বছর দেড়েক আগে কসমোপলিটান ইউকে একটি ভুল সংবাদ পরিবেশন করেছিল। তারা জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা) পশ্চিমের রাশিচক্রকে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধন করেছে। নক্ষত্রের অবস্থানের তিন হাজার বছর অতিবাহিত হওয়ার কারণে এ পরিবর্তন। আর এমন খবরে জ্যোতিষশাস্ত্রে আগ্রহীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছিলেন। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছিল, নাসা রাশিচক্রের তারিখ প্রায় এক মাস এগিয়ে দিয়েছে এবং বৃশ্চিক ও ধনু রাশির মধ্যবর্তী স্থানে নতুন একটি রাশি প্রতীকও যোগ করেছে, যার নাম অফিউকাস। এই অফিউকাসকে ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় রাশিচক্র থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, নাসা রাশিচক্রে কোনো পরিবর্তন আনেনি। বরং তারা জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যকার পার্থক্যকে প্রকাশ করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর অক্ষের পরিবর্তনকে হিসাব করে নাসার বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা প্রকাশ করেছেন। নাসার হিসাবে নতুন যে সময় নির্ধারণ হয়, তাতে প্রায় সবার রাশিই বদলে গিয়ে আগেরটিতে চলে যায়।

জ্যোতিষশাস্ত্রে মানুষের রাশির প্রতীকের ওপর নির্ভর করে তার নানা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যকে নির্ধারণ করা হয়, তার ভবিষ্যৎ অনুমান করা হয়। তাই নাসার নতুন গবেষণা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হইচই পড়ে যায়। এসব বিশৃঙ্খলার মধ্যে নাসা কিছু ভুল বোঝাবুঝি পরিষ্কার করতে একটি বিবৃতি দেয়। নাসা একটু কৌশলী হয়ে বলেছে, তারা কোনোভাবেই ঐতিহ্যবাহী রাশিচক্রে কোনো পরিবর্তন আনতে চায় না। তারা বরং দেখাতে চেয়েছেন, বিজ্ঞান ও গণিতকে অক্ষরে অক্ষরে প্রয়োগ করলে রাশিচক্রের চেহারাটা কেমন হবে।

নাসার গবেষণার ফলাফল নতুন করে একটি পুরনো বিতর্ককে উসকে দিয়েছে, জ্যোতির্বিদ্যা এবং পর্যবেক্ষণ ও সাংস্কৃতিক পুরাণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যে পার্থক্য।

এ পার্থক্য বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে খুব স্বাভাবিক মনে হলেও জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাসী মানুষের জন্য একটু কঠিন বৈকি। রাশিচক্রে বিশ্বাসী মানুষের মন এতে একটু এলোমেলো হয়ে যাবে, তাদের পক্ষে পরিবর্তন মানা খানিক কষ্টকর তো বটেই। কারণ রাশিচক্রের প্রতীকগুলো হাজার বছর ধরে মানুষের চিন্তা, এমনকি আত্মপরিচয়ের ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। রাশিচক্র ও এর প্রতীকগুলো কেন মানবসমাজে এমনভাবে মিশে আছে, সেটা একটু খুঁজে দেখলে এই বিস্ময়টা আরো ভালোভাবে বোঝা যাবে।

রাশিচক্রের প্রতীকগুলো বিজ্ঞান, বিশেষত জ্যোতির্বিদ্যারই অংশ। রাশিচক্রের ১২টি প্রতীকই জ্যোতির্বিদ্যা বিজ্ঞানের ইতিহাস বিকাশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আর এই ইতিহাসকে ধারণ করতে নাসা অক্ষম। রেনেসাঁর আগ পর্যন্ত পশ্চিমা জ্যোতির্বিদরা আকাশে নক্ষত্রের অবস্থানকে নির্ণয় করতে রাশিচক্র ব্যবহার করতেন। এরপর বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে বিষুবীয় কো-অর্ডিনেশন ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যবহার শুরু হয়।

