ইতিবৃত্তও। সাইকেল এখন সহজলভ্য বটে, কিন্তু সেই উনবিংশ শতাব্দীতে তা আমজনতার যানবাহন হয়ে ওঠেনি। এমন একটি যানে করে সারা বাংলা পাড়ি দিতে দিতে বার্ক যে ছায়াময় পথ দিয়ে যান, তা যে কালক্রমে কত ইতিহাসময় হয়ে উঠবে, তা যদি অনুমান করতে পারতেন, তা হলে বার্ক হয়তো আরো একটু বিস্তৃতই করতেন এই যশোর রোডের বর্ণনাকে। শার্শায় রাস্তার দুই ধারে যে মোহনীয় তেঁতুলরাজির কথা বলেছেন তিনি, তার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। অনুমান করি, বৃক্ষ তেমন ভালো করে চিনতেন না বার্ক, তাই বর্ণনায় যোগ করেননি কালী পোদ্দারের লাগানো সব কড়ই গাছের কথা। শুধু এককথায় সেরে দিয়েছেন— অপূর্ব উডল্যান্ড দেখেছেন তিনি।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ইতিহাসও শেষ পর্যন্ত মহৎ এক ফিকশন। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট পাল্টায়, ক্ষমতাধরের অবসান ঘটে, সমসময় আর পারিপার্শ্বিকতা বিন্যস্ত হয় নতুন করে। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সেনাপতি শেরশাহ আর তার দুর্দমনীয় বাহিনীর ছুটে চলার জন্যে যে সড়ক-ই-আজম গড়ে উঠেছিল, তাকে তাই আর কেউ মনে রাখেনি। নতুন শাসকের দুর্মর লালসায় সেটি হয়ে উঠেছে গ্রান্ড ট্রাংক রোড। তা-ও শেষ পর্যন্ত থিতু হতে পারেনি। মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় দেখা দিয়েছে নতুন এক পরিপ্রেক্ষিত, শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে লোকমুখে প্রচারিত নামটিই স্থান করে নিয়েছে। শাসকের সড়ক-ই-আজম কিংবা গ্রান্ড ট্রাংক রোডের মৃত্যু ঘটেছে, জন্ম নিয়েছে জনগণের ‘যশোর রোডের’। একাত্তরে, আমাদের ইতিহাসের বড় এক সুসময়ে, বড় এক দুঃসময়ে এ পথ দিয়ে শরণার্থীদের ঢল নামে। পাকিস্তানি সেনাদের অব্যাহত গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিনৃত্য আর লুটপাটের ফলে উদ্বাস্তু, ভীত মানুষ ছুটে চলে এ পথ দিয়ে। এ সত্যকে হূদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন সুদূর আমেরিকা থেকে আসা কবি অ্যালেন গিনসবার্গও। তার কলম থেকে বেরিয়ে এসেছিল ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’, আর তা গান হয়ে আন্দোলিত করেছিল বিশ্ববাসীকে। তবে শুধু একাত্তর তো নয়, ভয়ানক সব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ও এ পথ ছিল সহায়হীন উদ্বাস্তু-শরণার্থীদের সম্বল। এ যশোর রোড কি ভয়ঙ্কর দূরযাত্রার পথই না ছিল ভারত ভাগের সাম্প্রদায়িক সব দাঙ্গার সময়। ১৯৬৪ সালেও ভয়ঙ্কর এক দূরযাত্রার পথ হয়ে উঠেছিল এটি, যখন পাকিস্তান সরকার মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে সৃষ্টি করেছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এ রোড দেখেছে সবকিছু ছেড়ে চলে যাচ্ছে মানুষ, সব কিছু ছেড়েছুড়ে আসছে মানুষ। যশোর রোড তা শুধু একটি পথ নয়, এটি নিরুপায় মানুষের স্থানান্তরের ইতিহাস, একটি পথের মানবিকতা ও মুক্তিকামীদের পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস এবং বিজয়ীদের স্বাধীন স্বদেশে আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়তে পড়তে ফিরে আসারও ইতিহাস।