কারণ পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। সূর্য মহাকাশে যে অবস্থানে হাজির হয়, চাঁদও প্রতিরাতে তার কাছাকাছি জায়গায় দেখা যায়। সূর্যের অবস্থানের কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয় না। যে পরিবর্তন মানুষ তার চোখে দেখতে পায় সেটা বিভ্রম। পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘোরে।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ সূর্য ও বিভিন্ন নক্ষত্রের মধ্যে সম্পর্ককে পর্যবেক্ষণ করেছে। অনেক প্রাচীন সভ্যতাতেই নক্ষত্রকে ভিত্তি করে রাশিচক্র দেখা যায়। রাশিচক্রে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান সাগর কিংবা মরুভূমিতে পথ চলতে মানুষকে সাহায্য করেছে। এখনো বিভিন্ন গ্রহের অবস্থান ও মহাজাগতিক অনেক ঘটনার অবস্থান নির্ণয়ের জন্য নক্ষত্রের অবস্থানকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। জ্যোতির্বিদ্যার নানা শিক্ষামূলক উপাদানে এখনো রাশিচক্রের প্রতীকের ব্যবহার দেখা যায়। এ রাশিচক্রের গঠন একদিনে হয়নি; হাজার হাজার বছরের ইতিহাস, চর্চা এর সঙ্গে জড়িত। প্রাচীন সভ্যতাগুলোই তার বড় সাক্ষী। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই রাশিচক্রেরও যেন পথচলা:

 

রাশির প্রতীক যখন দুনিয়ার সংস্কৃতি ও শিল্পের অংশ

রাশিচক্রের ১২টি চিহ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শন। প্রতিটি প্রতীক স্বর্গের ৩০ ডিগ্রি করে স্থানকে নির্দেশ করে। প্রতীকগুলো যেহেতু দৃশ্যমান এবং সেগুলোর সঙ্গে অনেক পৌরাণিক গল্প জড়িয়ে আছে, তাই যুগে যুগে শিল্পীরা সেগুলোকে তাদের তুলির আঁচড়ে চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তুলেছেন। কেউ আবার খোদাই করেছেন প্রস্তরখণ্ডে। পশ্চিমে রাশির প্রতীক নিয়ে তৈরি হওয়া শিল্পকর্মগুলোর ভিত্তি মূলত গ্রিসের পুরাণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়: বৃষ রাশির প্রতীক ষাঁড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এথেন্সের রাজা, পৌরাণিক নায়ক থেসেয়াস এবং তার হাতে ভয়ানক জীব আধা মানুষ, আধা ষাঁড় মিনোটর বধ। মিথুন রাশি মনে করিয়ে দেয় ক্যাস্টর ও পোলাক্স নামের দুই ভাইয়ের গল্প। রশিচক্রে একটিই জড় চিহ্ন পাওয়া যায়, সেটি হলো তুলা রাশি। এটি গ্রিক পাতালরাজ্যের ন্যায়বিচারের দেবীর সঙ্গে সম্পর্কিত।

 

প্রাচীন গ্রিসের একজন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ‘পশ্চিমা রাশিচক্রের জনক’

গ্রিক রাশিচক্রের বিকাশ পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, কীভাবে প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষবিদ্যা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই প্রাচীন যুগের অনেক জ্যোতির্বিদই জ্যোতিষী ছিলেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রিক বহুশাস্ত্রবিদ ক্লডিয়াস টলেমি। তার রচিত গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যাবিষয়ক গ্রন্থ আলমাজেস্ত বিখ্যাত; এ গ্রন্থ অনেক আরব ও ইউরোপীয় বিজ্ঞানীকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু তার সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজটি হচ্ছে জ্যোতির্বিদ্যাসংশ্লিষ্ট গ্রন্থ টেট্রাবিবলোজ। জ্যোতির্বিদ্যাবিষয়ক টলেমির লেখাগুলো এতটাই প্রভাবসঞ্চারী ছিল যে, ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালগুলোয় সপ্তদশ শতক পর্যন্ত সেগুলো পাঠ্য ছিল।

টেট্রাবিবলোজ পশ্চিমা জ্যোতির্বিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছিল। টলেমি হেলেনিক রাশিচক্রের গ্রহ, বাড়ি ও প্রতীকগুলোকে যুক্তিসহকারে উপস্থাপন করেন এবং তারা সেই ব্যাখ্যা আজকের দিনে এসেও খুব সামান্যই বদলেছেন।

 

টলেমির গ্রিক রাশিচক্রের উদ্ভব মেসোপটেমিয়ায়

বর্তমান ইরাকের স্থানে ফোরাত ও দজলা নদীর তীরে দুনিয়ার প্রথম সভ্যতা গড়ে ওঠার প্রমাণ পাওয়া যায়। গ্রিকদের রাশি প্রতীকগুলোর উৎস খুঁজলে ফিরে যেতে হয় ওই সুমেরীয় সভ্যতায়। সুমেরিয়ার রাশিচক্রের ধারণা আক্কাদীয় সভ্যতার মধ্য দিয়ে আসিরীয়দের হাতে পৌঁছে। এখান থেকে তা যায় ব্যাবিলনীয়দের কাছে। তারপর সেখান থেকে পায় গ্রিকরা। আমরা আজ রাশিচক্রকে যেভাবে পাই, সেটা তৈরি হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে ব্যাবিলনীয়দের হাতে। আসিরীয় সভ্যতার বিশেষজ্ঞ লোরেনজো বের্দেরেম ব্যাখ্যা করে বলেছেন, রাশিচক্রের শুরু হয়েছিল তৃতীয় সহস্রাব্দে।

সুমেরীয়রা কীভাবে তাদের রশিচক্রের প্রতীকগুলো তৈরি করেছিল? তারা কি সেগুলো নিজেরাই তৈরি করেছিল, নাকি অন্যদের মতো তাদের থেকেও প্রাচীন কোনো উৎস থেকে সংগ্রহ করেছিল? উত্তর হবে দুটোই। কারণ সুমেরীয়দের তৈরি করা রাশিচক্রের প্রতীকের প্রাথমিক রূপ পাওয়া যায় তাদের আশপাশে। যেমন— ষাঁড় ও সিংহের প্রতীকগুলোর ব্যবহার সুমেরীয়দের শত্রু পূর্ব দিকের এলাম কিংবা মেটসামোরের সভ্যতায় দেখা যায়। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, রাশিচক্র বা তার কিছু অংশের জন্ম হয়েছিল মেসোপটেমিয়ার উত্তর-পশ্চিমে আর্মেনিয়ায়, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে। আর্মেনিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মেটসামোর, এটা ছিল একটি বাণিজ্যনির্ভর সভ্যতা। এখানে তিনটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার পাওয়া গেছে, যাতে কিছু খোদাই দেখা যায় এবং এ খোদাইগুলো রাশিচক্রসংক্রান্ত। এগুলো ব্যাবিলনীয়দের সহায়তা করেছিল বলে ধারণা করা হয়।

খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার অব্দে মেসোপটেমিয়ার জ্যোতির্বিদরা মুলাপিন (লাঙল) নামে নক্ষত্রদের একটি ক্যাটালগ তৈরি করেছিলেন। এটা জ্যোতির্বিদ্যার একটি টেক্সট বুক। এতে ব্যাবিলনের রাশিচক্রের ১২টি নক্ষত্রপুঞ্জের বিবরণী পাওয়া যায়। এ ক্যাটালগের সবচেয়ে পুরনো কপিটি কাদার ফলকে কিউনিফর্মে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে লেখা।

 

রাশিচক্রের চিত্রায়ণ শুরু হয়েছিল গুহামানবদের হাতে

অনেক গবেষকের মত হচ্ছে, কিছু রাশির প্রতীক এলাম কিংবা মেটসামোরের চেয়েও পুরনো। সাম্প্রতিক সময়ে পুরনো প্রস্তর যুগের কিছু গুহাচিত্র পরীক্ষা করে গবেষকরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। ফ্রান্সে পাওয়া ষাঁড়, ঘোড়া বা আরো কিছু প্রাণীর গুহাচিত্র থেকে গবেষকরা মনে করছেন, সেগুলো প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষের নক্ষত্রের সঙ্গে জড়িত। যদি তা-ই হয়, তাহলে কিছু রাশির প্রতীক যেমন বৃষের উদ্ভব ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার বছর আগে।

 

আলেকজান্ডারকে ধন্যবাদ

ব্যাবিলনের রাশিচক্র গ্রিক দুনিয়ায় পৌঁছেছিল আলেকজান্ডারের প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের দুটো উত্তরাধিকারী শহরের মাধ্যমে— মেসোপটেমিয়ার সেলুসিড সাম্রাজ্য ও আলেকজান্দ্রিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মিসরের টলেমিক রাজত্ব।