দূর অতীতে যুদ্ধ আর রাজ্য সুরক্ষার স্বার্থে ১৫৪১ থেকে ১৫৪৫ সালের মধ্যে শেরশাহের তত্ত্বাবধানে বানানো হয়েছিল সড়ক-ই-আজম, যা বিস্তৃত হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে যশোর হয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া দিয়ে পাকিস্তানের পেশওয়ার হয়ে আফগানিস্তানের কাবুল অবধি। ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথটি তখন এ উপমহাদেশের পূর্ব অংশকে যুক্ত করেছিল পশ্চিম অংশের সঙ্গে। বারবার শাসক পাল্টেছে, সেসঙ্গে পথের নামও পাল্টেছে। নাম বদলানোর এ খেলা শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু হওয়ার পর ১৮৩৩ সালে এসে। কোম্পানি তখন এ রাস্তার সংস্কারকাজ শুরু করে। ১৮৬০ সাল পর্যন্ত চলে সংস্কারকাজ। তখন এটি হয়ে ওঠে গ্রান্ড ট্রাংক রোড। যশোরে ব্রিটিশ শাসকদের একটি বিমানবন্দর ছিল। না, যাত্রী পরিবহনের স্বার্থে নয়, শাসক ও প্রশাসকদের স্বার্থে, সামরিক স্বার্থে। তাই এ সংস্কারের সময় যশোর বেশ গুরুত্ব পায়।

পথ হয়েছে, জনগণ উপকৃতও হয়েছে। তার পরও নিশ্চিত করেই বলা যায়, মোগল কিংবা ইংরেজ শাসনামলের এ পথ সংস্কারের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রধানত রাজ্য শাসন ও বিদ্রোহ দমন করার প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক লুণ্ঠনের দুর্মর বাসনা। বার্ক সাহেব যে অত সুন্দরভাবে সাইকেল নিয়ে পরিভ্রমণ করতে পেরেছিলেন, তার বিশেষ কারণ অবশ্য কালীপ্রসাদ রায় নামের একটি মানুষ। যিনি বেশি পরিচিত ছিলেন কালী পোদ্দার নামে। ঊনবিংশ শতকের শুরুতে যশোর ছিল বলতে গেলে যোগাযোগহীন। ধুঁকে ধুঁকে নামকাওয়াস্তে একটি রাস্তা গ্রান্ড ট্রাংক রোডের অংশ হিসেবে কলকাতা থেকে যশোর হয়ে ঢাকা অবধি গিয়েছিল বটে, কিন্তু তার কোনো ঔজ্জ্বল্য ছিল না। ১৯১২ সালের যশোর জেলা গেজেটিয়ারে দেখা যাচ্ছে, ১৭৯৫ সালেও সেখানে ওই কলকাতা-যশোর-ঢাকার অনুজ্জ্বল অস্তিত্বটুকু বাদে আর ছিল যশোর থেকে ঝিনাইদহ হয়ে কুমারখালী অবধি আর চুয়াডাঙ্গা থেকে খুলনা অবধি রাস্তাটুকু। ১৮০২ সালে যশোরে নাকি রাস্তার মতো রাস্তা ছিল মাত্র ২০ মাইল। তাছাড়া কোনো নদীতেই উল্লেখ করার মতো সেতু ছিল না!