এটা ছিল হেলেনীয় কাল: ৩২৩ থেকে ৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এ সময়েই মেসোপটেমিয়ার নক্ষত্রপুঞ্জের টিকে থাকার চিত্র পাওয়া যায়: মেসোপটেমিয়ার সেলুসিড ও মিসরের দেনদেরা রাশিচক্র। এ দুই রাশিচক্রই পিকটোগ্রাফিক ঐতিহ্যের অংশ। এতে ১২টি রাশিচক্রের প্রতীকের সঙ্গে একই ধরনের আরো চারটি প্রাণীর চিত্র পাওয়া যায়: কাক, সাপ, ঈগল ও মাছ।

সেলুসিড রাশিচক্র হচ্ছে ১২টি কাদার তৈরি ট্যাবলেটের একটি সেট, যেখানে জ্যোতির্বিদ্যার কাজে রাশিচক্রের প্রতীক দেখা যায়। খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শতাব্দী আগের এমন তিনটি ট্যাবলেট এখনো টিকে আছে: একটিতে দেখা যায়, বৃশ রাশির ষাঁড়ের সঙ্গে গ্রিক পুরাণের আর্টেমিসের সঙ্গী প্লিয়াডেজ; সিংহের সঙ্গে কাক এবং এ কাক দাঁড়িয়ে আছে একটি জলজ সাপের ওপর; আরেকটিতে দেখা যায় কন্যা রাশির প্রতীককে।

ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জন রজার্স বলেন, ‘মিসরের দেনদেরাহ শহরে প্রাপ্ত রাশিচক্রটি হচ্ছে প্রচীনকালের আকাশের একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র। এটি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে তৈরি হয়েছিল।’ দেনদেরাহের হাথোর মন্দিরের ছাদে রাশিচক্রটি সংরক্ষিত ছিল। এ রাশিচক্রে দেখা যায় বিভিন্ন রাশির ক্ল্যাসিক্যাল প্রতীকগুলোর সঙ্গে মহাকাশের অন্যান্য নক্ষত্রের জন্য ব্যবহূত জনপ্রিয় মিসরীয় প্রতীকগুলো। কিছু রাশির প্রতীকের নাম গ্রিকো-রোমান আর অন্যদেরটা মিসরীয়। এ প্রতীকগুলোর চেহারা মিসরের টলেমাইক যুগে তৈরি হয়েছে, যাতে গ্রিকো-রোমান স্টাইলের ছাপ স্পষ্ট। তবে এগুলো সবই মেসোপটেমিয়ার সেলুসিড রাশিচক্রের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। একই সঙ্গে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে পাথরের ওপর তৈরি পিকটোগ্রাফের সঙ্গেও সেগুলোর সাদৃশ্য পাওয়া যায়। রজার্সের মতে, দেনদেরাহের রাশিচক্রের প্রতীকগুলোর অবস্থান মিসরে হলেও বোঝা যায় যে, সেগুলো মেসোপটেমিয়ার রাশিচক্রের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি।

 

ব্যাবিলনীয়রা প্রভাবিত করেছিল আরবদের...

গ্রিক প্রভাবের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যেও তৃতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক সময়ে রাশিচক্রের উপস্থিতি দেখা যায়। বিশেষত নাবাতিয়ান আরব ও আরামায়িকভাষীয়দের মধ্যে, যাদের সঙ্গে আছে আসিরীয় ও হিব্রুভাষীরা।

ইসলামের ইতিহাসের প্রাথমিক কালে দেখা যায়, আরব রাশিচক্রের নক্ষত্রপুঞ্জের নাম নেয়া হয়েছিল গ্রিক ও আরামায়িক ভাষা থেকে। তবে লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমেদ আল-জাল্লাদ জানিয়েছেন, প্রাচীন আরব রাশিচক্রের উৎস ব্যাবিলনীয় ঐতিহ্য। তবে আরবে ইসলামী যুগ শুরু হওয়ার আগেই ব্যাবিলনীয় ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দশম শতকের আরব জ্যোতির্বিদ আল-সুফি বিশ্বাস করতেন যে, ইসলাম আগমনের আগে আরবরা রাশিচক্র সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞাত ছিল।

আল-জাল্লাদ সিরিয়া, জর্ডান ও সৌদি আরবের মরুভূমিতে থাকা সাফাইটিক খোদাই লিপি নিয়ে গবেষণা করেছেন। এ লিপি বেদুইনদের। এ লিপি পর্যবেক্ষণ করে তিনি রাশিচক্রের ১২টি নক্ষত্রের উপস্থিতি দেখেছেন, যেগুলোর উৎস ব্যাবিলনে। আল-জাল্লাদ মনে করেন, প্রাথমিক কালে আরবরা রাশিচক্র সম্পর্কে জানত না। তবে এটা স্পষ্ট যে, আগে যা ধারণা করা হতো, তার চেয়ে উর্বর ক্রিসেন্টের সভ্যতার সঙ্গে বেশি সাংস্কৃতিক যোগ ছিল আরবদের।

 

...এবং হিব্রু

হিব্রু রাশিচক্রের নাম মাজ্জালোথ (নক্ষত্রপুঞ্জ) পরিণত চেহারা নেয় হেলেনীয় ও ইসলামী যুগের মধ্যবর্তী সময়ে। এতে বিভিন্ন সভ্যতা ও যুগের প্রভাব দেখা যায়— গ্রিক থেকে মেসোপটেমিয়া। এদের ১২টি প্রতীক ব্যাবিলন বা গ্রিক প্রতীকের সঙ্গে মিলে যায়। চতুর্থ ও ষষ্ঠ শতকের মধ্যে নির্মিত সিনাগগগুলোর মেঝেতে যে রাশিচক্রের মোজাইক পাওয়া যায়, সেগুলো পরীক্ষা করে দেখেছেন প্রত্নতত্ত্ববিদ র্যাচেল হাচলিলি। তিনি বলেছেন, সিনাগগের মেঝেতে থাকা এ রাশিচক্র স্থানীয় মানুষের জন্য দিনপঞ্জি হিসেবে ব্যবহার হতো। এর সাহায্যে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ হিসাব রাখত।

হিন্দু রাশিচক্র তৈরি হয়েছে স্থানীয় ও গ্রিক উপাদান থেকে এবং এটা অনেক বেশি নিখুঁত

হিন্দু রাশিচক্রের উদ্ভব খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ বা তারও আগে। এতেও গ্রিক প্রভাব দেখা যায়। বিজ্ঞানের ইতিহাস বিষয়ে আমেরিকান বিশেষজ্ঞ ডেভিড পিনগ্রি ও আরো অনেকে মনে করেন, ভারতীয় রাশিচক্রের অনেক উপাদানই স্থানীয়। বেদ হিন্দু ধর্মের গ্রন্থ ও ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন সাহিত্য। বেদে জ্যোতিষবিজ্ঞানের উল্লেখ আছে। এতে সময় নির্ধারণের জন্য নক্ষত্রপুঞ্জের চলনকে অনুসরণ ও অনুমান করা হতো।

জ্যোতিষবিদ্যা একই সঙ্গে হিন্দু জ্যোতির্বিদ্যাকেও ধারণ করে। এ জ্যোতির্বিদ্যা গ্রিকদের সংস্পর্শে বিকশিত হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে উত্তর-পশ্চিম ভারতে আলেকজান্ডারের সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে দুই সভ্যতার যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ মিচিও ওনো দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শতকের মধ্যে গ্রিক জ্ঞানকে ভারতে গ্রহণ করাকে ‘গ্রিক জ্যোতির্বিদ্যার সংস্কৃতায়ন’ বলে অভিহিত করেছেন। ভারত গ্রিক জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত জ্ঞানকে গ্রহণ করেছিল, যার মধ্যে টলেমি আমলের আগের সময়কার উপাদানও ছিল। লিখিত ও মৌখিক রূপ সংস্কৃতে হলেও রাশিচক্রে ব্যবহূত ছবিগুলো হলো গ্রিক ধাঁচের। যেমন— ধনু হলো তীর ও কুম্ভ হলো পানির পাত্র। তবে গ্রিকদের থেকে ভারতীয় রাশিচক্র একটি বিশেষ জায়গায় ভিন্ন— গ্রিক রাশিচক্র ব্যবহার করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয়, এতে গ্রহের অবস্থান নির্ণয় করা হয় বসন্ত বিষুবে সূর্যের অবস্থানের বিপরীতে। অন্যদিকে হিন্দু ব্যবস্থা ব্যাবিলনীয়দের সদৃশ। এরা অনেক বেশি স্থিতিশীল নক্ষত্রকেন্দ্রিক রাশিচক্রকে ব্যবহার করে। এ ব্যবস্থায় নক্ষত্রের অবস্থানকে স্থির ধরে গ্রহের অবস্থান নির্ণয় করা হয়। এ ব্যবস্থা গ্রিকদের সূর্যকেন্দ্রিক ব্যবস্থার চেয়ে অধিকতর নিখুঁত। খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতকে হিন্দু রাশি ব্যবস্থা গ্রিকদের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পদ্ধতিকে ত্যাগ করে। এ সময়ই হিন্দুরা গ্রিকদের জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষবিদ্যার জ্ঞান গ্রহণ করছিল।