তবে এ চিত্র পাল্টে যায় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কালীপ্রসাদ রায়ের কল্যাণে। বিভিন্ন বর্ণনায় এ রকম বলা হয়েছে, মায়ের তীর্থ দর্শনের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য তিনি পথ নির্মাণ করেন, সে পথকে বৃক্ষশোভিত করে তোলেন। সৈয়দ রিয়াজুর রশীদের এক লেখায় পড়েছিলাম, রাজা প্রতাপাদিত্যের উত্তরপুরুষ, কালীগঞ্জের নলডাঙ্গার কালী জমিদারের বংশধর কালী পোদ্দারের মুষ্ঠি গলে নাকি কড়ি পড়ত না। কিন্তু কৃপণ হিসেবে খ্যাত এ সম্পদশালী মানুষটির অহংকারে লাগল, যখন তার মা গঙ্গাস্নানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে বড় নৌকায় চড়তে গিয়ে মাঝিদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হলেন। মাঝিদের এ প্রত্যাখ্যানের কারণ ছিল, তারা ধরেই নিয়েছিলেন, কৃপণ কালী পোদ্দারের মাকে গঙ্গাস্নানের জন্য পৌঁছে দিলে কোনো কড়ি মিলবে না। ভাঙা মন নিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে কালী পোদ্দারের মা ঘরে ফিরলেন। সন্তানের সামনেও তার চোখ থেকে অশ্রুবর্ষণ বন্ধ হলো না। আর স্তব্ধ, অস্থির, বিক্ষুব্ধ কালী পোদ্দার ঠিক করলেন, এমন ব্যবস্থা করবেন, যাতে তার মায়ের গঙ্গাস্নানে যেতে জলপথ ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না। এভাবে ১৮৪০ সালে শুরু হলো যশোরের বকচর থেকে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার গঙ্গাঘাট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজ। ১৮৪২ সাল অবধি চলে এ নির্মাণযজ্ঞ, আর তাতে ব্যয় হয় ২ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। তবে ঘটনা এখানেই শেষ হয় না। কারণ তার মা যশোদা দেবী এ ছায়াহীন পথ দিয়ে রোদ ঠেলে যেতে রাজি হলেন না। কোনো কোনো প্রতিবেদনে এমনও পড়েছি, বেহারাদেরও আপত্তি ছিল তীব্র রোদ ঠেলে এ পথ দিয়ে পালকি নিয়ে যেতে। মায়ের ইচ্ছা পূরণে ব্যর্থ হলে পাতক হবেন ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন কালী পোদ্দার। তবে মা যশোদা দেবীই সমাধান বের করে দিলেন তাকে। বললেন, রাস্তার দুই পাশে দ্রুত বর্ধনশীল কড়ই বা রেইনট্রি গাছ লাগাতে।

যশোর জেলা গেজেটে অবশ্য ফিকশনের মতো এ ইতিহাস লেখা নেই। গেজেটে বলা হয়েছে, বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কালীপ্রসাদ রায় মনোযোগী হন জনস্বার্থে তার সম্পদ ব্যয় করতে। যশোর থেকে গঙ্গা অবধি প্রয়োজনীয় সেতুসহ একটি পূর্ণাঙ্গ রাস্তা নির্মাণের কাজে নিয়োজিত হন তিনি। আর তাই পর্যায়ক্রমে সেতু নির্মাণ করেন যশোরের পূর্বে দইতলায় দইতলা খালের ওপর এবং ঢাকামুখী পথের দেড় মাইল পূর্বে ভৈরবত নীলগঞ্জে। ঝিকরগাছা ও বনগাঁয়ের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে কপোতাক্ষ ও ইছামতি নদীর স্রোতধারার উপরও কয়েকটি সেতু নির্মাণ করেন তিনি। ভবিষ্যতে এসব কাজের পুনঃসংস্কার যাতে নির্বিঘ্নে হতে পারে, সেজন্য ১৮৪৮ সালে কালী পোদ্দার ওই সময়ে প্রতি বছর ৩০২ টাকা আয় হবে, এমন চাষযোগ্য ভূমি দান করেন। তাছাড়া ঝিকরগাছার কাছে কপোতাক্ষ নদের ওপর ৯ হাজার টাকা ব্যয়ে এবং ইছামতি নদীর ওপর ১৮ হাজার টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণের উদ্যোগও নেন তিনি। এসব সেতু ও পথ পরে বিভিন্ন সময় নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে বটে, তবে তা বরং এ পথের আবেদনকেই বাড়িয়ে দিয়েছে। এ পথের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে রেলপথও।

ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে নাকি গ্রান্ড ট্রাংক রোড এখনো এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবেই ব্যবহূত হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। এখানে এ পথের আগের সেই আন্তর্জাতিকতা আর নেই।

যশোর রোডে অ্যালেন গিনসবার্গ শুধু দেখেছিলেন শরণার্থীদের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের অংশে পড়া যশোর রোডে অন্তহীন এক পথ হাঁটার দৃশ্য। দেখেছিলেন কাদাজলের মধ্যে, পথেপ্রান্তরে কী করে পড়ে আছে মানুষ। দেখেছিলেন যশোর রোড হয়ে উঠেছে বিপন্নতা, সহমর্মিতা ও বিদ্রোহের পথ; যে পথের মাধ্যমে দেশ ত্যাগ করে অসহায়, নির্যাতিত মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন বন্ধুরাষ্ট্র ভারতে। তবে তিনি আর তার সহযাত্রীরা দেখেননি লাখ লাখ মানুষকে এভাবে শরণার্থী ও বিপন্ন করে তোলা, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া দম্ভিত, নির্যাতক, নিপীড়ক পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কীভাবে পালিয়েছিল এ রাস্তা দিয়ে। সেই দৃশ্য দেখেছিলেন বাংলার কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। দেখেছিলেন কী করে ইঁদুরের মতো পিছু হটছে যশোর রোড দিয়ে নির্যাতক, গণহত্যাকারী পাকিস্তানি সেনারা। তার স্মৃতিচারণ থেকে আরো এক উত্তাপ খুঁজে পাওয়া যায় এ যশোর রোডের:

‘একাত্তরের ডিসেম্বরের ছয় কি সাত তারিখ, এতদিন পরে আর ঠিক মনে পড়ে না, সন্ধের মুখে আমি পাকিস্তানি বাহিনীর প্রথম ট্যাংকটি দেখতে পাই। দৌলতপুর কলেজের লোহার গেটের কাছে আমি দাঁড়িয়ে, দু’পা দূরে পুরনো যশোর রোড, তারপরে কলেজ রেলস্টেশন, ওখান থেকে খুলনা যাওয়ার নতুন বড় রাস্তা, তার মানে নতুন যশোর রোড। কলেজ গেট থেকে নতুন রাস্তার দূরত্ব, রেললাইনটা পেরোতে হলেও চল্লিশ গজ হবে কিনা সন্দেহ। ট্যাংকটা খুব স্পষ্ট দেখতে পাওয়ার কথা। কিন্তু শীতের বিকেল খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়, অন্ধকার নামার আগেই কোথা থেকে আসে কুয়াশার চাদর, ট্যাংকটা যতটা না দেখতে পাই, তার চেয়ে অনেক বেশি শুনতে পাই কর্কশ ভারী আওয়াজ আর অনুভব করি পায়ের নিচে মাটির কাঁপুনি। বিশাল একটা গুবড়ে পোকার মতো ট্যাংকের আকার আর দু’একটি সৈন্যের আবছা চেহারা এইমাত্র দেখা গেল। পেছনে লাগালাগি আরেকটি ট্যাংক, তার পেছনে আরো একটা। তারপরে একটির পর একটি। আলো নেই, সন্ধের ছাই রঙের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ দিকে, খুলনা শহরের দিকে যাচ্ছে। সমস্ত যশোর এলাকা থেকে এটা যে পাকিস্তানি বাহিনীর পিছু হটে আসা, সেটা তখনি বোঝার উপায় ছিল না। পালানোর সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী খেপা কুকুরের মতো আচরণ করতে পারে এটাও আমার আন্দাজ হয়নি। আদতে ওরা নয় মাস ধরে বাংলাদেশে খেপা কুকুরই ছিল, মানুষ ছিল বলা খুবই কঠিন। বরং পালানোর সময় হয়ে গিয়েছিল কোণঠাসা ইঁদুর।’... ... ...