হিন্দু জ্যোতিষবিদ্যা (বৈদিক জ্যোতিষবিদ্যা নামেও পরিচিত) এখনো জীবন্ত। অনেক ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার ডিগ্রি দেয়া হয়।

চীনা জ্যোতিষরা তাদের রাশিচক্র তৈরি করেছিলেন বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথের অন্তর থেকে

চীনা রাশিচক্রের নাম শেং জিয়াও (সদৃশ জন্ম)। এ ব্যবস্থা জাপান, ভিয়েতনাম ও কোরিয়ায়ও জনপ্রিয়। এর উদ্ভব খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে। গ্রিক কিংবা ব্যাবিলনের সঙ্গে এর সংযোগ অতি সামান্য। তবে এ সংযোগের সূত্র ধরেই গবেষকরা ব্যাবিলন থেকে চীনে সাংস্কৃতিক প্রবাহের সম্ভাবনাকে যাচাই করতে শুরু করেন। ব্যাবিলনীয় সভ্যতা চীনের চেয়েও অনেক প্রাচীন। এখানে সাদৃশ্য হচ্ছে, ১২টি রাশির প্রতীক পশু দিয়ে চিহ্নিত। এর মধ্যে শুধু ড্রাগনটিই পৌরাণিক, বাকি সব বাস্তব দুনিয়ার।

চীনের রাশিচক্র একটি দিকে অনন্য। কারণ এ চক্রে অন্য সবখানের মতো ১২টি মাস নয়, বরং ১২ বছরকে ব্যবহার করা হয়েছে। এ ১২ বছর ব্যবহার করার কারণ মূলত বৃহস্পতি গ্রহ। এ গ্রহ প্রাথমিক কালের চীনা জ্যোতির্বিদদের মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেত। তারা এ গ্রহকে ‘বছর গ্রহ’ (সাই-জিং) বলত।

খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার অব্দে চীনা জ্যোতির্বিদরাই প্রথম আবিষ্কার করেন যে, বৃহস্পতি সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ১২ মাস সময় নেয়, যাকে তারা এক ‘জুপিটার বছর’ নামে অভিহিত করে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক নাগাদ চীনারা আকাশকে ১২টি রাশি এলাকায় বিভক্ত করে। এর প্রত্যেক ভাগে বৃহস্পতি বছরে একবার অতিক্রম করে যেত।

চীনা জ্যোতির্বিদ্যায় রাশির প্রতীকের ভিত্তি চান্দ্র বর্ষপঞ্জি এবং মানুষের রাশি নির্ধারিত হয় কারো জন্মসালকে নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কেউ যদি ২০০৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারির মধ্যে জন্মগ্রহণ করে, তাহলে সে ইঁদুর বর্ষে জন্মেছে।

এ ব্যবস্থা অনুসারে বছর শুরু হয় একটি রাশি প্রতীকের প্রভাবে। একই বছর জন্ম নেয়া সবার ভাগ্য তাদের জন্য নির্দিষ্ট প্রতীকের ওপর নির্ভর করে। যেমন ইঁদুর বর্ষে জন্ম নেয়ারা উচ্ছল, বুদ্ধিমান, পরিশ্রমী হবে।

 

গ্রিক বা ব্যাবিলনীয় রাশিচক্র রেশমপথ ধরে চীনে এসেছিল...

সিল্ক রোড বা রেশমপথের যুগে রাশিচক্র কিংবা আরো অনেক বিষয়ে মেসোপটেমিয়া ও চীনের মধ্যে জ্ঞানের আদান-প্রদান হতো। মধ্য এশিয়া হয়ে এ পথ ধরে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংযোগ গড়ে উঠেছিল। চীনের পক্ষে এ সড়ক নিয়ে আগ্রহী হয়েছিলেন সম্রাট উ। তিনি পশ্চিম হান বংশীয় শাসক ছিলেন। উ পশ্চিমা দেশের উদ্দেশ্যে ঝ্যাঙ কিয়ান নামে একজন বিশেষ দূত প্রেরণ করেছিলেন। ঝ্যাঙ ফারগনা, সোগদিয়ানা, ব্যাকট্রিয়া (আলেকজান্ডার-পরবর্তী গ্রিকো ব্যাকট্রিয়া সাম্রাজ্য) সফর করেন। তিনি উত্তর ভারতের সিন্ধু নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ও পার্সিয়ান সাম্রাজ্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। তার সংগ্রহ করা তথ্য থেকে চীনা প্রশাসন বিদেশের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলতে আরো আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফলে সিল্ক রোড রোম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এতে রোমানরা সিল্ক রোড দিয়ে আসা চীনের সিল্ক ও মসলা কিনতে শুরু করেন। আর তাদের কাছ থেকে বণিকরা নিত কাচের পুতি, মালা। 

রাশিচক্রের সময় নির্ধারণ নিয়ে দুটো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছিল সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে চীনের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে— একটি হেবেই প্রদেশের জুয়ানহুয়া সমাধিক্ষেত্রে, অন্যটি গানসু প্রদেশের দুনহুয়াংয়ের ম্যাংগো কেভে। এগুলো নিয়ে বিশদ গবেষণা করেছেন স্যান দিয়েগো মিউজিয়াম অব আর্টের পূর্ব এশিয়ার শিল্প নিদর্শনের কিউরেটর ডায়ানা ওয়াই. চৌ।

জুয়ানহুয়া সমাধিক্ষেত্রে সমাধির ছাদে যে ম্যুরাল পেইন্টিং পাওয়া গেছে, তা দ্বাদশ শতকের এবং সেগুলো ব্যাবিলনীয় বা গ্রিক রাশিচক্র। ছাদে থাকা রাশিচক্রের প্রতীকগুলোর সঙ্গে দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী চীনা নক্ষত্র। ডায়ানা ওয়াই. চৌয়ের মতে, এটাই সম্ভবত চীনের ইতিহাসে প্রথম পরিপূর্ণ রাশিচক্র।

গোবি মরুভূমির কাছে সিল্ক রোডের স্থাপনার কাছে আছে মোগাও কেভস। চতুর্থ শতকে ধ্যান করার জন্য বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা এসব গুহা খনন করেছিল। হাজার বছর ধরে আরো অনেক গুহা খনন করা হয়। সব মিলিয়ে এখন গুহার সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এসব গুহায় এমন অনেক ম্যুরালচিত্র আছে, যা চীনের সমগোত্রীয় শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

৬১ নং গুহায় আছে একটি বুদ্ধ তেজপ্রভা। এর পেছনে আছে ২৮টি চীনা অ্যাস্ট্রলজিক্যাল নক্ষত্র এবং এগুলোর সঙ্গে আবার দেখা যায় ব্যাবিলনীয় প্রতীক।

 

ঘটনা না প্রমাণ...

চীনে ব্যাবিলনীয় রাশিচক্রের চিত্র দেখা যায় ডায়াগ্রাম, স্কেচ আকারে। বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, চীনা জ্যোতিষরা ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিদ্যার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তার পরও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, চীনা জ্যোতিষবিদ্যা ভিনদেশী প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল। কিন্তু ব্যাবিলনের সঙ্গে চীনের রাশিচক্রের সাদৃশ্য কোনোভাবেই উপেক্ষা করার উপায় নেই।

পশ্চিমা রাশিচক্র তাদের প্রতীকগুলো গ্রিসের ক্লাসিক্যাল যুগের চারটি মৌলিক পদার্থের ধারণার অনুসারে বিভক্ত— অগ্নি, মাটি, বাতাস ও পানি।  অন্যদিকে চীনা রাশিচক্র পাঁচটি উপাদানে বিভক্ত— অগ্নি, মাটি, পানি, কাঠ আর ধাতু। কোনো ব্যক্তির নিজস্ব জ্যোতিষ ঠিকুজি তৈরি করতে রাশিচক্রের ভূমিকা বিষয়েও চীন ও ব্যাবিলনীয় পদ্ধতির সাদৃশ্য দেখা যায়। এসব সাদৃশ্যের ভিত্তিতেই চীনা জ্যোতিষবিদ্যায় গ্রিস ও ব্যাবিলনের প্রভাবের বিষয়টি নিশ্চিত বলে মনে করা হয়। তবে ডেভিড প্যাংকনিয়ারের মতো একুশ শতকের অনেক পণ্ডিত কেন যেন বিষয়টি মানতে নারাজ!

 

সূত্র: আরামকো ওয়ার্ল্ড