‘মনে করে দেখছি, আমি প্রায় তিন ঘণ্টা গেটের দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেনাবাহিনীর এই পলায়নদৃশ্য দেখছিলাম। ভ্যানে, ট্যাংকে, জিপে নির্জন রাস্তা পরিপূর্ণ— শুধুই যন্ত্রের শব্দ, ইঞ্জিনের বিকট আওয়াজ, লোহার ঘষটানির কর্কশ শব্দ; কিন্তু মানুষের কণ্ঠ নেই। পুরো ব্যাপারটাই যেন দম-দেয়া, স্বয়ংচালিত। আমার কাছে প্রায় অনৈসর্গিক মনে হচ্ছিল। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল এ অন্তহীন যানবাহনের সারির মাথা খুলনা শহরে পৌঁছে গেছে— পেছনের দিকে কতদূর আছে, তা আন্দাজ করবার উপায় নেই। তখনো পর্যন্ত চমত্কার শৃঙ্খলা— কেউ কাউকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কোনো চেষ্টা করছে না।

কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, ট্যাংকের পিঁপড়ের গতি আমার একঘেয়ে লাগতে লাগল। হঠাৎ ফিরে পা চালিয়ে আমি একটু দূরে অধ্যক্ষের বাড়িতে ঢুকলাম। ভদ্রলোকের পরিবার সঙ্গে ছিল না, বাড়িটিতে তিনি একাই থাকতেন। নির্জন অন্ধকার ঘরগুলো পেরিয়ে দোতলায় উঠে তার ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকি। এক কোণে একটা হারিকেন থেকে লাল ম্যাটমেটে আলো আসছে, অধ্যক্ষ নিজের বিছানায় মরার মতো পড়ে আছেন। আমি উত্তেজিত গলায় বলি, স্যার, পাকিস্তানি আর্মি রিট্রিট করছে। কথাটা শুনেই তিনি স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে বিছানায় উঠে বসলেন, অতি দ্রুত ঝুঁকে লম্বা হাত বাড়িয়ে স্টেশনের দিকের জানালা খুললেন, তারপর ঠিক পাগলের মতো জানালার গরাদের ভেতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে পাকিস্তানি আর্মির উদ্দেশে ঘুষি ছুড়তে ছুড়তে বলতে থাকলেন, ‘জুতা মার্, জুতা মার্, জুতা মার্।’ এ রকম করে বাতাসে ঘুষি ছুড়তে ছুড়তে উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে এলে তিনি আমার দিকে ফিরে অনুচ্চার্য গ্রাম্য ভাষায় বললেন, মেয়ে মানুষের মাংস ছিঁড়ে খায় যে জাতির সৈন্য, সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য।’

কিন্তু পশ্চাত্পসারণও কি এতই সহজ? একের পর এক ট্যাংক, ভ্যান ছুটে এসে থেমে আছে স্তব্ধ হয়ে, হাসান তার চালচিত্র তুলে ধরেছেন, নিজের আবেগ তিনি মাঝেমধ্যে ধরে রাখতে পারেননি শত চেষ্টা করেও। ভীতি ছড়িয়ে পড়ছে, আকাশে উড়ছে বিমান, কেউ বলছে ভারতীয়, কেউ-বা বলছে চীনের। বোমা বিস্ফোরিত হচ্ছে নদীর ওপারে, জুট বেলিংয়ের গুদামে, কিন্তু শীতের ভৈরব পেরিয়ে তার একটি স্প্লিন্টার গেঁথে গেল সেই ট্রেঞ্চ কাটার সময় তোলা আলগা মাটিতে, যেটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সন্ত্রস্ত হাসান তার পরিবার-পরিজনের সঙ্গে। বোমা ফেলে বিমান চলে যেতেই তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, এখনই গ্রামের বাড়িতে চলে যাবেন। সেই গ্রামের বাড়ি যে খুব বেশি দূরে, তা নয়— যশোর রোডের ওপরেই দৌলতপুর থেকে যশোরের দিকে নয় মাইল দূরে তাদের বাড়ি। কিন্তু তাদের মনে হচ্ছিল, সেখানে গেলেই রেহাই পাবেন এ ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে রিকশায় করে গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা হলেন তারা। পথে গিজগিজ করছে পাকিস্তানি সৈন্য, যারা যেকোনো মুহূর্তে মেরে ফেলতে পারত তাদের। যেন শুশুকের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সেই কবির মতো তারা পেরোচ্ছেন এক কুমিরভরা নদী।

হাসান লিখেছেন, ‘বোমারু প্লেনগুলো বারবার ফিরে আসছে। ওদের এখন আর বুঝতে বাকি নেই যে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে বিমান আক্রমণের কামান-টামান কিছু নেই। কাজেই রাস্তার ওপর বোমা ফেলে তারা এই পুরো বাহিনীটিকে সহজেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। বিমানগুলো অনেক নিচে নেমে এসে রাস্তা বরাবর শূন্যে কড় কড় শব্দে চিরুনির মতো আঁচড়ে যাচ্ছে। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে রাস্তা ধরে একবার নিচের দিকে যাচ্ছে, আবার উঠে আসছে। ঘন ঘন ফিরে আসছে তারা। শব্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানিরা কাটা গাছের মতো রাস্তার পাশের ঢালুতে শুয়ে পড়ছে, মুহূর্তের মধ্যে মাটির মধ্যে মিশিয়ে দিচ্ছে শরীর।...আশ্চর্যের কথা এই: প্লেনগুলো একবারও বোমা ফেলল না কেন? শত্রুকে এর চেয়ে বাগে পাওয়া তো সম্ভব নয়! এতে কোনো সন্দেহ নেই যে পুরো পাকিস্তানি বাহিনীই সেদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত, তবে আমরাও যে কেউ বাঁচতে পারতাম না তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। অনভিজ্ঞ সাধারণ মানুষ হাজারে হাজারে মারা পড়বে শুধু এই বিবেচনাতেই কি সেদিন প্লেনগুলো বোমা ফেলেনি? আমি জানি না কিন্তু অন্য কোনো কারণের কথা তো আমি ভেবে উঠতে পারি না।’

হাসানের এ যশোর রোডের বর্ণনায় কোনো বৃক্ষ নেই, বড় রুক্ষ এ কথকতা; তার পরও সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর বিপর্যয়কর কিছু নেমে আসে না। তাহলে এমনই কি যশোর রোড— মানুষের মতো দানবকেও সে উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখতে পারে? আর উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখতে দেখতেই ন্যাড়া, বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়বে? যেমন মাঝেমধ্যেই ঘটে— কয়েক বছর ধরেই আমাদের নীতিনির্ধারকরা যেমন বারবার ঘোষণা করছেন, স্থগিত করছেন, ফের ঘোষণা দিচ্ছেন, ফের স্থগিত করছেন পৌনে ২০০ বছর পর কালী পোদ্দারের লাগানো সেসব বৃক্ষের মৃত্যুদণ্ড, যেসব বৃক্ষ মোহনীয় করে রেখেছে যশোর রোডকে। এমন হয়, কারণ কি ভারতে, কি বাংলাদেশে শাসকদের চরিত্র পাল্টে গেছে। তারা আজকাল পরিবেশের কথা বলেন, পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের কথাও বলেন। কিন্তু যত মধুর করেই বলুন না কেন, একসময় সত্যিকারের চেহারাটি বেরিয়ে আসে। বোঝা যায়, পরিবেশের সঙ্গে তারা ততটুকু পথই যেতে ইচ্ছুক, যতটুকু আসলে প্রকল্পবান্ধব, মুনাফাবান্ধব। তাই বারবার উদ্বাস্তু হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হয় যশোর রোডকে।